Skip to main content

Full text of "Upanishad O Rabindranath"

See other formats


উপনিষদ ও রবীক্ঞনাথ 


হিরগ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় 








নবপত্জ প্রকাশন ।কলকাতা- 


প্রথম প্রকাশ £ ১ জানুয়ারি, ১৯১৫৯ 


প্রকাশক £ প্রস্ল বনজ 
নবগপন্ত প্রকাশন 
৮ পটুয়াটোলা লেন | ক্িকাতা-৭০০০০৯ 


ুদ্রক £ নিউ এজ 'প্রশ্টার্স 
৫৯ পটুপাটোলা লেন | কালিকাতা-৯ 


প্রচ্ছদ £ সুবোধ দাশগদগ্ত 


পঁচিশ ডাকা 


12214751709 0 7945511508৭ 85114 
8৪৬ 21088177008 83000991৮. 


ভুমিকা 


উপনিষদের দর্শন ও রবান্্রনাথের দর্শন আমাকে আজীবন আকর্ষণ করেছে। 
এই দুই দর্শনকে যথাসাধ্য হাদয়হ্ম করবার চেষ্টা করেছি। তাদের গভীরে 
প্রবেশ করে তাদের সাঁহত 'নাবড় পাঁরচয় ঘটেছে এবং ফলে তাদের প্রকৃতি 
সম্বন্ধে যে ধারণাটি মনে গড়ে উঠেছে তাকে স্থায়ী রুপ দেবার জন্য দুটি 
গ্যতগ্ গ্রশ্থ রুনা করোছি। প্রথমাঁটর নাম দেওয়া হয়োছিল--'উপাঁনিষদের 
দশন', ছিতীয়টির--“রবীপ্রদর্শন । 


এই দুটি দর্শনের প্রকৃতিগত সাদৃশ্য এত আঁধক পাঁরলক্ষিত হয়েছে যে 
পরবতখকালে মনে হয়েছে যে তাদের একাটি তুলনামূলক আলোচনার প্রয়োজন 
আছে। এই প্রয়োজনীরতাবোধই আমাকে বর্তমান গ্রশ্থ রচনায় প্রণোদিত 
করেছে। এই দ্বিতীয় স্তরের আলোচনাই ষেন প্রাচীন উপানিষদের দর্শন এবং 
রবাদ্্নাথের দর্শনের আলোচনাকে পারিপূর্ণ করে। নুতরাং এই তিনটি গ্রষ্থকে 
পরস্পরের সাঁহত 'নাঁবড়ভাবে সংযন্ত বলে ধরতে হবে। তাদের এই ফুগ্ম- 
দশ'নের আলোচনার ্রয়ীরপ বলা যায় । 


রবান্দ্ুনাথ উপানষদের বাণীর সন্ছে আশৈশব পাঁরাচিত 'ছিলেন। পরবতাঁ 
জখবনে তার প্রাতি গভরগাবে শ্রম্ধাবিষ্ট হয়ে, তা সযত্বে পাঠ করে, তার মর্ম 
হনয়ঙ্ছম করেছিলেন। উপানিষদের বাণীর মানুষের মনকে উধ্বমুখণী করবার 
অপরিসীম শান্তর বিষয় অবাহত হয়ে পাশ্চাতা জগতে তার প্রচারকের ভূমিকাও 
[তান গ্রহণ করোছলেন। তবু একথা বলা যায় না যে উপনিষদের চিশ্তার 
দ্বারা তিনি প্রভাবাদ্ধত হয়েছিলেন। একথা গঠ্রিক যে তাঁর ধমনশতে বোঁদক 
খাষির রন্তধারা প্রবাহিত ছিল। উত্তরাধিকার সংশ্নরে তাঁদের দূদ্টিভ্গিও তিনি 
পেয়েছিলেন । তবু মনে হয়, অতীরস্তভাবে তাঁর নিজস্ব একটি মাঁতগাতি ছিল। 
এই দুটি শান্ত পরস্পরের উপর প্রভাব বিস্তার করে তার অধ্যাত্মচিশ্তাকে রূপ 
দিয়োছল। ফলে দেখি একটি বিচিন্ত বাপার ঘটেছে । রুবগন্দ্রনাথের দাশশনক 
চিন্তা কোথাও উপনিষদের চিন্তার অনুসরণ করেছে, কোথাও দরে সরে গেছে । 
যেখানে অনুসরণ করেছে সেখানে যেন উপনিষদের খাষরই বাণ? আরও বারা 
ভাষায় এই নৃতন খাঁধর মুখে শুনাছি মনে হয়। যেখানে তা দরে সরে গেছে 
সেখানে আমরা নূতন জুরে নূতন কথা শুনতে পাচ্ছি। 


বত'মান গ্রন্থে উভয় চিন্তার তুলনামূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে সাদশ্য ও 
পার্থকোর পরিপূর্ণ চিত্রটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। ফলে আমরা 
জাবিষ্কার করে বাঁস যে রধাশ্নাথের দর্শন উপনিষদের বাপারই নভদ রপ।” 


আমরা যেন তখন তাঁর মধ্ো প্রাচীন ধৃগের ধাধি-কবির নবতম আবিভবি 
আবার করে বসি। 


এই গ্রম্থটি প্রকাশনের ভার 'নবপন্ত প্রকাশন' সংস্থার কর্ণধার শ্রীপ্রসম 
বসু গ্রহণ করে আমাকে বিশেষভাবে ধাণী করেছেন । আমাদের দেশের প্রাচীন 
সংস্কাতির প্রচার, বিশেষ করে সংগ্কৃত 'সাহিত্াকে সহজলভ্য করে তিনি একটি 
অনূসরণযোগ্য দক্টাম্ত চ্ছাপন করেছেন। আমার বম্ধু শ্রীজ্যোতিভূষণ চাকা 
এ-বিষয় আমাদের সংযোগ শ্থাপন করে সহায়ত করেছেন । তাঁর খণও কৃতজ্- 
চিত্তে স্মরণ কারি। 


1হরপ্ময় বন্দোপাধ্যায় 


পরম শ্মেহতাজন 
গ্রীমান রমেজ্খনাথ মল্লিককে 


সূচিপত্র 


প্রথম অধ্যায় । প্রাথামক কথা 


প্রাচখন উপাঁনিষদ 'নিবচিন ১। উপানষদের ব্রক্ধবাদ ১৫। উপনিষদের 
শ্রেয়বাদ ২১। রবীন্দ্ুনাথেব দাশশীনক চিম্তাবঃস্বরূপ ২৫ । প্রস্তাবিত 
আলোচনারীতি ৩৩ 


দ্বিতীয় অধ্যায় । ব্রহ্ষবাদ 
উপানষদের জিজ্ঞান্ত দৃষ্টিভক্ষি ৩৬1] কর্মকাণ্ড হতে জ্ঞানকাণ্ডে 


উত্তরণ ৪০। ব্রক্ষবাদেব প্রাতি রৰাদ্দ্রনাথেব আকষণ ৪881 জশবন- 
দেবতাতত্ব ও ব্রক্ষবাদ ৫১ 


তৃতীয় অধ্যায় ॥ দ্বৈতভাবতত্ব 
দ্বৈতভাব ও মায়াবাদ ৬৫। ব্রঙ্ষবাদ ও মায়াবাদ ৭৯। রবান্দ্রদর্শনে 
মায়াবাদের প্রাতিবাদ ৭৮। 'বি"বরচনায় মানবমনের ভুমিকা ৮& 

চতুর অধ্যায়। আনম্দবাদ 
প্রার্থমক কথা ৯৪॥ উপাঁনিষদের আনন্দবাদ ৯৯। রবাশন্দ্রনাথের 
আনম্দতত্ধ ১০৯। উভয় 'চম্তার তুলনা ১২২ 

পণ্ঠম অধ্যাক্স । মৃতু ও অমৃত 
মৃত্যুরহস্য ৯২৫ । উপনিষদের মৃত্যু সম্পর্কিত চিন্তা ১২৮ । রবাদ্দ্ু- 
নাথের মৃত্যু সম্পকিতি চিন্তা ১৪৬ । উভয় চিষ্তার তুলনা ১৬০ 

ঘন্ঠড অধ্যায় । শ্রেয়তদ্ব 
প্রাথামক কথা ১৬৮। উপানধদের শ্রেয়বদ ১৭৩ । রবাস্্রনাথের বিশ্ব 
মানবতদ্ব ১৯৮৪ । উভয় চিন্তার তুলনা ১৯৩ 

সপ্তম অধ্যায় । মানাধকতা 
উপনিষদের মানবিকতা ১৯৯ । রবান্দ্রনাথের মানবিকতা ২১০। উ্ভা 
চিন্তার তুলনা ২২৩ 

গস্টঙস অধ্যায় । আলোচনা 
পবের 'পিপ্ধান্তের গ্রদ্থন ২৩১। সিপাম্ত ২৪৭ 


গ 1০০4 প্রথম অধায় গগগ৭গ 
প্রাথমিক কথ 


এক 
প্রান উপনিষদ নিবাচন 


বৈদিক যুগের শেবভাগে বেদে আশ্রয় করে প্রাচীন উপনিষদগ্খলি 
ধীরে-ধীরে গড়ে উঠেছিল ॥ বেদের সংহিতা অংশে ভার জন্ম, ব্রাহ্মণ 
ও আরণাক অংশে তাব পরিবর্ধন । বেদের যঙ্জকে কেন্দ্র কর যে 
আনুষ্ঠানিক পব গড়ে উঠেছে, তার থেকে উপনৈষদকে প্থক করবার 
জন্য তাকে কর্মকাণ্ড বলে সূচিত করা হয়েছে এবং উপনিষদকে জ্ঞান- 
কাণ্ড বলা হয়েছে । বেদের মধোই যেন ছুটি ধারা পাশাপাশি গড়ে 
উঠেছিল--একটি বৈদিক দেব-দেবীর স্তর্তি নিবেদনে ব্যাপূত, মন্থটি 
বিশ্বরহশ্াকে ভেদ করবার আকুতি হতে সঙজাত তর জ্ঞানতৃষ।। এই 
জ্ঞানতৃষ্ণাই প্রবতাঁকালে আরণ্যকের যুগে প্রাধান্য পেয়েছিল এবং 
বিশুদ্ধ দার্শনিক জ্ঞানের অন্বেষণে পরিপূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করে- 
ছিল। তারই পরিণত হলে! উপনিষদ । ত! €য-ততত্ব প্রচার করে 
তাকে বল। হতো ত্রন্গবাদ এবং তার সম্পকিত বিদ্ভাকে বলা হতে! 
ব্রহ্মবিষ্তা । 

এই উপনিষ/দর বৈদিকধুগে অভাবনীয় প্রতিপত্তি ও মর্যাদ৷ ছিল। 
উপনিষদেই গল্প আছে যে রাজধি জনক এই ব্রহ্গবিগ্ভালাভের 
জন্যা যাজ্ঞনন্ক্য নামে এক বিখ্যাত খধির শিষ্ত্ব গ্রহণ করেছিলেন । 
উপনিষদের মৌলিক বচনগুলি অভ্রান্ত সত্য বলে গৃহীত হতো । তাই 
দেখি ষড়দর্শনের যুগে তাদের একটি বিশেষ মধাদা দেওয়া হয়েছে 


উপ্পানযদ--১ 


এবং আগ্তবচন হিসাবে বিভিন্ন দার্শনিক তথ্যের সমর্থনে উদ্ধৃত করা 
হয়েছে। 

আমার্দের দেশে একটি রীতি প্রচলিত ছিল যে কোনও গ্রন্থ 
অত্যধিক মর্যাদায় প্রতিচিত হলে ব্যক্তিবিশেষ তার নিজস্ব মতকে 
সহজে প্রচার করবার উদ্দেশ্থে সেই নামে তাকে প্রচার কবত। আবও 
এক উপায় ছিল প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থকে নিজের প্রচারিত তত্বেধ অনুকূলে 
ব্যাখ্যা করে একই উদ্দেশ্য সাধন করা। দ্বিতীয় রীতিব সুন্দৰ উদাহবণ 
মেলে ব্রন্মস্থত্র ও গীতা সম্পর্কে। উভয় গ্রস্থেবই ভিন্ন-ভিন্নভাবে বিশেষ 
দার্শানিক মত প্রতিষ্ঠাব জগ্চ ব্যাখ্যা কব! হযেছে। ত্রন্মস্ত্রেব যেমন 
অদ্বৈতবাদেব ভিত্তিতে ব্যাখা! আছে, তেমন বৈষ্ব মতেব অনুমোদিত 
ব্যাখাও আছে । গীতাব ব্যাখ্যার বৈচিত্র্য মারও বেশি । উপনিষদেখ 
ক্ষেত্রে প্রথম বীতিটি বেশি বকম অনলম্বিত হয়েছিল । ফলে দেখা যায়, 
যেমন প্রাচীন ব্রহ্মবাদেব ব্যাখ্যাঘ নিবেদিত উপনিষদ আছে, তেমন 
যোগদর্শনেব দ্বাবা প্রভাবান্বিত সন্নাসবাদও উপনিষদ নামে প্রচাহ্তি 
হয়েছে। আবাব পুবাণেব যুগব ভাক্ততত্ব বাব প্রভাবান্বত নানা 
উপনিষদ আছে এইসব দেখেই মহষি দেবেন্দ্রনাথ উপনিষদ নামে 
প্রচাবিত বে ন্ছু গ্রন্থ আছে সেঞ্চল পাঠ কবে বলেছিলেন চয, 
অবস্থাটি এমন বিজ্রান্তকব যে এ যেন “কণ্টকাবণ।? | 

এই পবিস্থিত উপনিষদেব 'মালোচনায় একটি প্র।থনিক সমস্থ।ব 
স্থষ্টি কবে। কাবণ প্রাচীন উপনিষদগ্চলিকে অবলন্থন কবে যে ত্রহ্ম 
বাদ বিকাশলাভ করেছিল তার সঙ্গে ববীক্দ্রনাথের দার্শনিক চিগ্তাব 
তুলনামূলক া'লোচনাই বর্তমানে আমাদেব আলোচনার বিষয় । 

স্থতরাং আমাদের প্রথম কর্তব্য হয়ে পড়ে এই প্রাচীন উপনিষদ- 
গুলিকে পৃথক কবে চিহ্নিত কবে নেওয়!$; কাবণ তাদেখ উপব ভিত্তি 
করেই ব্রহ্মবাদ সম্বন্ধে তাব পরিচায়ক তথা আমাদের স গ্রহ করে 
নিতে হবে। ইতিমধ্যে যেটুকু আলোচনা হয়েছে তা হতেই এ-কথ। 
পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে উপনিষদগুলি তিনটি শ্রেণীতে পড়ে £ 


১৩ 


১। বৈদিক যুগের প্রাচীন ব্রহ্মবাদী উপনিষদ, 
২। ফড়দর্শনের যুগের যোগদর্শন-প্রভাবান্ধিত যোগ ও আঙ্জ্যাস- 
বাদী উপনিষদ এবং 

৩। পৌরাণিক যুগের ভক্কিবাদী উপনিষদ । 

যত সময় আঁতঙবাহিত হয়েছে উপনিষদনামধারা গ্রন্থের সংখ্য। 
তত বেডে গেছে। ডয়মেন অনুসন্ধান কবে দেখেছেন যে শংকরাচার্ষ 
তার বিভিন্ন ভাষ্যে যতগুলি উপনিষদ হতে আগ্তবচন উদ্ধৃত করেছেন 
তাদের সখ! চোদ্দ।১ সম্ট শাজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র দারাশিকো। 
যে উপনিষদগুলির ফারাস ভাবায় অনুবাদ কবেন তার সংখা! ছল 
পঞ্চাশ । মুক্তিকক উপনিষদে একশো আটখানি উপনিষদের উল্লেখ 
আছে। বোম্বাই-এব নির্ণয়সাগর প্রেস হতে যে উপনিষদ সংকলন- 
গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে তার নবতম সংস্কবণে একশো! কুড়খানি উপনিষদ 
স্থান পেয়েছ। এখন আমাদের কততবা হলো এদেব ভিতর থেকে 
সেই উপনিষদগ্চলি নিবাচন করে নেওয়া যেগুলকে ব্রহ্মবাদী উপনিষদ 
হিসাবে গ্রহণ কব। যাঁয়। 

সৌভাগ্যক্রমে এই নিরাচনকার্ষে সাহায্য করতে পারে এরকম 
ছুটি অনুকূল অবস্থা পাওয়া যায়। প্রথম কথা, এই প্রাচীন উপনিষদ- 
গুল বৈদিক সাহি:ত্যব অঙ্গ হিসাবে গড়ে উঠেছিল । সুতরাং যেগুলি 
বৈদিক সাহিতোর অন্তভূক্ত হয়ে অবস্থান করছে তাদের আমরা বিন। 
দ্বিধায় এই শ্রেণীর অন্তরভূক্তি করে নিতে পারি । দ্বিতীয়ত, আমবা 
দেখি যে ভারতীয় দার্শানক চিন্তার ঝপ কয়েকবার পরিবতিত হয়েছে। 
বেদেব মূল অ.শে অর্থাং কর্মকাণ্ডে চিন্ত।র যে বপ ছিল আপণাকেব 
যুগে তা পরিবতিত হয়ে গেছে। এই আরণ্যকে যুগেই ব্রহ্মবাদ 
বিকাশলাভ করে। তারপর যড়দর্শনের যুগে তা ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে 
এবং সর্বশেষে পুরাণের যুগে তার রূপ আবার পরিবতিত হয়। 


১, [09055৬0১216 5075167 0/ 75197710, 


৯৯ 


সুতরাং আরণ্যকের যুগে দার্শনিক চিন্তার যে প্রকৃতি ছিল তার 
সঙ্গে যে-উপনিষদের চিন্তার সাদৃশ্য পাওয়া যাবে, তাকে এই শ্রেণীর 
অন্তভূক্তি করতে পারি॥। প্রথম রীতিতে উপনিষদগুলি চিহ্নিত করে 
দেওয়। সহজ । কিন্তু দ্বিতীয় রীতির প্রয়োগ করতে হলে আমাঁদেব 
প্রথমেই ভারতীয় দার্শ।নক চিন্তার রূপ পরিবর্তনের ইতিহাসের সহিত 
পরিচিত হয়ে নিতে হয়! 

মোটামুটি দেখা যায়, ভারতীয় দার্শনিক চিন্তা চারটি অবস্থার মধ্য 
দিয়ে বিকাশলাভ করেছে : 

১। প্রাকৃতিক শক্তির উপর দেবত্ব আরোপ ; 

২। একটিমাত্র প্রচ্ছন্ন সর্বব্যাপী নৈব্যক্তি সত্তাকে বিশ্বেব 

মৌলিক শক্তি রূপে গ্রহণ ; 

৩। জ্ঞানমার্গে মুক্তির অন্বেষণ; এবং 

৪। ভক্তিমার্গে ঈশ্বরের সহিত মিলন । 

প্রথমটি পাই বেদের সংহিতা অংশে, দ্বিতীয়টি পাই উপনিষদের 
অংশে, তৃঠীয়টি পাই ছয়টি হিন্দ্ুদর্শতনে এবং চত্ুর্থটি পাই বিভিগ্ 
হিন্দুপুরাণে। 

বেদের সংহিতা অংশে আমরা দেখি প্রকৃতির মধ যেখানে 
কোনও শক্কির ত্ক্রিয়া আবিষ্কৃত হয়েছে বা বিশেষ সৌন্দধেব প্রকাশ 
ঘটেছে তার ওপর দেব আরোপ করা হয়েছে। এইভ!বে অগ্নি, 
বরুণ, মরুত উষ। প্রভৃতি দেখত। কাল্পত হয়েছেন । অগ্সিতে ঘ্বতাহুতি 
দিয়ে এইসব দেবতার ম্্রতিগান করে নান। প্রার্থনা নিবেদিত হয়েছে । 
প্রার্থনাগুলি আর্ত ও অর্থার্থী হুনাভাব প্রণোদিত ॥ তাদের উপাদান 
করেই বেদের সংহিত। অংশ গড়ে উঠেছে । 

কিন্ত বেদ তো। শুধু ধর্মগ্রন্থ নয়, দার্শনিক গ্রন্থ বটে। একদিকে 
যেমন যন্জানুষ্ঠানের মধা দিয়ে আনুষ্ঠানিক ধর্ম গড়ে উঠেছে, অপর 
দিকে তেমনি পাশাপাশি খবধির জিজ্ঞান্্ ম'নাভাব৪ প্রনল হয়ে 
উঠেছে। কাজেই নান। শুক্তের মধো বিভিন্ন দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপিত 


৯২ 


হয়েছে । যেমন, এই স্থষ্টি কোথা হতে এল? দেবতা এক না বছ? 
এইসব প্রশ্রের নীমাংস! বিভিন্ন স্ুক্তে দেওয়! হয়েছে। এই প্রসঙ্গে 
নাসদীয় সুক্ত (খগবেদ। ১০১২৯) এবং আত্মান্ৃতস্ত (যাকে 
দেবীস্ুক্তও বল! হয় ) ( খগ.বেদ। ১০১২৫ ) উল্লেখ কর যেতে পারে। 
এই দাশনিক চিন্তার মধ্য দিয়ে ধীরে-ধীরে বহছু-দেবতা-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বের 
পরিকল্পন। হতে এই ধারণ! গড়ে উঠেছে যে বিশ্ব একটি মাত্র নৈব্যক্তিক 
মহাশক্তি দ্বারা নিয়ান্ত্রত। তাকে কোথাও পুকষ বল। হয়েছে, কোথাও 
মাত্ব। বল হয়েছে, কোথাও বা সৎ বল] হয়েছে। এই প্রসঙ্গে 
ঝগ বেদের একটি সুক্ত হতে একটি বচন উদ্ধৃত করা যেতে পারে ঃ 
একং সদ্‌ বিপ্র। বহুধা বদস্তি। 
আগ্নি” যমং মাতরিশ্বানমাছঃ ১ 

যেচিন্ত। সংহিতা অংশে বীজ আকাৰে ছিল, তাই প্রাচীন 
উপশিষদগুলির মধ্যে বখকাশলাভ কবে বনস্পতিতে পরিণত হয়েছে। 
সংহতাব পুকষ উপনিষদের ব্র্দ ঝপান্তবিত হয়েছেন । সেখানে খষির 
জিজ্ঞাসু দ্ঠিভজি আবও প্রবল হযে উঠেছে । বাব্হারিক প্রয়োজনের 
উদের্ব উঠে তিনি বিশ্বসন্তাব পব্চিয় পেতেই 'বশি উৎকণ্টিত 
হয়েছেন । সেখানে ফে-প্রার্থন। নিবেদিত হয়েছে ত বলে বিশ্বতরষ্টা 
ঝষিকে এমন ধীশক্তি দান ককন যাতে তার বরেণা প্রকাশকে ধারণ! 
কর! যায়, শাধয়ো যা নঃ গ্রাচোদয়।ং | তাদের সবার বড় গবৰ 
বিশ্বসগাকে, "বদাহমেতম্।। এইভাবে জিজ্ঞাস। ও চিন্তার ফলে যে 
দর্শন গড়ে উঠেছে, তাতে বিশ্বসত্তা পরিকল্পিত হয়েছেন এক স্বব্যাণী 
প্রচ্ছন্ন শক্তিবপে। সকল মানুষ, সকল জীব, সকল বন্থকে জড়িয়ে 
নিয়ে তিনি প্রচ্ছন্নভাবে সবকিছু ব্যাপ্ত করে আছেন বলেই তাকে 
ব্রহ্ম বল। হয়েছে । ব্রন্মের অর্থ হলো যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং 
তাংপর্য হলে তিনি ধৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্বে পরিণত হয়েছেন । 


২. ধগৃবেদদ। ১/১৬৪৪৬ 


১৩ 


ভারতীয় দর্শনে পরবর্তী যে-যুগটি এসেছিল তা জিজ্ঞাম্থ অবস্থারই 
পরিবতিত রূপ । সেটি হলো যড়.দর্শনের যুগ । আগের মতো! এখানেও 
জিজ্ঞান্থর দৃষ্টিভঙ্গি ক্রিয়াশীল ; তবে তার প্রেরণা এসেছে ভিন্ন পথে । 
উপনিষদের যুগে সে-প্রেরণ৷ এসেছিল বিশুদ্ধ কৌতৃহলবৃত্তি চরিতার্থ 
করবার জন্য । এখন এসেছে একটি ব্যবহারিক প্রয়োজনে । এই যুগে 
কর্মফল ভোগ এবং তার জন্য জন্মান্তবের বন্ধনে বিশ্বাস বদ্ধমূল সংস্কারে 
পরিণত হয়েছে । সঙ্গে এই ধারণা গড়ে উঠেছে যে এই জন্মবন্ধন 
সুখকর নয়। কাজেই পরজন্ম হতে মুক্তির আকাঙজ্ষা পরিস্ফুট হয়ে 
উঠেছে। তার উপায় হিসাবে জ্ঞানমার্গকেই অবলম্বন কর। হয়েছে। 
তার ফলে বিভিন্ন দর্শন গড়ে উঠেছে। এই কথা যেমন হিন্দুর 
ষড় দর্শন সম্বন্ধে খাটে, তেমন বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন সম্বন্ধে ঘটে। 
সেখানেও মুক্তি বা নিবাণ হলে! পরমার্থ এব* তার উপায় হলো 
জ্ঞানমার্গ। 

প্রকৃত ভক্তের দগ্টিভঙ্গি ভারতে প্রতিষ্ঠ। হয়েছে তার অনেক 
পরে। তা একেশ্বরবাদকে অবলম্বন করে বাক্তিরূপী ঈশ্বরের পরিকল্পনার 
সিত্তিতে গড়ে উঠেছে ॥ বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন ঈশ্বব সম্বন্ধে নীরব | 
যোগদর্শনে ঈশ্বর স্বীকৃত হয়েছেন, কিন্তু বিশ্বে অনেকগুলি মৌলিক 
'তদ্বের নধ্ধো তিনি একটি মাত্র তব । হ্বায়সৃত্রে ঈশ্বরের উল্লেখ আছে। 
কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ঈশ্বর পূর্ণমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হন নি। তারপর 
একদিন দেখি ঈশ্বরকে বিশ্বতত্বেব কেন্দ্রস্থলে স্থাপন কবে, তার ওপর 
সকল “মীলিক শক্তি মারোপ করে, তাকে ব্যক্তিসারূপে কল্পনা করা 
হয়েছে এবং বিঞু ব। শিব বা শক্তিরূপে কলি হয়ে তার উপাসনা 
প্রবতিত হয়েছে । এই যুগে ঈশ্বরে ভক্তিই একমাত্র উৎকু্ট সাপনমার্গ 
বলে প্রচারিত হয়েছিল । 

স্থতরাং ভারতীয় দর্শনে আমর! চারিটি চিন্তার স্তর পাই £ বেদের 
সংহিতা অংশে বছদেবতাবাদ, বেদের উপনিষদের অংশে ব্রহ্মবাদ, 
ষড়দর্শনের যুগে জ্ঞানমার্গে যুক্তিবাদ এবং সর্বশেষে পুরাণের যুগে 


৯ 


ব্যক্তিরূণী ঈশ্বরকে ভিত্তি করে ভক্তিবাদ। বিভিন্ন উপনিষদগ্ুলি 
শেষের তিনটি শ্রেণীতে পড়ে। তাদের থেকে আমাদের প্রাচীন 
উপনিষদগুলিকে পৃথক করে নিতে হবে। যে উপনিষদগুলির ভাবধারা 
দ্বিতীয় স্তরের চিন্তার সঙ্গে মিলে যাবে তাদের এই শ্রেণীর অন্তত 
করে নিতে পারি। 

এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় মাত্র বারখানি উপনিষদ। তাদের 
মধ্যে সাতখানি উপনিষদ বেদগুলির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। তারা 
হলো £ ঈশ, এতরেয়, কৌধীতকি, তৈত্তিরীয়, বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য 
ও কেন। এদের কোনটি বেদের সংহিত| অংশের সঙ্গে যুক্ত আছে, 
কোনটি ব্রাহ্মণেব সঙ্গে, কোনটিও আরণ্যকের সঙ্ষে। এধন বাকি 
থাকে পাঁচটি উপনিষদ। এরা হলো ক, প্রশ্ন, মুগ, মাগুকা ও 
শ্বৈতাশ্বতর ৷ তাদেব বিষয় একই কথা বলা যায় যে বেদগুলির সঙ্গে 
প্রত্যক্ষ যোগন্ৃত্র খুঁজে না পাওয়া গেলেও একটি এঁতিহা আছে যে 
তার! বিশেষ বেদের সহিত যুক্ত । তবে তাদের এই শ্রেণীর অন্তভুক্ত 
করবার সপক্ষে বড যুক্তি হলো তারা মূলত ব্রহ্মাবাদই প্রচার করে। 
আমর। এই উপনিষদগুলির মধো যে-দার্শনক চিন্ত। বিকাশলাভ 
কৰেছে তার সঙ্গেই রবীন্দ্রণাথের দার্শনিক চিন্তার তুলনা সীমাবদ্ধ 
রাখবার প্রস্তাব করি। 


ছ্ই 
উপিষদের চ্বাদ 

এখন আমাদের সময় হয়েছে এই নির্বাচিত উপনিষদগ্লকে 
অবলম্বন করে যে-দার্শানক তত্ব বিকাশ লাভ করেছে তার সহিত 
পরিচিত হওয়া । এই তত্বকে আমরা ত্রহ্মবাদ বলতে পারি; কারণ 
উপনিষদেই এই পারিভাষিক শব্দটি প্রবর্তিত হয়েছে। 

উপনিষদে বণিত ব্রহ্ষবাদের প্রকৃতি সহজে হাদয়ঙ্গম কর! যায় 
এরিস্টটল কথিত যে চারটি কারণের উল্লেখ আছে তার দৃষ্টিভির 


৭৫ 


অনুসরণে । এ-কারণঞচলি বিজ্ঞান নির্দেশিত কারণ হতে স্বতন্ত্র। 
সেখানে ঘটন৷ পরম্পরাকে পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেন্ঠ সম্বন্ধে যুক্ত 
করে জানবার চেষ্টা হয়েছে । ছুটি ঘটনার মধো যদি শর্তবিহীন, 
অব্যবহিত এবং সর্ককালীন সংযোগ থাকে তাহলে, প্রথমটিকে 
দ্বিতীয়ের কারণ বলা হয়। এখানে উদ্বোশ্য হলো৷ একটি অবস্থার 
উৎপাদনে যে-শক্তি ক্রিয়া করে তাকে বোঝবার চেষ্টা। এরিস্টটল 
পরিকল্লিত কারণের বাখ্যার উদ্দেশ্য আরও ব্যাপক ॥ একটি বস্তুর 
উৎপাদনে যত সস্তাব্যশক্তি ক্রিয়াশীল হয় তাদের সকলকেই আবিষ্কার 
করার চেষ্টা সেখানে হয়েছে। 

একটি উদাহরণ প্রয়োগ করলে বিষয়টি বোঝবার স্ুুবিধ। হবে। 
এরিস্টটল-এর বিশ্লেষণ অনুসারে কারণ চার-প্রকার ; উপাদান কারণ, 
নিমিত্ত কারণ, রূপ কারণ এব" উদ্দেশ্য কারণ।৬ আমাদের দেশের 
দর্শনে প্রথম ছুটি কারণের প্রয়োগ আছে, শেষের উল্লেখ নাই । এখন 
মানুষের স্য্ট একটি ভোগ্যদ্রব্য উৎপাদনের কথা ধরা যাক। একটি 
মুংপাত্র সম্পর্কে এই সবকটি কারণের প্রয়োগ মিলবে । মুৎপাত্রেব 
উপাদান কারণ হলো মাটি; তার নিমিত্ত কারণ হলে। কুস্তকার, 
কারণ সে তার হাতের আঙ্লের নিপুণ স্পর্শে চাকায়-ঘোরা-অবস্থায় 
মুৎপিগুকে রূপ দেয়; যে রূপ তাকে দেওয়। হয় সেটি রূপ কারণ এবং 
সবশেষে উদদশ্য কারণ হলো যে-উদ্দেশ্টো তাকে ব্যবহার করা! 


হয় তাই। 
বিশ্ব হলে। স্থ্টি এবং ব্রহ্ম হলেন অষ্ঠা। এদের সম্বন্ধ উপনিষদের 


পরিকপ্পনায় এমন নিবিড় যে তরঙ্গের উপর একসঙ্গে এই সবগুলি 
কারণত আরোপ কর! যায়, মর্থাৎ উভয়ের মধ্যে উভয় ওতপ্রোতভাবে 
জড়িত। তার তাৎপর্য হ'ল। বিশ্বের মধ্যে বিশ্বশক্তি প্রচ্ছন্নভাবে 
ক্রিয়াশীল । দেই শক্তিই বিশ্বের শাশ্রয় এবং সেই শক্তিই বিশ্বকে 


৩. ৯1306051 091056) চ0001006 091156) £012771 09956 00 21139] 
(8056, 


সমগ্রভাবে একত্ব মণ্ডিত করেছে। বিশ্বশক্তি বিশ্বের মধোই ছড়িয়ে 
রয়েছে, এই হলো উপনিষদের ব্রহ্মবাদের মূল সুর । ব্রহ্ম সবকিছু 
ব্যাপ্ত করে আছেন, সব-কিছু ধারণ করে আছেন এবং সব-কিছুর 
অন্তরে অধিষ্ঠান করছেন উপনিষদের নান। বাণীতে এই কথাই বার- 
বার উীল্লখিত হয়েছে। ছান্দোগ্য উপনিষদে এই কথার সারমর্ম 
সংক্ষিপ্ত আকারে বোঝান হয়েছে এই বলে যে “এই সবকিছুই ব্রহ্ম, 
ব্রঙ্গেই তাদের জন্ম, পুষ্টি এবং বিলয়” ।8 

এখানে আমরা একে-একে ব্রন্মের উপর এরিস্টটল পরিকল্িত 
চারটি কারণ কিভাবে প্রয়োগ করা যায় তা বোঝাতে শচষ্টা করব। 
প্রথম ধর। যাক ব্রন্মের উপাদান কারণত্ব। ব্রহ্ষই যে বিশ্বের উপাদান 
কাবণ, এই কথাটিব উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে । তাই যেন 
ুন্মের সহিত স্থষ্টির সম্বন্ধের নিগুঢত্ব প্রমাণ কবে । এই কথাটি বোঝাতে 
একটি উপম। প্রয়োগ করা হয়েছে। নান্তষের নিমিত বস্তর সম্পর্কে 
দুটি বিষয় লক্ষণীয়-_একটি তার বিশেষ বপ এবং অপরটি তার 
উপাদান ॥ যেমন মুশ্নয় পাত্রের উপাদান মুন্তিকা এবং পাত্ররূপে 
প্রকাশ তাব কপ। এখানে মূলতব হলে উপাদান এবং গৌণতত্ব হলে! 
তার নান! বিশেষকপে প্রকাশ । উপাদানেৰ বিকার হতেই বিশেষ 
রূপের বা গৌণতত্বেন প্রকাশ এব তাকে পৃথক করতে তাকে 
নাম দিয়ে চিহ্চত কর! হয়েছে । সেইরূপ বিশ্বের মূল তত্ব হলেন 
ব্রহ্ম, তার উপাদান বিভিন্নবপে গ্রকট হয়ে নামের দ্বারা চিহ্ন হায়ে 
বহুকণপে প্রকাশ হয়েছে। 

এই বচন কে মনে হতে পারে ব্রগ্ধের রূপ কারণত্বের উপর 
এখানে তেমন গুরুত্ব মারোপ করা হয় নি। যেন ইঙ্গিত করা হচ্ছে 
যে উপাদান যখন এক, তখন তার পৃথক পৃথক রূপের মুলা নাই। 
কিন্তু উপনিষদে এমন কোনও বচন নাই যেখানে বিশ্ব-সন্তার বহুরূপে 


6. সর্ব খাজ্বদং বদ্ধ তঙ্জলানগাত ॥ ছান্দোগা । ৩১৪১ 
৫. বাচার্ভণং 'বিকারো নামধেয়ং মৃক্তিকেত্যেব সত্ম ॥ ছান্দোগা । ৬।১/৪ 


১৭ 


পগ্রকাশকে গৌণ প্রকাশ বলে নির্দেশ করা হয়েছে। বরং বন্রূপে 
প্রকাশকে ব্রদ্ষের নিজস্ব প্রকাশরূপেই বণিত কর! হয়েছে। কঠ 
উপনিষর্দে আছে যে একই ব্রহ্ম বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছেন এবং 
বিভিন্ন বস্তর মধ্যে যোগস্ুত্র হিসাবে গ্রচ্ছন্পভাবে বর্তমান আছেন ।৬ 
বুকে ব্যাপ্ত করেই তার একত্ব। একই সত্ত। বরূপে প্রকট হয়েছেন । 
কথাটি পরিস্ফুট করবার জন্য একটি উপম৷ প্রয়োগ করা হয়েছে । বলা 
হয়েছে একই অগ্নি বিভিন্নস্থানে বিভিন্নরূপে প্রকাশ হলেও অগ্নি বলেই 
তাকে আমরা চিনি। সেইরকম একই আত্ম। |বভিম্নৰপে প্রকাশ 
হয়েও মূলত সেই একই সত্ত। রয়ে গেছেন। একই শক্তির বিশ্বে 
বহুরূপে প্রকাশ ঘটেছে ।" 

নিমিত্ত কারণের লক্ষণ হলে। তা স্যপ্টির নিয়ামক শক্তি। ত্রহ্মযে 
বিশ্বের অভান্তরে থেকেও বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবিষয়ে উপনিষদে 
সুস্পষ্ট উক্তি পাওয়। যায়। এখানেই মানুষের নিমিত্ত কারণত্বের সঙ্গ 
বিশ্বশক্তির নিমিত্ত কারণহ্থের পার্থক্য । যখন মানুষ নিমিত্ত কারণ 
হিসাবে কাজ করে, তখন সে যাকে নির্মাণ করল তার বাইরে রয়ে 
যায়, তাকে নিয়ন্ত্রিত করে বাইরে থেকে । কিন্তু প্রকৃতির মধ্য নিয়ন্ত্রক 
শক্তি এমনভাবে কাজ করে 'ন।; কারণ সে-শক্তি প্রকৃতির বাহিরে 
অবস্থিত নয়। অণুর মধ্যে যে প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন সংহত 
হয়ে থাকে তার নিয়ামক শক্তি তাদের অভাস্তরেই স্থিত। যে-প্রাণশক্তি 
দেহের নিয়ন্ত্রণ করে তাও তার 'অভ্যন্তরেই স্থিত। উপনিষদে তাই 
বলা হয়েছে যে ত্রন্ম নিয়ামক শক্তি হিসানে বিশ্বে হুইভাবে কাঙ্গ 
করেন । প্রথমত কার প্রশাসনে সমগ্র বিশ্ব বিধৃত এবং পরিচাজিত। 
স্ুর্য-চন্্র, ছ্যাব।-পরথিনী, নিমেষ-মুহূর্ত, অহোরাত্রি ইত্যাদ তারই 


৩. একো বশখ সর্বতুতান্তরাত্মা একং রূপং বহূধা মঃ করোতি ॥ 
কণঠ। ২২১২ 
৭, আঁপ্নর্যথৈকো ভুবনং প্রবিষ্টো রূপং রূপং প্রাতিরূপো বুব। একন্তথা 
সর্বভূতান্তরাত্মা রূপং রুপং প্রতিরূপো বহিশ্চ ॥ কঠ। ২২৯ 


৯৬ 


প্রশাসদে বিধৃত হয়ে আছে ।৮ দ্বিতীয়ত বল। হয়েছে তিনি বিভিন্ন 
জীবের অস্তরে বর্তমান থেকে তাদের অজানিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ 
করেন । সকল জীব তীর শরীর স্বরূপ এবং তাদের অস্তরে থেকে তাদের 
নিয়ন্ত্রিত করেন বলেই তিনি অন্তর্ধামী । দেহ পরিবতিত হয়, কিন্তু 
ত।র নিয়ামক শক্তি নিত্য এবং তিনি অমুতম্বরপ ।৯ 

বাকি রইল ব্রচ্মের উদ্দেশ্য কারণত্ব। উপনিষদের খধিগণ বিশ্বের 
সামগ্রিকভাবে একটি উদ্দেশ্য কারণও আবিষ্কার করেছেন। তাদের 
মতে এই উদ্দেশ্য কারণ হলে। রমের আস্বাদন । এই "রস" অর্থেকি 
বোঝায় তারও ইঙ্গিত দেওয়। হয়েছে। তেন্তিরীয় উপনিষদে বলা 
হয়েছে ব্রহ্ম রসন্বরূপ, কারণ তিনি রস অনুভব করে আনন্দ পান ।১* 
স্ৃঙরাং যা। আনন্দ দেয় তাই রস। এই আনন্দ হলে। শিল্পার বা শিল্প- 
রসিকেব আনন্দ। এখানে যখন ব্রহ্ম সব জড়িয়ে, সব নিয়ে আছেন 
তখন শিল্পী, শিল্পরসিক এবং শিল্পকর্ম একই সত্তারপে পরিকল্লিত। 
তাই বিশ্বসন্তাও বসম্গবূপ হয়ে পড়েন। 

এখন আনন্দ জিনিসটি কি বুঝতে চেষ্টা করা যাক। তা সখ নয়, 
'ত। হতে আরও ব্যাপক । তা স্ুখ-ছুংখকে জড়িয়ে নৈয়ে পরিস্ফুট হয়, 
“যমন শাঁটকের অভিনয়ে! এর ঠিক সমাথবোধক ইংরাজি প্রতিশব্ 
নাই। যে পারিভাষিক কথাটি সব থেকে তাৰ কাছাকাছি যায় তা 
হলো “শিল্পতান্বিক অন্স্থীতি।'১১ শিল্পরসিক ক্লাইভ বেল এই কথাটির 
প্রবর্তন করেন! এই আনন্দ কোনও ব্যবহারিক প্রয়োজনের সঙ্গে 


৮. এতসা বাক্ষরস্য প্রশাসনে গা্গ সুযচিন্্রমসৌ বিধৃতো তিষ্ঠত এতসা 
বাক্ষরস্য প্রশাসনে গার্গি দ্যাবাপাথিবো বিধতে তিষ্ঠত-" ॥ 

বৃহদারধ্যক | ৩1৮1৯ 

৯, যঃ সবেষু ভুতেষ তিষ্তন সর্ধেভ্যো ভুতেভ্যোহভাস্তরো যং সবাপি 

ভুতানি ন বিদূর্ধসা সর্বাণ ভূতাঁণ শরীরং যঃ সবাণি ভূতানান্তরো 
যময়াঁতি এষ ত আত্মাস্তবম্িমৃত ইতি ॥ বৃহদারণ্াক | ৩।৭।১৫ 


১০. রসোবৈসঃ। রসং হোবায়ং লম্ধানন্দী ভবাঁত ॥ তৈত্িরীয় । ২৭ 
৬১, 6507500 10250002), 


১৯ 


যুক্ত নয়; তা অহৈতৃক। উপনিষদ বলতে চেয়েছে বিশ্বসন্তা শিল্পরসিক : 
তাই তিনি শিল্পীর ভূমিকা গ্রহণ করে আনন্দ পান। সমগ্র বিশ্ব তাই 
শিল্প। তাই তো বলা হয়েছে 'পশ্য দেবস্ত কাব্যং ন মমার ন জীর্যতি? ৷ 
এই চিন্ত1 যুক্তিসম্মত; কারণ বিশ্বশন্তির ব্যবহারিক প্রয়োজন থাকতে 
পারে না, ত। থাকে বন্ধজীব মানুষের । এখন উপনিষদে কিভাবে 
বিশ্বশক্তির উদ্দেশ্য কারণত্বকে প্রতিপাদন করা হয়েছে তার একটি 
ক্ষিপ্ত বণন1 দ্ওয়। যেতে পারে । 

রস উপলব্ধি করতে প্রয়োজন ছুটি বিভিন্ন প্রকৃতির সন্তার ; কারণ 
বিশুদ্ধ একত্বের মধ্যে রসের উপলব্ধির অবকাশ নাই । তারভম্যয 
প্রয়োজন দ্বৈতবোধের । একদিকে চাই রূপ-রস-শব্দ-স্পর্শ-গন্ধের 
জগং, অন্তদিকে চাই তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য মন। ছুয়ের 
জানাজানি, ছুয়ের পরিচয়, ছুয়ের প্রীতি এদের অবলম্বন কবেই "ত! 
রসের ধার৷ প্রবাহিত হয়। সেইজন্য স্থষ্টি-পুব অবস্থার যয এক এবং 
দ্বিতীয়বিহীন পে ব্রহ্ম অবস্থান করছিলেন তিনি তাব একাকিই 
উপাভোগ করলেন না॥ তাই রসেই উপলব্ধির জন্য তিনি বু ও 
বিচিত্রবপে প্রকট হলেন । একাকী “থকে আলন্দ পেলেন ন। বলে 
তিনি দ্বিতীয়কে চাইলেন৭১২ 

ব্রন্মের অহৈতুকী তৃপ্তির জন্তই এমন ঘটল । ত। ন| তলে হাব 
'আনন্দবপটি প্রকাশ হয় ন। যে। তাই “ত। দ্বৈএবোধের ভিন্তিও িশ্বে 
দ্বৈতসঙ্গীতের ধার! ছড়িয়ে পড়ল । জ্ঞাত ও জেঞেয়ের তিন্তিতে, তোক্তা 
৪ ভোগ্যের িত্তিতে বিশ্বসত্তার 'আপন মাধুবী আপন চক্ষে ধব পড়ল। 
তখন মান্ুষেব মনের সামনে বিশ্বের আানন্দবপটি ফুটে উঠল ।॥ তাই 
উপমিষদের খধি ঘোষণ। কবলেন £ বাতাসে মধু, প্রবাহিনাতে 
মধু ১ তিনি বললেন এই প্রর্থরবী সকল প্রাণীর নিকট মধুখবপ 


১২. আত্মেবেদমন্তর আসা স বৈ ন রেখে”. ৩6 08১, 
স দ্বিতীয়সৈচ্ছৎ ॥ বৃহদারণ্যক | ১। রে 246৯ 
১৩. মধু বাতা খতায়তে মধু ক্ষরস্তি / 






রর 


বৃহদারণাক। ৬০ 


১ 


এবং এই পৃথিবীর কাছে সকল প্রাণী মধুস্বরূপ।১৪ ব্রঙ্গোর বিশ্বরূপে 
যে মৃতপ্রকাশ তাকে তিনি অভিবাদন জানালেন আনন্দবপ এবং 
অমৃত বলে ।১৭ 

সুতরাং উপনিষদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে বিশ্ব একটি অঙ্গবিশিষ্ট 
অঙ্গীৰপে পরিকলিত : ত। বিশুদ্ধভাবে এক নয়, সকলকে জড়িয়ে 
নিয়ে এক। তাতে বহু ও পৃথক পদার্থের বিচিত্র সমাবেশ আছে; 
কিন্ত ভাবা একই খাপক সন্তাব নধ্যে বিধৃত। সেই সশ্ড] বিশ্বের 
বিভিশ্ন অশের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে ক্রিয়াশীল থেকে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রিত 
কবে (তাই 'ত| অন্তুযামী ) এখং দ্বেতভাবে চিহ্িত হয়ে শিচিত্রবপে 
প্রকট হয়। জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের স্গ্বপ্ধর ভিন্ডিতে তার বপ-রম শব্- 
স্পর্শ-গঞ্ধময বিচিত্র প্রকাশ ধর! পড়ে। বিশ্বশক্তি যেন আনন্দ- 
আন্বনদনের জন্য এই বৈচিচত্রা ভবা বিশ্ববপ মহাকাবা বচনা কবেছেন। 


1৩ন 
উপনিষদের শ্রেয়বাদ 
উপরে বলা হয়েছে, উপনিষদের দষ্টিভঙ্গি জিজ্ঞান্থর, ভক্তের নয়। 
সেই কাবণে বাক্তিরূ্পী ঈশ্বরের বা একেশ্বরবাদের পরিকল্পনা! তার 
চিন্তায় বিকাশলাভ কবে নি। কাজেই ঈশ্বব কতৃক দণ্ডিত হবাব ভয়ে 
পাপ হতে বিরত থাকা ৭ ঈশ্ববের সৃষ্ট জীব হিসাবে অন্থকে ভাল- 
বাসবার বা সেবা করবাবধ ধারণ। সেখানে জন্মলাভ করে নি। তা 
সত্বেও দেখি উপনিষদের ব্রগ্ষবাদ বা সবেশ্বববাদকে ভিত্তি করে একটি 
উচ্চ আদর্শের পীতিতধ বিকাশলা'ভ করেছিল । তার অবলগ্বন ছিল 
ছুটি প্রেরণ। ৷ প্রথমটি হলো। ব্রহ্মবাদ হতে সম্ভৃত বিশ্বের সকল প্রাণীর 


১৪. ইয়ং পৃথিবী সবেষাং ভুতানাং মধ; অস্য পৃথিবা সবাঁণি ভূভানি 
মধু ॥ বৃহদারণ্যক । ২৫।১ 

১৫, ভুদ্বিজ্ঞানেন পরিপশাস্তি ধীনা আনন্দরপমমৃতং যাঁদ্ভাঁভ । মৃণ্ডক। 
২২৭ 


১১ 


সহিত অখগুতাবোধের যোগস্থৃত্র। তা সকলের প্রতি প্রীতিবর্ধন 
করে স্বার্থ ও পবার্থের সংঘাতের প্রতিকার খু'জেছে। দ্বিতীয় হলো 
উপনিষদের একটি নিজন্ব তত্ব যাকে বল। যেতে পারে শ্রেয়বাদ। তা 
দেহের ও মনের যে-ছন্দ আছে বা ব্যক্তিশ্বার্থ ও গোষ্ঠী স্বার্থের যে দ্বন্দ 
আছে তার সমাধান খু'জেছে সামগ্রিক কল্যাণবোধের মধ্যে। বর্তমান 
আলোচনায় এ-ছটি বিষয় প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তাই এদের সম্বন্ধে 
একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে দেওয়। প্রয়োজন । 

প্রথমে ধর যাক প্রীতির ভিত্তিতে স্বার্থ ও পরার্থের সংঘধের 
সমাধান । এর বৈশিষ্ট্য হলো! এখানে উপনিষদ হদয়বৃত্ধিকে ব্জন কবে 
নি। তাকে নৈতিক উদ্দেগ সাধনের জন্য বাবহার করেছে । আমরা 
দেখব এই সংঘর্ষের সমাধান খোজা হয়েছে একটি বিচিত্র পথে । এই 
বিষয় বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তি উভয়কেই ভূমিক। দেওয়া হয়েছে । মূল 
ভূমিকা! দেওয়! হয়েছে হুদয়বৃত্তিকে আর তাকে প্রেরণ। দেবার ভূমিকা 
দেওয়া হয়েছে বৃদ্ধিবৃত্তিকে । 

উপনিষদ বুদ্ধিবুস্তির সাহায্যে হৃদয়বৃত্তির পরিবর্ধন চেয়েছে এবং 
হৃদয়বন্তির প্রসারের সাহায্যেই স্বার্থ ও পরার্থের ছন্দপ মীমাংসা 
করেছে। মানুষের হুদয়বৃত্তির শ্রেষ্ঠ বিকাশ পাই স্নেহ, প্রীতি ও 
ভালবাসার বিস্তারে । এই ভালবাসাকে বিস্তার করেই স্বার্থ 
পরিশোধিত হতে পারে । সেটা সম্ভবও বটে, কারণ সকল মানুষের 
মধ্যেই স্বার্থ এবং পরার্৫থবোধ উভয়ই অল্পবিস্তর ক্রিয়াশীল। এমনকি 
একান্ত শ্বার্থপর মানুষও সম্ভানের জন্ স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে। 
পরিবারের মানুষকে, প্রিয়জনকে মানুষ ভালবাসে বলে তার সহিত 
স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলে । এখানে প্রীতিবোধই স্বার্থকে শোধন 
করতে সাহায্য করে। 

উপনিষদে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে এই প্রীতিবোধ কেন হয় এবং 
তার একটি উত্তরও দেওয়া হয়েছে। উপনিষদ বলে, এই প্রীতিবোধ 
সঞ্জাত হয় প্রীতির বিষয়ের গুণে নয়, তার কারণ বিশ্বের সকল জীবকে 


১৬ 


ব্যাপ্ত করে একই মহাসন্ত। বিরাজমান আছেন বলে। একই আত্মা 
বা ব্রন্মের সকলেই অঙ্গীনৃত বলে আমরা পরস্পরের প্রতি প্রীতির 
আকর্ষণ অনুভব করি। পতির কারণে যে পতি প্রিয় হয়ঃ তা নয়; 
জায়ার কারণে যে জায়া প্রিয় হয়, তা নয়; পুত্রের কারণে যে পুত্র 
প্রিয় হয়, তা নয়। আত্মা সকলকে ব্যাপ্ত করে আছে বলেই সকলে 
প্রিয় হয়।১৬ এই অর্থে সকলেই সকলের আত্মীয়, সকল মানুষ 
একই পরিবারের সন্তানের মতো । এইভাবে অখণ্ডবোধ হতে যখন 
ঘনিষ্ঠতাবোধ পরিক্ষ,ট হবে তখন সকলের সঙ্গে প্রীতির সম্বন্ধ গড়ে 
উঠবে। তখন পরস্পরের স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চল। সহজ হবে । 

ঈশ উপনিষদে এই তব্বটি অবলম্বন করে সকল মানুষকে পরস্পরের 
সহিত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মতো ব্যবহার করতে উপদেশ দেওয়। হয়েছে। 
যুক্তি হলে বিশ্বে যাকিছু আছে সবই তো একই মহাসত্বার দ্বারা 
পরিব্যাপ্ত। স্থতরাং উপদেশ দেওয়৷ হয়েছে ত্যাগের সহিত ভোগ 
কর! উচিত, পরস্পর ভাগ করে ভোগ কর! উচিত; কারও স্ম্পদ 
অপহরণ কর! উাচত নয়। আপন লোকের জিনিম কি অপহরণ 
করা যায় না কি 1১? 

এখন শ্রেয়তুত্বের প্রসঙ্গ উ্1পন করা যেতে পারে । নীতির মূল 
সমস্যা। ছুটি (বষয়ের বিরোধ নিয়ে ॥ একটি বিরোধ দেহের সঙ্গে মনের 
দাবীর । দেহ চায় ইল্জ্রিয়স্রখ, বিষয়ভোগ £ মন চায় অন্য ধরনের 
তৃপ্তি। দেহ ভোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়, মন হয় সন্ন্যাসের প্রতি । 
অপর পক্ষে মানুষ সামাদিক জীব । তার প্রতিটি ইচ্ছাধান কপ যেমন 
তার স্বার্থের সঙ্গে জড়িত, তেমন অন্যের স্বার্থ বা সামগ্রিক কলাণের 
সঙ্গে জডওঙ। এইভাবে স্বার্থ ও পরার্থের ছন্ এসে পড়ে । 


১৬. ন বা অরে পৃতাঃ কামায় পাঁতঃ 'প্রিয়ো ভবত্যাত্মনস্তু কামায় পাঁতিঃ 
প্রয়ো ভবাতি ইত্যাঁদ। বৃহদারপাক । 8161৬ 


১৭, ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যতকিধচ জগত্যাং জগৎ ॥ তেন তান্তেন ভুঞধথা 
মা গ্ধঃ কস্াসিম্ধঘনম্‌ ॥ ই ।৯ 


৩ 


মনে হয়, এই ছুটি বিরোধকেই একটিমাত্র ব্যাপক বিরোধের 
অস্তভূক্ত কর! যায়। উপনিষদ তাই করেছে! দেহ য! চায় তা হলে 
ইন্ড্রিয়স্থখ উপভোগ। আবার ইন্ড্রিয়স্ুখ অর্থেই ব্যক্তিবিশেষের 
ইন্জরিয়ন্ুখ ; সুতরাং তা৷ ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কাজেই 
বাক্তি-স্বার্থের আকর্ষণ ও ইন্ড্রিয়স্বখের আকধণ--এই ছুই আকধণের 
প্রকৃতি একই হয়ে দাড়ায় । এই আকর্ষণকে উপনিষদ প্রেয়ের আকধণ 
বলেছে। ব! ইন্জিয়ন্ুখকর তাই হলো! শ্রেয়; তার সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্ 
ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে শ্বার্থপর করে। অপর 
পক্ষে মনের দেহের প্রতি একট বিরোধভাবও আছে । ইন্দ্রিয়স্থখে 
আকর্ষণ মনকে কাজ করবার অবসর দেয় না। তাই তা ইন্দ্রিয় 
সংযমের পক্ষপাতী । তাই মন ইন্দ্রিযশিরোধের প্রতি আকৃ& হয় 
এবং সমগ্টিগত কল্যাণকর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। স্ুতবাং 
সম্নাসবাদের সহিত পরার্থবাদের একটি প্রকৃতিগত সাদৃশ্য আছে। 
এইভাবে শ্রেয়বাদের সহিত সন্গ্যাসবাদদের একট। দ্বন্ব এসে পড়ে । 

স্থতরাং দেখা যায় বিরোধ ছুই ভিত্তিতে গড়ে ওঠে । প্রথম, দেহেব 
সঙ্গে মনের বিরোধ এবং দ্বিতীয়, স্বার্থের সঙ্গে পরার্থের বিরোধ । 
উপনিষদ বলে আমরা যদ সামগ্রেক কল্যাণ ব। শ্রেয়ের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে 
বিষয়টি দেখি তা হলে, বিষয়টি আরও সরল রূপ নেয় । মূল প্রশ্ন হলো, 
ব্যক্তির সুখ ব। তৃপ্তি নয়, গোষ্ঠীর সুখ ব। তৃপ্তি নয়, ব্যক্তির কঙ্সযাণ ও 
গোষ্ঠীর কল্যাণ। দেহ ৪ মনের পরস্পরের সহিত সম্বন্ধ এত ঘনিষ্ঠ 
যে উভয়ের কল্যাণ পরম্পর জড়িত ॥ স্ুতরাং ব্যক্তিবিশেষের সম্পকে 
ভোগ 'ও ত্যাগের সমাধান নির্ভর করে সমগ্র ব্যক্তির কল্যাণের উপর। 
অনুরূপভাবে ব্যক্তি সমাকত হতে পৃথক নয়, তার অঙ্গীভূত। ঠিক 
বলতে কি তাদের মধ্যে মূলত বিরোধ নাই । বাক্তির কল]ণ ও 
সমগ্রের কল্যাণ বর্ধিত করে। সামগ্রিক কল্যাণের দৃষ্টিভজি নিয়ে 
দেখলে উভয় ক্ষেত্রেই বিরোধের সমাধান সম্ভব । উপনিষদে এই 
সামগ্রিক কঙ্যাণকেই শ্রের বলা হয়েছে। 


২৪ 


এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে উপনিষদ বলে জীবনে 
ত্যাগেরও প্রয়োজন আছে ভোগেরও প্রয়োজন আছে; উভয়ের 
সামগ্রস্তের মধ্যেই জীবন সার্থকত। মণ্ডিত হয়॥। তাই উপনিষদে 
ইন্ছ্িয়সংযমের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, ইক্ড্রিয়নিগ্রহের উপর নয়। 
ভূমিকে উর্বর করতে হলে প্রথমে চাই তাকে ভালভাবে কর্ষণ কর!। 
দেই কর্ষণই হলে! জীবনে ত্যাগের দিক ; কিন্তু কধণ করে জমি ফেলে 
রেখে দেবারও কোন অর্থ হয় না। তাতে বীভ বপন করেশশস্ত 
উৎপাদন করলেই সেই কর্ষণ সার্থক হয়। 

উপনিষদে 'আত্মদমনের জন্যই শিক্ষা-অবস্থায় ত্রহ্মচর্ধপালনের 
ব্যবস্থ। ছিল। ত৷ সঙ্গ্যাসের প্রস্ততি নয়, গৃহস্থজীবনের প্রস্ততি । এ 
বিষয় তৈত্তিরীয় উপনিষদে স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়। যায় ॥। সেখানে দেখ। 
যায় সমাবর্তনের দিনে আচার্য অস্তেবাসীকে উপদেশ দিচ্ছেন শিক্ষা- 
"সমাপ্তির পর সংসার আশ্রমে প্রবেশ করে বংশধারা অব্যাহত রাখবার 
ব্যবস্থা করতে ।১৮ এখানে বংশধারাকে অব্যাহত রাখার উপদেশটি 
খুব তাৎপর্যপূর্ণ। জীবনে ত্যাগেরও স্থান আছে, ভোগেরও স্থান 
আছে। শুধু ভোগ বা শুধু সন্ন্যাস সামগ্রক কলাণ বা শ্রেয়ের 
পরিপন্থী । তাই উপনিষদ শ্রেয়ের পথই অনুসরণ করতে উপদেশ 
দিয়েছে। 


চার 
রবান্দুনাথের দার্শীনক চিন্তার স্বরূপ 
রবীন্দ্রনাথের পিতা৷ মহথ্ি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপনিষদের উপর 
গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তিনি ছিলেন একান্তিকভাবে একেশ্বরবাদী ভক্ত । 
তাই উপনিষদের সবেশ্বরবাদ বা শংকরাচার্ধের অছৈতবাদ তিনি গ্রহণ 
করতে পারেন নি। তবু উপনিষদের প্রতি শ্রদ্ধা তার শিথিল হয় নি। 


১৮. আচাধার় প্রিয়ং ধনমাহৃতা প্রজাতন্তুং মা ব্যবচ্ছেধসীঃ ॥ তৌত্তরীর ॥ ১।২ 


২৫ 
উপপানষদ--২ 


তাই দেখি ব্রাহ্গধর্মের যেউপাসনারীতি তিনি প্রবর্তন করেন, তার 
মধ্যে উপনিষদের কতকগুলি বচন স্থান পেয়েছে । তার মধ্য দিয়ে 
রবীন্দ্রনাথের বাল্যে পারিবারিক প্রার্থনাসভায় উপনিষদের সঙ্গে 
পরিচয় ঘটেছে। কিন্তু সে-পরিচয় ছিল একাস্তই বাহ্যিক এবং সেই 
কারণে তার উত্তর-জীবনের চিন্তাকে প্রভাবান্বিত করতে পারে নি। 
তিনিই বলেছেন £ 
“বাল্যে উপনিষদের অনেক অংশ বারবার আবৃত্তি দ্বারা আমার 
কণ্ঠস্থ ছিল। সবকিছু গ্রহণ করতে পারি নি সকল মন দিয়ে । শ্রাদ্ধ। 
ছিল, শক্তি ছিল না হয়ত।”১৯ 
পরবর্তাকালে যখন তিনি তরুণ বয়স অতিক্রম করে প্রায় 
প্রৌত্বের সীমায় এসেছেন তখন দেখি তিনি উপনিষদের এবং প্রাচীন 
তপোবনভিত্তিক অধ্যাত্মসাধনার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন । তপোবনেব 
খষি এবং উপনিষদে বিধৃত তাদের বচন-_-উভয়ই যে ভাব সুগভীর 
শ্রদ্ধ। আকর্ষণ করেছিল তার সুন্দর পরিচয় পাওয়া যায় তাৰ “নৈবেছ 
কাব্যগ্রন্থে । এই সাধনার প্রতি তিনি কতখানি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ 
করতেন নিচের কাব্যাংশে তার স্থন্দর পরিচয় পাওয়া যায় £ 
হে সকল ঈশ্বরের পরম-ঈশ্বর 
তপোবন তরুচ্ছায়ে মেঘমন্দ্রধৰ 
ঘোষণ। করিয়াছিল সবার উপরে 
অগ্নিতে জলেতে এই বিশ্বচর/চবে 
বনস্পতি-ওষাধতে এক দেবতার 
অথণ্ড অক্ষয় এঁক্য। সেবাক্য উদার 
এই ভারতেরই ।২* 
এরপরে দেখি উপনিষদে নিহিত তত্ব রবীন্দ্রনাথের মনকে আরও 
প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছে ; এবং ফলে তিনি যে তার মধ্যে গভীর- 


১৯, সানুষের ধর্ম, সংযোজন--১ 
২০, নৈবেদ্য, ৫৭ 


২৬ 


ভাবে প্রবেশ করেছেন তার প্রমাণও আমর! পাই । এমনই তে। হয়ে 
থাকে। প্রথনে শ্রদ্ধা আসে তারপর যার প্রতি শ্রদ্ধা আমে তাকে 
ভালভাবে জানতে ইচ্ছা করে। এর সুন্দর প্রমাণ পাওয়। যায় "শান্তি- 
নিকেতনের ভাষণমালার মধ্যে । এই ভাষণগুলি প্রদত্ত হয় বাংল! 
১৩১৫ হতে ১৩২১ সালের মধ্যে ৷ তাতে নিজশ্ব কথ। যেমন আছে, তেমন 
উপনিষদের বাণী উদ্ধৃত করে তার সমর্থনও চাওয়া হয়েছে। যাকে শ্রদ্ধা 
করি তার কাছ হতেই আমরা সমর্থন খুজি । এমনও ভাষণ আছে য। 
উপনিষদের ব্যাখ্যার ূপ ধারণ করেছে । এই প্রসঙ্গে “বিশ্ববোধ' শীর্ষক 
ভাষণটির বিষয়বস্তু লক্ষণীয়! এই সময়ের মধ্যেই, নোবেল পুরস্কার 
পাবার অব্যবহিত পুবে তিনি আমেরিকায় নান! স্থানে বন্তৃত৷ দেবার 
আমন্ত্রণ পান। সেখানে তার বক্তৃতার মূল বিষয় ছিল উপনিষদের 
বাণীর ব্যাখ্যা । বল। বাহুল্য, এই ভাষণগুলি ইংরাঞ্জরিতে প্রদত্ত হয় এবং 
পরে “সাধনা” নামে প্রকাশিত হয়। এদের মধো “দি রিয়ালাইজ্রেশন 
অব দি ইনফিনিট+২১ শীর্ষক ভাষণটি, বিশেষ কৰে দ্রষ্টব্য । 

স্থতরাং এটি অবধারিত সত্য যে রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের বাণী 
সহিত মাশৈশব পরিচিত ছিলেন এবং পরবতী জীবনে তার প্রতি 
গভীরভাবে শ্রদ্ধাবিষ্ট হয়ে, তা সযত্রে পাঠ করে, তার মন হৃদয়গম 
করেছিলেন। উপনিষদের বাণীর মানুষের মনকে ভবর্ধমুখী করবার 
শক্তির বিষয় অবহিত হয়ে, তার 'প্রচারকের ভূমিকাও তিনি গ্রহণ 
করেছিলেন। ওবু একথা বল! হয়ত শক্ত হবে যে তারচিন্তা 
উপনিষদের চিন্তাদ্ধার। প্রভাবাস্বিত হয়েছিল । ঠিক বলতে, তিনি 
প্রভাবান্িত হয়েছিলেন কিনা এব: হয়ে থাকলে কতখানি প্রভাবান্বিত 
হয়েছিলেন সেই প্রশ্রের মীমাংসাই বর্তমান আলোচনার অনুসন্ধানের 
বিষয় ॥ তার প্রস্তুতি হিসাবে রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক চিস্তার সহিত 
আমাদের সংক্ষেপে পরিচিত হয়ে নিতে হবে । 

রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক তথা আধ্যাত্মিক চিম্ত! সামগ্রিকভাবে 


৯৯ 100/2 06818986500) ০01 0১০ 10)81)156. 
৭ 


আলোচনা করলে দেখা যায় তা গতিশীল ছিল। অর্থাৎ বিভিন্ন 
অবস্থায় তার প্রকৃতির পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে । মোটামুটি তিনটি 
অবস্থার মধ্য দিয়ে তার চিন্তা পরিণতির পথে এগিয়ে গিয়েছে । 
প্রথম জীবনে দেখি, তিনি এক সর্বব্যাপী সত্তার বিশ্বের মধ্যে প্রচ্ছন্ন 
উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। পরবর্তা ' অবস্থায় দেখি, তিনি এক 
ব্ক্তিরপী ঈশ্বরকে তার অন্তরের মধ্যে আবিষ্কার করেছেন এবং মধুর 
রসের ভিন্তিতে তার সহিত গ্রীতির সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন ও সেই 
অস্তরে অবস্থিত দেবতার ইচ্ছ। অনুসারে জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করাই 
নিজের কর্তব্য বলে মনে করেছেন। এঁকেই তিনি “জীবনদেবতা, 
বলেছেন। শেষ অবস্থায় তিনি এই ছুটি তত্বের মধ্যে সামঞ্জস্থ স্থাপন 
করতে চেষ্টা করেছেন তার নিজস্ব মানবিকতা তত্বের মধ্যে । অখণ্ডতা- 
বোধ হতে বিশ্বমানবের প্রতি গ্রীতি এবং গ্রীতি হেতু বিশ্বজনীন কর্মে 
আত্মনিয়োগ করে আনন্দ এই হলে। সেই তত্বের মর্নকথ। | জঙ্ঞান হতে 
্লীতি, প্রীতি হতে সেবা, সেবা হতে আনন্দ। 

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক অসাধারণ কবি। তার কাব্যের উৎস 
ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অভিজ্ঞত! হতে সঞ্জাত তীব্র অনুভূতি নয়; তার মূল 
প্রেরণ হলো তার অধ্যাত্ম-চিন্ত।। অধ্যাত্ম-চিন্ত তার হৃদয়ে যে 
আ[লোড়ন স্থ্টি করত তাই তার কবিতায় ভাষা পেত। তাই দেখি 
তার কাব্যে বারবার পাল। বদল হয়েছে, অথচ তার মধো একট 
ধারাবাহিকতা আছে। ম্ৃতরাং তার অধ্যাম্মজীবন ও কাব্যজ্ীবন হাত 
ধরাধরি করে চলেছে এবং কাব্যের মধ্যেই তার অধ্যাত্ব-চিন্তার ইতিহাস 
অজানিতে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে । এবিষয় তিনি নিজেও অবহিত 
ছিলেন। তাই দেখি তিনি বলেছেন যে তার কাব্যজীবন ও অধ্যাত্ব- 


জীবন তার অজানিতে একই পথ অনুসরণ করেছে ।২+ 
২২, 79 16119100995 1106 1345 101109৩/60 6136 58096 73950211005 11706 
০6 0:০%/0) 29 1393 105 1০061101109. 90061805/ 0065 616 ৯০৫৫৭ 6০ 


6৪০1) ০6182 800 07008] 1১617 10610060091 0৭০ ৪ 1018 05190 ০£ 
০816100552৮ 985 (0506 56০16 60 282) 26118107 ০1 8607, 276 7715107. 


০ 


রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মজীবন শুরু হয়েছিল প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ 
এবং নিবিড় সংযোগের মধ্য দিয়ে। ভোরের স্ুর্যকিরণে বাতাসে 
আন্দোলিত নারকেলগাছের পাতা, মধ্যাহ্নকালের নিবিড় নিস্তব্ধতা, 
বর্ষায় ঘননীল মেঘের সমাবেশের মাধুর্য তার হৃদয়কে আন্দোলিত 
করত। মেঘ দেখলে তার হাদয় নাচত, বর্ষামুখর রতে এবং ফাস্তন 
সমীরণে ভার মন শিহরিত হতো, ভোরের স্ুর্যকিরণের আকর্ষণ তাকে 
বাল্যক।লে ঘুমের নিবিড় আলিঙ্গন হতে টেনে বার করে আনত। 

প্রকৃতির মধো নানা পরিবেশে এই মাধুর্ষের বিকাশের ভিতর তিনি 
এক প্রচ্ছন্ন সত্তার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতেন এবং তাকে জানবার ভন্য 
মনে একটি তীব্র আকৃতি জাগড। নীল আকাশে কে শাদা মেঘের 
ভেলা ভাসাল ত৷ জানতে তার মন উৎসুক হতো । নীল মেঘে আকাশ 
ছেয়ে গেলে তার হৃদয় শুধু ময়ূরের মতো! নেচে উঠত না, আকাশের 
পানে বাহুতুলে সেই অজ্ঞাত প্রচ্ছন্ন সন্তাকে পেতে চাইত। মন দিয়ে 
চিন্তা! করে, হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, তার মনে হয়েছে সেই মহাসত্। 
নিজে অলক্ষ্য থেকে মহাকাশে মহাবিশ্বকে এবং পৃথিবীর বক্ষে প্রাণের 
প্রবাহকে নিয়ন্ত্রিত করেন। গ্রহ-নক্ষত্রগুলি যেন তার আলোক ধেন্ু 
এবং পৃথিবীর বক্ষে লালিত তরুলত। আদি আলোয়চরা ধেন্ু॥ আর 
তিনি তন অদৃশ্য রাখালরূপে তাদের নিয়ন্ত্রিত করেন; তার বাঁশ 
শোনা যায়, তাকে দেখা যায় না £ 

এই যে -তামার আলোক ধেন্ 
শষ তার দলে দলে, 
কোথায় বসে বাজাও বেণু, 
চরাও মহ! গগন তলে ।২৩ 

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেই মহাসত্তার শুধু পবিচয় পেয়ে সন্তুষ্ট হতে 
পারেন (নি; তাকে গ্রীতির সম্বন্ধে পেতে চেয়েছিলেন। তার বুদ্ধিবৃত্তি 
যেমন প্রবল ছিল, হৃদয়বৃত্তিও তেমন শক্তিমতী ছিল । বুদ্ধিবৃত্তির 


২৩. গীতালি, আলোক ধেনু। 
২৯ 


সাহায্যে তিনি বিশ্বসন্তাকে এক জবব্যাগী প্রচ্ছন্ন সম্তারূপে 
জেনেছিলেন। এখন হৃদয়বৃত্তির আকষণে তিনি তাকে গ্্রীতির সম্থন্ধে 
পেতে চাইলেন । এই আকৃতির ফলেই তিনি অধ্যাত্মজীবনের দ্বিতীয় 
অধ্যায়ে তার জীবনদেবতাকে আবিষ্কার করলেন । 

এই জীবনদেবতা! তব্টি তিনি এক দিব্য অনুভূতির সাহায্যে 
আবিষ্ষার করেছিলেন । তার কথ! তিনি ছুই স্থানে উল্লেখ করেছেন ; 
তার 'রালজ্জিয়ান অব ম্যান গ্রন্থে এবং “মানুষের ধর্ম, গ্রন্থের 
( সংযোজন অংশে )। একদিন হুপুরে তহশীলের কাজ সেরে তিনি 
স্নান করতে যাবার পথে সাহাজাদপুরের কুঠিবাড়ির দোতলার খোল। 
জানলার সামনে দাড়িয়েছিলেন। হঠাৎ তার উপলব্ধি হলে। একটি 
শক্তি তার সমগ্র জীবনকে এক অথণ্ড এঁক্োব স্থাত্রে গ্রথিত করে 
আছেন। তিনি যেন নাটকের অষ্টাব মতো! অভিনেতারপী কবির 
জীবনকে, সার্থকতার পথে প্রীতির সম্বন্ধের ভিতর দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে 
চাইছেন। তার ধাবণা জীবনদেবতা। নৈবাক্কিক বিশ্বসন্তার বাক্তিরূপে 
প্রকাশ । 

এইভাবে রবীন্দ্রনাথ একটি অসঙ্গতির মধ্যে এসে পড়েছিলেন । 
মন দিযে বিশ্বের অন্তনিহিত শক্তিরূপে ধার পরিচয় পপলেন, তিনি এক 
প্রচ্ছন্ন সন্ত।। উপনিষদের ব্রহ্মবাদ তবের সঙ্গে তার মিল আছে। 
অথচ হৃদয় দিয়ে তাকে পেলেন হছাদয়ের মধ্যে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি-সন্তাবপে | 
তিনি এই 'অসঙ্গতির মীমাংসা কবেছেন এক অভিনব পথে । তিনি 
বলেছেন, বিশ্বসত্তার একই সঙ্গে ছুই বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশ হতে 
পারে। এক পর্যায়ে তিনি সর্বব্যাপী প্রচ্ছন্ন নিয়ামক শক্তি । তাঁকে 
তিনি বিশ্বসক্তার “কাজের প্রকাশ বলেছেন । এখানে বিশ্বসন্ত! 
বিশ্বদেবতা” । এর অতিরিক্তভাবে তার একটি প্রকাশ আছে, যেখানে 
তিনি ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন করে, তার হৃদয়ে 
স্থান নিয়ে তার জীবনকে গড়ে তুলতে চান। এই প্রেমের সন্বন্ধে 
কোনও বাধ্যবাধকত। নাই। যে তার খ্বীতির আহ্বানে সাড়া দেয়, 


9 


তার হৃদয়েই তিনি অধিষ্ঠান নেন। একে তিনি আনন্দের প্রকাশ 
বলেছেন। এখানে বিশ্বসপ্তা 'জীবনদেবতা” 1২৪ 

মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন এই তবটির প্রতীকের সাহায্ো একটি 
কবিতার মধ্য দিয়ে পরিষ্ফুট করতে চেষ্টা করেছেন । একই মহ্থাশক্তির 
ছুই পর্যায়ে যুগপৎ প্রকাশ যে সম্ভব ত1 একটি নৈসগ্িক দৃষ্টান্ত হতে 
তিনি সেখানে স্থাপন করেছেন । তূর্য বিরাট, গগন না হলে তার 
প্রকাশের উপযুক্ত পরিবেশ কল্পনা করা যায় ন ; অথচ ক্ষুদ্র শিশির- 
বিন্দুর বক্ষেও নিজেকে প্রতিফলিত করবার ক্ষমতা রাখে। স্ূর্ধ বিপুল 
কিরণে যেখানে ভবন আলোকিত করে, সেখানে পাই তার নৈধ্যক্তিক 
প্রকাশ, আবার যখন বিশেষ শিশিরবিন্ুর মধ্যে সে নিজেকে 
প্রতিফলিত করে, তখন পাই তার ব্যক্তিরপে বিশেষের সঙ্গে সম্বন্ধ 
স্থাপনের উপযুক্ত প্রকাশ ।২« প্রথমটি কাজের প্রকাশের সঙ্গে তুলনীয় 
এবং দ্বিতীয়টি আনন্দেব প্রকাশের সঙ্গে তুলনীয় । 

রবীন্দ্রনাথের যেমন বুদ্ধিবৃত্তি ও হাদয়বৃত্তি প্রবল ছিল, তেমন 
সেবাবৃত্তিও প্রবল ছিল। এই সেবা ব৷ কর্মবৃন্তির আকর্ষণই তাকে 
জীবনদেবতা হতে সবিয়ে নিয়ে মানবিকতার কাছে টেনে নিয়ে 
এসেছে। সাধন জীবনের শেষ অধায়ে জীবনদেঘতা তত্ব হতে 
মানবিকত তবে উত্তরণের প্রেরণ। বিশ্বজনীন কর্মে আত্মনিয়োগের 
আকর্ষণ হতেই এসেছিল । বুদ্ধিবৃত্তিব পথে তিনি জীবনদেবত৷ তত্বে 
আকৃষ্ট হয়েছিলেন ॥ কিন্তু এইভাবে ঈশ্বরকে পাওয়া গেলেও তাকে 
দেখ! যায় না, তাকে ধরা যায় না$ সুতরাং তাকে সেব করবার 
স্বযোগ পাওয়া যায় না। স্মৃুতরাং মানুষ রূপেই রবীন্দ্রনাথ তার সেবা 
করতে চেয়েছিলেন । 

এই কারণে তিনি বিশ্বসন্তার এমন একটি প্রকাশ চেয়েছিলেন 

২৪, এই প্রসঙ্গে “শাস্তিনিকেতন” গ্রন্থের “সোন্দর্য” “আত্মবোধ' ও ণবশেষ' 

শীর্ষক ভাষণগুলি দুষ্টব্য। 
২৫. উৎসর্গ, প্রসাদ । 


৩১ 


যেখানে মানুষ বুদ্ধিবৃত্তি, হৃদয়বৃত্তি এবং সেবাবৃত্তির প্রয়োগের স্থুযগ 
পেয়ে তার সঙ্গে মিলিত হতে পারে । তিনি ঈশ্বরকে যুগপৎ মন, 
হৃদয় ও কর্ম দিয়ে পেতে চেয়েছিলেন। তার ধারণায় সেটা সম্ভব, 
ঈশ্বরের ষে প্রকাশ মানুষের নিকট ঘনিষ্ঠতম সেই প্রকাশের সঙ্গে 
এই তিন বুত্তির সংযোগ স্থাপন করলে । তার প্রতিপাছটি সহজবোধ্য 
করবার জন্য তিনি একটি উদাহরণ স্থাপন করেছেন । বিষয়টি তার 
নিজের মুখেই শে:ন। যেতে পারে £ 

“মাতা যেমন একমাত্র মাতৃসম্বন্ধেই শিশুর সবাপেক্ষা নিকট, 
সর্বাপেক্ষা প্রভাক্ষ, সংসারের সহিত তাহার অন্টান্থ বিচিত্র সম্বন্ধ শিশুর 
নিকট অগোচর ও অব্যবহার্ধ, তেমনি ব্রহ্ম মানুষের নিকট একমাত্র 
মনুষ্যত্বের মধোই সবাপেক্ষা সতাকপে, প্রত্যক্ষরূপে বিরাজমান--এই 
সম্বন্ধের মধা দিয়াই আমরা তাহাকে শ্রীতি করি, তাহাকে কর্ 
করি।”২৬ 

রবীন্দ্রনাথের মানবিকতা তন্ব বলে বিশ্ব হতে পলাঙুক হয়ে 
সন্ন্যাসগ্রহণ মুক্তির পথ নয়; মুক্তির পথ বিশ্বের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত 
করে আত্মার বিকাশ সাধনের মধো । এই তন্বটি 'শান্তিনিকেওনে'র 
ভাষণমালায় বিশ্লেষণ করে দেখান হয়েছে । এতে মানুষেব তিনটি 
মৌলিক বৃত্তিই প্রয়োগের সুযোগ পায় এবং ফলে ঈশ্বর সাধন। 
সর্বতোমুখী হয়। বুদ্ধিবৃন্তির সাহায্যে জ্ঞানের পথে বিশ্বের অথগুতাবোধ 
পরিস্ষুট হয়। তার ফলে বিশ্বের সহিত যে একাত্মতাবোধ জাগে তা 
অন্যের প্রতি শ্রীঙি সঞ্চার কবে হৃদয়বৃদ্তিকে পবার্থে উন্মুখ করে। 
এই গ্রীতি সঞ্চারের ফলে কর্মবাত্ত আর স্বার্থবোধের দ্বাগ। প্রভাবান্বিত 
হয় ন।; প্রীতিপ্রণোদিত হয়ে সবজনীন কর্মে আত্মনিয়োগ করা সহজ 
হয়ে পড়ে । তখন পরের জগ্ত কর্ম কর! আর দায় বোধ হয় না, তাতে 
আনন্দ আসে; যেমন মায়ের সন্তানের সেবা করে আনন্দ আসে। 


২৬. ধর্ম 
৩৭ 


গ্রীতির প্রভাবে পরার্থ স্বার্থের সহিত একীভূত হয়ে যায়। একেই 
রবীন্দ্রনাথ বলেন জ্ঞান-প্রেম-কর্ম-আনন্দের সাধন] । 


পাচ 
প্রস্তাবিত আলোচনারণীতি 

এখন বঙ্মান প্রসঙ্গে কোন্‌ আলোচনারীতি প্রয়োগ করা হবে সে 
বিষয় কিছু বলে নেওয়া যেতে পারে । আমাদেব আলোচ্য বিষয় 
হলে। উপনিষদের ভাবধারার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচিন্তার 
তুলনামূলক আলোচন। ॥ উভয় চিন্তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি উপরের 
আলোচনায় সংক্ষিপ্ত আকারে লিপিবদ্ধ হয়েছে । এর ফলে তাদের 
পরস্পরের তুলনামূলক আলোচনাব পথ প্ররস্তত হয়ে গেছে। সেটা 
সব থেকে সহজসাধা হবে, যদ্দি উপনিষদের মূল চিন্তাগুলি পৃথকভাবে 
স্থাপন করে, প্রত্যকটির সহিত রবীন্দ্রনাথের চিন্তার তুলনা! করি। 
তাতে আলোচনার একটি স্বচ্ছ বপ পাবার সম্ভাবনা বেশি । তারপর 
আমরা এই গ্রন্থে যে মূল প্রশ্ন উত্থাপন করেছি তার উত্তর দেবার 
সময় আসবে । মূল প্রশ্ন হলো রবীন্দ্রনাথেব অধ্যাত্ম চিন্তার সহিত 
উপনিষদ চিন্তার সাদৃশ্য কতখানি এবং দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথ গঁপনিষদ 
[চস্তাঘ্বারা কতখানি প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন । দেই আলোচনাটি 
সবার শেষে হওয়াই বিধেয়। 

এখন বতমান প্রসঙ্গে যে তত্বগুলির সহিত রবীন্দ্রনাথের চিশ্তাব 
পৃথকভাবে আলে চন। করবার প্রস্তাব করি, তাদের একটি সংক্ষিপ্ত 
পরিচয় দিয়ে, এই প্রাথমিক আলোচনা শেষ করতে পারি । সেই 
বিষয়গুলি হলে। এই £ 


১। উপনিষদের ব্রহ্মবাদ £ তা রলে বিশ্ব এক প্রচ্ছন্ন মহাসত্তা- 
দ্বারা পরিব্যাপ্ত এবং নিয়ন্ত্রিত এবং বিশ্ব হতে তা অভিন্ন। 
রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় এই সবেশ্বরবাদ একরকম সমধিত। 


৩৩ 


৪8 


তবে একেশ্বরবাদের প্রভাব হতেও তিনি মুক্ত নন। ফলে 
জীবনদেবতা তত্বের উত্তব। 


২। উপনিষদের দ্বৈতভাব তত্বঃ উপনিষদের মূল চিস্তাধার। 


৩। 


৪1 


বিশুদ্ধ অদ্বৈতবাদ সমর্থন করে না। তা বলে আনন্দ 
আস্বাদনের জন্য যিনি ছিলেন একমাত্র অদ্ভিতীয় সত্তা, তিনি 
নিজের ওপর দ্বৈতভাব আরোপ করে এই বিচিত্র বিশ্বে 
রূপান্তরত হয়েছেন। ঘ্বৈতভাবের মধ্যেই বিশ্বসন্তার 
আনন্দরূপটি পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। আমবা দেখব 
রবীন্দ্রনাথ এই চিন্তার পুরণ সনর্থন করেন। তিনিও 
বলেন যিনি “পরম-এক" তিনি “আনন্দে উৎসুক” হয়ে 
“আপনারে ছুই করি লভিছেন সুখ । 

আনন্দতব্ £ উপনিষদের আনন্দবাদের সংঙক্ষপ্ত পবিচয় 
বর্ধমান আলোচনার প্রথম অংশে দেওয়া হয়েছে। 
আমরা দেখব, রবীনব্দ্রন।থ-পরিকল্পিত আনন্দতত্বেব সহিত 
তার আশ্র্ধরকম সাদৃশ্য আছে। 

মৃত্া সমস্া £ উপনিষদে এই সমস্তাটি নিয়ে 'অনেক 
আলোচনা আছে। আনন্দতত্বেরেইে অংশ হিসাবে তা 
আলোচিত। তা বলে আনন্দই ব্রহ্ধ। সেই আনন্দেবই 
আকর্ষণে জীবের জন্ম এবং মতা । তার প্রাণ প্রবাহে 
ছন্দ। কাজেই ব্যাপক দৃষ্টিভাঙ্গ দিয়ে দেখলে মৃত্যুর 
দাতিকাশক্তি থাকে না, তা আনন্দ ব। অযুতের উপাদান 
হয়ে দাড়ায় । তাই বল। হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবে দেখলে মৃত্যুর 
কষ্ট আছে, কিন্তু অখগুভাবে দেখলে শোকের অবকাশ 
থাকে না। সম্ভুতি ও বিনাশকে যুক্ত করে দেখলে অমৃত 
লাভ কর! যায়।২+ 


২৭. বিনাশেন মৃত্যুং তীর্থ সংভুত্যাহমৃতমন্নু তে ॥ ঈশ। 99 


রবীকজ্রনাথ বারবার মৃত্যুশোক পেয়েছেন এবং মৃত্যুর প্রকৃতি 
নিয়ে নান! প্রশ্ন তূলেছেন এবং উত্তরও দিয়েছেন। জে- 
উত্তরের চিস্ত। যেমন পরিণতির পথে এগিয়েছে তেমন তার 
রূপপরিবর্তন ঘটেছে । 'আমরা দেখব রবীন্দ্রনাথের পরিণত 
চিন্তাটি উপনিষদের চিন্তার কাছে ঘেঁষে এসেছে। 

শ্রেয়তত্ব :হ উপনিষিদের শ্রেয়তন্ব অনম্থসাধারণ। পাশ্চাত্য 
নৈতিক দর্শনের চিন্ত। হতে তা ভিন্ন পথে অগ্রসর হয়েছে। 
তার সহিত তুলনীয় কোনও তত্ব রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় যেন 
পাওয়া যায় ন। মনে হয় ॥ তবে এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের 
বিশ্বমানবতত্ব উল্লেখনীয়। তাও অভিনৰ এবং তার সহিত 
শ্রেয়তত্বের হয়ত কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। 
তবে সেটি অনুসন্ধান সাপেক্ষ । 

মানবিকত। £ উপনিষদের মানবিকতার প্রেরণ অখগ্ডবোধ। 
তাৰ ভিব্কিতেই স্বার্থবোধকে গ্রীতির উদ্রেকের সাহায্যে 
পরিশোধিত করবার প্রেরণা সেখানে আছে । তার 
মানবিকতাতত্ব ও শ্রেয়তত্ব অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ।॥ 'আমরা 
দেখব রবীন্দ্রনাথের মানবিকতাতত্বের শুপনিষদ তত্বের সহিত 
গভীর সাদৃশ্ঠ অআছে। উপনিষদের চিন্তায় পাই জ্ঞান হতে 
সবজনীন প্রীতি এবং প্রীতি হতে পরার্থপরত। । রবীন্্রনাথও 
বলেন অখগ্ুজ্ঞান হতে আসে প্রীতি এবং প্রীতি হতে 
কল্যাণকর্ধে প্ররণা। অতিরিক্তভাবে তিনি এই বিশ্বজনীন 
কর্মে আনন্দ আশ্বাদের কথ! উল্লেখ করেছেন। এখানে 
তিনি একটি অতিরিক্ত কথা বলেছেন। তিনি যেন স্বার্থকে 
উম্মুলিত করে পরার্থপরতাকে প্রতিষ্টিত করতে চেয়েছেন । 
উপনিষদ তা চায় নি। এ-বিষয় বিস্তারিত আলোচনার 
প্রয়োজন আছে। 


৩৫ 


৭০০৭৯ দ্বিতীয় অধ্যায় ৭৭৭৭৭ 
ব্রহ্মবাদ 


এক 
উপানহদের জিজাস, দৃস্টিভাজ 


উপনিবদের ব্রহ্মবাদের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পৃবের অধ্য।য়ে দেওয়া 
হয়েছে । আমাদের বর্তমান আলোচনার পক্ষে তাই যথেষ্ট। সুতরাং 
এখানে তার পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নাই। তবে বর্তমান আলোচন। 
প্রসঙ্গে ব্রহ্মবাদের প্রকৃতি সম্বন্ধে হুটি বিষয় আমাদের অবহিত হতে 
হবে। প্রথম কথা, তা বলে ব্রহ্মই বিশ্বরূপে প্রকাশ হয়েছেন এবং 
দ্বিতীয় কথা ত৷ বলে তিনি বিশ্বের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থান করে 
তাকে নিয়ন্ত্রিত করছেন। 
বিশ্বই যে ত্রঙ্গের প্রকাশ তাব সমর্থনে ছান্দোগ্য উপনিযদে একটি 
ক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্ধপূর্ণ বাণী,আছে য! এই প্রসঙ্গে উদ্ধৃত কর! যেতে 
পারে। তা বলে £ তিনিই নিচে, তিনিই উপরে, তিনিই পশ্চাতে, 
তিনিই সম্মুখ, তিনিই দক্ষিণে, তিনিই উত্তরে--এই সব-কিছুই 
তিনি ।১ 
আর ব্রহ্ম ষে নিয়ন্ত্রক শাক্ত হিসাবে বিশ্বের মধ্যে গ্রচ্ছন্নভাবে 
বিরাজ করেন তা সুন্দর প্রকট হয়েছে শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের আর 
একটি বচনে। ত৷ বলে, যিনি একক এবং নিবিশেষ থেকেও কামনা- 
হীন অবস্থায় বহ্ুপ্রকার শক্তির সাহায্যে প্রথমে বছ বিশেষ বস্ত্র 
স্থপ্টি করেন এবং শেষে সেই বু দিয়ে গঠিত বিশ্বকে নিজের মধ্যে 


১. স এবাধজ্ঞাং স পশ্চাৎ স পুরন্ঞাৎ দক্ষিণতঃ স উত্তরতঃ স এবেদং 
সর্বামাতি ॥ ছান্দোগ্য 1৭২৫১ 


৪৪ 


প্রত্যাহত করেন, তিনি আমাদের শুভবুদ্ধির সহিত সংযুক্ত করুন ।২ 

এই প্রসঙ্গে উপনিষদের আর একটি বৈশিষ্ট্যের সহিত আমাদের 
পরিচিত হয়ে নেওয়া দরকার । ত1 হলে! তার বিশুদ্ধভাবে জিজ্ঞাস্থুর 
দৃষ্টিভল্ি। সেখানে ভক্তের দৃষ্টিভঙ্গির একান্তই অভাব। অবশ্য 
গীতা জিজ্ঞাস্ুকেও ভক্তের অন্তভূক্ত করে। গীতা এই ব্যাপক অর্থে 
চার প্রকার ত্ৃক্তের কথ উল্লেখ করেছে £ আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাস ও 
জ্ঞানী ভক্ত।* আর্ত ও অর্থার্থী হলো সাধারণ ভক্ত যার! ঈশ্বরকে 
ব্যবহারিক প্রয়োজনে স্মরণ করে । জ্ঞানী ভক্ত ব্যবহারিক প্রয়োজনের 
উধের্ব ওঠেন। তিনি বিনাহেতুতে ঈশ্বরের প্রতি ভক্কি-আবষ্ট হন। 
তিনিই প্রকৃত ভক্ত । জিজ্ঞাস ঠিক ভক্ত নন। কারণ তিনি বিশ্বরহস্ 
ভেদ করতে চান! ভক্তের হাদয়বৃত্তি প্রবল। জিজ্ঞাম্থুর বুদ্ধিবৃত্তি 
প্রথল। তিনি বুদ্ধিশক্তির প্রয়োগে বিশ্বকে বুঝতে চান। বৈজ্ঞানিক 
ও দার্শনিক এই শ্রেণীতে পড়েন। উপনিষদের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের 
অনুরূপ । 

এইজন্যই বেদের মধ্যে কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ডের বিভাগ টান। 
হয় । আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে বেদে কর্মকাওই প্রাধান্ত লাভ করেছে। 
বেদের সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অংশের সম্পর্ক সাধারণত যজ্ঞের সঙ্গে । 
যজ্ধের উদ্দেশ্য বিশেষ-বিশেষ দেবতার গুণকীর্তন করে, ভার উদ্দেশে 
অগ্নিতে আন্তি দিয়ে প্রার্থনা নিবেদন ॥ এই প্রার্থনা--বিপদ হতে 
ত্রাণের জগত ব। ধন-সম্পদের জন্য । অর্থাৎ হোতা আর্ত ও অর্থার্থীর 
মনোভাব নিয়ে প্রার্থন। জানান । গীতা এই দৃষ্টিভঙ্গির নিন্দা করেছে, 
কারণ তা ভোগ এশ্বর্ষে আসক্তি স্চিত করে এবং তাইজন্া "তাকে 
ব্যবসায়াত্মিক। বুদ্ধি বলেছে ।& পরিবর্তে অহৈতুক ভক্তিকেই তাতে 


২. য একোহবর্ণো বহ্‌ধা শাস্তযোগাদ: বর্ণনিনেকান 'নাহতার্থো দধাঁত ॥ 
বিচোতি চান্তে বিম্বমাদৌ স দেবঃ॥ শ্বৈতাম্বতর ॥61১ 

৩. গ'তা ॥৭॥১৬---১৭ 

৪. গীতা ॥ ২॥ ৪২৪৪ 


৩৭ 


গ্রহণ করতে উপদেশ দেওয়! হঃয়ছে। উপনিষদ কিন্ত তার ধারে-কাছে 
যায় নি। তবে উপনিষদ ও ব্যবসায়াত্মিক বুদ্ধির নিন্দা করেছে ; 
কারণ, তার ধারণায় ভোগ-সম্পদ দিয়ে মানুষের তৃপ্তি হয় না। 
“ন বিত্তেন তর্পণীয়ে। মনুষ্যুঃ | তাই উপনিষদ তৃপ্তি খু'জেছে জ্ঞানের 
পথে॥ তাই উপনিষদকে বেদের জ্ঞানকাণ্ড বল হয়। 

বেদের জ্ঞানকাণ্ডকে কর্মকাণ্ড হতে পৃথক করবার স্তম্থ উপনিষদে 
প্রথমটিকে পরাবিষ্ভ। বলা হয়েছে এবং দ্বিতীয়টিকে অপরাবিস্তা বল 
হয়েছে। এই পারিভাষিক শব্দ- জ্ঞা সোজাস্থজি উপনিষদে 
দেওয়! নেই। কিন্তু তা কি বোঝায় তা উপনিষদের উক্তি হতেই বুঝে 
নেওয়া যায়। মুণ্ডক উপনিষদে বল! হয়েছে খগ বেদ, যজুবেদ, সামবেদ; 
অধর্ববেদ, শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ--এই নিজে 
অপরাবিগ্তা। আরও বল! হয়েছে, পরাবিষ্ঠা হলে। তাই ঘার দ্বারা 
সেই অক্ষরকে জানা যায়।ৎ এখানে অপরাবিগ্ঠার তালিকা দেওয়। 
হয়েছে এবং পরাবিগ্ভার একটি পরিচয় দেওয়া হয়েছে। অপরাবিষ্ঠার 
অস্তভূক্তি করা হয়েছে চার বেদ এবং ছয় বেদাঙ্গ, অর্থাৎ সেকালে যে- 
বিদ্তাগুলি ব্যবহারিক প্রয়োজনে কাজে লাগত সেইগুলি । অপরপক্ষে 
বলা হয়েছে পরাবিদ্ধ! হলো! মক্ষর সম্বন্ধে জ্ঞান। অক্ষর অর্থে বুঝি 
ব্রচ্ধ। যিনি ব্রহ্ম তিনি সব কিছু জড়িয়ে বিভ্মান । তার মধ্ো ধ্বংস 
আছে, স্থট্টি আছে, মৃত্যু আছে, জন্ম আছে, কিন্তু সব জড়িয়ে নিয়ে 
বিশ্ব আছে । অংশের বিনাশ আছে, সমগ্রের বিনাশ নাই; তাই 
তিনি অক্ষর। অক্ষর সম্বন্ধে জ্ঞান কাজে লাগে না, কেবল কৌতৃহল- 
বৃত্তি চরিতার্থ করে। তার আকর্ষণ 'অহৈতুক। তাইজগ্তই তা 
অপরাবিদ্ধা । 

জ্ঞানের মধ্যে এই বিভাগ টান] হতেই বোঝ! যাবে যে উপনিষদের 
খষির ব্যবহারিক কাজে লাগে না এমন জ্ঞানের প্রতি পক্ষপাত বেশি 
ছিল। প্রাচীন উপনিষদের যুগে এই পরাবিগ্ঠার প্রতি আকর্ষণ এমন 


$. জথাপরা বয়া তদক্ষরমাধগমাতে ॥ মৃশ্ডক ॥ ১॥ ১ & 


ড় 


ব্যাপক ছিল যে বর্তমান যুগে তার কল্লনা করা যায় না । ঠিক বলতে 
কি কৌতৃহল-বৃত্তি-প্রণোদিত হয়ে বিশ্বরহস্যকে ভেদ করবার আকাঙ্া 
সেকালের সমাজের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল । 
তাই দেখি সেকালের মানুষের প্রার্থনা ছিল অর্থার্থী মনোভাবের 
উধে্র্বে। সেকালের মনীধী প্রার্থন। জানাতেন, পরমশান্তি তাকে এমন 
ধীশক্তির সহিত্ব যুক্ত করুন যাতে অ্রষ্টাকে তিনি সেই ধীশক্তি দিয়ে 
উপলব্ধি করতে পারেন ।* তাই সেকালের মানুষের সব থেকে গবের 
বিষয় ছিল অর্থ নয়, প্রতিপত্তি নয়, ক্ষমতা নয়, ব্রহ্মবিদ্ভার অধিকারী 
হতে পারা। তারা গর্বভরে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘে।ষণা করেছেন, “সেই মহান 
পুরুষকে জেনেছি? ॥* নচিকেতার উপাখ্যানে দেখি বালক বিপুল 
সম্পদের প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে পরাবিগ্ভার প্রতি আগ্রহশীল 
হয়েছেন । মৈত্রেয়ীর উপাখ্যানে দেখি মৈত্রেয়ী স্বামীর সম্পদের 
থেকে স্বামীর ক্রহ্মবিষ্ঠার অংশভাগী হতে চেয়েছেন । রাজ! জনক 
দেখি পরাবিগ্যার আকর্ষণে বিদেহ রাজ্য দান করে যাজ্জবক্ষ্যের দাসত্ব 
কামনা করেছেন । 

ঠিক বলতে কি বেদের মধ্যে কর্ম ও জ্ঞানের প্রতি আকর্ষণের ঘন্ৰ 
প্রথম হতেই বর্তমান ছিল এবং ধীরে-ধীরে বেদের খবি অর্থা্থী 
মনোভাব হতে সরে এসে জিজ্ঞাস মনোভাবকে একদিন সর্বাস্তঃকরণে 
বরণ করে নিয়েছেন। এবিষয় এখানে কিছু বিস্তারিত আলোচনার 
প্রয়োজন আছে । বেদে যেন জিজ্ঞাস মনোভাব এবং অর্থার্থী 
মনোভাব একসঙ্গে কাজ করেছে। অর্থার্থী মনোভাৰ নিয়ে তিনি 
জিজ্ঞাসা করেছেন, অভীষ্ট সিদ্ধির জন্ত কাকে প্রার্থন। জানাবেন? 
বুদ্ধিশক্তি উত্তর দিয়েছে, প্রকৃতির বক্ষে যেখানে শক্তির বিকাশ 


৬. তৎ সাঁবতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবসা ধীমহি ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াং ॥ 
বৃহদারণ্যক ॥ ৬৪ ৩॥ ৬ 

৭. বেদাহমেতং পুর্ষং মহাক্তমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরন্তাৎ ॥ শ্বেতাম্বতর ॥ 
৩) ৬ টু 


১০ 


সেখানেই দেবতার অধিষ্ঠান; অতএব তাদের কাছেই প্রার্থন! 
নিবেদন কর। এইভাবে কত দেবতা এসেছেন । পরে জিজ্ঞাস 
মনোভাব নিয়ে চিন্ত! করে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে দেবতা! তে! বন্ছ 
নয় একই। তিনি ছাড়! আর কাকে হবি দ্বারা তৃপ্ত করব 1৮ 


ছুই 
কর্মকাণ্ড হতে জ্ঞানকাণ্ডে উত্তরণ 


কিন্ত কর্ণকাণ্ড হতে বিশুদ্ধ জ্ঞানকাণ্ডে উত্তরণ একদিনে ঘটে নি। 
তা ঘটতে শত-শত বৎসর সম্ভবত লেগে থাকবে । এই উত্তরণ সংঘটিত 
হয়েছিল কয়েকটি অবস্থার মধ্য দিয়ে । বর্তমান প্রসঙ্গে তার সংক্ষিপ্ত 
ইতিহাসটি আমাদের জানার প্রয়োজন আছে। 

আমরা দেখি এই অর্থার্থ মনোভাব হতে জিজ্ঞান্নু মনোভাবের 
উত্তরণের সঙ্গে-সঙ্গে বেদের সংহিতা অংশে দেবতার প্রকৃতি সম্বন্ধেও 
ধারণ! পরিবতিত হয়েছে । তা বনু দেবতাবাদ হতে একেশ্বরবাদের 
দিকে অগ্রসর হয়েছে; কিন্তু শেষে এক নৈব্যক্তিক সর্ষেশ্বরবাদে এসে 
পরিণতি লাভ করেছে? এই উত্তরণের ইতিহাস নিচে সংক্ষেপে 
বণিত হলে|। 

অভিযান শুরু হয়েছে সাধারণ মানুষের মনোবৃত্তি দিয়েই । 
সাধারণ মানুষ চায় স্থখে বাম করতে । তার জন্য প্রয়োজন বিপদ 
হতে মুক্তি এবং বৈষয়িক সমৃদ্ধি। এখন এর জন্য প্রার্থনা নিবেদন 
হবে এমন শক্তির কাছে য। বিপদ হতে ত্রাণ করতে পারে এবং সম্পদ 
দিতে পারে। সেই শক্তিই তো দেবতা । তাকে বেদের খষি খু'জেছেন 
প্রধানত প্রকৃতির মধ্যে । যেখানেই প্রাকৃতিক শক্তির বিকাশি দেখেছেন 


৮ যআত্মদা বলদা বস্য বিশ্ব উপাসতে প্রশিষং যসা দেবাঃ। বস্য 
ছায়ামতং ধসা নৃত্যুঃ কৈ দেবায় হবিষা বিধেম ॥ খাগ্বেদ ॥ ১০ 
॥*২১ | ৭ 


সেখানেই তার ওপর সার! দেবত্ব আয়োপ কয়েছেন এবং ভার উদোশ্ে 
স্ক্ত রচনা! করেছেন ॥ তাতে একদিকে যেমন বিশেষ দেবতার 
প্রশত্তি দেওয়া আছে তেমন প্রীর্ঘনাও নিবেদিত হয়েছে । এইভাবে 
আগ্রি, বায়ু, বরুণ, সবিতা, পর্জন্ত, ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতা কল্লিত হয়েছেন । 
এ'রা সকলেই শক্তির প্রকাশ । কিন্ত দেবন্ব আরোপ শুধু এদের মধ্যে 
সীমাবদ্ধ থাকে নি। যা সুন্দর তার ওপরও দেবত্ব আরোপিত হয়েছে। 
যেমন উধা। তাকে কল্পনা কর! হয়েছে অগ্নির কন্যা ও স্ুর্ধের 
পত্বীরপে।৯ কুকুরকেও দেবত্বে উন্নীত করা হয়েছে; কারণ তা 
গৃহস্থের সম্পত্তি রক্ষা করে তার উপকার করে।১৯০ এমনকি বর্ম, 
ধন্থু ও জ্যাকেও দেবত। কল্পন1! করে তাদের জন্য প্রশস্তি রচিত হয়েছে। 
কারণ তার দেহরক্সার সহায়ক 1১১ 
“ যাক সে-কথা। ইন্দ্রাদি দেবগণ নিয়েই আমাদের বিশেষ 
আলোচনা ॥। কারণ তারা কতকগুলি মৌলিক শক্তির আধার। 
অর্থার্থী মনোভাব হতেই এতগুলি দেবতার প্রথম চিন্তায় স্যরি হয়েছে। 
ফলে ধর্চিস্তার প্রথম অবস্থায় বহুদেবতাদের উৎপত্তি হয়েছে। 
চিন্ত! সেখানে থেমে যায় নি, আরও এগিয়েছে । ফলে এঁদের 
উপর এক অতিদেবতাকে স্থাপন করবার প্রয়োজনীয়ত! দেখ! দিয়েছে । 
তখন কোন দেবতাকে এই আসনে স্থাপন করা যায় তা নিয়ে 
চিন্তা হয়েছে এবং সেই চিন্তার ভিত্তিতে ছুটি দেবতাকে এই বৈশিষ্ট্যের 
উপযুক্ত বলে বিবেচনা কর! হয়েছে । তারা হলেন ইন্দ্র ও বরুণ! 
ইন্জ হলেন প্রভৃত বলশালী। যে বৃত্র নদীসমূৃহের জঅলধারাকে 
স্স্তিত করে রাখে তাকে তিনি অপস্যত করে নদীগুলিকে প্রবাহিত 
করেন। তার বিপুল বলের কথা স্মরণ করে তার প্রতি শ্রন্থ। 
উদ্রেক হয়েছে। তাই বল। হয়েছেঃ “ছাবা-পৃর্থিবী ধার বিপুল বল 
অনুধাবন করে, বরুণ ও সূর্য ধার নিয়মে চলে, নদীসমূহ ধার নিয়মে 
৯. খাগবেদ /১1৭১/৫ ও ৩৬১1৪ ১০. ধাগবেদ 1৭86৫ 
১১. খাগবেদ 1৭৭৫ 
৪১ 
উপাঁনহদ--.৩ 


গ্রবাহিত হয় সেই ইন্দ্রকে মরুংগণের সহিত আমাদের সহায় হবার 
জন্য আহ্বান করি 1৮১২ 

অপরদিকে বরুণের প্রজ্ঞা, বরণের কলাণকর্মে আগ্রহ তার প্রতি 
শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছে । তিনি একাধারে শক্তিমান ও কল্যাণতব্রতী। 
তার দেহের গুণ অপেক্ষা! মনের গুণ বেশি। তাই বল! হয়েছে £ 
*এই বরুণ মহিমাবান্‌, মহাকর্না, প্রাজ্ঞঃ তেজোযুক্ত এবং জর৷ রহিত, 
ইনি বিস্তীর্ণ। গ্ভাবা-পৃথিবীকে বিভাসিত করেন ।”১৩ 

কিন্ত অতিদেবতার পদে তে! হুজনকে বসান যায় না। তাহলে 
একটি অসঙ্গতি এসে পড়ে! তাই শেষে উভয়ের গুণের তুলনামূলক 
বিচার করে বরুণকেই শেষে সেই পদে নির্বাচিত কর। হয়েছে । তুলন। 
প্রসঙ্গে বল হয়েছে £ “হে ইন্দ্র ও বরুণ, আপনাদের একজন যুদ্ধে, 
বৃত্রগণকে হনন করেন, অপর একজন ব্রত রক্ষা করেন।”১৪ সুতরাং 
দৈহিক শক্তি হতে প্রজ্ঞা ও কল্যাণকর্মে আগ্রহ মহত্তর গুণ বলে' 
বিবেচিত হয়েছে ॥। ফলে তিনি 'স্ততিযোগয রাজা" বলে এবং “সমস্ত 
সৎ পদার্থের রাজা বলে বণিত হয়েছেন ।১৪ 

কিন্তু তাতেও চিন্তা থেমে যায় নি : আরও অগ্রসর হয়েছে । বহু- 
দেবতার উপর এক অতিদেবত। স্থাপন তো স্থষ্টির সরল বাখা! নয় : 
স্থৃতরাং একটি এঁকিক স্ত্রেব প্রতি মন আকৃষ্ট হয়েছে। এই পথে 
প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে পাই বিশ্ব দেবতাগণের পরিকল্লন। ॥ অনেক স্ুত্ত 
দেখা যায় যেখানে সকল দেবতাকে সমষ্টিগতভাবে 'প্রশস্তি জানান 
হয়েছে। এই সামগ্রিক পরিকল্পন। হতেই খধির মনে উপলব্ধি পরিস্ফুট 
হয়ে উঠেছে যে দেবতা একই, বনু নয়, তারই ভিন্ন-ভিল্ন রূপে প্রকাশ 
আছে। সুতরাং সুর্য, অগ্নি, উষ।-_-এর। বিভিন্ন নয়, একই মহাশক্তি এই 
সবকিছু হয়েছেন । “একংবা ইদং বিবন্ধৃব সর্বমূ'। প্রাসঙ্গিক রচনাটি এই £ 

“এক অগ্নি বহু প্রকারে সমিদ্ধ হয়েছেন, এক স্র্য সমস্ত বিশ্বে 

১২. খাগবেদ ।১১০১।৩ ১৩. খগবেদ 1৬৬৮৯ 

১৪, খাগবেদ 111৮০91৯ ১৬ খাগবেদ 11৮৭৬ 


৪২ 


প্রভৃত হয়েছেন, এক উষা এই সমস্তকেই প্রকাশ করছেন। এই 
একই সর্বপ্রকার হয়েছেন ।১৬ 

এইভাবে বেদের সংহিতার যুগেই খবির মন ধীরে-ধীরে কর্ণ হতে 
জ্ঞানের পথে সরে এসেছে। অর্থার্থা মনোভাব হতে জিজ্ঞান্থু মনোভাব 
প্রবল হয়ে উঠেছে। অর্থার্ী মনোভাব যখন প্রবল ছিল তখন 
বন্ছদেবতার উত্তৰ হয়েছিল। জিজ্ঞাস মনোভাব যেমন প্রবল হয়েছে 
তেমন প্রকৃতির মধ্যে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন শক্তির পরস্পরের সঙ্গতি লক্ষ্য 
করে খবি ব্ছদেবতাবাদ হতে একদেবতাবাদে আকৃষ্ট হলেন । চিন্তা 
পরিণতি লাভ করলেই এট! স্তব হয়॥ তাই দেখি খগবেদের শেষ 

ংশে দশম মগ্ুলে এই চিন্তা একটি মূল অংশ অধিকাব করে বসেছে। 

এইখানেই উপনিষদের ব্রক্মবাদের ভিত্তি স্থাপিত হয়। 

এইপ্রসঙ্গে দশম মণ্ডলের কয়েকটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ স্ক্কের 
প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়া উচিত মনে হয়। প্রথমে নাসদীয় 
স্ক্ত (১০।১২৯) ধর! ঘাক। তা৷ যে-তত্ব বহন কবে তাকে ভিত্তি করেই 
দর্শন গড়ে তোলা যায়। এতে কোনও দেবতার স্ততি স্থান পায় নি; 
স্টিকি করে হলো--হইয়ং বিস্য্টিঃ কুত আবভূব এই প্রশ্নই সোচ্চার 
হয়েছে। 

তারপন আমর! প্রজাপতি স্ুক্তের (১০১১১) কথা উল্লেখ 
করতে পারি। এখানে যেপ্্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে তা হলে! কোন 
দেবতাকে উপাসনা করতে হবে, "কশ্মৈ দেবায় হবিষ! বিধেম।” 
এখানে নানা দেবতা হতে মন সরে এসে একটি দেবতার প্রতি আকৃষ্ট 
হয়েছে। তাকে বল। হয়েছে প্রজাপতি । বল! হয়েছে তিনি 
আত্মদা, বলদ] ; বল! হয়েছে বিশ্ব তার উপাসনা করে। 

তারপর আদে আত্মা সৃক্ত (১০১২৫ )। তা বিশেষ তাংপর্য- 
পূর্ণ। তার একটি বচন এই £ “আমিই ছ্যলোক-ভুলোক নির্মাণ 
করতে বায়ুর শ্তায় ধাবমান হই ।”১৭ তিনি শুধু অষ্টা নন, তিনি 

১৬, খগবেদ 1৬1৫২॥২ ১৭. খাগ্‌বেদ 1১০১২৫।৮ 


৪৩ 


অনৃশ্ঠ, তিনি প্রচ্ছর শি, প্রচ্ছয্নভাবে সর্বজ্্র তিনি ক্রিয়াশীল । তাই 
ধাবমান বায়ুর সঙ্গে তার তুলনা কর! হয়েছে । আরও বল! হয়েছে £ 
*আমি ছালোক, ভূলোক আবিষ্ট হয়ে আছি ৮১৮ স্পষ্টতই ডাকে 
এখানে সর্বব্যাগী প্রচ্ছন্ন সন্ত। হিসাবে কল্পনা কর! হয়েছে! 

সবশেষে আসে বিখ্যাত পুরুষ সুত্ত (১০৯ )। এখানে সমগ্র 
বিশ্বকে এক বিরাট পুরুষের সঙ্গে তুলনা কর৷ হয়েছে। বলা হয়েছে, 
পুরুষ এবেদং সর্বং ফন্ভৃতং যচ্চ ভব্যম্*-এইসব কিছুই পুরুষ-যা 
হয়েছে তা এবং যা ভবিষ্যতে হবে তাও । 'এ-যেন উপনিষদের বচনেরই 
পুর্বকালীন উচ্চারণ । স্মরণী বিশ্ব এবং পুরুষরপী শ্রষ্টা এখানে একীভূত 
হয়ে গেছেন। স্থতরাং দেবতা এখানে নেব্যক্তিক সন্তায় পরিণত 
হয়েছেন। এইভাবে বেদের সংহিতা অংশের মধ্যেই আমরা উপনিষদের 
হারে এসে পৌছে গেছি। 

স্তরাং বেদের সংহিতা অংশে একটি সুন্দর দার্শনিক উপলব্ধির 
ধীরে-ধীরে বিকাশ লক্ষ্য করতে পারি। তা কয়েকটি অবস্থার মধ্য 
দিয়ে গিয়ে পরিণত রূপটি লাভ করেছে। প্রথমে ব্যক্তিরগী বু- 
দেতার পরিকল্পনা! । তারপর ব্যক্তিরপী অতিদেবতার পরিকল্পন]। 
তারপর বিশ্বদেবতার পরিকল্লুন। । এখান হতেই যেন বিশ্বশক্তির ব্যক্তি- 
রূপটি ধীরে-ধীরে মান হয়ে যেতে আরম্ভ করেছে। আত্মাস্ৃক্তে তার 
বাক্তিরূপ প্রায় তিরোহিত হয়ে তিনি প্রচ্ছন্প সপ্তায় পরিণত হয়েছেন। 
পুরুষস্থক্তে তিনি একেবারেই নৈব্যক্তিক সবব্যাগী প্রচ্ছন্ন সত্তা হয়ে 
গেছেন। এই পুরুষই উপনিষদে ব্রহ্ম নাম গ্রহণ করেছেন । 


তিন 
বরম্বঘাদেন প্রতি রবীন্রনাথের আকর্ঘণ 


এখন আমর। উপনিষদের ব্রক্ধবাদের সহিত রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক 
চিন্তার তুলনা করতে পারি! আমরা দেখব সাধনজীবনের প্রথম 


৯৮ খাগবেদ /১০৪১২৫/৬ 
৪6৪ 


অধ্যায়ে তিনি উপনিষদের ব্রক্মবাদের প্রতিই অলক্ষ্যে আকৃষ্ট হয়েছেন।' 
পারিবারিক পরিবেশ এবিষয় তাকে বিশেষ প্রভাবান্থিত করতে 
পারে নি, যদিও অগ্যদিকে সেই পারিবারিক পরিবেশ পৌরাণিক 
ধর্মের সংস্পর্শ হতে ত্ডাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে দিয়েছিল । নিজের 
মতিগতির পথে চলতে-চলতেই তিনি বৈদিক পূর্বপুরুষদের প্রতি 
আকৃষ্ট হয়েছিলেন । উপলব্ধির পথে এ-বিষয় তার চিন্তার আশ্চর্ঘ- 
ভাবে উপনিষদের ত্রহ্মবাদের সহিত একাস্তিক সাদৃশ্য দেখা যায়। 
কিন্তু তার মানসিক চিন্তা ছিল গতিশীল । তাই দেখি আবার নিজের 
মভিগতির পথে উপনিষদের ব্রহ্ষবাদ হতে দূরে সরে এসেছেন। তার 
কারণ তার বুদ্ধিবৃত্তি যেমন প্রবল ছিল, তেমন হৃদয়বৃত্তিও প্রবল ছিল; 
সম্ভবত প্রবলতর ছিল। জিজ্ঞাস্থ-মনোভাব-প্রণোদিত হয়ে উপনিষদ 
যে নৈব্যক্তিক মহাসত্তাকে আবিষ্কার করেছিল, তাকে তিনি গ্রহণ 
করেও সমগ্র হৃদয়-মন দিয়ে নিতে পারেন নি । তিনি শুধু জানা নয়, 
তাকে পেতে চেয়েছিলেন। অথচ সর্বেশ্বরবাদকেও একেবারে 
ফেলতে পারেন নি। তারই ফলে নিজের মতিগতির পথে তিনি তার 
নিজস্ব মৌলিক তত্ব, জীবনদেবতা পরিকল্পনায় উপনীত হয়েছিলেন। 
জীবনদেবতা বিশ্বসত্তার ব্যক্তিরূ্পী সংস্করণ; সুতরাং তার সঙ্গে 
গ্রীতির সম্বন্ধ স্থাপন করা যায়। এইভাবে তিনি উপনিষদের ব্রহ্ষ- 
বাদের সঙ্গে একেশ্বরবাদের একটি সহাবস্থিতির পরিবেশ রচনা করতে 
চেয়েছিেলেন। তার সাধনজীবনের এই ছটি পৃথক অধ্যায়ের 
আলোচনার মধা দিয়ে আমাদের তুলনামূলক আলোচনা গড়ে উঠতে 
পারে। 

তার অধ্যাত্মজীবনের প্রথম অধ্যায়ে প্রথমে তিনি উপনিষদের 
ব্রহ্মবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তার আলোচন। দিয়ে আরম্ত 
কর! যেতে পারে। সেটা সম্ভব করেছিল ছুটি অবস্থা ; প্রথম, 
পারিবারিক পরিবেশ এবং দ্বিতীয়, তার নিজস্ব মতিগতি। তার 
পিতা মহধি দেবেন্দ্রনাথ একাস্তিকভাবে একেশ্বরবাদী ভক্ত ছিলেন, 


৪৫ 


অথচ পৌরাণিক হিন্দুধধর্মে যে-বিগ্রহপুজার রীতি আছে তাকে তিনি 
গ্রহণ করতে পারেন নি! এরজগ্ই রামমোহনের অনুসরণে তার 
নিজস্ব ব্রাহ্গধর্ম পরিকল্পনা । তার ছুটি বৈশিষ্ট্য । তা! পিতৃরূগী, একক, 
ব্যক্তিত্ব বিশিষ্ট ঈশ্বরে বিশ্বাস করে এবং ঈশ্বরকে বিশ্ব হতে প্থক করে 
রাখে । দ্বিতীয়ত তা বিগ্রহপূজ। এবং অবতারবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। 
ফলে মহধির পরিণত জীবনের মত হলো ব্রাঙ্গধর্নকে তিনটি প্রভাব 
হতে মুক্ত রাখতে হবে। প্রথমত উপনিষদের অদ্বৈত তত্বে যেখানে 
মানুষকেও ঈশ্বরের অঙ্গীভূত বলে কল্পনা! করা হয়, তা! গ্রহণ করা হবে 
না। অবশ্য মহথির উপনিষদের বাণীগুলির উপর শ্রদ্ধা আজীবন 
অক্ষু্ ছিল। দ্িতীয়ত বিগ্রহপূজাকে বর্জন করা হবে, কারণ তা 
নিরাকার ঈশ্বরকে জড়বন্ততে রূপাস্তরিত করে ॥ তৃতীয়ত হিন্দুধর্মের 
বা শ্রীস্টধর্মের অবতারবাদকেও প্রত্যাখ্যান করতে হবে, কারণ ঈশ্বরের 
শরীরী প্রকাশ নেই। 

মহষি একাস্তভাবে ঈশ্বরপরায়ণ ভক্ত ছিলেন। প্রতাহ উপাসনার 
ব্যবস্থা ছিল। এই পরিবেশেই রবীন্দ্রনাথ মানুষ হয়েছিলেন । ফলে 
একদিকে তার ওপর এই দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তারলাভ ঘটেছিল। তিনি 
পৌরাণিক আনুষ্ঠানিক ধর্মরীতির প্রভাব হতে মুক্ত ছিলেন। এ-কথ। 
তিনি তার ম্মতিকথায় কতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন । এইপ্রসঙ্গে তার 
নীচে উদধূত মস্তবাটি লক্ষ্য করা যেতে পারে £ 

“উপনিষদের ভিতর দিয়ে প্রাকৃপৌরাণিক যুগের ভারতের সঙ্গে 
এই পরিবারের ছিল ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ । অতি বাল্যকালে প্রায় প্রতিদিনই 
বিশুদ্ধ উচ্চারণে অনর্গল আবৃত্তি করেছি উপনিষদের শ্লোক। এর 
থেকে বুঝতে পারা যাবে সাধারণত বাংলাদেশে ধর্সাধনায় ভাবাবেগের 
যে উদ্বেলতা আছে আমাদের বাড়িতে তা প্রবেশ করে নি।৮১৯ 

অপরপক্ষে মহত্ি প্রচারিত একেশ্বরবাদ-ভিত্তিক উপাসনারীতিও 
সভার মনে দাগ টানতে পারে নি । তিনি স্পষ্টই বলেছেন £ «আমাদের 


১৯, আত্মপরিচয় €& 
£্রত 


পরিবারে যে ধর্মসাধন! ছিল আমার সঙ্গে তার কোনও সংশ্রব ছিল না । 
আমি তাহাকে গ্রহণ করি নাই 1২, 

অথচ আমরা জানি তিনি কিছুকাল আদি ব্রাক্মাসমাজের সম্পাদকের 
কাজ করেছিলেন এবং অনেকগুলি সুন্দর ব্রহ্মসঙ্গীত রচন৷ করেছিলেন । 
সুতরাং তার উপরে উদ্ধৃত উক্তির সঙ্গে ভার আচরণের একটি অসঙ্গতি 
এসে পড়ে! এ-বিষয় তার কারণ বুঝিয়ে তিনি অন্ত প্রসঙ্গে একটা 
ব্যাখ্য। দিয়েছেন ॥। পারিবারিক সংস্কারের এবং পরিবেশের প্রভাবে 
তিনি সঙ্গীত রচনা! করেছিলেন সত্য, কিন্তু তা ঘটেছিল তার মতিগতির 
বিরুদ্ধে এবং পরিশেষে যাকে তিনি সত্য বলে বুঝেছিলেন তাকেই গ্রহণ 
করেছিলেন। উক্তিটির বাংল। অনুবাদ নিচে দেওয়া হলে। 

“তার উপাসনায় আমি যোগ দিতাম, তবে প্রধানত ধর্মসঙ্গীত 
রচন। করে  বন্ছু উপাসকের ভাবধার। হতে সংগৃহীত নৈষ্ঠিক ভক্তের 
মনের ছাপ তাতে থাকত। ( প্রকৃতপক্ষে ) তা ছিল এঁতিহোর একটি 
অস্পষ্ট যৌগিক ভাব।.. দীর্ঘকাল সংগ্রামের পর আমার মনে ধারণা 
হলে! যে আমি সত্যের জীবন্ত মুখ একটি মুখোস দিয়ে ঢেকে রেখেছি 
এবং তখন আমাদের সমাজের সঙ্গে আমার সংযোগ ছিন্ন করলাম ।”২১ 

এ-হতে দেখা! যায় যে রবীন্দ্রনাথের নিজম্ব একট। মতিগতি ছিল 
এবং তারই দেওয়। নিশানায় একলা-চল। পথিক হতে তিনি 
ভালবাসতেন । সাধনজীবনে এই পথে যেতে তার বৈদিক পৃবপুরুষের 
মতে! তিনি প্রকৃতির প্রতি প্রথম আকৃষ্ট হয়েছিলেন । আরও আশ্চষের 
কথা তিনি এই পথে অগ্রসর হয়ে তাদেরই মতে৷ একটি অহৈতৃক 
আনন্দের অভিযাত্রী মহাসন্তাব প্র্রচ্ছন্ন উপস্থিতি প্রকৃতির মধ্যে 
আবিষ্কাব কবেছিলেন। ফলে ব্রহ্মবাদের অন্ুবপ একটি ভাবন। তার 
কবিতা, সঙ্গীত ও রচনায় আত্মপ্রকাশ করেছিল । 

আরও এক আশ্চর্য ব্যাপার, তিনি যে অলক্ষো বেদের জ্ঞানকাণ্ডে 


২০. জীবনস্মৃতি, ভগ্নহৃয় 
২১. 76112107 ০/ 7467, 0596, ৬1], 1096 মঞ)। ০৫ ৫5 6৪৫, 


৪৭ 


যে-চিন্তা বিকাশলাভ করেছিল তার অস্ুমরণ করেছেন, এ-বিষয়েও 
তিনি অবহিত হয়েছিলেন । এই প্রতিপাঞ্ধের সমর্থনে তার হুটি উদ্ভির 
অনুবাদ এখানে স্থাপন করা যেতে পারে । প্রথম উক্তিটি এই £ 

«আমার সাধনজীবনের প্রথম অবস্থায় প্রকৃতির সহিত ঘনিষ্ঠতাবোধ 
ফুটে উঠেছিল-..ষে প্রকৃতি তার বাস্তব সম্পদ ব্যক্তি মনের কাছে 
উজাড় করে দিয়ে আমাদের মানবিক প্রকৃতির উপর নিত্য প্রতিক্রিয়া 
স্যষ্টি করে 1৮২২ 

এইপ্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন £ “সেই অতীতের দিনগুলির 
প্রতি যখন ফিরে তাকাই, আমার মনে হয়, অজানিতে আমি আমার 
বৈদিক পূর্বপুরুষের পথ অনুসরণ করেছি এবং আমার দেশের গগনে যে 
একটি মহান্ত্দুরের আভাস আছে তার দ্বারা আমি অনুপ্রাণিত 
হয়েছি (৮ ও 

এইভাবে তার বৈদিক পুপুরুষের দিত পথ অন্থগমন করে তিলি 
তাদেরই মতো! এক সর্বব্যালী লীলাভিসারী প্রচ্ছন্ন সত্তর উপস্থিতির 
ইঙিত পাচ্ছেন &এবং তাকে জানবার জন্য আকুল হচ্ছেন। কোনও 
দিন বনের পথে যেতে-যেতে তার মনে হয়েছে বাতাসে যে-গন্ধ ভাসে 
তা যেন কার প্রচ্ছন্ন উপস্থিতির আভাস দেয় 

সেদিন চলে যেতে যেতে চমক লাগে ! 
মনে হলগ বনের কোণে হাওয়াতে 
কার গন্ধ জাগে ।২৪ 

মনোরম শরতের দিনে আলো-ছায়ার খেলায় নীল আকাশে 

সঞ্চরমান শাদ মেঘ তাকে সেই প্রচ্ছন্ন সত্তার কথ! ম্মরণ করিয়ে 


দিয়েছে £ 
আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা । 


নীল আকাশে কে ভাসালে সাদ! মেখেব ভেল1 ।২ * 
২২, 76118/07 ০/ 802, 01১50. 17 ১8218 0015656, 
২৩, 75/18107 ০7 8167, 0005, ৬1০101৬৬280, 
২৪. গর্থীতমালা, ৪ ৯২৫. গাঁতাঞ্জাল, & 


4৮ 


বর্ষার দিনে জুইফুল দেখে মনে হয়েছে কে যেন মালা গেথেছেন, 
বর্ষার আধারে মনে হয়েছে কে যেন শয়ান আছেন £ 


আজ বাদল হাওয়ায় কোথারে জুঁই গন্ধে মেতেছে। 
লুপ্ত তারার মালা কে আজ লুকিয়ে গেঁথেছে। 
আজি নীরব অভিসারে 

কে চলেছে আকাশ পারে 

কে আজি এই অন্ধকারে শয়ন পেতেছে।২৬ 


তারপর দেখি দ্বিতীয় অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ এক প্রচ্ছন্ন শক্তিতে 
সর্বব্যাপী এবং সমগ্র বিশ্বের নিয়ন্তারূপে কল্পনা করেছেন । প্রথম 
অবস্থাটি খগবেদের সংহিতা অংশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির উপর 
দেবত্ধ আরোপ করার সহিত তুলনীয় । আর এই দ্বিতীয় অবস্থাটি 
যেন বেদ ও উপনিষদে বিকশিত যে-উপলবি বলে এক সর্বব্যাগী 
মহাসত্ত। প্রচ্ছন্নভাবে সমগ্র বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তার সহিত তুলনীয়। 
এই প্রচ্ছন্স সর্বব্যাপী নিয়ামক সত্তার ছবিটি সুন্দর ধর! পড়েছে নীচে 
উদ্ধৃত কাবা*শে । এখানে গগনে অবস্থিত গ্রহ-নক্ষত্র, পৃথিবীর বক্ষে 
আশ্রিত উদ্িদ-জীব--এদের ধেম্ুর সহিত তুলনা কর! হয়েছে এবং 
বিশ্বসন্তাকে অদৃশ্য রাখাল বালকের সহিত তুলনা করা হয়েছে। 
যেমন তাকে দেখ। যায় না, অথচ তার বাশি শোন! যায়, তেমন এই 
সত্তাকে দেখ! যায় না, তার উপস্থিতি অনুভব কর! যায়। প্রাসঙ্গিক 
কাব্যাংশটি এই £ 


এই তো৷ তোমার আলোক খেম্ছ 
সুর্যতার! দলে দলে। 
কোথায় বসে বাজাও বেণু 
চাও মহাগগনতলে। 


২৬. খেরা, বধাসিম্ধ্যা 


৪6৯ 


তৃণের সারি তৃলছে মাথা, 
তরুর শাখে শ্যামল পাতা, 
আলোয় চর ধেনু এর! 
ভিড় করেছে ফুলে ফলে ।২* 


এরপর দেখি রবীন্দ্রনাথ এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন যে বিশ্ব এক 
মহাশক্তির রচিত শিল্প, কিন্তু সে শিল্পীকে দেখা যায় না, তাকে 
এড়ানোও যায় না। খষির বাণী উদ্ধৃত করেই তিনি তার এই 
উপলব্ধির কথ। ঘোষণ। করেছেন ॥ প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই £ 


“অস্তি সম্তং ন জহাতি 
অস্ভি সম্তং ন পশ্যতি। 
দেবস্থ পশ্তঠ কাব্যং 

ন মমার ন1। জীতে।, 


কাছে আছেন তাকে ছাড়া যায় না, কাছে আছেন তাকে দেখা যায় 
না, কিন্তু দেখো সেই দেবতার কাবা, সে কাবা মরে না, জী 
হয় না।১৮ ৃ 

এইভাবে দেখি রবীন্দ্রনাথ নিজের মতিগতির পথে তার বৈদিক 
পূর্বপুরুষের পথ অনুসরণ করে তারা যেখানে পৌচেছিলেন সেখানেই 
উপস্থিত হয়েছেন । সাধনজীবনের প্রথম অধ্যায়ে তিনি অতি ঘনিষ্ঠ- 
ভাবে উপনিষদের নিকটবর্তী হয়েছিলেন । কও ঘনিষ্ঠভাবে হয়েছিলেন 
তা বোঝ। যায় সার একটি কাব্যাংশ হতে। তাতে যেন দেখি 
উপনিষদের ব্রক্মবাদের মর্মকথা তার মধ্যে বিধৃত আছে। ব্রহ্মবাদ 
বলে একই মহাসত্ত। আনন্দ আস্বাদনের জন্ট আপনার উপর দ্বৈতভাব 
আরোপ করে রূপ-রস-গন্ধে ভর! এই বন্ুদ্বার৷ বিখপ্ডিত দৃশ্ঠমান বিশ্বে 
রূপান্তরিত হুলেন। তারই প্রতিধবনি পাই রবীন্রনাথের এই 
কাব্যাংশে £ 


২৭. গাঁতমাল্য, ১০৩ ২৮ আত্মপারচয়, ৬ 
৫৬ 


যে ভাবে পরম-এক আনন্দে উৎস্থৃক 
আপনারে ছুই করি লভিছেন সুখ, 
ছুয়ের মিলন ঘাতে বিচিত্র বেদনা 

নিত্য বর্ণ, গন্ধ, গীত করিছে রচনা ।২৯ " 


চার 
জশীবনদেবতা তত্ত্ব ও ব্রচ্মবাদ 


সার মতিগতি যেমন রবীন্দ্রনাথকে উপনিষদের ব্রহ্মবাদের প্রতি আকুষ্ট 
করেছিল, তেমন তার মতিগতিই তাকে ত্রক্মবাদ হতে দূরে সরিয়ে 
নিয়েছিল ॥ তার কারখ, উপনিষদের খষির মনের গঠনপ্রকৃতির সহিত 
তাঁর মনের গঠনপ্রকৃতির ভিন্নতা । উপনিষদের খধির বুদ্ধিবৃত্তি একান্ত 
প্রবল ছিল। তাই তিনি জ্ঞানের পথে বিশ্বসন্তার পরিচয়লাভের 
প্রয়াসী হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের যেমন বুদ্ধিবৃত্তি প্রবল ছিল, 
তেমন হৃদয়বৃত্তিও প্রবল ছিল। তার অনুভূতি শক্তি অত্যন্ত প্রথর 
ছিল বলেই তিনি এত বড় কৰি হয়েছিলেন। তাই তিনি শুধু বিশ্ব- 
সত্তার পরিচয় পেয়ে তৃপ্তিলাভ করেন নি, তার সহিত প্রীতির সম্পর্ক 
স্থাপন করতে উৎস্থক হয়েছিলেন। শুধু জানতে নয়, তাকে প্রীতির 
সম্পর্কে পেতেও চেয়েছিলেন ৷ তাঁর এই পাবার আকৃতিই তাকে 
উপনিষদের ব্রহ্ধবাদ হতে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল । যে-প্রচ্ছন্ন 
সত্তার উপস্থিতি তিনি প্রকৃতির মধ্যে অনুভব করেছিলেন তাকে তিনি 
আকুল আবেগ নিয়ে পেতে চেয়েছিলেন তার সুন্দর পরিচয় মেলে 
নীচেব এই কাবাংশে । আকাশের ঘননীল মেঘের সমারোহ দেখে 
তিনি অনুভব করেছিলেন তাতে সাড়া দিয়ে তার হৃদয় ময়ূরের মতে। 
নাচছে এবং এক অজানাকে পাবার জন্য ব্যাকুলতা তাকে পাগল 
করেছে £ 


২৯. স্মরণ, ২২ 


€১ 


শতবরণের ভাব-উচ্চাস 
কলাপের মতে। করেছে বিকাশ, 
আকুল পরাণে আকাশে চাহিয়া 
উল্লাসে কারে যাচে রে। 
হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে 
ময়ূরের মত নাচেরে ।৩০ 


তাই আমর! দেখি তিনি উপনিষদের জিজ্ঞাস্থ মনোভাব সর্ধাস্তঃ- 
করণ দিয়ে গ্রহণ করতে পারেন নি। উপনিষদ ভক্তির অবকাশ 
ছিল না, কারণ সেখানে বিশ্বশক্তি নৈব্যক্তিক সত্তা রূপে পরিকল্পিত । 
অথচ তিনি ভক্তির পথেও তাকে পেতে চেয়েছিলেন । তাই তিনি 
উপনিষদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অসস্তোষ প্রকাশ করে এক ভাষণে এই 
মন্তব্য করেছেন £ 

“আমাদের সাধনার মধো একটা অসামঞ্জস্ত ঘটেছিল। আমর! 
ব্রন্াসাধনায় যখন জ্ঞানের দিকে ঝোক দিয়েছিঙ্গাম তখন জ্ঞানকে 
একাস্ত করে তুলেছিলাম ।৮৩১ 

এই অসস্তোষের ফলেই রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের ব্রহ্ষবাদ হতে সরে 
এসে একেশ্বরবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। ব্রহ্ম নৈর্যক্তিক সন্ত, তার 
সঙ্গে গ্রীতির সম্বন্ধ স্থাপনের অবকাশ নেই । একেশ্বরবাদের ঈশ্বর 
ব্যক্তিত্ব বিশিষ্ট; কাজেই তার সঙ্গে ত্বীতির সম্বন্ধ স্থাপনের অবকাশ 
আছে। এই কারণেই মনে হয় তিনি আবার পারিবারিক ধর্শের প্রতি 
আকৃষ্ট হলেন। ব্রাঙ্ষসমাজের পরিকল্পনায় ঈশ্বর পিতৃবূগী; তিনি 
শাসন করেন, কিন্তু স্নেহপরায়ণ। এই আদর্শের অনুসরণে যজুর্বেদের 
অর্তভূক্ত একটি বাণীকে ব্রাহ্মাসমাজের প্রার্থনায় একটি বিশিষ্ট স্থান 
দেওয়া হলে! £ পিতা! নোইসি ।৬২ 


৩৩. ক্ষরণকা, নববর্ষ ৩১. শান্তিনিকেতন, সামঞ্জস্য 
৩২. শুর যজবেদ ৩৭২৩ 


২ 


রবীন্দ্রনাথ এই বাধীটির প্রতি কতখানি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন 
তা বেশ বোঝা যায় তার 'শাস্তিনিকেতন' শীর্ষক ভাষণমালায় । তা 
হতে তার কিছু প্রাসঙ্গিক উক্তি এই প্রসঙ্গে স্থাপন করা যেতে পারে। 
তিনি বলেছেন, “আমরা তাকে ( ঈশ্বরকে ) পিতা রূপেও আশ্রয় 
করতে পারি, প্রভুভাবেও পারি, বন্ধুভাবেও পারি।” তারপর 
বলেছেন, “সব সম্বন্ধের মধ্যে প্রথম সম্থন্ধ হচ্ছে পিতা-পুত্রের সম্বন্ধ ।”৬৩ 

পিতারপে সাধনার প্রকৃতি সম্বপ্ধে তিনি আরও কিছু কথ। বলেছেন 
য! আমাদের বর্তমান আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হবে । তিনি বলেছেন) 
এই সন্বন্ধের মধ্যে ছুটি উপাদান আছে । একদিকে পিতা ও পুত্রের 
সম্থপ্ধ একটি নিবিড় ঘনিষ্ঠতার সম্বন্ধ । অপরদিকে ঘনিষ্ঠ হলেও তিনি 
ভক্ত হতে অনেক বড়। পুত্রস্থের ভিতর দিয়ে যেমন একত্বের যোগস্ুত্র 
আছে, বৃহত্তর শক্তি হিসাবে একটি ভেদেরও সম্বন্ধ আছে। একত্বেব 
সম্বন্ধ আনে প্রীতি আর বিরাটত্বের ধারণ! আনে নতি এবং আত্ম- 
নিবেদনের মনোভাব ॥ ন্ুুতরাং এই সম্বন্ধের মধ্যে একটি মিশ্রভাব 
জড়িত; প্রীতির সঙ্গে প্রণীতি এখানে মিশে গেছে । এই বিষয় এখন 
তার নিজের কথা শোন! যাক £ 

“$ পিতা নোইসি'--এই মন্ত্রে ছুটি ভাবের সামগ্রন্থ আছে। 
একদিকে পিতার সঙ্গে পুত্রের সামা আছে, পুত্রের মধ্য দিয়ে পিতা 
আপনাকেই প্রকাশ করেছে । আর একদিকে পিতা হচ্ছেন বড়ে, 
পুত্র ছোট । 

«একদিকে অভেদের গৌরব, আর একদিকে ভেদের প্রণতি। 
পিতার সঙ্গে অতেদ নিয়ে আমর আনন্দ করতে পারি; কিন্তু স্পর্শ 
করতে পারিনে। আমার যেখানে সীম আছে সেখানে আমার মাথ। 
নত করতে হুবে 17৩৪ 


৩৩. শাশ্তিনিকেতন, নমন্তেছক্তু 
৩9. শান্তানকেতন, ভয় ও আনন্দ 


৫ 


এনে হয় তার মনের এই অবস্থায় তিনি পারিবারিক ধর্মকেই 
সবাস্তঃকরণে গ্রহণ করেছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়। যায় তার 
“শাস্তিনিকেতনে'র অন্তভূক্তি 'ব্রাহ্মসমাজের সার্থকতা? শীর্ষক প্রবন্ধে। 
সেখানে তার প্রতিপাস্থ হলে এই যে আমাদের ধর্মসাধনার মধ্যে 'একট। 
অসামজ্স্ত ঘটেছিল” । একদিকে খপনিষদিক ব্রক্ষসাধনায় জ্ঞানের 
দিকে ঝৌঁক দিয়ে, 'ঝআআনকেই একাস্ত করে তৃলেছিলাম' । অপরদিকে 
পৌরাণিক যুগে যখন ভক্তির পথ গ্রহণ করেছিলাম তখন ভক্তিভাবের 
উপর বেশি জোর দিয়ে নিজেকে উচ্ছৃসিত করে “একটা ফেনিল 
ভাবোন্বত্ততার আবর্ত স্প্টি কবেছিলাম'। তার ধারণায় ত্রাক্গধর্ম এই 
অসামপ্রন্ত দূৰ করতে পেরেছিল। একদিকে তা যেমন জিজ্ঞানু 
দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখে নি, আপরদিকে 'ভক্তিকে 
ভাবোচ্ছাসে বিকৃত হতে দেয় নি।* 

কিন্তু ভার মতিগতি তাকে ত্রাঙ্গধর্ম হতে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিযে 
গিয়েছিল। এই বারবার মত পরিবর্তন তার মনের গতিশীলতারই 
পরিচয় দেয় এবং দেখায় ষে তিনি কোনও প্রচলিত সাধনরীতিকে 
গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। যাকে গ্রহণ কবতেন তাকে নিজের 
মতিগতির সঙ্গে সামপ্রস্ত রক্ষা! করেই গ্রহণ করতেন। আবার যখন 
নৃতন উপলব্ধির আলোকে অসামগ্জস্ত লক্ষ্য, করতেন, নিজের মত 
পরিবর্তিত করতেন। এইভাবে তিনি ধীরে ধীরে সাধনপথে তার 
সাধনায় লব্ধ উপলব্ধির পরিণত রূপটি আবিষ্কার করেছিলেন । 

এই মত পরিবর্তনের মূল কারণ হলো পিতারূগী ঈশ্বরের পরিকল্পনার 
পরিপুর্ণরূপে ঈশ্বরের সঙ্গে গ্রীতির সম্বন্ধ স্থাপন করা যায় না, অর্থচ 
তার মন চাইত সাম্যের ভিত্তিতে ঈশ্বরকে পেতে । পিতারূপে ঈশ্বরকে 
ধারণ করলে সেট! সম্ভব হয় না। এখানে বাৎসল্যরসের সাধনার 
সঙ্গে মধুররসের সাধনার সংঘর্ষ এসেছিল । বাৎসল্যরসের সঙ্গে যেন 
একটা ছোট এবং বড়র ভাব জড়িত আছে। এখানে সাধক ছোট, 
ঈশ্বর বড়; একদিকে ভক্তি, অপরদিকে ন্লেহ। এই পরিকল্পনায় তে৷ 


৫৪ 


পরিপূর্ণ মিলন সম্ভব হয় না। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরকে সাম্যের 
ভিত্তিতে গ্রীতির সম্বন্ধে পেতে চেয়েছিলেন। তাই তার মনে 
পিতাতত্বের প্রতি আকর্ধণক্রমশ শিথিল হয়ে গিয়েছিল । 

সুতরাং রবীন্দ্রনাথ পিতারূপের ভিত্তিতে বাংসল্য রসের পথে 
চলবেন, না সখারূপের ভিত্তিতে মধুর রসের পথ অবলম্বন করবেন-_- 
এই নিয়ে একট দোটানায় পড়েছিলেন। তার পারিবারিক 
পরিবেশের প্রভাব তাঁকে বাংসল্য রসের দ্ধিকে টানছিল। অপরদিকে 
ভার মতিগতি তাকে মধুর রসের সাধনার পথে আকর্ষণ করছিল । এই 
দোটানার মনোভাব নুন্দর পরিন্ফুট হয়ে উঠেছে নীচে উদ্ধৃত 
কাবা:শে £ 

দেবত| জেনে দূরে রই দাড়ায়ে, 
আপন জেনে আদর করি নে। 
পিতা বলে প্রণাম করি পায়ে, 
বন্ধু বলে ছহাত ধরি নে।৩* 

শেষে নিজের মতিগতিরই জয় হলে।। তিনি পারিবারিক ধর্ম হতে 
দূরে সরে এলেন। এক নূতন সুত্র ধরে, জীবনের এক দিব্য 
অনুভূতিকে অবলম্বন করে তিনি জীবনদেবত| তত্বে উপনীত হলেন। 
তার কথা তিনি সবিস্তারে 'দি রিলিজিয়ন অব ম্যান? গ্রন্থে লিখেছেন। 
সে উপলব্ধির পরিচয় তার কাব্যে ছড়িয়ে আছে । এই জীবনদেবতাকে 
আবিষ্কার, তার সহিত বিচ্ছেদের ব্যথা! এবং পরিশেষে তার সহিত 
মিলনে আনন্দ তার 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলির মধ্যে 
বিশেষভাবে বিধূত। এই তত্ব তিনি তার ছুটি প্রতীকধমী নাটকেও 
প্রচার করেছেন £ "রাজা, ও “অরূপরতন;। তিনি ভক্তের হৃদয়ের 
অভ্যন্তরে স্থান গ্রহণ করেন বলে তিনি “অন্ধকার ঘরের রাজা” । তার 
নিজের কোনও বিশেষ প্রকাশ নেই বলেই তিনি 'অরূপরতন'। 
ভক্তের সহিত শ্রীতির সম্বন্ধে ভক্তের মনে যে আনন্দ-বেদনার তর 

৩৪. গঁতাঞ্জলি, ২৯ 


৫৫ 


মিত হয়ে ওঠে তাতেই তার অস্তিত্ব প্রতিফলিত 

এই জীবনদেবতাতত্বও রবীন্দ্রনাথের মনে গড়ে উঠেছিল আর 
একটি দোটানার প্রভাবে । জ্ঞানের পথে অগ্রসর হয়ে প্রকৃতির মধ্যে 
তিনি এক প্রচ্ছন্ন অ্বব্যানী সত্তার অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছিলেন । 
কিন্তু সেখানে তিনি গ্রীতির সম্বন্ধ স্থাপনের অবকাশ পান নি। তাই 
একেসম্বরব্বদের ভিত্তিতে পিতারপী ঈশ্বরের কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু 
তাতেও স্থদয়বৃত্তির পরিপূর্ণ তৃপ্তি ঘটে নি। তাই হলো জীবনদেবত। 
তব্ব। তা যেন এ ছুয়ের মধ্যে একটি সামপ্রস্ত বিধান করে তাদের 
সহাবস্থিতি সম্ভব করায়। তার এই বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে যেন তিনি অবহিত 
ছিলেন মনে হয়। তার সমালোচক অধ্যাপক টমসন-এর কাছে তার 
ব্যাখ্যা করে তিনি যে চিঠি লেখেন ত| এই প্রতিপাদ্ সমর্থন করে। 
তিনি বলেছেন, জীবনদেবতাতত্বের ছুটি দিক আছে। একটি দিক 
উপনিষদের ব্রগ্ধবাদ সমর্থন করে। সেখানে তিনি বিশ্বের নিয়ামক 
শক্তি। অপরদিক বলে তিনি অতিরিক্তভাবে ভক্তের হৃদয়ে স্থান 
নিয়ে তার সহিত প্রীতির সম্বন্ধ স্থাপনে উৎস্থুক। এর মধ্যে উপনিষদের 
স্বেশ্বরবাদের সহিত বৈষব তক্তিতত্বের ঘ্বেতবাদের যেন সহাবস্থিতি 
ঘটেছে ।** | 

এই জীবনদেবতাতত্বের উৎপত্তি সংঘটিত হয়েছে খানিকটা দিবা- 
অনুভূতির ভিত্তিতে খানিকটা চিন্তার ফলে । দিব্য-অন্ুভূতির কথাই 
প্রথমে বলা যাক । সে বিষয় রবীন্দ্রনাথ ছু-জায়গায় বিবরণ দিয়েছেন । 
একবার "মানুষের ধর্জের (সংযোজন ) অংশে । আর একবার তার 
হিবার্ট বক্তৃতামালায় ঘ! “রিলিজিয়ান অফ ম্যান' নামে গ্রস্থ আকারে 
গ্রকাশিত হয়েছিল ॥। সেট! ঘটেছিল সাহাজাদপুরের কুঠিবাড়িতে। 

০৮. 1176 1065 1783 ৪ 020080162 50500019616 15 0156 ৬৪1512743 
00511510) --815%/855 16210876006 5608181061/655 ০0: 036 5918--8100 086 
98 006 01090131500 28010819078, 0300 15 9/9011)2 6801) 11501510091 , 824 


03০৫ 59 2150 0106 210000-062155 01 211 55 £ 086 ৬69001051015086108, 
28174127217, দএ৭৪:৭ 10002098012 01590960585, 0. 105. 


€ষ্ঠ 


তিনি জেদিন স্নানের আগে দোতলার জানলায় দাড়িয়ে নববর্ধীর 
জলভারনত মেঘের শোভা দেখছিলেন। হঠাৎ তার মনে হলে! তার 
অন্তরে একটি বাকিত্ববিশিষ্ট সত্তা রয়েছেন যিনি কবির নিজস্ব 
অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রক।শের ইচ্ছ! করছেন। এই অভিজ্ঞতার 
ফলে তার মনে ধারণ। জন্মাল যে একটি বিশেষ সত্তা কাকে এবং 
বিশ্বকে ব্যাপ্ত করে আছেন এবং তার অভিজ্ঞতার ভিত্তর দিয়ে নজের 
পৃর্ণতম প্রকাশের সঞ্চান করছেন। এই উক্তিটি পাই 'রিলিজিয়ন অব 
ম্যান'-এ ।৩৭ 

“মানুষের ধরনের সংযোজন অংশ এই সত্তার প্রকৃতি সম্বন্ধে কিছু 
অতিরিক্ত ব্যাখ্যা আছে। তার ধারণা এই জীবনদেবত ব্যক্তিবিশেষের 
অন্তরে থেকে তার জ্রীবনকে পরিচালিত করেন। তার ভূমিকা 
অনেকট! নাট্যকার এবং নাটকের নির্দেশকের ভূমিকার মতো। তিনি 
বিশ্বনাট্য রচনা! করেছেন, ব্যক্তিবিশেষকে বিশেষ ভূমিকা দিয়েছেন-। 
অভিরিক্তভাবে বাক্তিবিশেষের হাদয়ে অধিষ্ঠিত হয়ে জীবন-শিল্পীরূপে 
তার জীবনকে গড়ে তুলতে উৎস্থক হয়েছেন। নাটকের নির্দেশকের 
অভিনেতার সঙ্গে যেমন একটা প্রীতির সম্বন্ধ আছে এবং তাকে কি 
'ভাবে কি অভিনয় করতে হবে শিখিয়ে দিচ্ছেন, তেমন অভিনেতে। 
ঠিকমতো অভিনয় করছেন কিন। তা৷ দেখে তিনি সাফল্যে আনন্দ 
পাচ্ছেন, অসাফল্যে বেদন। পাচ্ছেন। অন্থরূপভাবে জীবনদেবতা 
জীবননাটোর অভিনয়েও আছেন তার বাহিরেও আছেন ।॥। তিনি 
ব্যক্তিবিশেষের মধা দিয়েই তার সহযোগিতা নিয়ে নিজের ইচ্ছাটি 
পুরণ করতে চাইছেন। তার প্রাসঙ্গিক মস্তবাটি এই ঃ 

“কিন্তু পরমপুরুষ আছেন সেই সমস্তকে অধিকার করে এবং 


৩৭. 11618 50056 0096 50156 10321175 91100 5012000161)87705 1256 8190 
09 ৩0110, ও/৪৪ 56151788159 0696 55100653102 50. 211 179 6১6166053, 
8110105 01১20 000 001 6৬6০৩106128 1015104৩120 2310 055 
১0/068৪1 ৬০11 ০6 31৮ £6118101) 01 14627. 10106 ৬7810, 


৫৭ 
উপাঁনষদ--”৪ 


আতন্রম করে, নাটকের অক্টা ও দ্রষ্টী তেমন আছে নাটকের 
সমস্তটাকে নিয়ে এবং পেরিয়ে ৮৮ 

একেই রবীন্দ্রনাথ “সীমার মাঝে অসীমে'র প্রকাশ বলে বণন। 
করেছেন। জীবনদেবতা অসাম এবং অশরীরী, ব্যক্তি মানুষকে 
অতিক্রম করে তিনি পরিব্যাপ্ত ॥ ভক্ত সসীম। ব্যক্তিবিশেষের ঝ৷ 
ভক্তের হাদয়ে স্থান নিয়ে তার সহযোগিতা নিয়ে তিনি তার জীবনকে 
পরিচালিত করেন। নাট্যের নির্দেশক যেমন অভিনেতার অভিনয়কে 
পরিচালিত করেন । এর মধো কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। যে 
ভক্ত তাকে গ্রহণ করে তার সহযৌ।গতা৷ নিয়েই তিনি তাকে ফুটিয়ে 
তোলেন ॥ কারণ, এটা তো প্রীতির সম্বন্ধ, জবরদস্তি কাজ করিয়ে 
নেবার ব্যাপার নয়। ভক্ত জীবনদেবতার সহিত সহযোগিতা করবে 
কিনা, তা ভক্তের ইচ্ছাধীন । এখানে তিনি প্রেমের ভিখারী : প্রেম 
তে! জবরদস্তি করে পাওয়া যায় না. তাই তিনি বলেছেন, এটি ছুজনের 
সহযোগিতার লীলা “সেইখানে তুমি আমাকে স্বাধীন করে দিয়েছ, 
কেন না স্বাধীন ন৷ হয়ে প্রেম সার্থক হবে না, ইচ্ছার সঙ্গে ইচ্ছ। 
মিলবে না, লীলার সঙ্গে লীলার যোগ হতে পারবে না 1৩৯ 

স্থতরাং ভক্ত ও জীবনদেবতার মধ্যে এই লীলার প্রকৃতির ছুটি 
বৈশিষ্ট্য মাছে। প্রথমত ভক্ষের জীবনকে অবলম্বন করে উভয়ের 
পরস্পরের সহযোগিতায় জীবনদেবতার ইচ্ছাটি ভক্তের কাজের মধ্য 
দিয়ে পরিশ্ফুট হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ভক্তের সহযোগিতা করা. তার নিজের 
ইচ্ছাধীন। মুতরাং এই লাল! সাম্যের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এবং উভয়ের 
প্রয়োজনেই এই সহযোগিত।। তাই রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় এই 
পরিকল্পনায় একটি দ্বপ্তভাব ফুটে উঠেছে। ভক্ত অবজ্ঞার পাঞ্জ নয়, 
গ্রীতির প্রকাশের জগ্ ঈশ্বরেরও ভক্তকে প্রয়োজন আছে। সেই দৃপ্ত- 
ভাব এই কাব্যাংশে সুন্দর পরিজ্ফুট হয়ে উঠেছে £ 


৩৮, মানুষের ধর্ম--৩ (সংযোজন ) 
৩৯, শাঁব্াঁনকেতন, বিশেষ 


৫৮ 


তাই তোমার আনন্দ আমার *পর 
ভূমি তাই এসেছ নীচে-_ 
আমায় নইলে ত্রিভূবনেশ্বর, 
তোমার প্রেম হত যে মিছে ।৪* 
এই হলে রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পনায় "সীমার মাঝে অসীমে'র 
লীল]। তাকে তিনি “মধুর প্রকাশ'ও বলেছেন । এখানে ভক্ত ও দেবতা 
উভয়ে মিলে ভক্তের জীবনকে পরিষ্ফুট করে চলেছেন। তাই ভক্তের 
জীবনের কর্মধারার মধ্যে দেবতারই ইচ্ছা তরঙ্গিত হচ্ছে। প্রাসঙ্গিক 
মন্তব্যটি এই £ 
আমায় নিয়ে মেলেছ এই মেলা, 
আমার হিয়ায় চলেছে রসের খেল।, 
মোর জীবনে বিচিত্র রূপ ধরে 
তোমার ইচ্ছা তরঙজিছে।৪১ 
এই প্রসঙ্গে বৈষব সাধনতত্বের মধুর রসের সাধনার সঙ্গে জীবন- 
দেবতাতত্ের সাদৃশ্যের কথ। প্রসঙ্গত এসে পড়ে । '্রীচৈতন্থ চরিতাসৃত' 
ঈশ্বরের সঙ্গে ভক্তের সম্বন্ধের চারটি সম্ভাব্য রূপের উল্লেখ আছে £ দাস্, 
সখ্য, বাৎসলা ও শুঙ্গার। এই শুঙ্গারকেই মধুর রস বলে উল্লেখ করা 
হয়েছে। “সব রস হইতে শুঙ্গারে অধিক মাধুরী ।৪২ ঈশ্বরের সহিত 
ভক্তের সম্বন্ধ কোন দৃষ্টিভঙ্গী ছার! নিয়ন্ত্রিত হবে, তার ওপরেই এদের 
বিভিন্নতা নির্ভর করে। দাস্ডে ঈশ্বরকে প্রভু কল্পনা করা হয়, সখো 
বন্ধুরূপে কল্পনা করা হয়, বাংসল্যে পিতা বা মাতারূপে কল্পনা কর! হয়, 
আর মধুরে দয়িত বা প্রেমাস্পদরূপে কল্পনা করা হয়। খানে 
গ্রীতির সম্বন্ধের পরিপূর্ণ রূপটি পাই। তাই তাকে মধুরসও বল! হয়। 
স্্ীরাধার সাধনা মধুর রসের সাধনা 
৪০. গাঁতাঞ্জলি, ১২১ 


৪১. গীতাঞ্জলি, ১২১ 
৪২. চৈতনা চাঁরতামৃত 


৫৯ 


জীবনদেবতাতত্বের সঙ্গে মধুর রসের সাধনার মিলও মাছে আমল? 
আছে। মিল এই অন্ত যে উভয় ক্ষেত্রেই গ্রীতি পরিপুর্ণতম রূপে 
প্রবাহিত হবার সুযোগ পায়। কিন্তু ছুই তত্বের মধ্যে বড় রকমের 
পার্থক্য আছে। রাধাভাবে সাধনায় ঠিক সাম্যের ভাব পাওয়। 
যায় না; তার দয়িত যেন তার থেকে বড়, এই ধবনের একটা চিন্ত। 
বৈষ্ব সাধনশাস্ত্রে পরিলক্ষিত হয় ॥ রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পনায় স্বাত্ক্য 
আছে॥। এখানে বলা হয়েছে রাজার রাজা হয়েও জীবনদেবত! ভক্তের 
প্রেমের ভিখারী | এই চিন্তায় সামোর বোধ অত্যন্ত প্রকট । 

দ্বিতীয়ত বৈষ্ণব সাধনায় ঈশ্বরের সহিত প্রীতির চর্চাই ভক্কেব 
সমগ্র মন জুড়ে বসে। ফলে ভক্তের কল্যাণধম্ণী কমন কববাৰ কোনও 
অবকাশ থাকে ণ।। কর্মবুাত্ত তার একরকম উপবাসে থাকে । শুক্তি- 
ভাবকেই এইভাবে সবন্ব করে তোল রবীন্দ্রনাথের রুচিবিকদ্ধ ছিল । 
তার জীবনদেবতা কর্মযোগী; শুধু গ্রীতির আস্বাদনে তার লীলা: 
সীমিত নয়। তাই তিনি উপদেশ দিয়েছেন, 'কর্মযোগে তার সাথে 
এক হয়ে ঘর্ম পড়ুক ঝরি”॥। কর্মের মধ্য দিয়েও মধুব রসের সাধনা 
করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ধারণায় কেবল ভক্তির উচ্ছাসে নিজেকে 
সীমাবদ্ধ কবে রাখলে তা হয়ে দাড়ায় ফেনিল ভাবোম্বত্ততা । প্রাসঙিক 
মন্তব্যটি এই £ 

“আমাদের সাধনা যেমন ভক্তির পথ অবলম্বন কবেছিল, ভক্তি 
তখন বিচিত্র কর্মে ও সেবায় আপনাকে প্রবাহিত করে না! দিয়ে, 
নিজের মধ্যেই নিজে ক্রমাগত উচ্ছুনিত হয়ে একট ফেনিল 
ভাবোম্ত্ততার আবর্ত স্থষ্টি করেছে 1১৪৬ 

বিশ্বসন্তারই যে জীবনদেবতারূপে ভক্তের হৃদয়ে বিশেষ খ্লকাশ 
ঘটে এ বিষয় আগেই উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের একটি 
উক্তির মধ্যে কিছু অস্পষ্টত| থাকায় তা নিয়ে মতানৈক্য দেখ। দিছে । 
কোনও কোনও ব্যাখ্যাকারের মতে জীবনদেবত। একটি স্বতন্ত্র সন্ত] । 


৪৩. শান্তানকে তন, ব্রাহ্মদমাজের সার্থকতা 


৬৪৩ 


যে মস্তব্যটিকে ঘিরে এই বিতর্কের স্থষ্টি হয়েছে ত৷ এই £ 

“বিশ্বদেবতা আছেন, তার আসন লোকে লোকে, গ্রহ চন্দ্র ভারায়। 
জীবনদেবতা বিশেষভাবে জীবনের আসনে, হৃদয়ে হৃদয়ে তার গীঠন্থান, 
সকল অনুভূতি, সকল অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে। বাউল তাঁকেই বলেছে 
মনের মানুষ ।8৪ 

সৌভাগ্যক্রমে রবীন্দ্রনাথের এমন নান পরিপূরক উক্তি পাওয়! 
যায় যার সাহায্যে এ বিতর্কের সহজ মীমাংস৷ হয়ে যায় ; বিভিন্ন 
বিরোধী মতের সম্মুখীন হয়ে বিভ্রান্ত হতে হয় না। তাই তার কয়েকটি 
প্রাসঙ্গিক মন্তব্য এখানে স্থাপন করবার প্রস্তাব করি । 

“অরূপরতন' প্রতীকর্মী নাটক । তার বিষয় হলে। একটি কাহিনীর 
সাহায্যে জীবনদেবতার প্রকৃতির কিছু পরিচয় দেওয়া । তার ভূমিকায় 
রবীন্দ্রনাথ একটি মন্তব্য করেছেন যা বিশেষ তাৎপধপুর্ণ। সেখানে 
স্পষ্টই বিশ্বদেবতার সঙ্গে জীবনদেবতার কোনও বিভেদ টানা হয় নি, 
তারা৷ যে উভয়েই এক, এই কথার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে £ 

“যে প্রভু সকল দেশে সকল কালে, সকল রূপে, আপন অন্তরের 
আনন্দরসে যাহাকে উপলব্ধি কর। যায়--এ পাটকে তাহাই বপ্নিত 
হইয়াছে ।? 

'শান্তিনিকেতনে'র ভাষণমাল।য় “.সীন্দধ' শার্যক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ 
বলেছেন, বিশ্বশক্তিব দুই পর্যায়ে প্রকাশ ; একটি কাজের প্রকাশ, 
ম্মপরটি আনন্দের গ্রকাশ। প্রকৃতিব মধো তিনি “সত্য” রূপে প্রকাশ। 
সেখানে ভার নিয়ম অমোঘ । আর আনন্দরূপে প্রকাশ সৌন্দর্যের 
মধ্যে। সেইরূপে তিনি প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন করতে ইচ্ছক হয়ে 
ভক্তকে বলেন, “আমাতে তোমাতে আনন্দ হোক; তুমি স্বতঃ 


আমাকে গ্রহণ কর।' 
বিশ্বদেবতা ও জীবনদেবতার একত্ব আরও স্পষ্ট ভাষায় স্বীকৃত 


8৪, মানুষের ধর্ম, ( সংযোজন ) 
৬১ 


হয়েছে 'শান্তিনিকেতনে'রই অন্তভূক্ত আর একটি ভাষণে ।৪* সেখানে 
তিনি বলেছেন, বিশ্বে যেখানে নিয়মের রাজ চ'লছে সেখানে তিনি 
“বিধাতা; সেটা তার কাজের প্রকাশ। আর একটি প্রকাশ আছে 
বন্ধুরপে মানুষের মনে। সেটাই আনন্দের প্রকাশ। প্রাসঙ্গিক 
মন্তব্যটি এই £ 

“কিন্ত তিনি তো শুধু বিধাত। নন, “স এব বন্ধু: ; তিনিই যে বন্ধু 

বিধাতার প্রকাশ তে! বিশ্বচরাচরে দেখছি, বন্ধুর প্রকাশ 
কোন্থানে ? বন্ধুর প্রকাশ তে। নিয়মের ক্ষেত্রে নয়, সে প্রকাশ আমান. 
অন্তরের মধ্যে, প্রেমের ক্ষেত্রে ছাড়া আর কোথ। হবে ? 

এই উক্তিগুলি হতে স্পষ্টই বোঝ। যায় যে রবীন্দ্রনাথ জীবনদেবতা 
ও বিশ্বসন্তার মধ্যে কোনও ভেদ টানেন নি। একই সত্তার যে তার! 
ভিন্ন প্রকাশ, তা বোঝাতে তিনি কোথাও বলেছেন একটি সতারূপে 
প্রকাশ, অন্থটি আনন্দরূপে প্রকাশ, কোথাও বলেছেন একটি বিধাতা-* 
রূপে প্রকাশ অন্যটি বন্ধুরপে প্রকাশ । সুতরাং বিশ্বদেবতা ও জীবন- 
দেবতা পৃথক সত্তা নয়, একই মহাসত্তার ছুই ভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশ-__ 
একটি প্রকৃতির মধ্যে নিয়মরূপে, অন্থটি মানুষের হৃদয়ে ভক্তের প্রেমের 
ভিখারী কপে। একটি নৈরাক্তিক প্রকাশ, অন্টি ব্যক্তিবপী 
প্রকাশ। 

এই আলোচনার আরম্তে বল। হয়েছিল জীবনদেবতাঁতত্ব গলে 
উঠেছিল খানিকটা! দিব্যদৃষ্টির প্রভাবে, খানিকট। কবি নিজস্ব 
মতিগতির পথে যুক্তির প্রভাবে । এর সমর্থক যুক্তি তিনি সংগ্রহ 
করেছিলেন প্রকৃতির কাছ'হতেই পাঠ নিয়ে । তার প্রতিপান্চ হলো 
একই বিরাট সন্ত। দুই বিভিন্ন পর্যায়ে আত্মপ্রকাশের ক্ষমতা রাঁখেন। 
একটি প্রকাশ হলো সমগ্র বিশ্বে ক্রিয়াশাল একটি নৈর্ব্যক্তিক 
শক্তিরপে। অপরটি হলে।' ব্যক্তিবিশেষের কাছে ব্যক্তিত্ববি শিষ্ট 
প্রেমিকরূপে। প্রকৃতির মধ্যে তার একটি সমর্থক দৃষ্টান্ত তিনি লক্ষা 


86. শান্তিনকেতন, বিধান 
৬২ 


করেছিলেন। সেটি “উৎসর্গ-এর একটি কবিতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে ।৪৬ - 
আকাশের নূর্য একটি বিরাট বন্ধ, বিপুল তার শক্তি, আকাশের 
মতো বিরাটতর আধার না হলে তাকে ধারণ করবে কে? অপরপক্ষে 
ঘাসের ভগায় লম্বমান শিশিরবিন্দু একটি তুচ্ছাতিতুচ্ছ ক্ষুদ্র বন্ত। 
উভয়ের মধো প্রীতির সম্পর্ক সম্ভব নয় বলেই মনে হবে। শিশির- 
বিম্দুরও ভাই ধারণা । তাই সে বলছে 
হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কেবা। 
ওগে। তপন তোমার স্বপন দেখি যে 
করিতে পারিনে সেব!। 
কিন্তু সত্যই কি স্ুর্ধ তাকে ধর! দেন ন1? তিনি যেমন বিরাট 
বিশ্বকে কিরণে ভরিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখেন, তেমন শিশিরবিন্তুর 
বক্ষে প্রতিফলিত হবারও ক্ষমত| রাখেন। তপন তাই উত্তরে 
বলছেন £ 
আমি বিপুল কিরণে ভূবন করি যে আলো, 
তবু শিশিরটুকুরে ধর! দিতে পারি, 
বাসিতে পারি যে ভালে।। 
এই উপমাটি মনে হয় অপূধ হয়েছে। এতে যেন রবীন্দ্রনাথের 
মনের ধারণার প্রতিধবনি পাই। রবীন্দ্রনাথ যেন শিশিরবিন্দ্বু এবং 
বিশ্বসন্ত। যেন স্বর্য। সুর্যের ছুই পর্যায়ে প্রকাশ। নৈবাক্তিক 
সত্ত।রূপে মহাকাশে এবং বাক্তিরপী সত্তারূপে শিশিরবিন্দুর বক্ষে 
প্রতিবিদ্বিত হয়ে । বিশ্বসন্তারও প্রকাশ ছুই পর্যায়ে, বিশ্বদদেবতারণে 
এবং জীবনদেবতারূপ, বিধাতারপে ও বন্ধুরপে। একটি কাজের 
প্রকাশ, অপরটি আনন্দের প্রকাশ । 
এইভাবে রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের ব্রহ্মবাদকে এক অবস্থায় গ্রহণ 
করে, পরের অবস্থায় তা হতে সরে এসেছিলেন। কারণ, ত্রচ্মাবাদ 
একটি নৈর্যক্তিক সত্তার জ্ঞানের পথে পরিচয় দেয়। সুতরাং তাতে 


৪৬, উৎসর্গ ১২ 


৬৩ 


হাদয়বৃত্তির প্রয়োগের অবকাশ নেই । ভঙিমার্গে বযক্তিরগী ঈশ্বরের 
সাধনায় হৃদয়বৃত্তির প্রয়োগের এবং তৃপ্তির যথেষ্ট স্থযোগ মেলে । এই 
পথে তিনি প্রথমে পারিবারিক ধর্নচিন্তার প্রভাবে পিতারূপী ঈশ্বরের 
পরিকল্পনায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন ; কিন্তু তাতে তিনি তৃপ্তি পান নি। 
কারণ, তিনি ঈশ্বরের সহিত আরও নিবিড় সম্ব্। চেয়েছিলেন । এই 
অতৃপ্তির প্রভাবেই তিনি তার জীবনদেবতাতত্বকে লাভ করেছিলেন। 
তবে ওঁপনিষদিক চিন্তাকে একেবারে ঠেলতে পারেন নি। তাই 
ভ্রীবনদেবতাতত্বের মধ্যে দেখি নৈব্যক্তিক ব্রক্ষবাদের সহিত একেশ্বর- 
বাদের ব্যক্তিরপী ঈশ্বরের সামপ্রস্ত স্থাপনের জন্য এক অভিনব 
পরিকল্পনা গড়ে উঠেছে। এ সতাই এক অভিনব স্থপ্টি। স্মৃতরাং 
বলা যায় তার সাধনপথে ব্রক্মবাদের কাছে এসে আবার সরে 
গিয়েছিলেন । তবু উপনিষদের প্রতি ভার আকধণ শিথিল হয় নি। 
জীবনদেবভাতত্বই তার প্রমাণ। 


৬৪ 


গ%০গগগ্ণ তৃতীয় অধ্যায় %%%শণ 
দ্বৈতভাব তত্ব 


এক 
দ্বৈতভাব ও নায়াধাদ 


দৃশ্যমান বিশ্বের মধ্যে একটি দ্বৈতভাৰ ক্রিয়া করছে। আমাদের 
জ্ঞানেক্দ্রিযগুলির সাহায্যে আমরা যে বিশ্বের সহিত পরিচিত হই তা 
বৈচিত্রো ভরা । চোখে দেখি নীল আকাশের উের্ব বিস্তার, মেঘের 
গায়ে দেখি রানধন্থুর সাত রঙের সমাবেশ, পুথিবীর বক্ষে দেখি 
উদ্ভিদের সবুজ সমারোহ, ফুলে দেখি রঙের বাহার! কান দিয়ে শুনি 
কত বিচিত্র শক; ত্রাণ শক্তি দিয়ে আস্ত্রাণ করি কত বিচিত্র ধরনের 
স্রাণ। রাতের অন্ধকারে যে-ফুল ফোটে তা কোথায় আছে জানি 
না, অথচ বাতাসে বাহিত তাব সুগন্ধ আমাকে পুলকিত করে। এই 
ভাবে দেখ যায়, বিশ্বের যে পরিচয় আমর! পাচ্ছি ঙার মধ্যে একটি 
ছ্বৈতভাব ক্রিয়া করছে॥ একদিকে আছে বহির্জগতের নান বস্ত, 
আমাদের জ্ঞানেশ্রিয়গুলি যাদেব পরিচয় এনে দিতে পারে। অপর 
দিকে আছে তাদের সম্বন্ধে সচেতন হতে পারে এমন একটি মন। 
পনিষদ এই দ্বেতভাখ সম্বন্ধে বিশেষ সচেতন ছিল। যার সম্বন্ধে 
ইন্ড্িয়গুলি খবর এনে দেয় তাকে উপনিষদে বিষয় বল! হতো । আর 
যা ইন্জ্িয়গুলির সাহাযো তাদের সম্বন্ধে সচেতন হয় তাকে উপনিষদে 
ভোক্তা বল! হতো। কঠ উপনিষদে এই ছৈততত্বকে একটি উপমার 
সাহায্যে ঘোঝান হয়েছে। বিশ্ব যেন একটি বিস্তৃত ক্ষেত্র। 
আমাদের তার সহিত পরিচিত হতে হবে। ছোট জায়গায় পায়ে 


৬৫ 


হেঁটে ঘুরে আসা যায়; কিন্ত রিরাট জায়গায় তা সস্তব নয়। একটি 
যানের প্রয়োজন হয়ে পড়ে । তাই কল্পনা কর! হয়েছে বিশ্ব দর্শনের 
জন্য মানুষের মন যেন একটি রথে চড়ে বসেছে; আর ইঞ্জিয়গুলি 
যেন অস্থের মতে৷ সেই রথটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মন*যেন 
পচ ঘোড়ার রথে চড়ে বিশ্বকূপ দর্শন করছে । প্রাসঙ্গিক শ্লোকটি এই £ 
| ইন্দ্রিয়ানি হয়াম্তাহুবিষয়াংস্তেু গোচরান্‌ ॥ 
আত্মেক্তিয় মনোযুক্তং ভোক্তেত্যাছর্মনীধিণঃ ॥১ 

স্থতরাং এই বিশ্লেষণ অনুসারে বহিধিশ্ব হলে| বিষয়, ইন্জিয়গুলি 
মন্বের মতে। আমাদের তাদেব সহিত সংযোগ ঘটায়, আর অন্ঠদিকে 
ভোক্ত। ভাদ্র খবব নেয় । ভোক্ত! আবার তিনটি উপাদান নিয়ে 
গঠিত £ ইন্দ্রিয় মন ও আত্মা। ইক্জ্রিয় খবৰ আনে, মন তাৰ অর্থ- 
গ্রহণ করে এবং আত্মা তা উপলব্ধি কবে। বোঝাই যায় একটা 
ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টি দেখা হয়েছে । মোট কথা হলো বিশ্ব 
প্রকট হয় না একটি দ্বৈতভাব না থাকলে । তাব একদিকে বিষয়, 
অপর দিকে ভোক্তা । চুয়ের পরম্পব সশঘাতে বিশ্ব পরিষ্ফুট হয়ে 
ওঠে । 

মাগু,ক্য উপানষদে গাবও কিছু অতিরিক্ত কথা বলা হয়েছে। 
তাতে এই ছ্ৈতভাবেৰ পুবে একটি অদ্বৈতভাব স্থাপন কৰা হয়েছে। 
অর্থাৎ বিশ্বসত্তা বা ব্রহ্ম বা আত্মার দুটি পুথক অবস্থা হতে পাবে। 
একটি হলো অদ্বৈত মনস্থা "যখানে জ্ঞাত-জ্ঞেয় সম্বন্ধ না ভোক্ু- 
ভোগ্য সম্বন্ধ থাকে না। €সখানে কেবলমাত্র অদ্বৈতভাবই প্রকট। 
মার একটি অবস্থা। থাকে যেখানে জ্ঞাত জেঞ্য় সম্বন্ধের ভিত্তিতে একটি 
দ্বৈতভাব প্রকাশ হয়ে পডে। সেখানেই বছু ছারা খণ্ডিত ইন্দ্িয়গ্রাহ 
বনু ও বিচিত্র বিশ্বের সমাবেশ আবিষ্কৃত হয়। আর বলা হয়েছে এই 
দ্বৈতভাবের ও উপলব্ধির তারতমা 'মাছে। সেখানে তিনটি অবস্থা 


১. কঠ 1১৩৬৩ 


ভঙ 


আছে। 


প্রথম, যেখানে দ্বেতভাব পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত; দ্বিতীয়, 


যেখানে বহিথিশ্বের সহিত সংযোগ ছিন্ন হলেও দ্বৈতভাব প্রকট; 
তৃতীয়, যেখানে ছৈতভাব প্রচ্ছন্ভাবে বর্তমান । প্রথমটি জাগ্রত অবস্থা, 
দ্বিতীয়টি স্বপ্র-অবস্থ! এবং তৃতীয়টি সুধুণ্ি-অবস্থা । কাজেই ত্রচ্ষের 
চারটি অবস্থা পাই। স্থুতরাং তিনি চতুষ্পাৎ ।* 


এই ব্যাখ্য। অনুসারে চারটি অবস্থার বিশ্যাস এইভাবে হবে £ 


১ । 


(ক) 


(খ) 


(গ) 


| 


দ্বৈতভাবমণ্ডিত অবস্থ। ৷ তার অস্তভূক্তি তিনটি অবস্থা পাই : 


মানুষে জাগ্রত অবস্থা (উপনিষদের ভাষায় জাগরিত 
স্থান )। এখানে মন বহিঃপ্রজ্ঞ, অর্থাৎ বাহিরের বিশ্বের 
সঙ্গে সংযেগ ঘটে এবং তাদের পরস্পরের সংঘাতের ফলে 
বপ-রস-শব-স্পর্শ গন্ধের বিচিত্র বিশ্বের উপলবি হয়। 


স্বপ্নের অবস্থা, (উপনিষদের ভাষায় ধরপ্প স্থান )$ এখানে 
মনের অভান্তবে অবস্থিত বিষয়ের সঙ্গে মনের সংযোগ 
ঘটে। এখানেও দ্বৈতভাব প্রকট; তবে ভোক্তা ও 
বিষয় উভয়েই মানসিক পদার্থ । তাই এখানে অস্তঃপ্রজ্ঞের 
অবস্থা বর্তমান আছে বলা হয়েছে। 


স্থযুপ্ত অবস্থা (উপনিষদের ভাষায় সুষুপ্ত স্থান)। 
এখানে পাই স্বপ্রহীন গভীর নিদ্রার অবস্থা । এখানে মনের 
সাহত কি বহিথিশ্বের অস্তুভূক্তি বিষয়, কি মনের কল্পিত 
বিষয়েব যোগ থাকে না। ছ্বৈতভাব এখানে প্ররচ্ছন্লভাবে 
থাক। কারণ, যেকোনও মুহূর্ডে আবার মনের সহিত 
বিষয়ের সংযোগ স্থাপিত হতে পারে। মন ক্রিয়াহীন 
অবস্থায় থাকে বলে একে অগ্রজ্ঞ অবস্থা! বলা হয়েছে। 


দ্বৈতভাব মুক্ত অবস্থা । তাই হলে! চতুর্থ অবস্থা । তাকে 


২. সর্বং হোতহুক্ষায়মাত্মা পরহ্ধ সোহয়মাত্মা চতুষ্পাধ | মাণ্ড্‌কা ।২ 


৬৭ 


উপনিষদে বলা হয়েছে অদ্বৈত অবস্থা । এই অবস্থায় দ্বৈত- 
ভাববিহীন স্বরূপে স্থিত আত্মা বা ব্রঙ্গকে পাই। এই 
অবস্থায় ত্রহ্ষমের উপর বিষয়গুলির যা গুণ তাও আরোপ 
করা যায় না, আবার জ্ঞাতুরূগী মনের যা গুণ তাও আরোপ 
করা যায় না। তাইজন্া, বলা হয়েছে, এই অবস্থায় ত্রহ্ম 
একদিকে অদৃষ্ট, অব্যবহারধ, অগ্রাহাঃ লক্ষণহীন, চিন্তা ও 
শ্রবণের অগম্য এবং অপরদিকে তা বহিঃপ্রজ্ঞ নয়, অস্তঃপ্রজ্ঞ 
নয়, অপ্রজ্ঞ নয়! লক্ষা করে দেখা যেতে পারে প্রথম 
পর্যায়ের বিশেষণগুলি জ্ঞেয় বিষয়ের ওপর প্রযোজা এবং 
দ্বিতীয় পর্যায়ের বিশেষণগুলি জ্ঞাতারপী মনর ওপর 
প্রযোজা । সুতরাং এর তাৎপর্য দাড়ায় এই যে অছৈত 
অবস্থায় ব্রন্মের না জ্ঞাতৃরূপ প্রকট থাকে, না বিষয়ৰপ ব| 
জ্ঞয়রূপ প্রকট থাকে । ত1 এক তৃতীয় সাম্যাবস্থায় থাকে । 

তাকে তাই শাম্ত এবং শিব বল! হয়েছে ।৩ 
শঙ্করাচার্যেব অদ্বৈতবাদ সম্ভবত এই চতুর্থ অবস্থাকে ভিন্তি কবেই 
গড়ে উঠেছে । গোৌঁড়পাদের . মাণ্ড,ক্য উপনিষদের উপর কারিকাই 
তার ভিত্তি। তার অদ্বৈততত্ব কিছু ভিন্ন । মোটামুটি উপবের ব্যাখা। 
হতে বোঝা যায় যে দ্বৈত অবস্থ। এবং অদ্বৈত মবস্। ব্রহ্মের হুই ভিন্ন 
অবস্থা বলে সচিত হয়েছে । কিন্তু শঙ্করাচাধ তাদের মধো পার্থকা 
টেনেছেন। তিনি উভয়েব অনন্যা স্বীকার করেও ছেত অবস্থানে 
একটি বিকৃতরূপ বা মায়া বলে বর্ণন। করেছেন। ০সই কারণে ঠার 
দর্শনকে মায়াবাদ বল। হয়। বর্তমান আলোচনায় শঙ্করাচাষের 
অদ্বৈততত্বের আলোচন। প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে ছুই কারণে। প্রথমত্ত 
ভার তন্বটি তিনি উপনিষদের কতকগুলি আপ্তবচনের উপর স্থাপন 
করেছেন । তার ধারণায় উপনিষদের বাণীর উপরই তা প্রতিষ্ঠিত। 


৩. গ্রাডক্য 1৭ 
৬৮ 


দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি তরুণ বয়স হতেই মায়াবাদের প্রতি আকৃষ্ট 
হয়; কিন্তু তিনি তাকে গ্রহণ করতে পারেন নি। তাই নানাভাবে 
তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন । সুতরাং প্রশ্ন ওঠে উপনিষদে 
মায়াবাদের সমর্থন আছে কি-না । এইপ্রসঙ্গে শঙ্করাচার্ষের অদ্বৈত 
বাদের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে দেবার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। 

আমাদের দেশে ভ্রান্ত ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানকে ছি শ্রেণীতে ভাগ করা৷ 
হয়ে থাকে : নিরালম্বন ভ্রম ও সালম্বন ভ্রম । নিরালম্বন ভ্রম পাই 
যখন এমন একটি বস্তব উপলব্ধি করি যার আদৌ অস্তিত্ব নেই, যেমন 
আকাশকুনুম, ব! স্বপ্রে দেখা বস্ত ব। ঘটন! । আব সালম্বন ভ্রম পাই 
ঘখন একটি বস্তু আছে ঠিকই, কিন্ত আমর। তার স্্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণ! 
করে বমি, ৫যমন শুক্তি পা বলে ভ্রম কবি। শঙ্করাচার্ধ বলেন আানর। 
বু দ্বারা বিখপ্ডিত যে-বিশ্বকে দেখি তা আছে ঠিকই, কিন্তু তা৷ ব্রহ্ম 
হতে অভিন্ন । সুতরা' তাকে যে বরূপে দেখি সেট! ভ্রান্ত দর্শন। 
স.ক্ষেপে তার মতে বিশ্ব ব্রহ্ম হতে অভিন্ন, কিন্ত তার ব্ুরূপে প্রকাশ 
বিকৃত দর্শন । এখন তাৰ অদ্বৈতবাদের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া 
যেতে পারে। 

অদৈতবাদে তিনটি মূল কথ। পাই। প্রথম তত্ব হলো। ব্রহ্ম বিশুদ্ধ- 
ভাবে একক সত্তা, তার মধো বিভাগ নেই । দ্বিতীয় তব হলে। বহুরূপে 
প্রকট বিশ্ব ব্রহ্ম হতে ভিন্ন, তবে ভার বন্ছত্ব ভ্রান্ত দর্শনের ফলে 
ঘটেছে এবং অবিগ্ধ। তার মূলে । তৃতীয় তত্ব হলো ব্রদ্ষের প্রকৃতি হলো 
জ্ঞাতৃম্বরূপ, তিনি শুধু বিস্তদ্ধভাবে চিন্ময় নন, তিনি নিভা জ্ঞাতারগী, 
জে্য় বস্তু না থাকলেও তার জ্ঞাতৃরূপ বর্তমান থাকে । এইবার এই 
তিনটি তত্বের সংক্ষিপ্ত .ব্যাখ্য। দেবার প্রস্তাব করি। 

শঙ্করাচা বিশ্বের সহিত ব্রঙ্গের অভিন্নতা প্রমাণ করেছেন তাদের 
ওপর কারধকারণ সম্বন্ধ আরোপ করে। তিনি বলেন ব্রহ্ম একাধারে 
বিশ্বের নিমিত্ত কারণ ও উপাদান কারণ। কিন্তু আমাদের ব্যবহারিক 
জগতের অভিজ্ঞতা। বলে যে নিমিত্ত কারণ ও উপাদান কারণ পরম্পর 


৬৯ 


পৃথক হয়ে থাকে । যেমন ঘটের নিমিত্ত কারণ কুস্তক!র তার উপাদান 
কারণ মৃত্তিকা হতে পৃথক। শঙ্কর বলেন বিশ্বপম্পর্কে ব্রদ্মের এ 
ধরনের কারণন্ব আরোপ করলে তিনি বিশ্বের একমাত্র কারণ হতে 
পারেন না। আ্বুতরাং এখানে ধরতে হবে নিমিত্ত ও উপাদান কারণ 
হিসাবে এখানে কার্কারণ সম্বদ্ধের অভিক্নত। বর্তমান । এইপ্রসঙ্গে 
তার প্রাসঙ্গিক ভাষ্যের অনুবাদ স্থাপন কর! যেতে পাবে। 

£এই ভোক্ত-ভোগ্য সন্বন্ধঘুক্ত ব্যবহারিক বিভাগ প্রকৃত বলে 
গৃহীত হতে পারে বিবেচনায় এই ব্তিক্রমের এখানে উল্লেখ করা 
হয়েছে। এই বিভাগের পরমার্থতঃ কোনও অস্তিত্ব নাই ; কারণ, কার্য 
ও কারণের মধ্যে কোনও পার্থক্য নাই ॥ কার্য হলে! আকাশাদি বনু 
প্রপঞ্চময় জগৎ, কারণ হলেন ত্রক্ধ ; সেই কারণ হতে কার্ষের পার্থকা 
নাই, আছে অনন্যত্ব-- এই বুঝতে হবে 15 

স্থতরাং বোঝা যায় শঙ্কর যে-অর্থে ব্রহ্গকে বিশ্বের কারণ বলেছেন 
তা সাধারণ অর্থ হতে ভিন্ন । আমর! কার্কে কারণের রূপান্তর বা 
পরিণাম বলে ধরে নিই । কিন্তু শঙ্কর বলেন বিশ্ব ব্রঙ্গের রূপাস্তর 
নয়, তা ব্রহ্মই ;: তাদের মধো সম্বন্ধ একত্বের। ব্রচ্গ নিত্যকাল তার 
খ্ীকিক অসঙ্গত। নিয়ে অবস্থান করছেন । ইন্দ্রিয়গ্রাহ জগতে যে 
তাকে বন্ছুরূপে দেখি তা দেখার ভুল । এইজন্য তিনি ইন্জ্িয়গ্রাহ 
বু দ্বার৷ খণ্ডিত বিশ্বকে বিশ্বের পরিণাম বলেন নি, বলেছেন িবর্ত 
বা বিকৃত রূপ । ছুধ যখন দইয়ে পরিণত হয় তখন আমর! পাই 
%. আর শুক্তিকে যখন রৌপ্য জ্ঞান করি তখন পাই বিবর্ত। 

এখন এই বিবর্ত বা বিকৃতি কি করে ঘটে শঙ্কর তারও ব্যাখ্য। 
দিয়েছেন । ইতিপুর্বেই বলা হয়েছে আমাদের দর্শনে হুরকম আস্ত 
ইন্জিয়জ জ্ঞানের উল্লেখ আছে: সালম্বন ভ্রম ও নিরালম্বন ভম ৭« 
রজ্ছুতে সাপ দেখ। সালম্বন ভ্রম এবং আকাশকুস্থম দেখা নিরালম্বন 





৪. শারীরক ভাষ্য 1২।১৪১৪ 
&,. যথারুমে তারা হলো 1118101) ও 119110011)511 00, 


মা, 


ভ্রম। সালম্বন ভমে দেখবার একটি জিনিস আছে, কিন্তু তাকে 
জ্রান্তরূপে দেখি। এই শ্রেণীর ভরাস্তিকে খ্যাতিও বলে। শঙ্কর বলেন 
বিশ্ব পরমার্থত ব্রন্মই, কিন্ত তাকে ভুল করে আমরা বনুরূপে দেখি। 
অর্থাৎ এখানে সালগ্বন ভ্রম বা খ্যাতি ঘটেছে । তিনি বলেন অবিষ্তাই 
তার কারণ ॥ যেমন অস্পষ্ট আলোক রজ্জুকে সাপ বলে ভুল করতে 
সহায়ক অবস্থা! স্থপ্টি করে । এই অবিগ্ঠা বিশ্বের প্রকৃতিকে খানিকটা 
আবৃত করে মায়া রচন! করে এবং সেই মায়ার প্রভাবে প্রকৃতপক্ষে 
য। দ্বৈতভাবহীন একক সন্ত! তাকে আমরা বহছরূপে দেখি । 

তৃতীয়ত শঙ্কর বলেন ব্রন্দের প্রকৃতি হলে। জ্ঞাতুরপ। আমাদের 
দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা বলে জ্ঞাতা৷ ও জ্ঞ্েয় পরস্পর আপেক্ষিক 
সত্বা। জানবার বস্ত থাকলে তবেই জ্ঞাতৃত্ব ফুটে ওঠে। কিন্তু শঙ্কর 
ব.লন জানবাৰ কিছু না! থাকলেও ব্রহ্ম জ্ঞাতৃরূপী; তার জ্ঞাতৃরূপ 
নিতা। তিনি নিত্য চিন্ময়।৬ মহাকাশে কিরণ প্রতিফলিত করবার 
কিছু থাক ব1 নাই থাক, ৃূর্ধ যেমন কিবণ ছড়ায়, ব্রন্মেরও সেইরূপ 
জানবাব বস্ত কিছু থাক বা নাই থাক, জ্ঞানশক্কি অক্ষুপ্ন থাকে । 
তিনি যে কিছু দেখেন ন।, তার কারণ দেখবার বস্ত কিছু নেই, কেবল 
এক। তাকে নিয়েই বিশ্ব । 


তুই 
বরচ্মবাদ ও শায়বা 


এইপ্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে শঙ্করাচার্ধ প্রকল্লিত মায়াবাদ উপনিষদের বাণীতে 
সমধিত হয়েছে কি-ন। | এই প্রশ্নের মীমাংসার প্রয়োজন এসে পড়ে এই 
কারণে যে উপনিষদের দর্শনের প্রকৃত পরিচয় সংগ্রহ করতে না পারলে 
রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারার সঙ্গে তার তুলনামূলক আলোচনা আদৌ 
সম্ভব হবে ন1। স্বুতরাং তার একট! মীমাংসা এখানে করে নিতে হয়। 
প্রথমত ব্রঙ্গের প্রকৃতি সম্বন্ধে ব্যাখ্যার কথা ধরা যাক। স্বরূপে 


৬. নত চৈতনোহ্য়মাত্মা ॥ শারীরক ভাষা |২৩১ 


১ 


অবস্থিত ব্রদ্মের যে-চিত্র শঙ্কর কল্পন। করেছেন সেধানে তিনি নিত্য 
চৈতন্য ও জ্ঞাতৃরূপী ; জেয়বস্ত নিরপেক্ষভাবে এই জ্ঞাতৃরূপ নিত্য 
প্রকট। মনে হয় বৃহদারণ্যক উপনিষদে উল্লিখিত যাজ্বক্ক্ের বচন 
হতে তার কিছু সমর্থন সংগ্রহ করা যায়। যাজ্বন্ধ্য বলেছেন যে 
প্রাজ্জ আত্ম! দ্বারা সংপরিষক্ত হলে মানুষের আত্মার দ্রষ্টারপ নষ্ট হয় 
না; কেবল দ্বৈতভাব লুণ্ড হয় বলেই সে কিছু দেখে না।+ সম্ভবত 
এই উক্তির মধ্যেই বীজাকারে যোগদর্শনের অন্তনিহিত তত্ব পাওয়া 
যায়। তবে সে-কথ। এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। এখানে উল্লেখ কর! 
প্রয়োজন যাজ্ঞবন্ধ্য মানুষের আত্ম। সম্বন্ধেই এই মন্তব্য করেছেন। 
এই উপনিষদের আর এক জায়গায় যাজ্জবন্ক্ের আর একটি অনুরূপ 
উক্তি পাওয়া যায় যা ব্রক্গ সম্বন্ধেই প্রয়োগ কর! হয়েছে । জেখানে 
বল! হয়েছে, ব্রন্মোর সদৃশ ভরষ্ঠ! আব নেই ।” মনে হয় এইসব উক্তি 
হতে শস্কর তার তবের সমর্থন পেয়েছেন । 

অপরপক্ষে উপনিষদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে যাদের আমর। জড় 
পদার্থ বলি তারাও ব্রহ্ম হতে অভিন্ন। ব্রহ্গ জড়েও আছেন চেতন 
পদার্েও মাছেন। তৈত্তিরীয় উপনিষদে বল! হয়েছে "যিনি মানুষে 
অবস্থিত এবং যিনি আদিতো অবস্থিত উভয়ে এক? ।৯ একই উপনিষদে 
উল্লেখ আছে যে যাকে আমরা জড় পদার্থ বলে জানি, যেমন ক্ষিতি, 
অপ, তেজ, মরুৎ ও খ্ঠোম নিয়ে যে পঞ্চনহাভূত এরাও ত্রন্মা। এই 
তালিকায় যেমন ইন্দ্র, প্রজাপতি প্রভৃতি স্থান পেয়েছেন তেমন 
পঞ্চমহাভূত, প্রথিবী, আকাশ, জল, নক্ষত্ররাজি স্থান পেয়েছে ।১, 


৭. যদ্ধৈ তলব পশাতি পশ্যন বৈ তন্ন পশ্যাঁ ন হি দ্ুদ্টট ৭.স্টেবপরিলোপো 
ধবিদাতেধাবনাশিত্থাৎ । বূহদারণ্যক 181২৩ 
৮. নাদ্যদতোহ্স্তি দ্ুষ্টা ॥ বৃহদারণাক 1৩1৭1৫৩ 
৯. স য্চারং পুরুষে ॥ যশ্চাসাবাদিত্যে ॥ স একঃ ॥ তৈত্তিরীয় ২1৮. 
১০. এষ ব্রদ্গেষ ইন্দু, এষ গ্রজাপাঁতিরেতে সর্বে দেবা ইমানি চপ মহাভুতানি 
পৃর্থিবীরাকাশ আপো জ্যোতাীংবীতি'"*প্রজ্ঞানে প্রারতিষ্টিতং প্রজ্ঞানং 
দ্ধ ॥ এতরেয় 1৩141৩ 


পিই 


সুতরাং ত্রন্মের প্রকৃতি সম্বন্ধে শঙ্করাচার্ধের মতের পূর্ণ সমর্থন উপনিষদে 
পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। সম্ভবত এই তত্ব তর নিজস্ব চিন্তার 
কলে গড়ে উঠেছে । ৮ 

আরও বড় তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হলে! অধৈতবাদের জমর্থন মূল 
উপনিষদগুলির বাণীতে পাওয়া যায় কি-না। শঙ্করাচার্য তার মায়াবাদের 
সমর্থনে বুহদারণ্যক উপনিষদের একটি বচনের উপর নির্ভর করেছেন। 
সেখানে বল। হয়েছে ইন্দ্র মায়ার সাহায্যে বিরাট আকার ধারণ 
করেছেন; তার রথের অশ্বের সংখ্যা! দশ শত।১১ শক্করাচার্য এই 
বচনটির রূপক ব্যাখ্য। করেছেন ॥ অর্থাৎ ইন্দ্রের স্থলে ব্রহ্গকে ধরে 
নিয়েছেন এবং অর্থ করেছেন ব্রহ্ম মায়ার সাহায্যে বিস্তার লাভ 
করে বনু ইন্দ্রিয়যুক্ত জীবের ব্ধপে প্রতিভাত হন। এরূপ ব্যাখ্যার 
পশ্চাতে যে-সবল যুক্তি আছে তা বলা যায় না। কারণ এই বচনটি 
খগবেদের একটি স্থক্ত হতে উদ্ধৃত।১২ সেখানে নিশ্চিত তা অভিধ। 
অর্থে ই ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ ইন্দ্র সেখানে নানা বৈদিক দেবতার 
অন্যতম । তবে সত্যই উপনিষদে এমন কিছু বচন পাওয়া যায় যা 
পরোক্ষভাবে মায়াবাদের সমর্থন করে। 

পূর্বেই বলা হয়েছে ইন্ড্রিয়গ্রাহ্া বিশ্বের প্রকাশকে সম্ভব করতে 
ছুটি ভিন্নধর্মী সন্তার সংযোগ প্রয়োজন । একটি জানবার বা উপভোগ 
করবার ক্ষমত| রাখবে, অন্থটি জ্ঞাত হবার বা ভোগ্য হবার ক্ষমতা 
রাখবে ॥। এই জ্ঞাতৃ-জ্ঞয় ও ভোক্ত-ভোগ্য সম্বস্ধকে ভিত্তি করেই 
বিভিন্ন বস্তর বিচিত্র সমাবেশ হিসাবে বিশ্ব মানষের মনের নিকট 
প্রকট হয়। একে বলা হয় দ্বৈতভাব। এই দ্বৈতভাব না থাকলে 
বিশ্বের প্রকাশ নেই। তা লুপ্ত হলে সবকিছু বৈচিত্র্যহীন অথণ্ড 
একাকারে পরিণত হয় । | 

১১. ইদ্দ্রো ময়োভিঃ পূুর্রুপ ঈয়তে যৃত্তা হ্যস্য হরমঃ শতদশোতি । 


বহদারণ্যক 1২161 
৯৯, হাগবেদ 8৬18৭ 


শত 


উপানষদ--ও 


ছান্দোগ্য উপনিষদ এই কথাটি বোঝাতে ছটি কথার ব্যবহার 
করেছে; “অল্প' অর্থাৎ দ্বৈতভাব মণ্ডিত খণ্ডিত বিশ্ব এবং 'ভূমা” 
অর্থাং দ্বৈতভাববিহীন 'মখণ্ড বিশ্ব ॥ তার মধ্যে কোনও বিভাগ ব। 
ছেদ নেই বলে তা ভূমা। আরও বলা হয়েছে যেখানে এক অপরকে 
দেখে, এক অপরকে শোনে, এক অপরকে জানে, তাহ হলে। অল্প। 
আর যেখানে এক অপরকে দেখে না, এক অপরকে শোনে না, এক 
অপরকে জানে না, তাই হলে ভূম1।১৬ এখানে যা অল্প তা যে 
ব্রচ্মের বিকৃত রূপ ত৷ ইঙ্গিত কর! হয় নি। 
অপর পক্ষে বৃহদারণ্যক উপনিষদের ছুই স্থানে যাজ্ঞবন্ধায কথিত 
একটি বচন পাই; ত! যেন ইঙ্গিত করে যে বিশ্ব যেখানে জ্ঞাতৃ-জ্ঞেয় 
বপে খণ্ডিত, সেখানে ব্রহ্মকে নিজস্বরূপে পাই না। বচনটির বিশেষ 
তাৎপর্য আছে বলে মূল আকারে তাকে উদ্ধৃত নাঁ করে উপায় নেই। 
কথাটি এই £ ““যত্র হি দ্বৈতমিত ভবতি তদিতর ইতরং জিম্রতি তদ্দিতব 
ইতরং পুতি তদিতব ইতরমভি বদতি' ইত্যাদি ।১৪ এখানে “গ্বৈতমিব 
কথাটির ব্যবহার খুব তাৎপর্যপূর্ণ । যাক্জবন্ধা যেন বলতে চেয়েছেন 
যেজ্ছাতৃ-জ্ঞেয় ৪ ভোক্ৃ-ভোগ্য সম্বন্ধে বিশ্ব যে বহুরূপে প্রকট হয়, ত। 
ত্রদ্মের বিকৃত রূপ এবং “দ্বৈতবোধেব ভাব যেখানে লোপ পায় সেখানে 
ভাব অদ্বৈত বিজ্ঞাত রূপটি ফুটে ওঠে এবং তাই তার প্রকৃতরূপ। 
স্থতরাং “ইব” কথাটির প্রয়োগ হেতু এই ঠাৎপর্ধ দাড়ায় যে 
দ্বৈতভাবমপ্ডিত রূপ একটি ভ্রান্ত উপলব্ধির মত এবং অদ্বৈতরূপই ব্রদ্দের 
নিজন্দ প্রকৃতি বুচিত করে । এই অদ্বৈত অবস্থার একটি বর্ণনা আমরা 
উপনিষদে পাই । সেখানে বল! হয়েছে যে সেই অবস্থায় তিনি 'অশব, 
অস্পর্শ, 'অবপ, অব্যয় অনাস্বাদেয়, নিত্য এবং অগন্ধ ।১ * 
১৩. যন্তু নানা পশ্যতি নান্চ্ছণোতি নান্যদ 'বিজানাত স ভুমাহথ 
যন্্রান্যৎ পশ্যঙ্যনাচ্ছৃণোতান্য দ: 'বিজানাতি তদঙ্পম্‌ ॥ 
ছান্দ্যোগায ॥৭/২৩।১ 


১৪. বৃহদারণ্যক ॥২1৪/১৪ ও 5161১৫ 
১৫. অশব্দম প্পর্শমবপমব্যযং তথারসং 'নিত্যমগন্ধ বচ্চ যত ॥ কঠ ॥ ১৩১৫ 


৭8 


এই বাণী ছুটির মধ্যে মায়াঁবাদের পরোক্ষ সমর্থন আছে মনে হয়। 
তবে এট! নিঃসন্দেহ যে প্রাচীন উপনিষদগুলির বচনে মায়াবাদের 
প্রতাক্ষ সমর্থন নেই । এমনকি বুহদারণাক উপনিষদেই এমন বচন 
আছে য। ব্রন্মের খগ্ডিতরূপ এবং অখণ্ড অদ্বৈতরূপকে সমান মর্যাদা! দিয়ে 
স্বীকার করে নেয়। সেখানে বল! হয়েছে ব্রন্ষের ছুটি রূপ। মূর্ত এবং 
অমূর্ত, মতর্য এবং অম্বৃত, স্থির এবং গতিশীল, প্রকট এবং 
স্থানাতীত।১৬ 

প্রাচীন উপনিষদগুলিকে সমগ্রভাবে আলোচনা করলে দেখ! যায় 
যে উপনিষদের মূল ভাবধার! বলে যে বিশ্বসন্তার স্বাভাবিক গতিই 
হলে। বিশুদ্ধ একক অবস্থা হতে সরে এসে বহু ও বিচিত্রবূপে আত্মপ্রকাশ 
করা; কারণ তিনি মিজেকে বিভাগ করে, নিজের উপর দ্বৈতভাব 
আরোপ করে আনন্দ পান। বিশ্বে মধ্যে ব্ুরূপে আত্মপ্রকাশ না 
করলে তার শিল্প রচন৷ সার্থক হয় না, তার আনন্দের মহাকাব্য 
রচিত হয় না। তার জন্যই তে! তিনি বিশ্বরূপ হয়ে, আনন্দরূপ হয়ে 
আত্মপ্রকাশ করেন। তার অর্থ এই নয় যে তিনি বনু ও বিশ্লিষ্ 
সত্তর গাণিতিক সমষ্টিতে পরিণত হন। সকলকে জড়িয়ে নিয়ে তার 
অথগ্ড রূপ তখনও অক্ষুপ্ন থাকে, যেমন নাটকের বনু চরিত্র ও ঘটনাকে 
জড়িয়ে নিয়ে তার অথগুতা বিরাজমান । ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে 
দেখলে তা বোঝ। যায়। সেই অখধণ্ডতাবোধ ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞানে ধর! 
পড়ে না; মন দিয়ে, ধীশক্তি দিয়ে তাকে উপলব্ধি করতে হয়। 
উপনিষধদে সেই কথাই বলে ।১* 

'আমাদের এই প্রতিপান্ঠের সমর্থনে উপনিষদের কয়েকটি প্রাসঙ্গিক 
বচন এখানে উদ্ধৃত করবার প্রস্তাব করি। বৃহদারণ্যক উপনিষদে 
বল হয়েছে মূল সত্ব! ( যাকে কোথাও সং, কোথাও আত্মা, কোথাও 


১৬. দ্ধেবাব ব্রঙ্ছণো রূপে মত চৈবামূর্তং চ মর্তং চামৃতং চ চ্ছিতং চচ্চ 
সঙ্গে তা ॥ বহদারণ্যক 11৩1১ 
১৭. মনসৈবেদমাপ্তব্যং নেহ নানা্তি কিংচন ॥ কঠ ॥২১১১ 


ণ€ 


ব্রহ্ম বল। হয়েছে ) আগে একাই ছিলেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করে 
অন্ত কাউকে দেখতে পেলেন না । সেই জন্য তিনি আনন্দ পেলেন 
না। সেই কারণেই একাকী অবস্থায় কেউ আনন্দ পায় না। তখন 
তিনি দ্বিতীয়কে ইচ্ছা করলেন।১৮ বল৷ বাহুল্য বিশ্বশক্তির ইচ্ছ। 
হতে ক্রিয়া। তার ইচ্ছাই তাকে পুরণ করবার শক্তি ধারণ করে। 
স্থতরাং এই ইচ্ছা-প্রণোদিত হয়েই বিশ্বে দ্ৈতরূপের আবির্ভাব । 

এতরেয় উপনিষদে আছে পুর্বে একমাত্র আত্মাই ছিলেন। অন্য 
কেউ ছিল না। তিনি ইচ্ছা করলেন বিভিল্ন লোক স্যৃষ্টি 
করব ।১৯ 

ছান্দোগ্য উপনিধদে এই কথারই প্রতিধ্বনি পাই। সেখানে বলা 
হয়েছে পুর্বে এক এবং অদ্বিতীয় সংই ছিলেন। তিনি ইচ্ছা করলেন 
আমি বহু হব, জন্মগ্রহণ করব । তখন তিনি তেজ স্থষ্টি করলেন ।২* 
সেই তেজ হতেই এই বনু দ্বারা বিখগ্ডিত বৈচিত্র্যময় বিশ্বের 
উৎপত্তি । 

তৈত্তিরীয় উপনিষদে দ্বৈতভাবের উৎপত্তিব যে ব্যাখ্যা পাই তা 
এদেরই অনুরূপ তবে আরও বিস্তারিত। তা বলে; ব্রহ্ম ইচ্ছা 
করলেন মামি বহু হব, আমি জন্মগ্রহণ করব । তিনি তপস্া। করলেন 
এবং তপস্তা করে এই সবকিছু স্থপ্টি করলেন। তাদের স্থষ্টি করে 
তিনি তাদের মধ্যে প্রবেশ করলেন এবং প্রবেশ করে সন্তাবান ও 
সন্তাহীন রূপ ধারণ কখলেন, বিশেষ বস্ক হলেন ও নির্বিশেষ হলেন, 


১৮. আত্মৈবেদমগ্র আসীং পুরুষাঁবধঃ সোহনুবীক্ষা নান্যদাত্বনোহপশ্যং ॥ 
বৃহদারণ্যক 1৯1৪1১ 
স বৈ নৈব রেমে তস্মাদেকাকী ন রমতে স খিতীয়মৈচ্ছৎ | 
বৃহদারণাক 1১18/৩ 
১৯. আত্মা বেদমেক এবাগ্র আসীম্বান্যৎ 'কিচন মি স ঈক্ষত লোকানু 
সূজা হীতি। এতরেয় ॥২১ 
২০. সদেব সোমোদমগ্র আসাদেক মেবাদ্বিতীয়ং-.. 
তদৈক্ষত বহ্‌ সাং প্রজায়েয়োত ততোজো হসজত । ছান্দোগ্য 1৬২৩ 


আঙ্িত ও অনাশ্রিত হলেন, চেতন ও অচেতন হলেন ।২১ অর্থাং 
তিনি দ্বৈতমগ্ডিত রূপে প্রকট হলেন। সে রূপে তিনি চেতনও বটে 
অচেতনও বটে। 

স্থৃতরাং সব দিক বিবেচন! করে এই সিদ্ধান্ত করাই সঙ্গত হবে যে 
উপনিষদের মূল ভাবধারা ইন্দ্িয়গ্রাহ্া বিশ্বকে শুধু ব্রদ্গের অঙ্গীতৃত 
বলে নি, অতিরিক্তভাবে এ কথাও বলেছে যে একক অবস্থ।য় তৃপ্তি ন৷ 
পেয়ে ব্রহ্ম নিজের উপর দ্বেতভাব আরোপ করে বহু হলেন । সেই 
ভাবধারা মায়াবাদকে শ্বীকার করে নি, তা বিশ্বরূপে প্রকাশকে 
ব্রদ্ষের প্রকাশ রূপেই বর্ণনা করেছে।॥ মায়াবাদ ভারতীয় দর্শনে পরে 
এসেছে। গৌড়পাদ ও শঙ্করাচাধই তার প্রবর্তক ॥ অবশ্য মায়াবাদের 
পরোক্ষ সমর্থন উপনিষদের কিছু বচনে মিলবেঃ বিশেষ করে 
যাজ্বক্ষ্যের মন্তব্যে । 

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ কর! যেতে পারে যে আমাদের দেশের মধ্যযুগের 
বিশিষ্ট চিস্তানায়ক গ্রীচৈতম্ক এক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন । 
কষ্খদাস কবিরাজ বিরচিত “চৈতম্চরিতামৃত, গ্রন্থে তার ছু-জায়গায় উল্লেখ 
আছে; একবার সার্বভৌম ভট্টাচার্যের সহিত আলোচনায়, অন্যবার 
প্রকাশানন্দ সরন্ঘতীর সহিত আলোচনায় । আমাদের দেশে মধাযুগে 
শহ্করাচাধ প্রবতিত অদ্বৈতবাদের দারুণ প্রতিপত্তি ছিল, অথচ 
শত্রীচৈতন্ত ছিলেন ভক্তিবাদী। সেই কারণেই তিনি তাদের সহিত 
বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। সাবভৌমের কাছে তিনি যা মন্তব্য 
করেছিলেন ত। এই ভাবে বর্ণিত হয়েছে £ 

পরিণামবাদ ব্যাসম্ৃত্রের সম্মত । 
অচিন্ত্য শক্তি ঈশ্বর জগদ্‌ রূপে পরিণত। 


২১. সোহকাময়ত ॥ বহু স্যাং প্রজায়েয়োত ॥ স তপোহতপাত ॥ স 
তপন্ঞঞ্চদা ॥ ইদং সর্বমসজত । যাঁদদং কিং চ ॥ স তত সৃন্টা ॥ তদেবান- 
প্রাবশং ॥ তদনপ্রাবশ্য ॥ সচ্চ ত্যচ্চাভবং ॥ নির্দ্তংচানিরুন্তং চ॥ 
নিলয়নং চাঁনলয়নং চ ॥ বিজ্ঞানং চাবিজ্ঞানং চ। তোত্তিরীয় 1২৬ 


৭৭ 


মণি যৈছে অবিকৃত প্রসবে ছেমভার । 

জগদ্‌ রূপ হয় ঈশ্বর তবু অবিকার ॥ 

ব্যাস ভ্রান্ত বলি সেই শৃত্রে দোষ দিয়া । 

বিবর্তবাদ স্থাপিয়াছে কল্পন। করিয়! ॥২২ 
বল। বাহুল্য বাদরায়ণ বা বাস রচিত ক্রন্গস্থত্রকেই এধানে ব্যাসস্থত্র 
বলে উল্লেখ কর! হয়েছে। 

সুতরাং শ্রীচৈতন্চের ধারণায় উপনিষদের বাণীতে যে তত্ব বিকশিত 

হয়েছে ত। পরিণামবাদী, বিবর্তবাদী নয়; অর্থাৎ ত। বলে ইন্জ্রিয়গ্রাহ্য 
বিশ্ব ব্রন্মের বিকৃতরূপ নয়, স্বাভাবিক পরিণতি । তবে তার ধারণায় ও 
উপনিষদে শঙ্করাচার্য প্রচারিত অদ্বৈতবাদের সমর্থক বচন যে নাই, তা 
নয়; তা আছে কিন্তু গৌণ তত্ব আকারে । মুখ্যতত্ব বলে ব্রন্মই স্থপ্টির 
মধো আত্মপ্রকাশ করেছেন এবং তা বিকৃত রূপ নয়, স্বাভাবিক 
পরিণতি! এই কথাটিও শ্রীচৈতন্ঠ ছজায়গাতেই পরিষ্কারভাবে উল্লেখ 
করেছেন। এই প্রসঙ্গে প্রকাশানন্দ সরম্বতীর সহিত তার যে 
আলোচনার কথা বণিত হয়েছে তা হতে প্রাসঙ্গিক উক্তিটি উদ্ধার কর! 
যেতে পারে £ 

উপনিষদ সহিত স্ত্র কহে যেই তত্ব। 

মুখ্য বৃত্ত্যে সেই অর্থ পরম মহত্ব ॥ 

গৌণ বৃত্তে যে বা ভান্ত করিল আচার্য । 

তাহার শ্ববণে নাশ হায় সব কার্ধ ৪২ £ 
বল। বাহুল্য মাচার্য 'মর্থে এখানে শঙ্করাচার্ধ। 


তিন 
রবান্মুদর্শনে মায়াবাদের প্রাতষাদ 
এইবার এই চিন্তাগুলির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সঙ্গে তৃলনামুলক 


২২, চৈতনাচারতামৃত ॥ মধ্যকাশ্ড (৬।২০---৭২ 
২৩. চৈতন্য চরিতামত ॥ আরদিকান্ড 1৭/১০৮--১০৯ 


পাচ 


আলোচনার জন্ত আমর প্রন্তত হয়েছি। সেই আলোচনায় প্রবেশ 
করবার আগে আমাদের ছুটি কথা স্মরণ রাখতে হবে। প্রথমত 
শঙ্করাচার্য প্রবতিত অদ্বৈতবাদ ব! মায়াবাদ উপনিষদের মূল ভাবধারার 
সহিত সঙ্গতি রক্ষা করে না। দ্বিতীয়ত, মূল ভাবধার। বলে বিশ্বশক্তি 
বাব্রন্দের স্বাভাবিক আকৃতিই হলে৷ আপনার উপর দ্বৈতভাব আরোপ 
করে রূপ-রস-শব্দ-স্পর্শ-গন্ধে মণ্ডিত এই বিচিত্র বিশ্বরূপে আত্মপ্রকাশ 
করা। ত।নাহলেযে তার আনন্দ নাই॥। আমর! এই ছুই বিষয় 
সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের চিন্ত। বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি। প্রথমে 
মায়াবাদের কথ। ধরা যাক । 

আশ্চর্য লাগে দেখতে যে নিজস্ব মতিগতির পথে রবীন্দ্রনাথের মনে 
মায়াবাদবিরোধী মনোভাব অতি তরুণ বয়সেই আত্মপ্রকাশ করেছিল । 
তখন মায়াবাদের সহিত তার ভালরূপ পরিচয় হয় নি। সেই মনোভাব 
প্রকাশ পায় তার রচিত “কড়ি ও কোমল, গ্রন্থের মস্তক “চিরদিন” 
শীর্ষক কবিতায়। এ গ্রন্থটির প্রকাশনের তারিখ ১৮৮৬ খরীস্টাকড 
( কাতিক ১২৯৩ )। তখন তার,বয়স বছর পঁচিশ। খুব সম্ভব এই 
কবিভাটিই হলে! দার্শ'নকভাবে মগ্ুপ্রাণিত তার প্রথম কবিতা । 

কবিতাটি চিরদিন? অর্থ।ৎ শাশ্বত উদাসীন কালের উদ্দেশে রচিত ॥ 
বিশ্বে কত কি ঘটে, কত মানুষ আসে, হাসে, কাদে চলে যায়, কিন্তু 
“অনন্ত আধার মাঝে দোসর হীন” কাল উদাস হয়ে চেয়ে থাকে। 
কবির মনে প্রশ্ম ওঠে তা হলে কি এই প্রবহমান প্রাণের আতকে 
অবলম্বন করে এত হাসি কান্ন! ফুটে ওঠে তা কি ছায়া, ত। কি স্বপ্রের 
মতো মায়া। নিজের অন্তরের উপলব্ধির ভিত্তিতে তিনি সন্তাবনার 
ইঙ্গিত গ্রহণ করে তার প্রতিবাদ করেছেন। 

মহাকালের উদাসীন আচরণ হতে যে প্রশ্ন মনে *জগে ওঠেতা। 
তিনি প্রকাশ করেছেন এই ভাবে £ 

তাই কি? সকলি ছায়।? আসে, থাকে আর মিলে যায়? 
তুমি শুধু একা আছ, আর সব আছে আর নাই? 


৭8 


তিনি এই সন্ভাবনাকে সত্য বলে স্বীকার করতে চান নি। তার 
প্রতিবাদ জানিয়েছেন এই ভাবে £ 
“কালো না সকলি স্বপ্ন, সকলি এ মায়ার ছলন, 
বিশ্ব যদি স্বপ্ন দেখে সে স্বপন কাহার স্বপন ? 
সে কি এই প্রাণহীন, প্রেমহীন, অন্ধ অন্ধকার? . 
তার ধারণায় ত। স্বপ্ন নয়; এর মধ্যে একটি প্রেমের লীলা চলছে 
যাচিরস্তন। তা না হলে কেন-_ 
“যত দেয় তত পায় কিছুতে না হয় অবসান । 
যত ফুল দেয় ধরা! তত ফুল পায় প্রতিদিন-_ 
যত প্রাণ ফুটাইছে ততই বাড়িয়। উঠে প্রাণ ।, 
তাই তাঁর ধারণ, এই বিশ্বের মধ্যে জন্ম-মৃত্যু আন্দোলিত প্রাণের 
ধারায় এক প্রীতির আদান-প্রদান চলছে। দ্বৈতভাব মণ্ডিত বিশ্ব স্বপ্ন 
নয়, ছায়া নয়, মায়! নয়। প্রাসঙ্গিক উক্তিটি এই-_ 
অসীম জগতে একি পিরিতির আদান-প্রদান । 
কাহারে পৃজিছে ধর! শ্টামল যৌবন উপহারে, 
নিমেষে নিমেষে তাই ফিরে পায় নবীন ষৌবন। 
ংসারের মধ্যেই ফে দেবত! আছেন, সংসার যে মায়া নয়, সংসাব 
ত্যাগ করলে দেবতাকেই ত্যাগ করা হয়--এই সকল কথা বোঝাতে 
অনবগ্ধ ভঙ্গিতে রচিত রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা “চৈতালি কাব্যগ্রন্থে 
স্থান পেয়েছে। ক্ষুদ্র চতুর্দশপদী কবিতা, কিন্ত তারই প্রশস্ত বক্ষে 
নাটকীয় ভঙ্গিতে তার বক্তব্য এখানে সুন্দর ফুটে উটেছে। 
সংসার মায়াময়, প্রেয়সী, শিশু-সম্তান, এর! সব মায়ার ছলনা, এই 
বোধ নিয়ে মুক্তিকামী মানুষ সংসার ত্যাগ করতে উদ্ভত। ওদিকে 
শয্যায় শিশুকে বুকে নিয়ে প্রেয়সী নিদ্রিত আছেন। সংসার-দিরাগী 
মানুষটি তাদের উদ্দেশ করে জিজ্ঞাসা করছেন; তার! কি স্নায়ার 
ছঙ্গনা ; দেবত৷ উত্তর দিয়েছেন, তা নয়, তাদের মধ্যেই তিনি বগ্তমান 
থেকে তাকে সংসারে আকৃষ্ট করেছেন । কবিতার প্রাসঙ্গিক অংশটি এই £ 


৮৪ 


স্থ্িময় শিশুটিকে জাকড়িয়া বুকে 
প্রেয়সী শ্যার প্রান্তে ঘুমাইছে স্ুুখে। 
কহিল, “কে তোরা ওরে মায়ার ছলন! ? 
দেবতা কহিল, “আমি ।--কেহ শুনিল ন1।২৪ 
ংসারকে যে মায়াজ্ঞান করেছে তার কাছে যে এমন উত্তর 
গ্রহণযোগ্য হবে না, তা বোঝাই যায়। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের প্রতি মমতার 
আকর্ষণ একটা বড় আকর্ষণ। তাও সোচ্চার হলে কিন্ত ফল হলে 
না। শিশু স্বপ্নে কেঁপে উঠে পিতার স্নেহ আকর্ষণ করল, কিন্তু তাকে 
ধরে রাখতে পারল না । তখন দেবতা আর কি করেন ? খেদোক্তি কর! 
ছাড়। আর কিছু করবার তার উপায় রইল না ঃ 
স্বপনে কাদিল শিশু জননীরে টানি--" 
দেবতা কহিলা, “ফির | শুনিল না বাণী। 
দেবত৷ নিঃশ্বাস ছাড়ি কহিলেন “হায়, 
আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল। কোথায় £ 
কিন্তু সব থেকে প্রবল প্রতিবাদ পাই “সোনার তরী'র অন্তভূর্তি 
একটি কবিতায় । তার নাম “মায়াবাদ? ! তা হতেই বোঝা যায় 
মায়াবাদেব বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ লিপিবদ্ধ করাই এই কবিতার 
উদ্দেগ্য । প্রতিঝ।দ উচ্চারিত হয়েছে যুক্তি দিয়ে নয় আক্ষেপ দিয়ে। 
রূপ-রস-গঞ্ধ স্পর্শ শব্দে বিচিত্রিত হাসি-কান্না, জন্ম-মরণের তরঙ্গে 
আন্দোলিত, গ্রীতি-ভালবাসায় উদ্বেলিত এই পাথধিৰ জীবন এমন 
প্রত্যক্ষ, এমন নিশ্চয় প্রতীতির বিষয় যে তাকে কি করে মায়াবাদী 
দার্শনিক “ছেলেখেল।' ব৷ “প্রবঞ্চনা" মনে করতে পারেন, তা৷ দেখে তিনি 
স্তম্ভিত হয়েছেন। তাই এই আঙ্ষেপ। 
তাকে প্রবঞ্চন! প্রমাণ করতে যে সুশ্ম যুক্তিজাল বিস্তার করা 
হয়েছে তাতে তিনি আঘাত পেয়েছেন। আঘাত পাওয়ার কারণ এই । 
এদের ধারণা, বিশ্ব যেন মানুষের বুদ্ধিকে বিভ্রান্ত করবার জন্তই অতি 
২৪. চৈতালি, বৈরাগা 


৯১ 


কৌশলে রচিত হয়েছে । কিন্তু তা যে প্রপঞ্চ বা মায় ত। এদের সুক্ষ 
বুদ্ধির কাছে ধর! পড়ে গেছে । ঈশ্বর প্রবঞ্চনা করতে পারেন, এমন 
কথ! তার! ভাবতে পারেন, এই দেখেই তিনি মর্মাহত হয়েছেন । 
তাই ক্ষোভ করে কবি বলেছেন ; 
হারে নিরানন্দ দেশ পরি জীর্ণ জরা, 
বহি বিজ্ঞতার বোঝা, ভাবিতেছ মনে-- 
ঈশ্বরের প্রবঞ্চন! পড়িয়াছে ধর! 
সচতুর সুক্ষমদুষ্টি তোমার নয়নে ! 
অন্ত কারণ হল এই যে মায়াবাদী দার্শনিক বিশ্ব জুড়ে যে স্যষ্টির 
অনবচ্ছিন্ন ধার! প্রবাহিত, যাকে যুগ যুগ ধরে সকল জীব একান্ত সত্য 
বলে মেনে নিয়েছে, তাকে মায়া বা স্বপ্নের মতো অলীক বস্তু বলে 
কল্পনা করেছেন। একটি প্রচ্ছন্ন প্রশ্ন এই খোদোক্তির মধো রয়ে 
গিয়েছে এই যে তারই একমাত্র প্রজ্ঞার অধিকারী, আর ধার। বিশ্বকে 
সত্য বলে স্বীকার করে নেন তার কি বুদ্ধিশক্তি হতে একেবাবেই 
বঞ্চিত? প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই : 
যুগযুগাত্তর ধরে পণ্ড পক্ষী প্রাণী 
অচল নির্ভয়ে হেথা নিতেছে নিশ্বাস 
বিধাতার জগতেরে মাতৃক্রোড় মানি ; 
তুমি বৃদ্ধ কিছুরেই কর না বিশ্বাস! 
লক্ষ কোটি জীব লয়ে এ বিশ্বের মেল। ; 
তুমি জানিতেছ মনে সব ছেলে খেলা । 
এই তো! গেল মায়াবাদের প্রতিবাদ । প্রশ্ন ওঠে তা কেন উচ্চারিত 
হলে।। তার উত্তর হলে। রবীন্দ্রনাথের নিজন্ব তে দার্শনিক চিন্তা, 
ত৷ বিশ্বকে প্রপঞ্চ বলে প্রত্যাখ্য/ন করে নি; তাকে তিনি এক মানন্বা- 
অভিসারী বিশ্বশক্তির স্বাভাবিক প্রকাশ বলেই গ্রহণ করেছেন। তার 
এই প্রত্যয় তাকে মায়াবাদকে প্রত্যাখান করতে উদ্োগী করেছে। 
এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় রবীন্দ্রনাথের কাব্যে ও দার্শনিক আলোচনায় 


৬৭ 


মিলবে।" আমাদের উপরের প্রতিপান্ঠের সমর্থনে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক 
মন্তব্য এখানে স্থাপন করা যেতে পারে। 
চুঙ্কে তার ধারপাঁটি স্ুদ্দরভাবে 'ম্মরণ-এর অস্তুভূক্কি একটি 
চতুর্দশপদী কবিতায় পাওয়। যায়। যে শক্তি বিশ্বকে স্থ্টি করেছেন, 
তিনি আনন্দ অভিলাষী হয়ে, বিশ্বের উপর দ্বৈতভাব আরোপ করে, 
বিশ্বরূপে অভিব্যক্ত হয়েছেন! এই দ্বৈতবোধের ভিত্তিতেই ভোক্তা 
ও ভোগের মধ্যে যে সংঘাত স্থগ্রি হয়, তা হতেই বিশ্ব বর্ণ, গন্ধ, গীতে 
বিচিত্র হয়ে ওঠে, প্রণয়ী যুগলের মধ্যে গ্রীতি প্রবাহিত হয়, ধরণীর বক্ষে 
লতায়, ফুলে, নদীর লহরীতে (সীন্দর্ষ ফুটে ওঠে । এখানে রবীন্দ্রনাথের 
চিন্তা উপনিষদের মূল চিন্তাধারার এত কাছে এসে গেছে যে মনে হয় 
যেন উপনিষদের বাণীই তার ভাষায় নূতন রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ 
করেছে। কবিতাটির কিছু অংশ এই প্রসঙ্গে স্থাপন কর। যেতে পারে : 
যে ভাবে পরম-এক আনন্দে উৎস্বক 
আপনারে ছুই করি লভিষ্ছেন সুখ, 
ছুয়ের মিলনঘাতে বিচিত্র বেদনা 
নিত্য বর্ণ গন্ধ গীত করিছে রচনা, 
হে রমণী, ক্ষণকাল আসি মোর পাশে 
চিত্ত ভরি দিলে সেই রহস্ত আভীসে ।২৫ 
বিশ্বের মধোই যে বিশ্বসত্তার প্রকাশ এবং বিশ্বকে ব! সংসারকে 
ত্যাগ কবে মুক্তিলাভ হয় না, এ প্রতীতি ভার তরুণ বয়সেই গড়ে 
উঠেছিল। তার প্রথম বয়সে রচিত “প্রকৃতির পরিশোধ নামক 
নাটকের ভঙ্গিতে রচিত কবিতায় প্রথম তা লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই 
প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন £ 
“আমি বালক বয়সে প্রকৃতির পরিশোধ লিখিয়াছিলাম--তখন 
আমি নিজে তালে! করিয়া বুঝিয়াছিলাম কিনা জানি না- কিন্ত 
তাহাতে এই কথ! ছিল যে, বিশ্বকে গ্রহণ করিয়া, এই সংসারকে গ্রহণ 


খ্$, স্মরণ, ৬ 


৮ 


করিয়া, এই প্রত্যক্ষকে শ্রদ্ধা! করিয়া আমর! যথার্থভাবে অনস্তকে 
উপলব্ধি করিতে পারি ॥২৬ 
এই দৃষ্টিভঙ্গির পুনরুল্লেখ তার যৌবনে রচিত “কড়ি ও কোমল'-এর 
অন্তভূক্ত কবিতায়ও যে পাই তার কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। 
পরিণত বয়সে যে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছিল তা তার 
'নৈবেছ্টের অন্তভূক্তি কবিতাগুলির মধ্যেও পাওয়া যায়। এই 
দৃষ্টিভঙ্জিকে অবলম্বন করেই তিনি লিখেছিলেন : 
বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয়। 
অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় 
লভিব মুক্তির স্বাদ। এই বস্ুধার 
মৃত্তিকার পাত্রখানি ভরি বার বার 
তোমার অমৃত ঢালি দিব 'মবিরত 
নানা-বর্ণ-গন্ধময় ।২+ 
সংসারকে ভোগ করবার জন্ত তিনি বৈরাগ্যের প্রতি বিমুখ হন নি; 
এই সংসারেই ঈশ্বরের সহিত প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভ করবেন, এই ধারণা 
ছিল বলেই তিনি সম্ন্যাসকে প্রত্যাখ্যান করেছেন । ছেতভাব মণ্ডিত 
বিশ্বে বু ও বিচিত্ররূপের প্রকাশের মধ্যেই তার অপ্রত্যক্ষ প্রকাশ । 
স্থতরাং সেই অরূপকে এই বিশ্বরূপের মধ্যেই পাওয়া যাবে এই ছিল 
তার ধারণ।। এ বিষয় তার নিজের প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই £ 
পৃথিবীর প্রেমের মধ্য দিয়াই সেই ভূমানন্দের পরিচয় পাওয় যায়, 
জগতের এই রূপের মধ্যেই সেই অরূপকে সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করা-_ 
ইস্থাকেই তে৷ আমি যুক্তির সাধনা বলি ।'২৮ 
আমর! ইতিপূর্বে উপনিষদের দ্বৈত আলোচনা করে এই 
সিদ্ধান্তে এসেছি যে উপনিষদের মূল ভাবধার! দ্বেতভাব মণ্ডিত বহুরূপে 
প্রকাশ বিশ্বকে স্বপ্ন বা মায় বা ছায়। বলে প্রত্যাখ্যান করে নি; 
বরং তাকে বিশ্বসত্তার প্রকাশ বলেই গ্রহণ করেছে। তাই বিশ্বকে 


২৬. আত্মপরিচয়। ১ ২৭, নৈবেদা, ৩০ ২৮. আত্মপরিচয়, ৯ 


৮৪ 


সেখানে “আনন্দরূপমমৃতং যদ্বিভাতি'২৯ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। 
আমর! দেখেছি এই চিন্তাটি রবীন্দ্রনাথ সর্বাস্তঃকরণে গ্রহণ করেছেন 
এবং সেই কারণেই তিনি মায়াবাদের বিরুদ্ধে নানাভাবে প্রতিবাদ 
জ্ঞাপন করেছেন। 


চার 
বিশ্বরচলায় মানব মনের ভ্যামকা 


এতক্ষণ আমরা আলোচনা করেছি মায়াবাদ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের ধারণ! 
কিছিল। আমরা দেখেছি তার বিশ্বাসের সঙ্গে এবং মতিগতির সঙ্গে 
তা সামঞ্জস্য রক্ষা করত না এবং সেই কারণে তিনি মায়াবাদকে 
প্রত্যাখান করে এ বিষয় শ্রীচৈতন্যেব অনুগামী হয়েছিলেন । আমরা 
অতিরিক্তভাবে এই সিদ্ধান্ত করেছি যে প্রাচীন উপনিষদগুলির মূল 
ভাবধারার সঙ্গে মায়াবাদ সঙ্গতি রক্ষা করে ন।; তার। বলে বিশ্বসত! 
রস-আম্বাদনের জঙন্ঠ নিজেব উপর দ্বৈতভাব আরোপ করে হুদার 
বিখগ্ডিত বিশ্বরূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। এখন আমর! দেখব 
রবীন্দ্রনাথ এই তন্বটি নিজের স্বাধীন চিন্তা ও উপলব্ধিব পথে সম্পুর্ণ- 
ভাবে গ্রহণ করেছেন। 

রবীন্দ্রনাথের এই চিন্তায় ছুটি অবস্থা পাই। প্রথম অবস্থায় 
ছ্ৈতভাবহীন একত্ব একান্তই নীরস এবং অর্থহীন বলে তার মনে 
হয়েছে । সেই জন্যই তার আরও মনে হয়েছে সেই শু, নীরস 
একত্বকে খণ্ডন করে তার ওপর বিশ্বশক্তি দৈতভাব আরোপ করলেন 
রসের উপলব্ষিব জন্ত । একক অবস্থায় ষে প্রকাশ তা বাণীহীন এবং 
একাস্তই নীরব। তার জন্যই চেতনায় উদ্দীপিত মন এল এবং ছুয়ের 
জানাজানির সম্বদ্ধের ভিতর দিয়ে বিশ্বে রসের প্রকাশ প্রবাহিত হলো । 
এখানে রবীন্দ্রনাথের চিন্ত। একাস্তভাবে উপনিষদের চিন্তার অনুরূপ । 

দ্বিতীয় অবস্থায় দেখি রবীন্দ্রনাথ আর একটি নূতন কথা৷ বলেছেন 

২৯. মৃস্ডক ।২২।৭ 


স্‌ 


যার উল্লেখ উপনিষদের বচনে পাই না।' তিনি লক্ষ্য করেছেন 


, বিশ্বজোড়। যে রসের ধার। প্রবাহিত, যা রূপ, রস, শব, স্পর্শ, গন্ধে 


বিচিত্র হয়ে আত্মপ্রকাশ করে ত। অপ্রকট থেকে যেত যদি না মানুষের 
মন সৃষ্টি হতো। তার চিন্তাটি পরিস্ফুট করবার জন্য তিনি ছুটি উপমা 
প্রয়োগ করেছেন। প্রথমত বলেছেন অভিনয়ের সঙ্গে শ্রোতার যে 
সম্পর্ক, বিশ্বের প্রকাশের সঙ্গে মানুষের সেই স্্পক । রঙগমণ্ে 
অভিনয় চলেছে অথচ শ্রোতা না থাকলে তা যেমন অর্থহীন হতে।, 
তেমন মানুষের মন ন থাকলে বিশ্বের বিচিত্র প্রকাশ অর্থহীন হয়ে 
পড়ত। অম্ুরূপভাবে বিশ্বের প্রকাশের সহিত মানুষের মনের যে 
সম্পর্ক তার তুলনা! করেছেন পটের সঙ্গে শিল্পীর জাক৷ চিত্রের যে 
সম্পর্ক তার সহিত । চিত্র তো শৃন্ে আকা যায় না, তার জন্য পট চাই। 
তেমন বিশ্বের রূপ প্রকট হয় না যদি না তাকে গ্রহণ করবার উপযুক্ত 
মন থাকত । মুতরাং বিশ্বের প্রকাশের জন্য মানুষের মনের একাস্তই 
প্রয়োজন । 

ছৈতভাবে প্রকট বিশ্বের রচনায় এইভাবে মানুষের মনের একটি 
মূল ভূমিকা এসে পড়ে । এ বিষয়ে সচেতন হয়ে তিনি মানুষ হিসাবে 
বিশেষ গববোধ করেছিলেন এবং মানুষের হয়ে অহঙ্কারও প্রকাশ 
করেছিলেন । তিনি হয়ত সেই কারণে চেতনবাদীৎ* দার্শনিকের মতো 
এতখানি এগিয়ে যেতে প্রস্থত ছিলেন না যে সেই কারণে দাবী 
করবেন যে মানুষের মনই বিশ্বকে স্যপ্টি করে। তিনি বস্তুর বাস্তবতা 
স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন বলেই মনে হয়। অর্থাং তিনি মন- 
নিরপেক্ষভাবে বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করতে প্রস্তত ছিলেন; তবে তার 
ধারণ! মানুষের মন ন। থাকলে বন্ত অপ্রকট থেকে যেত। মনের 
এই বিশেষ ভূমিকার জন্যই তার মাছুষের হয়ে হঙ্কার। মানুষের 
মন ন1 থাকলে বিশ্বে যে শিল্প রচিত হয়েছে তা অর্থহ্থীন হয়ে পড়ত, 
দেবতার কাব্যের রসগ্রহণ করতে কেউ থাকত না ॥। এই জগ্তই তার 


৩9, 10581350. 


৪ 


গববোধ। এই অহঙ্কারবোধের প্রকাশ তার একাধিক কবিতায় বেশ 
দৃগ্ততঙ্গিতে পরিশ্ষুট। উপনিষদ্দে এ বিষয় কোনও উল্লেখ নাই। 
এ তার একান্তই নিজন্ব চিন্তা । 

“ছুই স্তরে দ্বৈতভাব সম্পর্কে তার যে চিন্তার কথা উপরে উল্লেখ 
করা হয়েছে তার সমর্থনে এবার আমরা তার রচন। হতে প্রাসজিক 
মন্তব্য উদ্ধৃত করে স্থাপন করবার প্রস্তাব করি। প্রথমে আমরা 
দ্বৈতভাব আরোপের কথ দিয়ে-শুরু করতে পারি। 

' “মহুয়ার একটি কবিত। আরম্ভ হয়েছে একটি বচন দিয়ে যাকে 
উদ্ধৃত কবে আমাদের এই আলোচন। শুরু কর যেতে পারে £ 
একার ভিতরে একের দেখা ন। পাই, 
ছুজনার যোগে পবম একের ঠীই ,৩১ 

ছুটি পরস্পর বিরোধীভাব দিয়ে এখানে নিপুণভাবে অল্প কথায় 
গততত্ব প্রকাশ কর। হয়েছে । দ্বিতীয় বিহীন অসঙ্গ একার একত্বের 
মধ্যে সামগ্রিক একত্ উপলব্ধি হয় না। তা সম্ভব করতে প্রয়োজন 
তার ওপর দ্বৈততাবের আরোপের । তা প্রথমে ছুই হবে তবেই জ্ঞাতা- 
জয়ের সম্পর্কে তাদের ভেদ সত্বে্ড তাদের অখগুতা উপলব্ধি হবে। 

এই কথাই অন্যভাবে ধলা হয়েছে 'বীথিকা'র অস্তভূক্তি একটি 
কবিতায় । কেউ কাউ (শানাবে তবে তো বলবে । জানাবার লোক 
ন| থাকলে বলবার কথাও ওঠে না। কাজেই মান্চুষেব জানবার মন 
এল তবেই তাকে অবলম্বন করে বাণী এল ॥ সেই বাণীই তে। আমাদের 
বণাপাণি বাগ দেবী ॥ তাই কবি বলছেন £ 

অস্তিত্বের গহন তত্ব ছিল মৃক বাণীহীন-_ 
অবশেষে একদিন 
যুগান্তর প্রদোষ জাধাবে 
শুন্ত পাথারে 
মানবাত্বার প্রকাশ উঠিল ফুটি।৩২ 
৩১. মহল্লা, পারণয় ৩২. বাঁথিকা, সংযোজন, বাণ 


৮৭ 


মানুষের মনের চেতনারগী পপ্মই বাগদেবীর অধিষ্ঠান। তাই কৰি 
আরও বলছেন £ 
চিৎপয্পের আবরণ গেল টুটি। 
শতদলে দিল দেখা! 
অসীমের পানে মেলিয়ে নয়ন 
ধাড়ায়ে রয়েছে একা 
প্রথম পরম বাণী 
বীণ! হাতে বীণাপাণি। 


স্থতরাং আকাশভরা সূর্য তার! শুধু নয় বিশ্বভরা প্রাণও চাই। 
তঁবই বিশ্বনাট্যের পরিপূর্ণ এবং সার্থক রূপটি পরিক্ষুট হবে॥। কাজেই 
বিশাল বিশ্বের একপ্রান্তে এক ক্ষুদ্র গ্রহের আশ্রয়ে ক্ষণকাল স্থায়ী 
যে প্রাণের ধারা প্রবাহিত হয়েছে তার ভূমিক৷ নগণ্য নয়, ক্ষুদ্র নয়, 
মহৎ। এ কথা ঘোষণ| কর! হয়েছে 'প্রান্তিকে'র একটি ক্ষুদ্র কবিতায় । 
কবিতা হলেও ত1 যে ভাবটিকে ধারণ করে তাকে দিয়ে একটি দর্শন 
গড়ে তোল! যায় । 
আমাদের দার্শনিক কবি বলেছেন কোটি কোটি বৎসর ধরে লক্ষ 
লক্ষ তারা আবতিত হয়েছে” তাদের কাছে আমাদের পৃথিবী একটি 
মাটির বুদবুদের মতো। তাকে অবলম্বন করে প্রাণের আবির্ভাব ঘটল, 
তবেই তে! এই বিরাট বিশ্বের অসীমত৷ প্রকট হয়ে উঠল £ 
তারি মধ্যে এই প্রাণ 
অগুতম কালে 
কণাতম শিখা লয়ে 
অসীমের করে সে আরতি 1৬৩ 
সেই প্রাণের আবির্ভাব যদি না ঘটত, ত হলে তে। বিশ্বরূপ 
মহামন্দিরে শঙ্ঘধবনি উঠত না, আলোকের বাণী অশ্রুতই থেকে যেত £ 


৩৩. পরিশেষ, প্রাণ 
৯ 


সে না হলে বিরাটের নিখিল মন্দিরে 
উঠত ন। শহঙ্ঘধবনি, 

মিলত ন। যাত্রী কোনোজন, 

আলোকের সামমন্ত্র ভাষাহীন হয়ে 
রইত নীরব । 


এতক্ষণ দেখেছি রবীন্দ্রনাথ দ্বৈতভাবের প্রয়োজনীয়তার কথ 
বলেছেন ; মানুষের মন না এলে বিশ্বনাট্য অনাবিষ্কৃত রয়ে যেত সে 
কথ! বলেছেন; জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের ভিত্তিতে যে পদ্ প্রন্ষুটিত হলো 
তাতে আবির্ভাব হলো বাগ.দেবীর বাণী সে কথা বলেছেন । এরপর 
দেখি তার রচনার মধ্যে একটি নৃত্তন স্থুর সোচ্চার হয়ে উঠেছে। এখন 
তিনি মানুষের প্রতিনিধি হয়ে নিজের মনের ভূমিকার মূল্য উপলব্ধি 
করে গর্ববোধ করতে শুরু করেছেন । মানুষের মন তো তুচ্ছ জিনিস নয়, 
তার আবির্ভাব হলো বলেই তো মাকাশভপ। তারার বিস্ময় উৎপাদনের 
ক্ষমতা, ফুলের রঙের বাহারের মাধুর্য, এক কথায় সমগ্র স্থষ্টির 
হৃদয়-হরণ রূপ প্রকট হয়ে উঠল । এই অবস্থায় এই ধরনের ভাবন! 
বিশেষভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে। কয়েকটি প্রাসঙ্গিক কাব্যাংশ এই 
প্রসঙ্গে আমাদের মন্তব্যের সমর্থনে এখানে স্থাপন করা যেতে পারে । 

কোটি কোটি ্ুর্য-তারা হতে যে শতলক্ষ ধারায় আলো ঝরে 
পড়ছে, তা সার্থক হবে তখন, যখন তা কবির চেতনায় প্রতিফলিত 
হয়ে তাকে মুগ্ধ করবে। পুষ্পের বিচিত্র বর্ণ।ঢ্য রূপ অস্পষ্টই থেকে 
যাঁয় যদ্দি না তা কবির অনুভূতিতে ধরা পড়ে। এই প্রসঙ্গে নীচের 
কাব্যাংশটি লক্ষ্য করা যেতে পারে : 


এই যে আলো। সূর্ষে গ্রহে তারায় 
বারে পড়ে শতলক্ষ ধারায়, 

পুর্ণ হবে এ প্রাণ যখন ভরবে ॥ 
তোমার ফুলে যে রঙ ঘুমের মতো লাগল 
আমার মনে লেগে তবে সে যে জাগল গো 1৩৪ 


৩৪. গ্ীতাঁবতান, পূজা, ৭৩ 


" ৮৯ 
উপনিষদ--৬ 


এফই চিন্তা একটু ভিন্ন আকারে প্রকাশ নিয়েছে আর একটি 
কবিতায় । ওপরে বল। হয়েছে মানুষের মন আছে বলেই বিশ্বের 
বিচিত্ররূপে প্রকাশ সীর্ঘক হয়ে উঠেছে। এখানে বল। হয়েছে বিশ্ব 
দ্বৈতভাবমগ্ডিত হুয়ে বিখগ্ডিত হয়েছিল ; কিন্তু কবির মনের মধ্যে তার 
চেতনায় একামগ্ডিত হয়ে তার অথগ্ুরূপ ফিরে পেয়েছে । কাজেই 
বল। যায় বিশ্ব তার অখগুরূপ ফিরে পেয়েছে কবির চেতনার মধ্যে । 
প্রাসঙ্গিক কাব্যাংশটি এই ঃ 
এ চাঁদ এ তারা এ তমঃপুণ্ধ গাছগুলি 
এক হল” বিরাট হল, সম্পূর্ণ হল 
আমার চেতনায় ! 
বিশ্ব আমাকে পেয়েছে, 
আমার মধো পেয়েছে আপনাকে, 
অলস কবির এই সার্থকতা ।৩« 
এই চিন্তার পেছনে একটি দর্শন আছে। তা বলে, স্ষ্টি-পুব 
অবস্থায় যে দ্বৈতহীন একক সত্ত। ছিল ত। স্থষ্টির মধ্যে দিজের উপর 
দ্বৈতভাব মারোপ করে বহু হলো। তার পর মানুষের মনে তার 
উপলব্ধির ভিতর দিয়ে“খগুরূপের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়ে মুলসত্তা 
আবার অথগ্ুরূপ ফিরে পেল । এই জগ্তই মানুষের মনের সম্পকে 
কবির এই সার্থকতাবোধ। 
এই চিন্তার সঙ্জে যেন হেগেল-এর দর্শনের মূল তবটির তুলনা চলে । 
অবগ্ঠ মৌলিক পার্থকা আছে। হেগেপ-এর চিন্তার স্বরূপে অবস্থিত 
মূল সন্ত সকল সম্ভাব্য জ্|নের ধারক স্বরূপ। তাকেই, তিনি 
“এবসলিউট আইডিয়া”*৬ বলেছেন ! সেখানে ত। অমূর্ত । প্রকৃত্তির মধ্যে 
মূর্তরূপ ধারণ করে তা আবির্ভাব হলো বহু দ্বারা বিখণ্ডিত বিশ্বরূপে । 
আবার মানুষের মনের চিন্তায় তা অথগুজ্ঞানরূপে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হলে।। 


৩৫, পন্রপ্ট, চি. 
৩৬. /১5০1066 1065, 


€টি5 


একে তিনি “এবসলিউট স্পিরিট”৭ বলেছেন। যা ছিল স্বরূপে 
প্রতিষ্ঠিত একক সন্ত। ত। মানুষের মনের ভিতর দিয়ে আবার একক 
সত্তারূপে প্রতিভাত হলে।। তার ভাষায় যা! ছিল 1980106-1)- 
18911 তা 40931069-607-768817-4 পরিণত হলে|। 

এখন উভয় চিন্তাব মধ্যে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যেতে পারে । ঘৈতপূর্ব 
অবস্থার একত্ব খণ্ডিত হলে! দ্বৈতভাবমণ্ডিত বিশ্বে । আবার মান্ুষেব 
মনের চিন্তায় তার এক্যন্ুত্র আবিষ্কৃত হয়ে তার অখণ্ড রূপের উপলব্ধি 
এল । মোটামুটি উভয়েই এক কথা৷ বলতে চেয়েছেন ॥ তবে তাদেব 
মধ্যে পার্থক্য সুদূরপ্রসারী ॥ হেগেল-এর ধারণায় কি প্রাকৃস্থষ্টি একক 
সত্তা, কি প্রকৃতির মধ্যে প্রকট দ্বৈতভাব মণ্ডিত সন্ত! উভয়েই জ্ঞান যে 
প্রকৃতির সেই প্রকৃতির । অর্থাৎ তিনি বিশুদ্ধবূপে চেতনবাদী 1৩৮ 
রবীন্দ্রনাথ এ বিষয় কোনও সুস্পষ্ট মত প্রকাশ করেন নিধধ জড়বা 
চেতন কোনও পদার্থের প্রতি তার পক্ষপাত ছিল না। তার ধারণ। 
উভযেই বিশ্বস্ভাব প্রকাশ । এ বিষয় তাব চিন্তা উপনিষদের 
অনুবতী। 

এইবার আমর! একটি অনন্যসীধারণ কবিতা স্থাপন করব যার 
মধ্যে মানুষেব মনের ভূমিকার গতীর তাংপর্ষের ভিত্তিতে রবীন্দ্রনাথের 
মানুষের হযে গৌরববোধ চূড়ান্তভাবে সোচ্চার হয়ে উঠেছে । ত| হলো।: 
'্যামলী' কাব্যগ্রন্থের অন্তভূতি 'আমি' নামে পরিচিত কবিতাটি । 

তার অহঙ্কারের কারণ হলে। এই উপলব্ধি যে বিশ্বসত্ত। যে বিরাট 
শিল্প রচন1 কবেছেন তার পট হিসাবে তিনি ব্যবহার করেছেন মানুষের 
মনকে । পাল্লার সবুজখ ব। চুনির রাডিমা ব। আলোকের জ্যোতিরূপ 
অপ্রকট রয়ে যেত যদি না অহংবোধ বিশিষ্ট মানুষের চেতনায় তা 
প্রতিফলিত হতো৷। তাই তিনি বলছেন £ 


৩৭, /১0501066 920, 
৩৮, 10691550, 


৯১ 


আমারই চেতনার রঙে পার্না হল সবুজ 
চুনি উঠল রাঙা হয়ে। 
আমি চোখ মেললুম আকাশে, 
জলে উঠল আলে! 
পুবে পশ্চিমে । 
সুতরাং প্রমাণ হচ্ছে মানুষের মানসপটেই বিশ্বশিল্প প্রকট হয়ে 
উঠেছে, যেমন চিত্রকরের মনের কল্পনা পটের ওপর রূপ পায়। সুতরাং 
সকল মানুষের হয়ে তার অহঙ্কার দৃপ্ত ভাষায় এইভাবে ঘোধিত হয়েছে £ 
এ আমার অহঙ্কার, 
অহঙ্কার সমস্ত মানুষের হয়ে। 
মানুষের অহঙ্কার পটেই 
বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প। 
এই গধিত ঘোষণা বিখ্যাত জার্সান দার্শনিক শোৌপেনহাউআর-এর 
একটি অনুরূপ ভর্গিকে উচ্চারিত বাণীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 
তার বিখ্যাত দার্শনিক গ্রন্থটি আরস্তই হয়েছে সেই বাণীটি দিয়ে ; বিশ্ব 
তে! আমারই চিন্তা ।১ 
বিশ্বশিল্লীর শিল্পরচনায় মানুষের এই অপরিহার্য ভূমিকার তাৎপর্য 
একই কবিতায় সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন, মানুষ যে.দিন বিশ্ব হতে 
সরে যাবে সেঙ্জগিন বিধাতার কি অবস্থ। হবে, তা কল্পনা করে। মান্গুষের 
ইন্দ্রিয়, মানুষের মন--এদের সাহায্যেই তো বিশ্বের বর্ণ গন্ধ গীতে 
মধুময় রূপটি পরিস্ফুট হয়। সুতরাং মানুষ চলে গেলে তারাও চলে 
যাবে £ 
মানুষের যাবার দিনের চোখ 
বিশ্ব থেকে নিকিয়ে নেবে রঙ, 
মানুষের যাবার দিনে মন 
ছানিয়ে নেবে রস। 


৩৯. পুু)০ 10110 15 12) 1069) 106 10014 5 111 4845 10৩৪, 


৯২ 


শক্তির কম্পন চলবে আকাশে আকাশে, 
জ্বলবে না কোথাও আলো । 
বীণাহীন সভায় যন্ত্রীর আঙ,ল নাচবে, 
বাজবে ন স্বর । 
সুতরাং কবির ধারণ! মানুষ যদি চলে যায় বিধাতা কি নিজের গরজেই 
আবার বসবেন সাধনায় মানুষকে ফিরে পেতে ? তার প্রশ্নের ভিতর 
দিয়ে এই ধ্বনিটি ফুটে উঠেছে । এষেন উপনিষদেরই বাণীর প্রতিধ্বনি £ 
সোশুকাময়ত ॥ বছ স্যাং প্রজায়েয়েতি ॥ স তপোইতপ্যত ॥ ৪* 


8০৯ তো্তরীয় ॥ বরহ্ধানন্দবল্পশী |২1৬ 


৪৩ 


2০৭ চতুথ অধ্যায় ৭০ 


আনন্দবাদ 
এক 
প্রাথমিক কথা 


এই যে বিরাট আকাশে কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র এবং পৃথিবীর 
বক্ষ জুড়ে প্রাণের তরঙ্গিত প্রবাহ নিয়ে মহাবিশ্ব প্রকট হয়েছে, তার 
মধ্যে কি কোনও উদ্দেশ্য নিহিত আছে ? ত্রান্্রাণ্ড রাসেল-এর ধারণায় 
মহাবিশ্ব সম্বন্ধে এ প্রশ্ন আদৌ উত্থাপন করা সঙ্গত নয়। তার 
অভিমতের সমর্থনে তিনি ছুটি যুক্তি দেখিয়েছেন। প্রথমত, তার 
ধারণায় স্থ্টির অভ্যন্তরে যে নান! প্রক্রিয়। চলছে তার মধোই উদ্দেগ্ঠের 
অনুসন্ধান সীমাবদ্ধ রাখ! যুক্তিসঙ্গত। স্থ্টির বাহিরে অষ্টার সম্পর্কে 
তা প্রযোজ্য নয়। কারণ, তা হলেই প্রশ্ন উঠবে আর এক শক্তিমত্তর 
উশ্বর তকে বিশেষ উদ্দেখ্য নিয়ে স্থঘটি করছেন কিনা১! দ্বিতীয়ত, 
তিনি বলেন ঈশ্বর জম্বন্ধে এই ধননের উদ্দেশ্য চিন্ত। করা অধামিকের 
মতো আচরণ হয়ে দাড়ায়। 

স্পষ্টই বোঝা যায় রাসেল-এর এই আপাতত একেশ্বরাদের দষ্টি- 
ভঙ্গি দ্বারা প্রভাবান্বিত। তার পবিকল্পপার ঈশ্বর ব্যক্তিরপী, তিনি 
স্থপ্টি হতে ভিন্ন, তিনি একান্ত শ্রদ্ধার পাত্র ॥ কাজেই তার কারসন্বন্ধে 
কোনও উদ্দেশ ইঙ্গিত কর! ধামিকের আচরণ-বিরদ্ধ॥ এই প্লরনের 

৬১, 176 ০0002190018 01191010056 15 0115 20011081016 ৬018 1627 

11) 1006 60 16311 29 ও 1১01৩. 


[7900০ 91 ৬65০2 01501050109) 13০০৮ 1 008, 1% 
২, 1011085 


%8 


যেন একটি যুক্তি তার পেছনে নিহিত আছে। কিন্তু যে পরিকল্পনায় 
এঁনী শক্তিকে বিশ্বের মধ্যে ক্রিয়াশল বলে ধরে নেওয়া হয়, সেখানে 
ছটি যুক্তির কোনটিই প্রয়োগযোগ্য থাকে না॥ এখানে ভক্তি বা 
শ্রদ্ধাবোধ বাধ। হয়ে দাড়ায় না, কারণ জিজ্ঞাস মনোভাব এখানে 
প্রবলতর। স্থপ্টিকে রহস্তাবৃত ধরে নিয়ে, তার প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনও 
উদ্দেশ্ট ক্রিয়াশীল কিনা, ত৷ অনুসন্ধান করে দেখা জিজ্ঞাস্থ মনোভাবের 
স্বাভাবিক প্রকৃতি বলে পরিগণিত হওয়া উচিত। অবশ্য এখানে 
কল্পনাভিত্তিক অনুমান করতে হয়; ক্িস্তু উদ্দেশ্য থাক। যে অসস্তব, 
এমন কথাও তে! জোর করে বল যায় ন।। 

বরং আমরা দেখি সাম্প্রতিককালে নহাবিশ্বের প্রক্রিয়ার মধ্যে 
তুজন বিশিষ্ট দার্শানক স্থষ্টির অন্তনিহিত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আলোচনা 
করেছেন এবং নিজন্ব ধারণ! অনুসারে একটি উদ্দেশ্যের নির্দেশও 
করেছেন। এর হলেন শ্ত্রীমরবিন্দ এবং ডু নুয়িৎ॥। এদের দুজনেরই 
ধারণা, মহাবিশ্বেব মধ্য একটি উদ্দবেশ্ট ক্রিয়াশীল থেকে স্ৃ্টিপ্রবাহকে 
তার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । এই শ্রেণী দার্শনিক মতকে আমরা 
লক্ষাবাদ বলতে পাবি। 

শ্রীমরবিন্দের বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থে কি ভাবে বিশ্বশক্তি তার ইচ্ছা- 
পুবণের বাবস্থা কবেছেন তার ব্যাথা। দেওয়া আছে। আমাদের 
বর্তমান আলোচন। প্রসঙ্গে তাৰ এই দার্শনিক তত্বের সবিস্তার 
আলোঢন।র কোনও প্রয়োজন দোখ না। সংক্ষেপে কি উদ্দেশ্য তার 
মতে ক্রিয়া করছে তান্ন একটি পরিচয় দিলেই বর্তমান প্রসঙ্গে চলবে। 

শ্রীঅরবিন্দের দর্শনের ছুটি মুল তত্ব আছে । তাদের একটি হলে। 
মূলসত্তার স্ববপে অবস্থিত শবস্কা । ৩ স্থান-কাল-অতীত এবং স্থাণু; 

৩. 1[,০০০00৮65 104 ০৩৬-এর 130290% [099%%) এবং শ্রীঅরাঁবন্দের 

7৬116 [01৮10 এই প্রসক্ষে দুষ্টব্য । 
9. ৬/০ 13956) 05151010, (০ 00100910605 9015 06 [0016 ৮১157 


(6006) ৪, 98০6 01 732176 810 ৪. 90% 01135000810. 
140 0851065 1300৮ হু, 09, ৮], 


৯৫ 


তাকে তিনি সচ্চিদানন্দরূপ বলেছেন। এই অবস্থায় তিনি সং, অর্থা 
আছেন; চিংশক্তি বিশিষ্ট, অর্থাৎ জ্ঞানম্বরূপ; এবং আনন্দশ্বরূপ | 
স্থতরাং তিনি আপনাতেই আপনি সম্পূর্ণ । 

দ্বিতীয় তত্বটি হলে। এই মূল স্থাণু সন্তার বিকাশখর্মী রূপ। একে 
তিনি বিকাশপরায়ণ সত্তা বলেছেন ॥। সেই অবস্থায় ত! স্থান ও কালে 
বিধৃত এবং গতিশীল সত্ত। ; তা একটি উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য করে বিকশিত 
হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, যিনি ছিলেন স্থাণু, তিনিই তার জ্ঞান ও 
বল শক্তির যোগে এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিশ্বে রূপান্তরিত হন । বিশ্বের এই 
বিকাশেরও ছুটি স্তর আছে। একটিতে পাই জড় বিশ্ব; তাকে অবলম্বন 
করে প্রাণের বিকাশ এবং পরে মানবমনের বিকাশ। জড় প্রকৃতির 
ক্রিয়ার মধ্যে স্বরূপে অবস্থিত সত্তর অবরোহণপর্বকে পাই । তার পরেই 
একই বিকাশের পথে আরোহণ পর্ব শুরু হয় । প্রথম স্তরে যে আরোহণ 
ঘটে তা সম্পাদিত হয় প্রাণশক্তি ও মানবমনের বিকাশের মধা দিয়ে । 

কিন্তু সেখানেই বিকাশের পথে আবোহণ পর্বের সমাপ্তি ঘটে না। 
তার দ্বিতীয় অবস্থায় | আরও এগিয়ে চলে । মানুষের মন যুক্তির 
পথে বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণের« প্রয়োগের মধ্য দিয়ে পুর্ণতর জ্ঞানের 
সহিত পরিচিত হয়, যেমন দর্শনে ও বিজ্ঞানে । কিন্তু তার ধারণায় সে 
জ্ঞানও অসম্পুর্ণ। পরিপূর্ণ অখণ্ড জ্ঞানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে 
ভিন্ন পথে। সে পথ যুক্তির নয়, স্বঙঃলন্ধ জ্ঞানের" । এই পথে 
উন্নততর জ্ঞানশক্তির বিকাশের ফলে ত। এমন এক অবস্থায় উন্নীত হয়, 
যেখানে মূল সত। নেমে এসে তার সহিত সংযোগ স্থাপন করেন। 
তখন মানুষের মন পরিপূর্ণ অথগ্ুজ্ঞানের অধিকারী হয় এবং ফলে 
মানবচরিত্রের রূপান্তর ঘটে৮। মানুষ তখন স্বতঃজ্ঞানের অধিকারী 
সঝায়* পরিণত হয় । তখন ব্যক্তিম।মুষের ব্যক্তিত্ববোধ লোপ পাবে 


&,  /১081955 200 59200192915 ৬, 117668101 11905/16029 
৭, 1001000 ৮৮171590900170901020 ৯5 0095600৮218 


৯৩ 


এবং তা মূলসত্ত। সচ্চিদানন্দের আবির্ভাবের কেন্দ্ররপেই সে কাজ 
করবে। এই হলে। আরোহণের চূড়ান্ত অবস্থা এবং বিকাশের পরিণতি । 

এখন মুল সত্তার এই অবরোহণ এবং জটিল পথে পরে আরোহণের 
প্রয়োজন কি? শ্রীঅরবিন্দ বলেন তার মানুষের মতো কোনও 
ধাবহারিক প্রয়োজন থাকতে পারে ন। এবং প্রকৃতপক্ষে নেই। এ যেন 
একটা অহৈতৃক খেল।, খেলার আকর্ষণেই খেলা । এই খেলায়, মূল 
স্বরূপে অবস্থিত সত্ত। নিজেই খেলোয়াড়, নিজেই খেলার মাঠ এবং 
নিজেই খেলা১*। 

এই হলো! অতি সংক্ষেপে শ্রীঅরবিন্দের দর্শন ॥ তিনি জড়কে 
স্বীকার করেন? কিন্তু জড়বাদকে গ্রহণ করেন নি। তিনি এক" 
বিকাশধর্মী বিশ্বে বিশ্বাসী এবং বিশ্বের মধ্যে একটি এঁশী শক্তির ক্রিয়াও 
লক্ষ্য করেছেন। সে ইচ্ছাশক্তি একটি সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য দ্বারা 
নিয়ন্ত্রিত। তা বলে, য| ছিল সং এবং স্থাণু, ত। নিজেকে জড়ে 
পরিবতিত করে গতিশীল বিশ্বে পরিণত হয় এবং প্রাণের বিকাশের 
মধ্য দিয়ে মানবমনের বিকাশ ঘটায়; পরে সেই মনের চূড়ান্ত 
বিকাশের মধ্য দিয়ে স্বরূপে ফিরে আসে। সুতরাং তিনি বিশ্বাস 
করেন যে বিশ্ব একটি উাদ্দ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত । 

আমর! দেখি দার্শনিক ডু নুয়িও একটি তুলনীয় সিদ্ধান্তে উপনীত 
হয়েছেন। প্রথমে তার প্রতিপাগ্ভের বিষয় আলোচনা করা যাক। 
তিনি তার দার্শনিক তত্বের নাম দিয়েছেন “টলিফাইনালিজম্+১১। 
এর বাংল! অনুবাদ হতে পারে দৃরপ্রসারী লক্ষ্যবাদ। নামকরণ 
হতেই বোঝা যায় তার প্রতিপাগ্ধ হলো! এক ম্দুরপ্রসারী উদ্দেশ্য 
ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে ক্রিয়া করছে। 

১০, 09:6300006 210 1600690/06 [715616 007 0156 91766111159 ০1 

9611-016550019১ 06 0080 96117761016561)090101---170275518 59 


17195, 131005016 006 [7159615 150009611 005 01498100870. 


[106 101506, 8০0৮ [5 0091৮ 20], 
১১. 51620581850), 


৯৭ 


ডূস্থয়ি-এর বিশ্বাস ক্রমবিকাশ ব্যাপারটি সমগ্র পৃথিবীর বক্ষ জুড়ে 
ক্রিয়াশীল । সুতরাং তাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। সেই ভাবে 
দেখলে বোঝা যাবে যে এর মধো একটি উদ্দেশ ক্রিয়া করছে এবং তা 
একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে১২। অবশ্য তার মধ্যে 
পরীক্ষ!-নিরীক্ষা আছে : সব জায়গায়ই সব পরীক্ষা সফল হয় নি। 
তবে সমগ্রভাবে দেখলে তার গতি অগ্রগতির পথে ॥ তার ধারণায়, 
একটি চূড়ান্ত উদ্দেশ্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে ধরে না নিলে, ক্রম- 
বিকাশের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। অপরপক্ষে, কেবল 
মাত্র জড়শক্তির সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে গেলে আমাদের হতাশ হতে 
হয়; কারণ জড়বস্তর প্রকৃতি ও আচরণরীতির সঙ্গে তার প্রকৃতিগত 
পার্থক্য আছে। অবশ্য এ কথা স্বীকার্ধ যে পরিবেশের সহিত 
সামগ্তস্তা বিধান১৬, প্রাকৃতিক নির্বাচন১৪ এবং জীবকোষের 
পরিবর্তন১*__এদেরও ভূমিকা আছে। তবে তাদের ভূমিকা গৌণ : 
কেবল এই প্রক্রিয়াগুলির সাহায্যে ক্রমবিকাশের সন্তেরষজনক ব্যাখ্যা 
হয় না। এগুলি কার্ধসাধনের উপায় মাত্র১৮। তার। প্রকৃত 
মিয়ন্ত্রকশক্তি নয়।' একটি বাড়ি নির্াণ করতে কণিকের | রাজ- 
মিক্্রীর যে ভূমিকা. এদের ভূমিক। তার অনুরূপ । কর্িকের সাহাযো 
বাড়ি গাথনার মালমসল!1 বানহার করা যায় এবং প্রয়োজন হলে মিস্ত্রী 
তার সাহায্যে ইট কাটতে পারে ; কিন্ত কেউ কি ত। হলে বলবেশ যে 
কণ্নিক ন৷ মিস্ত্রী বাড়ি গাথে? প্রকুতপক্ষে যে স্থপতি নকশা। রচন৷ 
করেন, তিনিই এই নির্মাণ-কাধে মুখ্য ভূমিক। গ্রহণ করেন । ক্রম- 
বিকাশের ক্ষেত্রেও একটি লক্ষ অনুরূপভাবে মুখ্য নিয়ন্ত্রক শক্তি 
হিসাবে ক্রিয়াশল। 


৯২, ৬৪ 512265£ £১০ 17500613515 ০01৪. 1191165 * 01135 00 
98, ॥ 16150591185 411606100 2%0106101) ও5 2 11016, 

১৩, 4৯0808007১৪, ইত) 5515000 ১৯৫, 811680100 

১৬, 11601591151 


৪৮ 


এই লক্ষ্য বা উদ্দেগ্ত হলে! এমন একটি জীবরূপ বিকশিত করা, 
যার চূড়ান্ত বিকাশের পূর্ণ স্বাধীনত! মিলবে । এই লক্ষ্যের পথ নানা 
বিশ্ব ও প্রতিকূল পরিবেশ হতে জীবকে পরিত্রাণের চেষ্টার দ্বারা 
সুচিত। প্রথম অবস্থায় অচলভাবে স্থিতি হতে দেহের স্থান হতে 
স্থানাস্তরে পরিচালনার শক্তি অর্জন তার প্রথম পদক্ষেপ । পরিবেশের 
উপর নির্ভরশীলত৷ হতে মুক্তি তার দ্বিতীয় পদক্ষেপ; হাত ছুটির দেহ 
সঞ্চালনের কাজ হতে মুক্তি তার তৃতীয় পদক্ষেপ; অল্পিত বিদ্া ও 
অভিজ্ঞতা পুরুষানুক্রমে কথ! ও গ্রন্থের মাধ্যমে সংক্রামিত করার একটি 
সফল উপায় উল্তাবন তার চতুর্থ পদক্ষেপ, এবং নুীতিবোধের 
পরিস্ফুরণ তার শেষ পদক্ষেপ১৭। 

সুতরাং দেখ৷ যায়, ডুনুয়ি ক্রমবিকাশের মধ্যে একটি উন্নততর 
জীবন উদ্ভাবন করবার উদ্দেশ্য লঙ্গ্য করেছেন । তিনি বলেন, ক্রম- 
বিকাশের চূড়ান্ত রূপ হলো মানুষ, এমন মানুষ যাঁর মধ্যে উচ্চমানের 
নৈতিকবোধ পরিস্ফুট হয়ে উঠবে । তার ধারণায়, মানুষের প্রখরতর 
বুদ্ধি, ছুপায়ে চলবার শান্ত এবং ছুটি যুক্ত হাত তাঁকে শুধু প্রকৃতির 
দাসন্ব হতে মুক্তি দেয় নি, তার কাঁছে একটি সমৃদ্ধতর ও উচ্চতর 
মানসিক জাবনের সম্ভাবনার পথও উন্মুক্ত করে দিয়েছে । সেই পথেই 
তার বিবেক ও দায়িববোদের উৎপন্তি হয়েছে । সেই বিবেকবোধকে 
পরিপূর্ণকূপে বিকশি৩ করেই মানুষ তার লক্ষ্যে পৌছতে পারবে । 

রবীন্দ্রনাথ স্থষ্টির মধ্যে একটি উদ্দেশ্ট ক্রিয়া করছে বলে বিশ্বাস 
কবেন। সে বিষয় বিস্তারিত আলোচন। প্রাসঙ্গিকভাবে এসে 
পড়বে। সুতরাং এখানে তার উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন । 


দই 
উপাঁনঘদের আনন্দবাদ 
উপনিষদের খধিগণ ও সমগ্র স্থষ্টির মধ্যে একটি অন্তনিহিত উদ্দেস্টের 


১৭, [10210501000 (50095016800 


?৪১ 


ক্রিয়া লক্ষ্য করেছেন। ঠ্টাদের মতে এই উদ্দেখ্য হলো! আনন্দ 
আস্বাদন। তাদের এই প্রতিপান্টি পরিস্ফুট করতে তারা বিশ্বকে যে 
মহাসত্া নিয়ন্ত্রণ করছেন তার ছটি রূপ কল্পনা করেছেন-_-একটি স্থপ্রি- 
পূর্ব রূপ এবং অপরটি স্থষ্টি-রূুপ। প্রথমটিকে অমূর্ভ বলা হয়েছে এবং 
ঘ্বিতীয়টিকে মূর্ত বল। হয়েছে । 

এই প্রসঙ্গে বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি বচন এখানে সি করা 
যেতে পারে। তাতে বল। হয়েছে ব্রচ্গের ছুটি রূপ : মূর্ত এবং অমূর্ত, 
মত্ত্য এবং অস্ত, স্থির এবং গতিশীল, সন্তাবান ও অত্তাহীন।১৮ 
এখানে ছুটি রূপেরই বর্ণনা পাই। প্রাক্‌ স্থষ্টির রূপ অমূর্ত রূপ; 
সেখানে ব্রহ্ম স্থির, স্থানকালে বিধৃত নন ( সন্তাহীন ) এবং মৃত্যুর স্পর্শ 
রহিত। আর যেটি স্থপ্টির রূপ, সেখানে তিনি মূর্ত হয়ে ইন্জিয়গ্রাহ 
বিশ্বে পরিণত হয়েছেন ; সেখানে তার নিত্যপরিবর্তনশীল বিচিত্র রূপ; 
স্থান-কালে তা বিধৃত ( সন্তাবান )॥ অমূর্তরপকেই উপনিষদে অন্ত 
অদ্ৈতরপ বলা হয়েছে। এখানে তিনি বহুকে জড়িয়ে সমগ্ররূপে 
অখণ্ড নন, খণ্ুহীনভাবে বিশুদ্ধ এক । 

এই অমূর্তরপের প্রকৃতি কি রকম, তার একটি বর্ণনা কঠ 
উপনিষদের একটি বচনে" পাওয়। যায়। সেখানে বল। হয়েছে, সেই 
অবস্থায় ত্রন্ম শব্বগুণহীন, স্পর্শঞচণহীন, রসগ্চণহীন, অনাদি এবং 
অনস্ত১৯। অর্থাৎ সে অবস্থায় তিনি ইন্ড্িয়ছারা গ্রহণযোগ্য নন। 
দ্বৈতভাব না থাকলে তে৷ ভোক্-ভোগ্যের সম্পর্কে রূপ-রস-শব্-স্পর্শ- 
গন্ধের আন্বাদন থাকে না। এই অদ্বৈত অবস্থায় ব্রহ্ম একান্তই 
নিঃসঙ্গ । তাই ফাকে 'একমেব' এবং “অদ্ধিতীয়' অর্থাৎ দ্বৈতভাবহীন 
বলে বর্ণনা কর! হয়েছে। 

উপনিষদের ধারণায় এই নিঃসঙ্গ অবস্থাই যেন স্যন্টির প্রেরণ] । 

১৮। হে বাব ব্দ্ধণো রুপে মৃত চৈবামর্ত চ মর্তাং চা মৃতং চ শ্ছিতং চ 


যচ্চ চ্চ তচ্চ ॥ বৃহদারণ্যক ২৩১ « 
১৯1 অশবন্দঘস্পশ'মরপেমবায়ং তথারসং নিত্যমগন্ধবচ্চষৎ। কঠ ॥ ১1৩১৫ 


১০৩ 


অমূর্ত, অসঙ্গ, নিশ্চল, স্থাণুরূপ ভাল লাগে না বলেই ্রন্ধ বিশ্ব স্থষটি 
করে ভাতে রূপান্তরিত হলেন ॥ এই কথাটি একাধিক উপনিষদে 
বিভিন্ন ভঙ্গিতে বলা হয়েছে। প্রাসঙ্গিক কয়েকটি নির্বাচিত বাণী 
এখানে স্থাপন করা যেতে পারে। 

এতরেয় উপনিষদে বল। হয়েছেঃ পুরে একমাত্র আত্মাই 
ছিলেন। নত কিছুই ছিল না। তিনি ইচ্ছা করলেন, বিভিন্ন লোক 
স্ষ্টি করব।২০ বলা বাছলা, এখানে আত্ম অর্থে ব্রন্মাই স্ুচিত 
হয়েছেন; কারণ এখানে পাই স্থপ্টির পূর্বের অবস্থার কথ, তখনও 
মানুষের আত্মার আবির্ভাব হয় নি। 

ছান্দোগ্য উপনিষদে বল! হয়েছে, একমাত্র, দ্বিতীয়বিহীন একটি 
সন্ত স্থষ্টির পূর্বে ছিলেন।২১ তিনি তার পর ইচ্ছ। করলেন, আমি 
বন্ছ হব, জন্মগ্রহণ করব । সেই উদ্দেশ্যে তিনি তেজ সৃষ্টি, করলেন ।২২ 
সেই তেজই সেই মহাশক্কি য। প্রকট বিশ্বকে স্থষ্টি করল । 

একই কথ বৃহদারণ্যক উপনিষদে একটু স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে বল! 
হয়েছে। স্ষ্টি-পূরব অবস্থায় আত্ম ব। ব্রহ্মকে সঙ্গবিহীন পুরুষের 
সঙ্গে তুলন! করা হয়েছে । তার পর বল! হয়েছে সেই নিঃসঙ্গ অবস্থায় 
আনন্দ পেলেন না বলেই তিনি দ্বিতীয়কে ইচ্ছা করলেন ।২৩ 

তৈত্তিরীয় উপনিষদ একটি অিরিক্ত কথ। বলেছে। শুধু ইচ্ছা 
করলেই তো ইচ্ছাপৃবণ হয় না; তার জন্য সাধন। করতে হয়, তপস্যা 
করতে হয়। তৈন্ভিরীয় বলে, সেই একক, নিঃসঙ্গ দ্বিতীয় বিহীন স্থষ্টি- 
ূর্বত্ত! যখন কামনা করলেন তিনি জন্মগ্রহণ করে বনু হবেন, তখন 


২০, আত্মা বেদমেক এবাগ্র আসীন্নান্যৎ কিন 'মিষং 
সঈক্ষত লোকান নু সৃজা হীতি ॥ এতরেয় ॥ ২॥১ 
২১. সদেব সৌমোদমগ্ আসাদেকমেবাছ্িতীয়ম- ॥ ছাদ্দোগ্য ॥ ৬ ॥ ২॥ ১ 
২২. তদৈক্ষত বহ্‌ স্যাং প্রজায়েয়োতি তৎ তেজোহস্জত ॥ ছান্দোগ্য ॥ ৬ ॥ ২॥৩ 
২৩. আত্মৈবেদমগ্র আসীং পুর্ষাবধ £ সোহনবাক্ষ্য নানাদাত্বনোহপশ্যৎ ॥ 
বহদারণ্যক ॥ ১। ৪1৯ 
স বৈ নৈব রেমে'-'স ছিতীয়মৈচ্ছৎ ॥ বৃহদারণাক ॥ ১। ৪ ॥ ৩ 


৭৩১ 


তিনি তপস্তা করলেন । সেই তপস্যার বলেই এই সব কিছু স্ব 
করলেন এবং তাতে প্রবেশ করে এই বিচিত্র বিশ্বরূপে প্রকট 
হলেন ৪ । 

এখন প্রশ্ন ওঠে স্থপিপূর্ব একক অমূর্ত রূপ কেন নিজের ওপর 
দ্বৈতভাব আরোপ করে বনু দ্বারা খণ্ডিত এই বিচিত্র বিশ্বরূপে নিজেকে 
পরিবতিত করলেন। তার উত্তরে উপনিষদের খষি বলেন, ব্রন্মের তো 
কোনও ব্যবহারিক প্রয়োজন ছিল নাং তিনি আনন্দ আব্বাদনের 
জন্ত স্থষ্টি প্রবাহে রূপান্তরিত হলেন। এই কথাটি বোঝাতে উপনিষদে 
ব্রহ্ষকে আনন্দ বা রসখরূপ বলে বর্ণনা কর! হয়েছে। এখন রস তো। 
শৃম্তকে অবলম্বন করে ক্ফুরিত হয় না; তার জন্ চারটি পক্ষের 
প্রয়োজন । যেমন শিল্পের ক্ষেত্রে চাই শিল্পবন্ত ব! রূপকর্ণ, তার 
অন্তনিহিত রসকে গ্রহণ করতে শিল্পরসিক, তাদের সংযোগের ফলে যে 
রসামুভূতি সংঘটিত হয় তাই এবং শিল্পবস্ত স্থপ্টির জন্ত শিল্পী । শিল্পের 
ক্ষেত্রে এরা চারটি বিভিন্ন পক্ষ: কিন্তু বিশ্বশিল্প রচনার ক্ষেত্রে একই 
মহাঁশক্তি একাধারে এই চারটি পক্ষে রূপান্তরিত হলে।। ব্রক্ম একাধারে 
অই্টাবূপে বিশ্বশিল্পী, বিশ্বরূপে শিল্প, দ্রষ্টারূপে মানব মনে শিল্পরসিক 
এবং ভোগা-ভোক্তার সম্বন্ধ রূপে শিল্পানুভূতি : অতিরিক্ত'ভাবে সবই 
তিনি বলে সমগ্ররূপে তিনি আনন্দ ব৷ রস্দরূপ ॥ উপনিষদেব ধারণায়, 
এই রসের বা আনন্দের আকর্ষণই এই নিরবচ্ছিন্ন স্টিধারা প্রবাহিত 
হয়েছে। তাতে জন্ম আছে, মৃত্যু মাছে, তাদের জড়িয়ে রসান্ভূতি 
আছে এবং সেই কারণেই অথণ্ড দৃষ্টিতে বিশ্বরূপে প্রকট রূপ ঝ৷ ব্রন্ষের 
মুত্'রূপ তার রসরূপ বা আনন্দরপ। 

আমাদের এই প্রতিপাগ্ঠের সমর্থনে আমরা ছুটি বিভিন্ন উপমিষদ 
হতে ছুটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বাণী এখানে উদ্ধৃত করব। একটিতে 


২৪. সোইকাময়ত ॥ বহ্‌ স্যাং প্রজায়েয়োতি ॥ স তপোহতপ্যত ॥ স তপচ্ঞগ্তহা ॥ 
ইদং সর্বমস্জত ॥ যাঁদদং 'কিধ্চ ॥ স তৎ সূন্ট্যা॥ তদেবানপ্রাবিশৎ ॥ 


তৌত্িরীয় ॥২॥ ৬ 
১০২ 


বন্ধের বসরূপের উল্লেখ কর। হয়েছে এবং শরগ্ুটিতে তার আনন্দরূপেখ 
উল্লেখ কর! হয়েছে । পু 

প্রথম বচনটি পাই তৈত্তিরীয় উপনিষদে। সেখানে বল! হয়েছে £ 
তিনি রসন্বরূপ 1 তিনি রসলাভ করে আনন্দিত হন । কে-ই বা জীবন- 
ধারণ করত ব! প্রাণধারণ করত যদি না এই আকাশ আনন্দের আধার 
হতো । প্রকট বিশ্বের ভিতব দিয়ে তিনিই আনন্দ আম্বাদ করেন২৫ । 

এই বাণীটি গভীর তাৎপর্ষপূর্ণ। রস হলো তাই যা মনকে 
আনন্দসিক্ত করে। ভরতমু'ন এই অর্থে ই শিল্পকর্মকে রস বলেছেন । 
তাকে আখ্বাদ করেই শিল্পবসিক ত্রন্ষান্থাদের সমব্থানীয় আনন্দ লভ 
করেন। এ কথ! হলে। খিশ্বনাথ কবিরাজের । উপনিষদের খধিব 
পরিকল্পনায় বিশ্ব যুতরিসম্বরূপ এবং বিশ্বশিষ্লের প্রত্যেকটি উপাদানই 
্রন্ম হওয়ায় ব্রন্মও বস বপ। তাই বল। হয়েছে “বসো বৈ স”। 
বিশ্বশিল্পীর শিল্প আকাশপটেইবিধৃত। অগণিত গ্রহ নক্ষত্র এবং পৃথিৰীর 
কোলে প্রবাহিত প্রাণের ধাব। সবই তো মাকাশে আশ্রিত। কাজেই 
আকাশ আনন্দেভর।। মানুষের মন দিয়ে মানুষের চেতন! দিয়ে সেই 
বিশ্বশিল্লী মানন্দ আস্বাদন করেন । তাই যে মানুষের মনে অখগ্ডবোধ 
সঞ্।ারিত হয়, সে বিশ্বকে “মানন্দরূপমমূতং যদ্ধিভাতি' বলে অভিখ।দন 
করে ।২৬ 

দ্বিতীয় বচনটিও একই উপনিষদে পাই। তাতে বল হয়েছে 
( বরুণের পুত্র ভগ) জানলেন ত্রহ্মই আনন্দ। আনন! হতেই এই 
জীবসকল জন্মগ্রহণ করে। জম্মগ্রহণ করে আনন্দের জন্কই জীবন 
ধারণ করে। (মৃত্্যুব পর ) আগণন্দেই প্রতিগমন করে এবং ( আনন্দে) 
গ্রবেশ করে ২৭। 


২৫. রূসো বৈ দঃ ॥ রসং হ্োবায়ং লব্খানন্দ? ভবাঁতি ॥ কো হোবান্যাৎ কঃ প্রাণ্যাং ॥ 
যদেষ আকাশ আননদ্দো ন স্যাৎ ॥ এব হ্যেবা নন্দয়াত ॥ তৌত্তরীয় । ২। ৭ 
ষ্ড, মুণ্ডক ॥ ২1২1৭ 


, আনন্দো ব্রদ্দোত ব্জানাং ॥ আনন্দাদ্ধযেব খাঁতবমানি ভুতান জ্লায়ন্তে 
রর আনন্দেন জাতানি জবি ধ আনন্দং প্রযস্ত্যাভি রাত | 
তৌত্তিরীয় । ৩। ৬ 


১৪৩ 


এ বচনটিও সমান'তাৎপর্ধপূর্ণ। জন্ম ও মৃত্যু এখানে আনন্দের 
উপাদান রূপে কল্পিত হয়েছে । সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে ্যষ্টির 
প্রবাহ যেন বিশ্ব জোড়া নাট্য, তা স্থান ও কালের রঙ্গমণ্ে বিধৃত। 
নাট্যকার, নাট্যের চরিত্র, নাট্যে আশ্রিত যে রস এবং নাটারদিক 
সবই ব্রহ্ম। তাই জন্মেও আনন্দ, মৃত্যুতেও আনন্দ। যেহেতু এদের 
সব কিছু ব্যাপ্ত করে ব্রহ্ম বিরাজিত, তিনিও আনন্দ। 

এখন আনন্দ জিনিসটি কি বুঝতে চেষ্টা করা! যাক। তা! সুখ নয়, 
তা সুখ হতে আরও ব্যাপক । আমাদের ইন্দ্রিয়ানুভৃতি সুখ দেয় ব। 
হুখ দেয়। আমাদের হৃদয়বৃত্তির অনুভূতিও সুখ দেয় বা ছুঃখ দেয়; 
তবে তার অতিরিক্ত একটি অন্ুভূতিরও আস্মাদ দিতে পারে । তবে 
তা সুখের মতোও নয়, ছুঃখের মতোও নয়, তা একটি শ্বতন্ত্র ধরনের 
ব্যবহারিক জীবনের সহিত সংযাগহীন অনুভূতি উৎপাদনের ক্ষমতা 
রাখে। তাকেই উপনিষদের খধি আনন্দ বলেন। তা৷ সুখ-ছুঃখকে 
জড়িয়ে নিয়ে, তাদের উপাদান হিসাবে ব্যবহার করে গড়ে ওঠে। 
নাটকের অভিনয় দেখে যে অনুভূতি মনে সঞ্চারিত হয়, তার সঙ্গে 
এর তুলনা চলতে পরে ॥ এর ঠিক সমার্বোধক শব্দ ইংরেজিতে নাই। 
যে পারিভাধিক শব্দটি তার সব থেকে কাছে যায়, তার বাংল অনুবাদ 
দান্ডাবে শিল্পতাত্বিক অনুভূতি২৮ | 

আমাদের বক্তব্যকে সহজবোধ্য করবার জন্ত একটি উপম। প্রয়োগ 
কর! যেতে' পারে ॥ নাট্যকার যে নাট্য রচনা করেন তাতে কত 
ঘটনার সমাবেশ, কত বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে, কত ভিন্ন ধরনের অন্ুস্ভূতি 
ফুটে ওঠে। কেউ হাসে, কেউ কাদে, কেউ প্রীতি করে, কেউ হিংসাত্মক 
কাজ করে! বিশেষ চরিত্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকলে, আমর! দর্শক হিসাবে 
তাদের সুখে সুখী হই, ছুঃখে মন খাবাপ করি; কিন্তু সমগ্র নাটফকে 
অবলম্বন' করে যে রস বিকশিত হয়ে ওঠে, তা গ্রহণ করে আমরা 
আনন্দ পাই। বিশ্বকেও অখণ্ড দৃগ্িভঙ্গি দিয়ে দেখলে এমন একটি 
ই৮. 4১680)6610 20750001 


১০৪ 


রসের ধারার আবিষ্কার করা! ধায়। উপনিষদ তাকেই আনন্দ বলেছে 
এবং আরও বলেছে যে সেই রসের আকর্ষণেই বিশ্বসন্ত। বিশ্ব রচনায় 
প্রবৃত্ত হন। এই অর্থেই বল! হয়েছে আনন্দের আকর্ধণেই জীবের! 
জন্মগ্রহণ করে, আনন্দকে অবলম্বন করেই তার জীবনধারণ করে এবং 
মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আনন্দে প্রবেশ করে ॥। সুতরাং সমগ্র বিশ্ব জুড়ে যে 
রসের ধার৷ প্রবাহিত তা হতে ব্রচ্ধ অভিন্ন । কাজেই আনন্দই ব্রহ্ম । 
মনে হয় বিশ্বকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে একটি বিরাট 
প্রবহমান নাটা বলেই প্রতিভাত হয়। মহাবিশ্বে কি দেখি? বিশ্লেষণ 
করে করে একপ্রিকে পাই অগুকে । কিন্তু সেই অণুর মধ্যেও বিভাগ 
আছে; তাদের মধ্যে একটি সামগ্রিক স্থমিতি বিরাজিত। প্রোটন ও 
নিউট্রনকে কেন্দ্র করে ইলেকট্রনগুলি চক্রাকাঁরে ঘুরছে । খণাত্মক ও 
ধনাত্মক বিছ্যুৎ-শক্তির সামগ্জস্তের ভিত্তিতে তাদেব মধ্যে একটি ভারসাম্য 
প্রতিষ্ঠিত। তাদের মধ্যেও আবার ভাঙাগড়া আছে। বড় অথু ভেঙে 
ছোট অণুতে পরিণত হচ্ছে, ছোট অণু অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে বড় 
অণুতে পরিণত হচ্ছে। এই ভাঙাগড়ার খেঙ্গায় যে শক্তি মুক্ত হচ্ছে, 
তাই তাপ ও আলোক তরঙ্গ রূপে মহাশুষ্ছে ছড়িয়ে পড়ছে । অপর- 
দিকে বিভিন্ন শ্রেণীর অণুর অস্তভূ্ত ইলেকট্রনগুলির যে নির্দিষ্ট কক্ষপথ 
আছে তার মধ্যেও কোথাও কোথাও শৃন্ স্থানের সুযোগ নিয়ে অণুতে 
অণুতে মিলন ঘটে রাসায়নিক মিশ্রণ সম্ভব হচ্ছে। এই ভাবেই 
বিভিপ্ন মৌলিক পদার্থের মিশ্রণে জলের মতো, লবণের মতো 
রাসায়নিক পদার্থ গডে উঠেছে । এই নিয়েই তো৷ জড় জগৎ । 
কিন্তু সত্যই কি তা জড়? তাকে অবলম্বন করেই কি প্রাণের 
প্রকাশ নয়? সে প্রাণশক্তি তো দেহকে আশ্রয় করেই বিকশিত। 
সেই দেহ গড়ে উঠছে নানা মৌলিক ও মিশ্র পদার্থের সমাবেশে । 
তাতে কান আছে, অক্সিজেন আছে, আরও কত কি আছে। তার 
মধ্যে যে সুসংহত শক্তি ক্রিয়াশীল তার একা ও তার অনবদ্ধ কর্মবিস্তাস 
সত্যই বিস্ময়কর। বাহিরকে জানা ও পরিবেশ হতে পুষ্টি সংগ্রহ করার 


৯৪৪ 


কাজ কি নিপুণভাবে তা সম্পার্দন করছে। সেখানেও রাসায়নিক 
প্রক্রিয়ার সাহায্যে বিছ্যৎশক্তি উৎপাদিত হুচ্ছে এবং তার সাহাষ্যে 
কাজ চলছে। হাৎপিগু দ্বারা যে রক্তপ্রবাহু পরিচালিত হচ্ছে তার 
ছন্দ এই বিদ্ধযুৎশক্তি দ্বার নিয়ন্ত্রিত । মস্তিষ্কে যে চিন্তা হচ্ছে, ইন্ছিয়ের 
সাহাযো বহিথিশ্ব সম্বন্ধে যে প্রত্যক্ষ-জ্ধান আহ্বত হচ্ছে অঙ্গপ্রত্যাজের 
নিকট যে নির্দেশ যাচ্ছে, তার সঙ্গেও বিহ্যৎশক্কির সংযোগ আছে। 
কার্য-কারণ সম্বন্ধের ভিত্তিতে কেবলমাত্র জড়শক্কির ওপ্‌র নির্ভর করে 
মানসিক ক্রিয়ার ব' প্রাণশক্তিব ব্যাখ্য। হয় না সত্য; কিন্তু তাদের 
সম্বন্ধ তে। নিত্য; জড়ের বাহিরে তে! প্রাণের প্রকাশ দেখি না। 
কাজেই জড় ও চেতনের বধ্যে সমধণিতা নিশ্চয়ই আছে। 

ওদিকে মহাকাশেও বিন্ময়কর ব্যবস্থার শেষ নাই। ক্ষুদ্র অণু 
জুড়ে জুড়ে উপগ্রহ, গ্রহ গড়ে উঠেছে । তারাও নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে 
ইলেকট্রনের মতোই আবতিত। "অণু ও বিরাটে একই ছন্দ ক্রিয়াশীল । 
কোটি কোটি নক্ষত্র এক কেন্দ্রবিন্তুকে মাঝে রেখে থালাব আকারে 
আবভিত। আমাদের ছায়াপথ এমান একটি নক্ষত্রমগুলণ দিয়ে ৰচিও 
থালা । মহাশুন্ত আবার এই ধরনের কোটি কোটি নক্ষত্রপুঞ্জের দ্বার! 
বেষিত। এযেন এক ধরনের রাসনৃত্য ; অণু হতে বিবাটে, বিরাট 
হতে বিরাটতরে একই বর্ুলাকার নৃত্যছন্দ নিত্য ক্রিয়াশীল । 

অপবদিকে বিশ্ব বোপে যে বিরাট নাট্য অভিনীত হচ্ছে তা 
বোঝবার বা হৃদয়ঙ্গম করবার উপযুক্ত মন যতক্ষণ না বিশ্বে ফুটে 
উঠছে, ততক্ষণ তা যে শৃন্' প্রেক্ষাগারে নাট্যাভিনয়ের মতই অর্থহীন 
' হয়ে ঈাড়ায়। বিজ্ঞান সে কথ। স্বীকার করুক ব| নাই করুক, জ্ঞান- 
শক্তির উদয়ের পূর্বে বিশ্বে বপ বলে কিছু ছিল না, শব্দ বলে কিছু ছিল 
না, আম্বাদ বলে কিছু ছিল না। রামধন্থুব বর্ণাঢ্য শোভা। দেখে কেউ 
বলবার ছিল না, কি লুন্দর ! হাদয় বলে কিছু ছিল ন।; মায়! মমতা! 
গ্্রতি বলে কিছু ছিল না। উপনিষদে বলে সেই জপ্তই সঙ্গহীন, 
দ্বিতীয়বিহীন একক জীবন বিশ্বসন্তার ভাল লাগে নি এবং সেইজগ্ক 


১৬৩ 


তিনি বন্ুদ্বার! বিধণ্ডিত বিশ্বে নিজেকে রপাস্তরিত করলেন। 

সুতরাং দ্বৈতবোধের ভিত্তিতে যে বিচিত্র বিশ্ব গড়ে উঠেছে তা 
উপনিষণ্দের খধষির অথণ্ড দৃষ্টিভঙ্গির গুণে আনন্দরপ ও অন্ত বলে 
প্রতিভাত হয়েছে । তারা বুঝেছিলেন, খণ্ডের মধ্যে অখণ্ড বিরাজমান । 
একই সন্ত বিশ্বের মধ্যে ; মানুষের শরীরের অভ্যন্তরে অবস্থিত হয়ে 
তাদের একটি সামগ্রিক নুমিতির বিশ্যাসে গ্রত্থিত করেছেন আনন্দ- 
উপলন্ধির জন্য । দেই কারণে, তাদের উপলব্িতে পৃথিবী হয়েছে 
মধুময় এবং তাতে অবস্থিত সকল ভূত হয়েছে মধুময় এবং তাদের ব্যাপ্ত 
করে যিনি বিরাজ করছেন তিনি অমুতময় ।২৯ 

এইভাবে সামগ্রিক দৃষ্টিতঙ্গি নিয়ে দেখলে মনে হয়, সত্যই বিশ্ব 
জুড়ে একটি শিল্প-আস্বাদনের বাবস্থা গড়ে উঠেছে । সেই ব্যবস্থায় 
শিল্প ও শিল্পরন্দিক একই মহাশক্তি হতে উদ্ভৃত হয়েছে । বিশ্বের পরিণত 
রূপেই যেন বিশ্ব এক দিকে শিল্প এবং অন্যদিকে শিল্পরনসিক হয়ে জ্ঞাতা 
ও জ্য়, ভোক্তা ও ভোগের সন্বন্ধে। প্রকট । আর যিনি শিল্পী তিনি 
উভয়কে এঁকান্ত্রে গ্রথিত করে, সবকিছু নিয়ে একটি সামগ্রিক একতা- 
মগ্ডিত করে শিল্প ও শিল্পরসিকের মধ্যে প্রচ্ছন্নরূপে বিরাজ করেন। 
এই শিল্পকে অনবন্থ করার জগ্ত কোনও ক্রটি রাখা হয় নি। উপনিষদ 
তাই বলা হয়েছে, বিশ্বশক্তি যেখানে যেমনটি সাজে তার উপযুক্ত 
ব্যবস্থা শাশ্বত কালের জন্ক করে রেখে দিয়েছেন: কারণ, তিনি 
একাধারে কবি ও মনীষীত* ॥। এ শিল্প নিত্য প্রবহমান, কারণ এ যে 
দেবতার শিল্প । তাই জন্যই ত৷ জীর্ণ হয় না, মৃত্যুও তার নাই । 
“ন জীর্যতি ন ভিয়তে? | 


২৯. ইয়ং পৃথিবী সর্বেষাং ভুতানাং মধবস্যৈ পাঁথবো সবাঁণি ভুতানি মধু 
ধশ্চায়মস্যাং পাথব্যাং তেজো ময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো বাশ্চায়মধ্যাতং 
শারীরষ্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পৃরুযোহয়মেব স যোহয়মাত্েদমৃতমিদং রঙ্গে 
সর্বম: ॥ বৃহদারণাক ।২৫1১ 

৩০. কাবর্মনীষাী পারভুঃ ঈবয়ন্ভুযাঁথাতথ্যতো বাদধাং শাম্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ ঈশ ৮ 


১৩৭. 


উপনিষদের খির ধারণায় ব্রদ্ষের আনন্দ পবিমাঁণে এত বেশি যে 
তা ধারণ করা যায় না। তার আনন্দের পরিমাপ বোঝাতে একটি 
গাণিতিক হিসাব স্থাপন কর! হয়েছে । এই হিসাব ছুটি উপনিষদে 
আছে (বৃহদারণ্যক 880৩৩ ও তৈত্তিরীয় 1২৮ )। উভয় ক্ষেত্রেই 
একটি মানুষের আনন্দকে মাপকাঠি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। 
মানুষের আনন্দের ব্যাখ্যার ভাষায় কিছু তারতম্য থাকলেও অর্থ একই 
দাড়ায়। তৈত্বিরীয় বলে, একটি সাধু যুবা, সে একাধারে দ্রটিষ্ঠ এবং 
বলিষ্ঠ এবং সমগ্র পৃথিবী বিত্তে পূর্ণ হয়ে তার অধিকারে আসবে-_-এই 
হল মনুষ্া-আনন্দ। বৃহদারণাক উপনিষদ মনুষ্া-আনন্দের পরিচয় দিতে 
গিয়ে বলেছে ; একটি মানুষ, সে রাদ্ধ এবং সমৃদ্ধ এবং সমগ্র এনুখ্য 
আনন্দে সম্পন্নতম' হবে--তাই হলে। এক মনুষ্য-আনন্দ। তারপর এই 
গাণিতিক বিবরণ ধাপে ধাপে উঠে গেছে ব্রন্ষের আনন্দকে লক্ষ্য কৰে 
পিতৃগণ, গন্ধর্ব ও বিভিন্ন দেবতাদের আনন্দের পরিমাপ দিতে দিতে। 
প্রতিক্ষেত্রেই আনন্দের অঙ্ক শতগুণ বধিত হয়ে গেছে । উভয় ক্ষেত্রেই 
যে গাণিতিক সংখ্যা মেলে তা৷ ধারণাতীত। অর্থাৎ মর্ম হলো। এই যে 
ব্রদ্মের আনন্দের পরিমাণ এত বেশী যে তা ধারণা কর! যায় ন।। 

এই জগ্যই তৈত্তিবীয় উপনিষদে বল! হয়েছে £ ব্রদ্মের আনন্দ মন 
দিয়ে গ্রহণ করা! যায় না, বাক তাকে ধারণা করতে চেষ্টা কবে মৃক 
হয়ে ফিরে আসে, সেই আন্বাদ পেলে ভয় বলে কিছু থাকে না*১। 
মূল বচনটি নীচে পাদটাকায় উদ্ধৃত কর! হলো! । অনেকে ব্যাখ্যা করেন 
যে মন ও বাক্য পরাহত হয়ে ফিরে আসে ব্রক্ষকে না পেয়ে। কিন্ত 
বাক্যটির ব্যাকরণগত বিন্যাস দেখলে সন্দেহ থাকে ন। যে এখানে মূল 
পদ হলো! “আনন্দ, “ব্রহ্ম” নয়; আনন্দই এখানে জ্ঞাতব্য বিষয়, 
আনন্দকে নির্দিষ্ট করতেই ব্রদ্মের সহিত তার সম্বন্ধ পদ্দের সংযোগ 
ঘটেছে। 


৩৯. যতো বাচো নিবর্তন্কে। অগ্রাপ্য মনসা সহ। আনন্দং ব্র্ধণো বিদ্বান ॥ 
ন বিভেতি কুতশ্চন ॥ তোত্তিরীয় 1২18 ও ২৯ 


১৪৯ 


তিন 
রবীল্দুনাথের আনন্দতত্ব 


আশ্চর্য লাগে দেখে যে রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের আনন্দবাদ সমগ্র 

অস্তঃকরণ দিয়ে গ্রহণ করেছেন ॥। এ উপলব্ধি ঠিক উপনিষদ পাঠ 
করে সংঘটিত হয় নি, কবির নিজস্ব অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও হাদয়ের 
অনুভূতি হতে উন্মথিত হয়ে উঠেছে। তিনিও বিশ্বাস করেন যে স্থষ্টির 
অন্তনিহিত উদ্দেশ্য হলে। অহৈতুক আনন্দের আম্বাদ। তিনি এও 
বিশ্বাস করেন, এই আনন্দের আকর্ষণেই যিনি একাস্তই একক ছিলেন, 
সেই দ্বিতীয়হীন পরম-এক এই বহ্ুদ্বারা খণ্ডিত ও বিচিত্রিত বিশ্বে 
নিজেকে রূপান্তরিত করলেন। আরও আশ্চর্যের কথা, তার এই 
উপলব্ধি এল একটি মহাশোকের আঘাতের মধ্য দিয়ে। তার পত্বী 
মুণালিণী দেবী অকালে লোকান্তরিত হলে, তিনি বিচ্ছেদের তীব্র 
আঘাতের বেদনায় নিপীড়িত হয়ে বলেছিলেন, “প্রেম এসেছিল চলে 
গেছে আজি খুলি দ্বার । কিন্তু সেই বেদনার আলোকেই তিনি 
উপলব্ধি করলেন এই মহাসত্য যে বিশ্বসত্ত। আপনাকে হই করে 
আনন্দ আম্বাদ করবার জন্যই এই বিশ্বে রূপান্তরিত হয়েছেন ॥ তার 
প্রাসঙ্গিক উক্তিটি চুম্বকে কি সুন্দরভাবে উপনিষদের আনন্দতত্বের 
মর্মকথ। বলে দিয়েছে, তা মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলেই বোঝা যায়। 
সমগ্র উপনিষদের দর্শনখানিই যেন এখানে স্থাপন কর] হয়েছে 

যে ভাবে পরম-এক আনন্দে উৎস্থুক 

আপনারে ছুই করি লভিছেন স্তুথ, 

ছুয়ের মিলন ঘাতে বিচিত্র বেদন। 

নিত্য বর্ণ গন্ধ-গীত করিছে রচনা ।৩২ 

রবীন্দ্রনাথ জীবনে বনু হুঃখের আঘাত পেয়েছেন। পারিবারিক 

জীবনে মৃত্যুশোক তার মনে বার বার নিষ্ঠুর আঘাত হেনেছে । অতি 


৩৭, মরণ, ৮৬২ 
১৪৪) 


ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের একে একে তাকে ছেড়ে চলে গেছেন । তবু তিনি 
হুখবাদী হন নি। তার কবিতায় আনন্দের আন্বাদের বারবার 
পরিচয় পাই। স্বখ-হুখ, আশ।-নৈরাশ্ট, গ্রীতি-বিদ্বেষ, জীবন-সৃত্যু 
জড়িয়ে নিয়ে যে মানবজীবন তাকে তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন 
আনন্দের লীলাক্ষেত্ররূপে । তার দৃষ্টিভঙ্গির সুন্দর পরিচয় পাই 
নীচের কাব্যাংশে £ 
জগতে আনন্দযজ্জে আমার নিমন্ত্রণ, 
ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন 1৬৬ 

ত৷ সস্তব হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের মতোই স্ুুখ-হুঃখ, জীবন- 
মৃত্যুকে সামগ্রিক দৃর্িভঙ্গি নিয়ে দেখেছিলেন বলে। এর দ্য 
প্রয়োজন অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গির । জীবনের বহু খণ্ড অভিজ্ঞতাকে এঁকোর 
সুত্রে যদি গ্রথিত করতে পারি) তবেই আনন্দকে আম্বাদ করবার 
অধিকারী হই। তা না হলে আমর! দুঃখ ও মৃত্যুর আঘাতে ক্ষুপ্ন হই। 
সামগ্রিক দৃষ্টিতজিই আমাদের মনকে সখ হুংখ বোধের উদ্ধে তুলে 
নিতে পাবে, যেখানে বিশ্ব জুড়ে প্রাণের প্রবাহের মধ্যে যে অমৃত 
লুকানে। আছে তার সন্ধান মিলবে । এই প্রসঙ্গে তার নীচে স্থাপিত 
মন্তবাটি লক্ষ্য কর! যেতে পারে £ 

“নানার মধ্যে সেই এককে না পাইলে মনের স্থখ শাস্তি মঙ্গল 
নাই, তাহার উদভ্রান্ত ভ্রমণের অবকাশ নাই। সেঞ্রব একের সহিত 
মন 'মাপনাকে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করিতে না পারিলে, সে 'অমৃতেব সহিত 
যুক্ত হয় না--সে খণ্ড খণ্ড মৃত্যুদ্ধারা আহত ভাড়িত বিচ্ষু্ধ হইয়! 
বেড়ায়। মন আপনার শ্বাভাবিক ধর্ম বশতঃই কখন জানিয়া, কখন 
ন! জানিয়।, কখন বক্রপথে, কখন সরল পথে, সকল জ্ঞানের মধো, 
সকল ভাবের মধ্যে অহরহ সেই পরম এক্যের পরম আনন্দকে সন্ধান 
করিয়া কিরে' ॥৩৪ 


৩৩. গদতাজাল, 95 
৩৪. আত্মপরিচয়, ৩ 


১১৪ 


স্থৃতরাং স্ুখ-ছঃখ, জন্ব-মত্যু আনন্দের উপাদান। হছখকে ব। 
মৃত্যুকে এড়াতে চাইলে আমরা আনন্দ হতে বঞ্চিত হব। কারণ, 
আনন্দের ছুইটি উপাদান, ছুটিকে যে সমান দৃষ্টিতে দেখতে পারবে, 
সেই আনন্দ আম্বাদের অধিকারী হবে । রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিক 
উক্তিটি এই £ 

'আনন্দ দুঃখের বিষয়কে অনায়াসে পরিপাক করিয়া ফেলে । এই 
জন্য কেবল ভালোটুকুর দিকেই সুখের পক্ষপাত- আর আনন্দের পক্ষে 
ভালে মন্দ দুই-ই সমান 1১৭ 

এই জন্যই তিনি ছুঃখকে, অশান্তিকে এড়াতে চান নি, তাদের 
সদরে গ্রহণ করতে চেয়েছেন। কারণ, তার ধারণায়, তাকে গ্রহণ 
করে, তার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে, তবেই ব্যাপকতর দৃষ্টিভলির মধ্য 
দিয়ে আনন্দের দ্বার উদঘাটিত হয়-_এই ছিল তার ধারণা । ছুংখের 
আধার, শোকের আধার, মৃত্যুর আধাব-_এদের উত্তীর্ণ হয়েই 
আনন্দলোকে পৌছান যায়। তিনি নিজেই বলেছেন ৭খয়াতে, 
“আগমন শীর্ষক কবিতায় তাকেই তিনি স্বাগত জানিয়েছেনও৬। 
তাকেই তিনি এই কবিতায় “আধাব ঘরের রাজা" বা 'হখরাতের রাজা 
বলে স্বাগত জানিয়েছেন । কবিতার প্রাসঙ্গিক অংশটি এই £ 

€রে হুয়াব খুলে দেবে, বাঙ্তা শঙ্খ বাজ| ৷ 

গভীর রাতে এসেছে আজ আধার ঘরের রাজা । 
বজ্জ ডাকে শৃন্যতলে বিহ্যাতেরই ঝিলিক ঝলে, 
ছিক্স শয়ন টেনে এনে আডিন। তোর সাজ! । 
ঝড়ের রাতে হঠাৎ এল হুঃখরাতের রাজা । 

মনে হয় “গীতাগ্রলি'ব একটি কবিতায় এই স্থুবেরই প্রাতিধ্বনি 
পাই। বিশ্ব জুড়ে যে আনন্দনৃতা প্রবাহিত তাতে সুখ-হুঃখ, জন্ম-মৃত্যু, 
ভাঙা-গড়া এরাই ছন্দ । সুতরাং হঃখকে, ভাঙাকে, মরণকে এড়িয়ে 
৩৫. আত্মপারিয়--৩ 
৩৬. খেয়া, আগমন 


৯৯৯ 


যেতে নেই। তাদের গ্রহণ করতে হয়; তাদের পার হয়েই আনন্দ- 
লোকে উতীর্ণ হওয়া যায়। তাই কবি নিজেকেই উদ্দেশ্য করে 
বলছেন £ 
পারৰি নাকি যোগ দিতে এই ছন্দেরে, 
খসে যাবার ভেসে যাবার 
ভাঙবারই আনন্দেরে । 

একই চিন্তা তিনি উপনিষদের বাচনভঙ্গির অনুসরণে রুদ্রের প্রসঙ্- 
মুখের উল্লেখের মধা দিয়ে প্রকাশ করেছেন । রুদ্রের রুদ্রতাকে বক্ষে 
ধারণ করে নিলে তবেই রুদ্রের প্রসঙ্নমুখ দেখা যাবে । সেই প্রসন্নমুখ, 
তার ধারপায়, পরম সত্য, কারণ, তার ধারণায়, বিশ্বস্থপ্টির চুড়াস্ত 
সার্থকতা আনন্দ আশ্বাদনে । তিনি বলছেন, রমসত্য ও পরম সত্য 
হচ্ছে ওই প্রসন্নমুখ । সেই সত্যই হচ্ছে কদ্রতার উপরে । কিন্তু এই 
সত্যে পৌছাতে গেলে রুদ্রের স্পর্শ নিয়ে যেতে হয়? । ৩৭ 

স্থতরাং বিশ্ব জুড়ে যে আনন্দযজ্জের আয়োজন চলেছে তাতে 
নিমস্রণের অধিকার পেতে হলে সুখ-ছুখকে অতিক্রম করে একটি 
সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তূলতে হবে। শুধু সুখকে আকড়ে ধরে এবং 
ছুখকে এড়িয়ে চলে তাকে পাওয়। যায় না। তা হলে সুখ-হঃখেব 
বোধের স্তরেই মামবা সীমাবদ্ধ থাকব । ছুঃখকে, শোককে, অশাস্তিকে 
গ্রহণ করে তবে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা যায়। তাই রবীন্দ্রনাথ 
বলছেন £ 

“আত্মার প্রকাশ আনলাময়। এই জন্যই যে হুঃখকে, মৃত্যুকে 
স্বীকার করতে পারে না--ভয়ে কিন্ব। আালস্থে কিংহ্ব। সংশয়ে এই 
ছুঃখের পথকে যে লোক এড়িয়ে চলে--জগতে সেই আনন্দ থেকে 
বঞ্চিত হয়? । ৩৮ 

স্থখ-ছঃখ, নুত্ী-কুষ্তরী জড়িয়ে নিয়ে যে সাষগ্তিক স্থুমিত্তি ফুটে 


৩৭. আত্মপরিচয়--৩ 
৩৮. আত্মপরিচয়--৩ 


১১২ 


উঠেছে, তাই যে আনচ্দের আকর রবীন্দ্রনাথের এই উপলব্ধি জীবনের 
শেষ প্রাস্তেও অটুট ছিল। এই স্মুমিতিকে তিনি সুষমা বলেছেন 
একটি কবিতায় । শব্দটির গ্যোতন। অত্যন্ত গভীর । অভিধা অর্থে যা! 
পাই ধ্বন্যর্থ পাই তার থেকে অনেক বেশি! তিনি বিতর্ক এড়িয়ে 
গেছেন, কবির হৃদয় দিয়ে অনুভব করা উপলব্ধির কথা বলেছেন, 
এই ভাবে, তার অনমুকরণীয় ভঙ্গিতে : 

আমি কবি তর্ক নাহি জানি, 

এ বিশ্বেরে দেখি তার সমগ্র স্বরূপে 

লক্ষ কোটি গ্রহতারা আকাশে আকাশে 

বহন করিয়া চলে প্রচণ্ড সুষমা, 

ছন্দ নাহি ভাঙে তার, সুর নাহি বাধে, 

বিকৃতি ন। ঘটায় স্থলন : 

এইতে। আকাশে দেখি স্তরে স্তরে পাপড়ি মেলিয়। 

জ্োতির্সয় বিবাট আলাপঙ৯। 

রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পনায় বিশ্বরচনার উদ্দেখা আনন্দ-শাম্বাদন 

বলেই তার কোনও বাবহারিক প্রয়োজন চরিতার্থ করবার ক্ষমতা 
থাকে না। এই কারণে, তিনি বিশ্বরচনাকে এমন জিনিসের সহিত 
তুলনা করেছেন, য'র প্রেরণ। কোনও বাবহারিক প্রয়োজনবোধ নয়, 
আনন্দ-আম্বাদন । তাই দেখি তার বিরাট কাবাসাহিত্যে তিনি 
তাকে কোথাও তুলনা! করেছেন খেলার সঙ্গে, কোথাও যাহুকরের 
পালার সঙ্গে, কোথাও নুতোব সঙ্গে । সব কটি উপমা নই শিল্পের গণ 
ধারণ করে। সবক্ষেত্রেই উদ্দেশ, এই কথাটি বোঝানো ষে বিশ্ব- 
রচনার পিছনে কোনও অস্তুনিহিত উদ্দেশ্য নাই, তা অহৈতুক। তার 
কাব্যে রীন কল্পনা এবং চিত্তহারী ভাষায় এগুলি প্রচারিত হয়েছে। 
আমরা এখানে তার কিছু উদাহরণ সংগ্রহ করে স্থাপন করবার প্রস্তাব 
করি। 


৩৯, রোগশব্যার। ২১ 


১১৩ 


প্রথমেই খেলার পরিকল্পনার কথা ধরা যাক। রবীন্দ্রনাথের 

ধারণায় সমস্ত বিশ্ব জুড়েই সেই প্রচ্ছন্ন শিল্পীর খেলা চলছে। এই 
প্রসঙ্গে “উৎসর্গের ৩৮ সংখ্যক কবিতাটি বিবেচনা কর! যেতে পারে। 
এখানে কবির কল্পনায় যে চিস্তাটি রূপ নিয়েছে তা হলে। এই £ বিশ্বের 
পিছনে এক প্রচ্ছন্ন শক্তি আছেন। তিনি চিরকাল ধরে বিশ্ব রচন। 
করছেন, বিশ্ব ধবংস করছেন । এ যেন দোল! দেবার খেলা, দোলা 
একবার বাঁদিকে একবার ডানদিকে যায় ॥ এরা দৌলার ছন্দ । জন্ম- 
মৃত্যু, ভাঙা-গড়া সেই ছন্দেব তাল রক্ষা করে। আসলে তো এ খেলা, 
এ লীলা । যিনি খেলছেন তিনি নিজের ধন নিজেই হবণ করছেন, 
আবার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কাজেই দেওয়া নেওয়। তার কাছে হুইই 
সমান । তার নিজের ভাষায় £ 

ডান হাত হতে বাম হাতে লও বাম হাত হতে ডানে। 

নিজধন তুমি নিজেই হরিয়। কী যে কর কেব। জানে। 

কোথা বসে আছ একেলা-_ 

সব রবিশশী কুড়ায়ে লইয়৷ তালে তালে কর এ খেল।। 

থুলে দাও ক্ষণ তরে, ঢাক দাও ক্ষণ পরে 

মোর! কেঁদে ভাবি, আমারি কি ধন কে লইল বুঝি হরে ! 

দেওয়া নেওয়া তব সকলি সমান সে কথাটি কেবা জ্ঞানে । 

ডান হাত হতে বাম হাতে লও, বাম হাত হতে ডানে । 

একই স্থুর ধবনিত হয়েছে শিশু ভোলানাথ কাবাগ্রস্থের একই 

নামে চিহ্িন্ত প্রথম করিতাটিতে। তবে তাতে একটি বিভিন্ন ভঙ্গি 
পরিস্ফুট। উপরের কবিতায় ভাঙা-গড়া ছুই যেন সমান মূল্যের বলে 
দেখান হয়েছে । এখানে শস্য বস্র সংরক্ষণের ইচ্ছাকে দমন করে 
তাকে ধ্বংস করার প্রয়োজনীয়তার দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। গড়া 
এবং ভাঙা ছটিই প্রয়োজনীয়, ছয়ে মিলে স্ৃষ্টি.খেলার ছন্দ। এখন 
শুধু গড়! জিনিসকে নিয়ে আকড়ে ধরে থাকলে যে ছন্দ-পতন ঘটে 
এবং খেলা থেমে যায়--এই কথাটির উপরই এখানে বেশি জোর 


৯১৪ 


দেওয়া হয়েছে । খেলন! ভাঙাও যে খেলার একট! অঙ্গ, তাও উপলব্ধি 
করবার প্রয়োজন আছে। অষ্টা যেন শিশু ভোলানাথ। তাই তার 
কাছে এ জিনিস সহজেই আসে, কারণ, তার কাছে কিছুরইতো৷ 
কোনও মূল্য নাই । কবি তাই তার ভক্ত হবাব ইচ্ছ। প্রকাশ করেছেন 
এই ভাবে £ 
ওরে শিশু ভোলা নাথ, মোরে ভক্ত বলে 
নেবে তোর তাগুবের দলে, 
দেরে চিত্তে মোব 
সকল-ভোলার ওই ঘোর, 
খেলেন।-ভাঙার খেল দে আমারে বলি । 
আপন সষ্টিব বন্ধ আপনি ছি'ড়িয়া যদি চলি 
তবে তোব মত্ত নর্তনেব চালে 
আমাব সকল গান ছন্দে ছন্দে মিলে যাবে তালে। 
এই শিশু ভোলানাথই “মন্ুযা” কাব্যগ্রন্থের 'বোধন' শীধক কবিতায় 
কপান্তবিঙ হয়েছেন 'নিতাকালেৰ মায়াবী'তে । এই কবিতার বিষয়টি 
হলে৷ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা--শীঙেব শেষে বসস্তেব আবির্ভাব । 
শীত হলে। প্রকৃতিব জরতীব অবস্থা, সে তখন বিজ্ত, ক্রাস্ত, সবহার! । 
বসম্তের আবি্ভাবে সেই প্রকৃতিই যেন কোন যাহকরের মায়াকাটির 
স্পর্শে রাতারাতি সৌন্দধের প্রতিমায় বপাস্তবিত হয়ে যায়। এই 
ব্যাপাবটি প্রতি বছরেই ঘটে থাকে । তাকে অবলম্বন কবে রবীন্দ্রনাথ 
ভাব আনন্দভাবন। বাক্ত কৰেছেন এই কল্পনা কনে যে বিশ্বসত্তা যেন 
এক মায়াবী, তিনি প্রতিবছধ প্রকৃতিকে রিক্ত করে দিয়ে, আবার 
তাকে সকল সস্ভাবা আভবণে মগ্ডিত করে, নববরবেশে জয় করে নিতে 
চান। এই মায়ার খেল। নিত্যকাল ধরে চলেছে; তাই বিশ্বের 
রচয়িতাকে তিনি নিত্যকালের মায়াবী বলে বর্ণনা! করেছেন £ 
নিত্যকালের মায়াবী আসিছে নব পরিচয় দিতে। 
নবীন রূপের অপরূপ জা আনিবে সে ধরণীতে। 


১১৫ 


জক্ষ্মীর দান নিমেষে উজাড়ি 
নির্ভয় মনে দূরে দেয় পাড়ি, 
নববর সেজে চাহে লক্ষ্মীরে ফিরে জয় করে নিতে। 


এই নিত্যকালের মায়াবীর প্রাচীন সঞ্চিত ধনে এঁকাস্তিক 
অবহেল।। তাই বসন্তে যে এই্বর্-ভাগ্ডার সঞ্চিত হয়, শীতের আঘাতে 
তাকে তিনি ভেঙে-টুরে নিঃশেষ করে দেন । ভোলানাথ ভাই করেন, 
কারণ, তিনি অকিঞ্চন, তার কাছে তে কিছুরই কোনও মূল্য নাই। 
এই মায়াবী তাই করেন, কারণ, তিনি মহাশক্তিধর, তার কাছে এমন 
পরশপাথর আছে, য1 মৃূল্যহীনকে সোন। করবার ক্ষমত। রাখে । একই 
ভাবন! ছৃইভাবে প্রকাশ হয়েছে। এই লোকোত্বর প্রতিভাধারী 
কবির কল্পনা কত বৈচিত্র্যময় । নৃতন ভঙ্গিতে তিনি তাই বলছেন £ 


বাধন ছেঁড়ীর সাধন তাহার, স্থষ্টি তাহার খেল! । 
দস্্যর মত ভেঙেচুরে দেয় চিরাভ্যাসের মেল] । 
যূল্যহীনেরে সোনা করিবার 

পরশপাথর হাতে আছে তার, 

তাই তে প্রাচীন্‌ সঞ্চিত ধনে উদ্ধত অবহেল। ৷ 


রবীন্দ্রনাথের এই প্রসঙ্গে প্রযোজ্য তৃতীয় ভাবন। হলো  স্থষ্িপ্রব।হকে 
নৃত্যের সহিত তুলনা করা । পুবেই বল৷। হয়েছে, তার ধারণায় স্থষ্টির 
প্রবাহকে অবঙগম্বন করে “আনন্দ শত শত মৃতি ধরে” বিকশিত হয়ে 
উঠে জীবনকে “নিবিড় সুধায় ভরে দেয় । এই আনন্দকে আস্বাদ 
করতে হলে দৈনন্দিন দৃষ্টিভঙ্গির উপরে উঠতে হয়। দৈনন্দিন জীবনের 
দৃষ্টিভঙ্গি বিখণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি ; তা! খণ্ড আকারে বিষয়কে দেখে; তাই 
ব্যক্ি-জীবনের সঙ্কুচিত দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে ক্রিয়াশীল ॥ সেখানে আমরা 
স্থখ পাই, হুখ পাই, ভালবাসি, রাগ করি, শোকের আঘাতে, মৃত্যুর 
আঘাতে কষ্ট পাই। কিন্তু যদি অথণ্ড দৃষ্টিভঙ্গিতে উত্তীর্ণ হতে পারি, 
তা হলে সুখ-ছুখ, গ্রীতি-বিদ্বেষ, আশা-নৈরাশ্য প্রভৃতিকে নৃতন ভাবে 


৯৯৩ 


উপলব্ধি করি। তখন যে অনুভূতি জাগে তাই আনন্দ এবং, স্থুখ ছুঃখ 
প্রভৃতি তার উপাদান হয়ে যায় । 
কেমন করে এই বিম্ময়কর রূপান্তর ঘটে ত৷ একটি উদাহরণ দিয়ে 

বোঝান যেতে পারে। অন্য প্রসঙ্গে আমি সেটির "ব্যবহার করেছি ; 
কিন্তু বিষয়টি বোঝা সহজ করতে তাকে আবার ব্যবহার করার 
প্রয়োজন হয়ে পড়েছে । ছুই শ্রেণীর মানুষ ফুটবল খেল দেখতে 
যায়। এক শ্রেণী হলে।; যে হই প্রতিদ্বন্ী দল খেলায় নামবে, তাদের 
নিজ নিজ সমর্থক দল। মর এক শ্রেণীর দর্শক আছে যারা কোনও 
দলেব সমর্থক নয়: ভাল খেল! দেখতেই তার! মাঠে যায়। অবস্থার 
পার্থক্য হেতু এই ছুই শ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গিরও পার্থক্য এসে পড়ে ॥ ছুই 
দলেব নিজ নিজ সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি খণ্ডিত ২ কারণ তারা বিশেষ 
দলের জয়-পরাজয়ের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত। অপর পক্ষে ষে 
নিরপেক্ষ দর্শক তার দৃষ্টিভঙ্গি অখণ্ড : কারণ সে খেলাকে সমগ্রভাবে 
দেখতে চায়, একটি বিশেষ দলের খেলাকেই শুধু দেখতে চায় না। 
ফলে প্রথম দল খণ্ডত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখে বলে তার সমধিত দল 
হারলে হুঃখ এবং জিতলে স্থখ পায়; কিন্তু খেল! জমে উঠলে যে 
আনন্দ সঞ্তাত হয়, ত। তার নাগালের বাহিরে থেকে যায়। অপরপক্ষে, 
যে দর্শক অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শুধু খেল! দেখবার আকর্ষণেই খেল! 
দেখে তাকে কোনও বিশেষ পক্ষের জয়ের সুখ বা পরাজয়ের হ্‌ঃখ 
স্পর্শ করে না; ছুই জড়িয়ে তার কাছে তার। আনন্দের উপাদানে 
রূপান্তরিত হয়। রবীন্দ্রনাথ এই ঘৃষ্টিভঙ্গিই গ্রহণ করেছেন। তাই 
হুঃখ ও সুখ জীবন ও মরণকে জড়িয়ে যে প্রাণের ধার! প্রবাহিত, তাকে 
তিনি “জগ্ম-মরণ খেল। বলেছেন । প্রাসঙ্গিক সঙ্গীতাংশটি এই £ 

এই জঙ্ম-মরণ খেলায় 

মোরা মিলি তারই মেলায়, 

এই হুঃখ স্থখের জীবন মোদের তারই খেলার ভঙ্গি ।৪০ 

8০, গতাঞ্জলিঃ ৩১ 


৯১৭ 


সৃষ্টি খেল|রপে কল্পনা করলে যেমন ছুটি দল এসে পড়ে, তেমন 
তাকে ন্ৃত্যুরপে কল্পনা করলে ছুটি পদক্ষেপ এসে পড়ে। সেই 
পদক্ষেপই নৃত্যের ছন্দের তাল রক্ষা করে। স্থৃতরাং রবীন্দ্রনাথ যখন 
স্থপ্িধারাকে নৃত্যের সঙ্গে তুলন| করেছেন, তখন অষ্টা বৃত্যুপরায়ণ 
শিল্পীতে পরিণত হয়েছেন এবং অুখ-ছুঃখ, ভাল-মন্দ, জদ্মা-সৃত্যু তার 
স্বত্যের ছন্দে পরিণত হয়েছে । এই পরিকল্পনাই পরিণত আকারে 
তার মনে বৃত্যপ্ররায়ণ নটরাজরূপে পরিক্ষুট হয়ে উঠেছে । স্থষ্টিখারার 
এমন বর্ণাঢ্য পরিকল্পনা বিশ্বসাহিত্যের কোথাও বোধহয় খুজে পাওয়া 
যাবে না। 

এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় লক্ষ্য করবাব এই যে এই পরিকল্পনা 
রবীন্দ্রনাথের মনে ছুটি অবস্থার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। প্রথমে তার 
মনে হয়েছে স্বষ্টি একটি বিরামহীন ধারা, ত। নিতা গতিশীল, তা নিত্য- 
পরিবর্তনশীল। তাই তাকে তিনি নদীর প্রবাহের সঙ্গে তুলন। 
করেছেন। কিন্তু উপমাটি প্রয়োগ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি 
করেছেন যে প্রবাহেব পরিকল্পনা কেবল স্যপ্িধাবার গতিশীলতাবই 
পরিচয় দেয় । তাকে অবলম্বন করে, স্থ্টি ও ধ্বংসকে উপাদান করে 
নিয়ে যে আনন্দধার। প্রবাহিত হয়, তাব পরিচয় দেয় না। তাই তিনে 
নৃত্যের সঙ্গে তার তুলনা করেছেন । তাতে যেমন গতি প্রকট, তেমন 
ছন্দ প্রকট এবং সেই ছন্দকে অবলম্বন করে আনন্দ প্রকট । 

এই ছোট তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাসটুকু তার বিখ্যাত কবিতা! “চঞ্চলায়'* ১ 
লিপিবদ্ধ হয়েছে । এই কবিতাটির বর্ণনীয় বিষয় স্ষ্টি প্রবাহ ॥ এই 
বিষয়টির প্রকৃতির পরিচয় দিতে কৰি পর পর তিনটি ভাবমৃত্তি স্থাপন 
করেছেন। এইরূপে ততবার ভাবমূতি পরিবর্তনের কারণ, স্থপ্রিধারার 
প্রকৃতি সম্বন্ধে তিনি যা বলতে চেয়েছেন ত৷ প্রথম ছুটির সাহাযো 
সম্পূর্ণরূপে বল! যায় না বলে। এইভাবে আমর! দেখি, তিনি 
স্থপ্টিধারার সঙ্গে প্রথমে নদীর শত্রোতের তুলনা করেছেন, তার পর 


৪১৯. বলাকা, % চলা 


১১৮ 


তাকে বিবাগিনী, অভিসারিনী নারীর সন্ঠিত তুলন৷ করেছেন এবং 
থেমেছেন তাকে ন্ৃত্যপর! 'অপ্দবীর সাথে তুলনা করে। প্রতোকটি 


কল্পনাই সুন্দর এবং তিনটি জড়িয়ে তার বক্তব্যটি পরিপূর্ণ রূপ 
পেয়েছে । 

প্রথম পরিকল্পনায় স্থষ্টিধার। এক, বিরাট নদী, নিত্য প্রবাহিত। 
তার তরঙ্গের সংঘাতে যে ফেন। জেগে ওঠে তাই হল বস্তা; তার মধ্যে 
যে ঘৃণি আবঠিত হয় তাতে যে বুদবুদ ফুটে ওঠে, তাই হলো! গ্রহ, চক্র, 
তারকা : 


বস্তহীন প্রবাহের প্রচণ্ড আঘাত লেগে 
পু গুঞ্জ বন্ত ফেনা ওঠে জেগে, 
আলোকের তীব্রচ্ছটা বিচ্ছ,রিয়া উঠে বর্ণ আোতে 
ধাবমান অন্ধকার হতে। 
ঘর্ণাচক্রে ঘুরে ঘুরে মরে 
স্তরে স্তরে 
ূর্য চন্দ্র তারা যত 
ধুদবুদের মত। 


কিন্তু তাতে কবি তৃপ্তি পান নি। তিনি লক্ষা করেছেন, স্তর 

নধ্যে শুধু অবাধ গতি নেই, একটি লক্ষ্যও আছে। ্ৃষ্টিধারা শুধু 
বৈরাগিনী নয়, নিরুদ্দেশ পথ চলাতেই সে নিযুক্ত নয়: নিশ্চয় কোনও 
নিদিষ্ট লক্ষে তাব তীব্র আকর্ণ আছে। সে কি সুদুরের প্রেমের 
আকর্ষণ? তাহলে ততিনি অভিসাবিণী। স্বতরাং নদী পরিবতিত 
হয়েছে অভিসারিক! নারীতে £ 

অন্তহীন দূর 

তোমারে নিরস্তর দেয় সাড়া? 

সর্বনাশ। প্রেমে তার নিত্য তাই তুমি ঘর ছাড়া? 

উতন্মপ্ত সে অভিসারে 


১১৪৯ 


তথ বক্ষ হারে 
ঘন ঘন লাগে দোলা--ছড়ায় অমনি 
নক্ষত্রের মণি ; 

কিন্তু তাতেও ত কবির তৃপ্তি হল না। কারণ, স্থপ্টিধারা ত শুধু 
গতি নয়, শুধু বিবাগিনীর নিরুদ্দেশ চল। নয়; এ ত শিল্প যা গতিশীল। 
তাই নদী শেষে রূপান্তরিত হল নৃত্যপব। অঞ্ধরীতে। তার ন্বত্যের 
ছন্দ জীবন ও মৃত্যু £ 

ওগো! নটী, চঞ্চল। অপ্পদবী, 

তব নৃত্য মন্দাকিনী নিতা ঝরি ঝরি। 
তুলিতেছে শুচি করি 
মৃত্যু স্নানে বিশ্বের জীবন । 

'বলাকা'র প্রকাশ তারিখ ১৯১৬ খ্রীষ্টাব্ব । রবীন্দ্রনাথের প্রতীকধর্মী 
নাটক “রাজ। প্রকাশিত হয় ১৯১০ খ্রীষ্টাকে। তখনই মনে হয় 
বিশ্বসন্তাকে বৃত্যশিল্পীরূপে পরিকল্পনার কথ! তার মনে উদয় হয়েছিল । 
তার প্রমাণ স্ব£প তার অন্তভূক্তি একটি সঙ্গীতের প্রাসঙ্গিক অংশ 
এখানে উদ্ধত কর! যেতে পারে £ 

মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে 

তাত! থৈ থৈ তাতা থৈ থে তাতা থে থে। 
তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে 

তাত! থে থে তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ ॥ 
হাসি কান্না হীরা পান্না দোলে ভালে 
কাপে ছন্দে ভালে! মন্দ তালে তালে । 
নাচে জম্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে। 

এখানে স্প্টিপ্রবাহকে নৃত্যধারার সহিত তুলনা কর! হয়েছে । যে 
নট নাঁচেন হাসি-কান্স। তার ভূষণ, ভালো-মন্দ তার নৃত্যের ছন্দ, 
জন্ম-মৃত্যু সে নৃত্যপ্রবাহছের অঙ্ । ফলে যা উপজিত হয় তা আনন্ট। 
তার উল্লেখও এই সংগীতে আছে। সুতরাং সংক্ষেপে বিশ্বরচনাকে 


২২৩ 


নবত্যণিল্প বলে পরিকল্গানা এখানে প্রায় পূর্ণাঙ্গরূপে পরিস্ষুট। তবে 
কে যে'ন্নহা করেন তার সুস্পষ্ট উল্লেখ এখানে নাই । মনে হয় দুটি 
পরিকল্পন।--একটি প্রবাহিণী নদী ও অপরটি নৃতাপরায়ণ শিল্পী-- 
এদের মধ্যে একটা দোটানাভাব ছিল। সেটি সুস্পষ্টভাবে প্রকট 
হয়েছে 'বলাকা'র “ঞ্চল।' পর্ষক কবিতায় ॥। শেষে যেন নৃত্যপরায়ণ 
শিল্পীরূপটিই ভিতে গেছে, অর্থাৎ কবির তাকেই বেশী ভাল লেগেছে 
এবং সেই কারণে এই কবিতায় নদী নটীতে রূপান্তরিত হয়েছে। 
বিশ্বসগ্ভার নৃত্যশিল্পারূপ ষে পরবতী কালে রবীন্দ্রনাথের মনকে 
রীতিমতো! দখল করে বসেছিল তার পরিচয় পাই ১৯১৭ গ্রাষ্টাবে 
প্রকাশিত খতুরঙ্গ' শার্ধক গীতিগুচ্ছের মধ্যে । তার পরিকল্পনাটি 
এইরূপ £ বিশ্বসত্ততকে সেখানে নটরাজরূপে কল্পনা করা হয়েছে। 
তার দ্বৃতো যে আনন্দ উল হয় তারই আকর্ষণে ছয় খতুর 
আবর্ভব। পরিকল্লন।টি নৃতন দয়, পুরাতন ; 'গীতাঞ্জলি'র একটি 
কবিতায় তাকে আভাসে পাওয়। যায়৪২। তার প্রাসাঙ্গক অংশটি 
এই £ 
সেই আনন্দ চরণ পাতে 
ছয় খহু যে নৃত্যে মাতে, 
প্লাবন বহে যায় ধরাতে 
বরণ গীতে গন্ধেরে | 
এই চিন্ত/ই “ধতুরঙ্গে' সবিস্তারে বগিত হয়েছে । এর সঙ্গীত- 
গুলির মধ্যে নটরাজের ভাবমূতি পরিপূর্ণভাবে বিকাশলাভ করছে। 
রাজার সঙ্গীতে যিনি অনশিদিই সন্ত। কপ 'কো' সব্নাম দ্বারা চিহ্চিত, 
ডিনি এখানে নটরাজ্রূপে পরিকল্পিত হয়েছেন । স্ৃট্টিধার! তার নুতা । 
স্থখ ছুখ সে নৃত্যের তাল। »সই তালে যে মাধুষ উচ্ছু'লত হয়ে 
উঠল, তাই জড় অণুকে জেযোতির মঞ্জীর! পরিয়ে চন্দ্র-ভাঙুতে রূপাস্তরিত 


৪২. গীতাঞ্জলি, ৩৬ 
১৭২৯ 
উপানষদ--৮ 


করল। তা হতে যে প্রাণশক্জি মথিত হয়ে উঠল তাই যুগে যুগে কাশে 
কালে বিশ্বের প্রাণের বিকাশ ঘটাল। প্রাসঙ্গিক অংশটি এই ঃ " 
নৃত্যের বশে সুন্দর হল বিদ্রোহী পরমাণু 
পদযুগ ঘিবে জ্যোতি মঞ্জীরে বাজিল চক্দ্রভামু । 
তব নুতোর প্রাণ বেদনায় বিবশ বিশ্ব জাগে চেঙনায় 
যুগে যুগে কালে কালে স্ুবে সুরে তালে তালে, 
সুখ হঃখে হয় তবঙ্গময় তোমার পবমাণন্দ হে। 


চাখ 
উভয় চিন্তার তুলনা 


উপনিষদের ও ববীন্দ্রনাথেব আনন্দতঙ্গের ব্যাখ্যা যথাক্রমে উপরে 
স্থাপিত হয়েছে। এখন আমবা বিচার কবে দেখতে পাবি এই ছুই 
চিন্তার সাদৃগ্ভ কতখানি ॥ বল। বাহুগা যে সবক্ষেত্রেই চিন্তাছ্টিব মধ্য 
সাদৃশ্য এত সুস্পষ্ট ষে তা শিয়ে বিচাব কবাব কোনও প্রয়োজন থাকে 
না। আমরা অনায়াসে বিন। দ্বিধায় এই সিদ্ধান্ত কবতে পাবি যে এই 
ছুই চিন্তায় কোনও পার্থক্য নেই; একটি অন্ভেব অনুসবণ কবেছে। 
উভয়ের পরিকল্পনা একই । উভ/য়েবই বক্তব্য এই যে যিনি ছিলেন 
একক দ্বেতহীন সত্ত। তিনি অকাবণে, আনন্দ আন্বাদনেব জন্ত নিজের 
উপর দ্বৈতভাব আরোপ কবে স্ষ্টিব ধাবাবপে প্রকাশ নিলেন। 
কারণ, বিশ্বসব। শিল্পী, বিশ্ব হল তাব শিল্প। তিনিই একাধাৰে শিল্পী, 
শিল্প ও শিল্পবসিক। তাই বিশ্বসন্ত ই আনন্দ। উপনিষদে বণ্রিত 
বরুণেব পুত্র ভগুব মতে। রবীন্দ্রনাথও উপলব্ধি করেছিলেন আনন্দই 
ত্রক্ধ। এই মানন্দেব প্রকৃতি সম্থন্ধে পরিকল্পনাও উভয় চিন্তায় একই। 
আনন্। আন্বাদনেব অগ্য চাই ব্যাপক, অখণ্ড দৃষ্টিভজি। সুখ-হু:খ, 
জন্ম-মৃত্যু মানন্দের উপাদান। খণ্ড দুষ্টিভঙ্গিতে দুঃখেব আঘাত গাছে, 
সুখের তৃপ্তি আছে; কিন্তু অখণ্ড দৃষ্টিভলিতে এ ভেদ অর্থহীন, কারণ 


১২ 


তারা আনন্দের উপাদান হয়ে যায়। সেই জন্যই উপনিষদ বলতে 
পাবে, আ।নন্দেৰ আকর্ধণেই জীব জন্মগ্রহণ করে, জানন্দের আকধ,ণই 
সে মৃত্যুর মধ্যে লয় হয়। সেই জগ্চই রবীন্দ্রনাথ বলতে পারেন, 
নৃত্য পরায়ণ নটরাজের ভালেৰ ভূষণ হলো হাসি-কান্ন। | 

ছুই চিন্তার মধ্যে টুকু পার্থক্য লক্ষিত হয় তা হলে বর্ণনার 
ভঙ্গিতে । উপনিষদ্ধে খষিও কবি ছিলেন, ববীন্দ্রনাথও কবি ছিলেন । 
কিন্তু এ কথ! অনম্বীকার্ধ যে রবীন্দ্রনাথেব কাবাশক্তি অনন্য-সাধরণ। 
এমন শক্তিধব কবি বোধ হয় বিশ্বে আর দ্বিতীয় পাওয়। যাবে ন।। 
কাজেই উপনিষদে যে চিন্তা স'ক্ষেপে বণিত হয়েছে, সে চিন্তা 
রবীন্দ্রনাথের লেখনীব গুণে আরও বর্ণাট্য বপ পেয়েছে। উপনিষদে 
যেখানে ন্ষ্টিপ্রবাহকে আনন্দরূপ এবং অমুতরূপের প্রকাশ বলা 
হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের উন্ডাবনীশক্তি ও কল্পনাশক্তি তাকে নানাভাবে 
আরও চিন্তাকর্ষক কবে বর্ণনা করেছে। যা বিমুঙ্ আকারে উপনিষদের 
ভ।ষায় ৰূপ পেয়েছে, তা উপমা প্রয়োগের কৌশলে কোথাও খেলা, 
কোথাও যাছু, কোথাও নৃতাৰপে বণিত হয়ে অপূর্ব শোভা ধারণ 
করেছে! 

এ হুলে। পাহিবের বিষয়, গৌণ বিষয় ; মূল কথ। হলে! একই চিন্তা 
উভয়ক্ষের়্ে প্রকট হয়েছে । ঠিক বলতো ক এই পরিকল্পনায় আনন্দ- 
তত্বের প্রসঙ্গে ববীন্দ্রনাথ বাধ হয় উপন্িষদেৰ অতান্ত কাছে চলে 
এসেছেন, তার প্রমাণপরীপ ভাষার ও ভাবের আশ্চষরকম সাদৃশ) 
অনেক ক্ষেত্রে পাওয়। যাবে । আমাদের প্রততিপাঞ্থের সমর্থনে কেবল 
ছুটি উদাহরণ এখানে স্থাপন করলেই যধেষ্ট হবে। 

প্রথমে মুণ্ডক উপনিষদের দেই বিখাত বাণীটির উল্লেখ করা 
যেতে পারে £ 

তদিজ্ঞানেন পরিপশ্বাস্তি ধীব। আনন্দরূপমমূতং যাদ্বিভাতিঃ * 


8৩. মুণ্ডক ।২।৭ 


১২৩ 


এয় সঙ্গে তুলনা চলতে পারে রবীন্দ্রনাথের এই বচনটির 
দিকে দিকে আজ টুটিয়া সকল বন্ধ 


মূরতি ধরিয়৷ জাগিয়! উঠে আনন্দ, 
জীবন উঠিল নিবিড় নুধায় ভরিয়।৪ ৪ 
সাদৃশ্য এত সুস্পষ্ট যে মন্তব্য নিষ্পয়োজন । 
বৃহদারণ্যক উপনিষদে এই বাণীটি আছ £ মধুমৎ পাধিবং রজঃ 
মধু ছ্োৌরস্ত নঃ পিতা 0৬॥৩)৬ 
তার সঙ্গে হুলন। কর। ষেতে পারে রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিটি £ 
এ ছ্যালোক মধুময় মধুময় পৃথিবীর ধূলি-_ 
অন্তরে নিয়েছি আম তুলি 
এই মহা মন্ত্র খানি, 
চরিতার্থ জীবনের বাণী ।৪৭ 
এখানে উপনিষদের ভাষ| কবির মুখে প্রতিধবনিত হয়েছে 
রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব হৃদয় 'ও মনীষ। দিয়ে যে তত্ব উপলব্ধি করেছিলেন, 
তা যে উপনিষদের খষির দেওয়া তত্ব সে বিষয় তিনি নিজেও অবহিত 
ছিলেন মনে হয়। তার নীচে উদ্ধৃত মন্তবা হতে তার সমর্থন পাওয়া 
যাবে £ ূ্‌ 
“আমি স্বীকার করি, আনন্দাদ্ধোব খবিমানি ভৃতানি জায়ন্তে এবং 
শানন্দং প্রবস্তি অভিসংবিশস্তি-কিন্ধক সেই আনন্দ ছুংখকে বর্জন-কর। 
আনন্দ নয়, দুঃখকে আত্মসাৎ করা আনন্দ। সেই আনন্দের যে 
মঙ্গলরাপ তা অমঙ্গলকে অতিক্রম করেই, তাকে ত্যাগ করে নয়, তার 
যে অখণ্ড অদ্বৈতরূপ, তা সমস্ত বিভাগ ও বিরোধকে পরিপূর্ণ করে তুলে, 
তাকে অর্াকার করে নয় ।8* 


8৪. গীতাজালি, ১৩ 8৫. আরোগা, ১ ৪৬, আত্মপারিচয় 


১২৪ 


গৃণ্গৃগগৃ০্গগ পঞ্চম অধ্যায় %গগগঘগথ 
মৃত্যু ও অমৃত 
মৃত্যুরহস্য 


মানুষে জীবনে যতগুলি অভিজ্ঞত। আছে, তাদের মধ্যে মৃত্যুশোক 
নিশ্চিত সবাব থেকে বড় আঘাত । ঘটনাটি যেমন আকন্মিক বলে 
মনে হয় তেমনি তা রহস্ত-আাবৃত। একটি জাবন্ত মানুষ হাসছে, গল্প 
করছে, কাজ করছে; কিন্তু হঠাং যখন মৃত্া এসে তার জীবনদীপ 
নির্ধাপিত কবে দিল তখন দে মানুষটিব আব কোনও সন্ধান পাওয়া 
যায় না। তখন তাব দেহ নিতান্তই জড় পদ!৫ের মতে। নিক্রিয় হয়ে 
পড়ে থাকে । আত্মীয়-স্জনেব মনে তা কি প্রচণ্ড আঘাত হানে তার 
বিষয় কল বয়স্ক মানুষেরই আভজ্ঞতা। আছে । 

মৃত্যু যে মানুষের চোখে ভয়ঙ্কব হয়ে ওঠে তার কাবণ বোধ হয় ছুটি । 
প্রথম যার সঙ্গে গ্রী তর সম্পর্ক মাছে, যে একান্ত আপনজন তাকে 
চিরকালেব জগ্ হারিয়ে বসলাম- এই উপল।্ধ মনে প্রচণ্ড আঘাত হানে । 
এই চিরস্থায়ী বিচ্ছেদবোধ হতে যে প্রচণ্ড ছঃখবে।ধ মানুষের মনকে 
নিপীড়িত করে, তার বোধহয় অন্য কোনও শোকের সঙ্গে তুলনা হয় 
না। তাই দেখি তাকে অবলম্বন কবে বিশ্বেৰ নান। সাহিত্যে হৃদয়- 
গ্রাহী কত কাবাগ্রস্থ বচিত হয়েছে । শেলীব 'এডোনেইল+, টোনিসনের 
“ইন মেমোরিয়ীম' তার উদাহধণ। কালিদাতসেব কাবো অজের বিলাপ 
এবং রূতর বিল।প তাই এ গভীরভাবে আমাদের মনকে স্পশ 
করে। বাংল। সাহিভো সরযুখাল। দাশগুপ্ত রচিত “বসন্ত-প্রয়াণও 
চক্্রশেখর মুখোপাধায় রচিত “উদ্ত্রান্ত প্রেম” অক্ষয়কুমার বড়াল রচিত 


১২৫ 


“এষা; কাব্যগ্রন্থ বা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ রচিত 'ন্মরণ' কাব্যগ্রন্থ এই প্রসঙ্গে 
উল্লেখ করা যেতে পারে। 

দ্বিতীয়ত মৃত্যুর পর যে লোকটি ছিল সে থাকে কি না, এ বিষয় 
নান! প্রশ্ন জাগে ; কিন্ত তার উত্তর মেলে ন।। জীবনের উপর মৃত্যু 
যখন যবনিকা টেনে দেয়, তখন তার ওপাবে কি ঘটছে তা জানবার 
উপায় নাই। আমব। নান। কল্পনা কবতে পারি; কিন্ত দে কল্পনার 
সত্যত। স্থ্বন্ধে কোনও নিশ্চয়তা নাই £ মৃত্যুব পৰ কি হয় তা জানবার 
আগ্রহ মানুষের একটি মূল কৌতুহলেব বিষ । তা অনন্তকাল ধরে 
উত্বাপিত হয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতে উত্থাপিত হবে । গীতায় অবশ্য 
বল! হয়েছে বিষয়টি আমাদের বোধশক্তির নাগালের বাইরে, ত। 
অব্যক্ত । আমবা কোথা হতে আসি তাও যেমন জানি না) তেমন 
মৃত্যুর পর কোথায় যাই, তাও জানি ন।: উভয়েই অবাক্ত, কেবল 
মাঝের অংশটি নিয়ে যে জীবন বচিত তাই বাস 1১ 

কঠ উপনিষদে এই প্রশ্ন একটি নুন্দব কাহিনর মধ্য দিয়ে স্থাপিত 
হয়েছিল । সেটি সংক্ষেপে এখানে বর্ণনা কব অপ্র।সঙ্গিক হবে ন। 
বরং তা নানাভাবে তাৎপষপুর্ণ হওয়ায় বমান গ্রন্থে বাব বার 
আলোচনার বিষয় হয়ে তবে । সক্ষেপে কাহিনীটি ৭ই | নচিকেতার 
পিত। ওদ্দালক আরুণি ছুগ্ধবতী নয় এমন বৃদ্ধা গাভী দান কক্ছেন 
দেখে প্রতিবাদ করায় পিতা রাগেব মাথায় বললেন, তে।মাঘ যমকে 
দেব॥ ফলে নচিকেতা যমেব বাড়ি আনীত হলেন, কিন্তু পিতার 
প্রতি অভিমান-হেতু উপবাসী বইলেন। অঠিথি উপবাসী থাকলে 
অকল্যাণ হয় এই বিবেচনায়, যম তাকে অন্নগ্রহণ কবতে অন্নবোধ 
করলেন এপং অতিরিক্রভাবে অনুরোধ বাখলে তিনটি বব দেবার 
প্রতিশ্রুতি দিলেন। বর হিসাবে নচিকেতা য।-য। চাইলেন তাণের চিন্তম 
হল মৃত বাক্তির কি শবস্থ। হয় জানতে । প্রশ্নটি এখানে নচিকেতার 


৯, অবাস্তাদীনি ভুতানি ভারত । অব্যন্তনিধনানোৰ তন্ত্র কা পারদেবনা ॥ 
-গীতা /২২২ 


১৬ 


মুখের ভাষাতেই স্থাপন করা যেতে পারে £ 

এই যে মৃত ব্যক্তিব বিষয় মানুষেব সংশয়, কেউ বলে সে থাকে, 
কেউ বলে থাকে না, এ বিষয় বিছ্ঠ/ আপনার নিকট শিক্ষা করব--এই 
হলে! আমার তৃতীয় বর ।”২ 

কিন্তু যম এ বিষয় তাকে নিকংসাহ কববাব জন্য নানা লোভ 
দেখলেন। নচিকেত। তবু অটল বইলেন। যম তখন খুশী হয়ে 
তাকে মৃতু সম্বন্ধে এবং শ্রেয়তত্ব সম্বন্ধে উপদেশ দিলেন । 

এই কাহিনীর মূল সূত্র বনু প্রাচীন। খগ.বেদেও যম এবং 
শচিকেতার সাক্ষাৎকাবেব উল্লেখ তাছে।হ তবে ত। খুব সংক্ষিপ্ত; 
সেখানে মৃত্যু সম্বন্ধে প্রশ্মেব উল্লেখ নাই। তাতে শুধু বল! হয়েছে, 
পিতার নির্দেশে নচিকেতা পিতৃলোকে গিয়েছিলেন এবং যম সেখান 
থেকে তাকে পিতৃগুহে জীবিত অবস্থায় ফিবিয়ে দিয়েছিলেন । সুতরাং 
উপনিষদেব কাহিণী তুলনায় অনেক সুন্দৰ “যমন কাব্যগুণে সমৃদ্ধ, 
তেমন তত্বকথায় মহিমান্বিত । 

আমরা দেখব এই প্রশ্ন উপনিষদেব খষিব মনকে বিশেষভাবে 
আলোড়িত করেছিল। ত| নিয়ে খিভিপ্ন উপনিষদে আলোচন। করা 
হয়েছে এব" মৃতাব তাৎপর্য কি তা নিয়েও গালোচনা হয়েছে, 
অতিরিক্তভাবে এই বহস্তয ভেদ কববাব ১চষ্টা হয়েছে। বর্তমান অধ্ায়ে 
আমাদের এ বিষয় বিস্তাবিত আপেল ৮নাব অবকাশ ঘটবে। 

অপব দিকে “দখি ববান্দ্রনাথেব মতো দার্শনক-দষ্টিভঙ্গি-সম্পন্ন 
কবির মনেও প্রশ্নটি বাব বার উঠেছে। তার জীবনে মৃত্যু বাব বাৰ 
দেখ! দিয়েছে, অতি ঘণিষ্ঠ আত্মীয়দেব তাব কাছ হতে নির্মমভাবে 
সরিয়ে নিয়েছে। সুতরাং মৃত্াবহস্ত ভেদ কববার ইচ্ছা ভাব মনে বাব 
বার উদয় হয়েছে। তাই দেখি তাব কাব্যে অতি তকণ বয়স হতে 

২. যেয়ং প্রেতে 'বিচাকংসা মনুষ্োহস্তখতোকে নাষমস্ততি চৈকে। 


এতাঁবদ্যামনুশিষ্টস্ভয়াহং ববাণামেঘ বরস্তৃতীঃ। কণঠ ॥১২1২০ 
৩. খাগবেদ 1১০1৯৩৫ 


৪২৭ 


জীবনের সায়া কাল পর্যস্ত মৃত্যু সম্পকিত প্রশ্ন নিয়ে আলোচন! 
আছে। এই সম্বন্ধে তার পরিণত চিন্তায় একটি সমাধানও স্থাপন 
করা হয়েছে। বর্ভমান প্রসঙ্গে তার সেই চিস্তাগুলিকে স্ুসংবদ্ধ 
আকারে সংগ্রহ করে আমাদের স্থাপন করতে হবে। তবেই আমরা! 
প্রস্তুত হব মৃত্যু সম্পর্কিত উপনিষদের চিন্তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিজঙ্গ 
চিন্তার তুলনামূলক আলো চন! করতে । 

আলোচনার শেষে আমরা দেখব এই প্রশ্থের সম্বন্ধেও উভয়ের চিন্ত। 
অত্যন্ত কাছাকাছি এসে গেছে। শানন্দতত্ব সম্বন্ধে যে কথা বল। 
হয়েছে সে কথা এখানেও খাটে । রবীন্দ্রনাথের পঞ্গিণত চিন্তা ষেন 
উপনিষদের চিন্তার প্রতিধ্বনি বলে মনে হয়। তার তাষায় নতুন 
ভঙ্গিতে প্রাচীন খধির বাণীই যেন শুনতে পাই। প্রস্তুতি হিসাবে 
এইটকু বলেই আমর। মূল আলে'চনার মধ্যে প্রবেশ কবতে পারি। 


্‌ই 
উপানধদের মৃত্যু স্পকিত চিন্তা 


এই আলো চন। প্রসঙ্গে আমরা দেখব উপন্যিদের বচনে "মৃত ও 
“অমৃত এই শব্দ ছুটি একযোগে হোক, পুথক ভাবে হোক বার বার 
ব্যবহার করা হয়েছে । মৃত্যুর অর্থে কি বুঝবি সে সম্বন্ধে অস্পষ্টতা 
নাই। জীবনের ত! বিপরীত । তাদের সহাবস্থিতি সম্ভব নয়। জীবনের 
যখন সমাপ্তি ঘটে তখন মৃত্যুকে পাই । অসুত শকের অর্থ কিন্ত সুস্পই 
নয় এবং দেখ! যায় উপনিষদের বাণীতে এবং 'অন্তত্র বিভিন্ন অর্থে 
ব্যবহার কর! হয়েছে । সুতরাং উপনিষদে ব্যবহ্াত “মৃতের অর্থ কি 
সে বিষয়ে আমাদের বিশ্লেষণ করে জানা উচিত। 

সোজাস্থভি অমৃত অর্থে বুঝি যা জীবিত। | মৃত্য দ্বারা আক্রান্ত 
হয় না তাকে সাধারণ ভাষায় অমৃত বলি না, বলি অমর বা অমর্ত্য। 
যা মরপণীল তাই মর বা মত্য। সুতরাং য। মরে না তাই অমর বা 


১৯ 


অমর্ড্য। কিন্তু অমৃতের অন্য অর্থও আছে।, 

আমর! জানি উপনিষদোত্তব যুগে অত শব্দটি হই অর্থে ব্যবহার 
কর! হয়েছে। মেদিনী মুক্তি অর্থে তাকে ব্যবহার করেছেন এবং 
পৌরাণিক কাহিনী অন্রসারে সমুদ্রে মন্থন কবে যা পাওয়া গিয়েছিল 
এবং যাপান করে দেবতার অমর হয়েছিলেন তাকে ও অস্ত বলেছেন। 
প্রাচীন উপনিষদের যুগে এই ছুটি অর্থের কোনটিই ব্যবহৃত হবার সম্ভাবনা 
ছিল না। কারণ, ত। ছিল বেদের ভান কাণ্ডের যুগ। তখনও পরজন্মবাদ 
এবং পরজন্মতত্ব তার বর্তমান রূপ গ্রহণ করে বদ্ধমূল সংস্কারে পরিণত 
হয় নি; এ বিষয় একটি অস্ফুট ধাবণ। মাত্র বীজাকারে ছিল । কাজেই 
মুক্তির আকৃতি সে যুগে জাগে শি॥ প্রাচীন উপনিষদ্চলিতে মুক্তি 
শব্দটিব প্রয়োগ কোথা ও দেখ। যায় না। দ্বিতীত, সে যুগে পুবাণগুলি 
রচিত হয় নি। কাজেই পাথবীকে দোহম করে “য অযুত পাওয়া গেল 
এবং ছুবাসার শাপে সমু প 5: শিন্ষপ্ত হলে। এবং দেবতারা অস্থরদের 
সাহায্যে তাকে মন্থন কবে খেয়ে অমব হলেন, সে অযৃতের সঙ্গে 
উপনিষদেব খণ্ষব পরিচিত হওয়1 সম্ভব ছিল না। 

উপনিষদে 'অয় ৬ শব্দটি ছুই বিভিন্ন অর্থে বাবচত হয়েছে । প্রথম 
অর্থ হ,লা অমতা হওয়া অর্থাৎ মৃত্াব অধীনতা। হতে মুক্ত হওয়া। 
দ্বশ্তীয় আর্থে তা আনন্দের সমার্থবোধক ॥ কোথায় কোন্‌ অর্থ ব্যবহার 
করা হয়েছে ত। নির্ধারিত হবে যে প্রসঙ্গে তা বাবহার হয়েছে তা৷ 
হতে। এই প্রসঙ্গে কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্বাপন করা যেতে পারে । 

অম্বতেন অমর্ভা অর্থে বাবহারে দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে বৃহদারণাক 
উপনিষদে নিত মৈত্রেয়া ও যাজ্জবক্ক্যের কাহিনীতে । যেখানে 
মৈত্রেয়ী প্রশ্ন করে'ছলেন, যাদ সমগ্র পৃথিবী বিং-স্ত পরিপূর্ণ হয়ে তার 
নিজন্দ সম্পাত্ত হয়, তা হলে কি তিনি “অমৃতা হবেন? উত্তরে 
যাজ্জবন্থ্য বলেছিলেন [বস্তির দ্বারা “অমৃতত্বে'র আশ। করা যায় না । 


৪. অমতস্বস্য তু নাশাস্তি। বৃহদারণ্যক 1২1৪।২ ও 61৫78 


৭৪ 


কাহিনী হতেই বোধ। যায় এখানে অমৃত শব্দটি মৃত্াহীন বা অমর্ত্য ব। 
অমর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 

অযুতকে আনন্দ অর্থে ব্যবহারের দুষ্টান্ত উপনিষদে অনেক অ।ছে। 
ঠিক বলতে কি আনন্দের সমার্থবোধক শব্দ হিসাবেই সেখানে তার 
ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে স্থাপন কর! হেতে 
পারে। 

এই প্রসঙ্গে আমরা লক্ষ্য করব যে প্রাচীন উপনিষদে আত্মা, 
ব্রহ্ম, অমুত ও আনন্দকে পবস্পবেব সমার্থবোধক শব হিসাবে ব্যবহাব 
কর! হয়েছে। তার কারণ খু'ঙ্ততে হলে আমাদের উপনিষদের দৃষ্টি 
ভঙ্গির কথ! উত্থাপন করতে হয়। উপনিষদের ধারণায় ইন্টরিয়গ্রাহা 
প্রকট বিশ্ব ও মূল সন্ত একই । তিনিই অহেতুক আনন্দ আশ্বাদনের 
জন্ত নিজেকে নষ্টিপ্রবাহরূপে পরিবতিত কবছেন। ফলে তিনি 
একাধারে বিশ্বের উপাদান কারণ, কপ কারণ এখং উ(দ্ঞ কারণ । 
উদ্দেশ আনন্দ উপলদ্ধি। আনন্দ উপলব্ধি হয় শিল্পেব রস গ্রহণ 
করে। সুতরাং স্থষ্টি শিল্প বটে । কাজেই মৌলিক সন্ত। একাধাবে 
শিল্প, শিল্পী, শিল্পরসিক এবং অমৃত ব। আনন্দ । নিশ্বসত্ত। প্রচ্ছন্নাভাবে 
সকঙ্দ জড় ও চেতন পদার্থের মধ্যে বিরাঙ্গ করেন বলে তিনি আত্মা । 
যা নিজেকে গোপন রেখে কাক করে তাই আয! । তিন বর্ধিত হয়ে 
বিশ্বরূণপে প্রকট হন বলে ব্রহ্ম । তিনি বিশ্ব রচন। করে নিজকে শিল্পা 
বন্ততে পরিণত করেন বলে তিনি অম্ুত | এখানে অমৃত নসের প্রতি- 
শব রূপে বাবহাত হয়েছে এবং তার আব্বাদনে আনন্দ উপলব্ধি হয় 
বলে তিনি আনন্দও বটে। এইভাবে অমৃত ও আনন্দ এক রকম 
সমার্থবোধক শব্দ হয়ে ঈাড়িয়েছে। এই প্রসঙ্গে উপনিষদের এই বচনটি 
চক্ষ্য করা যেতে পারে: 

“যিনি সকল জীবের মধ্যে গবস্থিত থেকেও তাঁদের থেকে গৃথক, 
ধার (উপস্থিতি ) বিভিন্ন জীবের! লক্ষ্য করে না, ধার সক জীব 
শরীর স্থানীয়) যিনি সকল জীবের অভ্যন্তরে থেকে তাদের নিয়ন্ত্রিত 


১৩০ 


করেন, তিনি হলেন তোমার সেই অন্তর্যামী অমুত, আত্ম! ।৮৫ 

উপরের উদ্ধৃত বচনে আত্ম। যে ব্রন্ষের সমার্থবোধক শব্দ হিসাবে 
ব্যবহাত হয়েছে ত1 বেশ সুস্পষ্ট । তা ন। হলে গ্কাকে সকল জীবের 
অন্তরে থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন বলে বর্ণনা করা হত না। তিনি 
সকল জীবের অন্তরে থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন বলেই অন্তর্ধামী, আর 
তিনি নিজেকে এমনভাবে গোপন রাখেন যে জীবের তার অবস্থিতি 
লক্ষ্য করে না; তাই তিনি আত্ম।। সেই আত্ম? ব। ব্রক্মষকে এই বচনে 
আত্ম। বলে বর্ণনা করা হয়েছে। 

আত্মাকে কেন অমৃত বল। হয়েছে তার ব্যাখ্যা মিলবে আর একটি 
প্রাসঙ্গিক শ্লোকে। য। শুধু সুখ দেয় ন।, য। অত্যন্ত উল্লাস দেয় তাকেই 
অমৃত বলি। তা শুধু প্রঙ্ঞ। নয়, হৃদয়বৃপ্তিকেও আলোড়িত করে, তা 
চন্দণের প্রলেপের মতে হৃদয়কে নিপ্ধ করে । এই বোধ বা অনুভূতিকে 
জ্ঞাপন করতে আমরা স।ধারণত ছুটি শের ব্যবহার করি। যে বিষয় 
মনকে এমন অন্ুষ্ূতি দ্বারা সম্পৃক্ত করে তাকে মধুর বলি ধা অমৃত 
বলি। এই অথে হৃদয়কে স্পর্শ করে এমন বচনকে মধুর বলি বা 
অমৃতময় বলি। যাঁকে মধুর বলি তাকে মধুও বলি, কারণ ত। মাধুর্ষের 
আবন্বাদ দেয়। অনুরূপভাবে যাকে অমুতময় বলি তাকে অমৃতও বলি, 
কারণ তা অমুতের আন্বাদ দেয়। এই অর্থেই বলি যিনি মিষ্ট কথা 
বলেন তার বচনে মধু । এই অর্থেই সংস্কৃতি একটি বচন প্রচলিত 
আছে, “অম্ং বালভা।ষঙতম্» শিশুর বচন অমৃতম্বপ। আমরা 
দেখৰ যাঁকে এইভাবে মধুময় বল। যায়, তাকেই মধু বল। যায়, যাকে 
অমৃতনয় খল। হয়েছে তাকে অমৃত বল। হয়েছে। 

আমব। এখনি উল্লেখ করেছি যে উপনিষদে সাধারণ ক্ষেত্রে আত্মাকে 
ব্রন্মের সমার্থবোধক শব হিসাবে ব্যবহার কর! হয়েছে । আমরা এও 

৫. যঃ সর্বেষ ভুতেষ, তিষ্ঠন্‌ সর্বেভ্যো ভূতোব্যাহদ্তরো বং সবাণি 


ভূতান ন বিদ্‌ঃ যস্য সবাণি ভুতানি শরীরং বঃ সবাণি ভুতান্যন্তরো 
যময়ত্যেষ ত আত্মান্তষম্যম্ত ইতি ॥ বৃহদারগ্যক 1৩1৭1১৫ 


৯৩১ 


জানি পুরুষ শবটিও ত্রদ্বের সমার্থবোধক শব হিসাবে ব্যবহাত হয়েছে। 
সেই ব্রক্গ বা পুরুষ যেমন মানুষের অন্তরে অন্তর্যামীরূপে বিষ্তমান 
তেমন ব্‌হংপ্রকৃতিতেও প্রচ্ছন্নরূপে বির।জম।ন । উপনিষদ বলে উভয় 
রূপেই তিনি মধুস্ধরূপ বা অমৃতন্বরূপ। এই প্রসঙ্গে নীচের বচনটি 
লক্ষ্য করা যেতে পারে। 

“এই পৃথিবী সকল জীবের নিকট মধুস্বরপ। এই পৃথিবীর কাছে 
সকল জীব মধুস্বরূপ। এই পৃথিবীতে যে তেজোময় মমৃতময় পুরুষ 
আছেন এবং এই শরীরের অভান্তবে যে তেজোময় অমৃতময় পুরুষ 
আছেন, ইনিই তিনি, যিনি হলেন আত্মা, অমৃত, এই ব্রহ্ম, এই সব কিছু ।& 

এখানে লক্ষ্য করা যেতে পারে যে যে সস্তা মান্ুষেব অভ্যন্তরে 
আছেন এবং বাহিবে আছেন তাকে যুগপৎ পুকষ, আত্মা, ব্রহ্ম ও অমৃত 
বল। হুয়েছে। অতিরিক্তভাবে বল। হয়েছে তিনি একাধারে তেজোময় 
ও অমৃতময় ! অশেষ শক্তি ধারণ করেন বলে তিন তেজোময় ও 
অমৃতম্বরপ বলে তিনি অমৃতময়। বিকারার্থে ময়ট্‌ প্রত্যয় । বিশ্বের 
মধ্যে ব্যক্ত রূপ তেজেরই পরিবতিত বপ এবং অমুতের পরিবতিত রূপ । 

এইবার আর একটি বচন এই প্রসঙ্গে উদ্ধৃত কব। যেতে পারে, 
“আনন্দরূপ এবং অমৃতরূপে যিনি বিভামিত হায়েছেন ত'কে ধ্বাব বা্তি 
বিজ্ঞানের সাহায্যে উপলব্ধি করেন ।" 

এখানে বিজ্ঞানের অর্থ হলে। বিশেষ জ্ঞান অর্থাৎ পরাবিষ্ঠ। | 
উপনিষদের ব্যাখ্যায় পরাবিষ্ঠা1! হূল। তাই যা যিনি বিশ্বকে অখগ্ড রূপ 
দিয়ে বিশেষের ফোগন্বত্র হিসাবে বিরাজমান ভাব বিদ্যা দেয়। 

স্থৃতরাং আমর! দেখি ব্রন্গকে আনন্দও বলা হয়েছে এবং অমুতও 

৬. ইয়ং পুতিবী সবেষাং ভূতানাং মধদসো পাঁথবো সবাণি ভূতানি, মধু 

ষণ্চায়মস্যাং পাথিব্যাং তেজোময়োহমতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মক্ত্যাত্বং 
শারীরস্তেজাময়োহমৃতময়ঃ পুরুযোহ্মেব স যোহ়মাজেদমৃতামিদং 


বক্ষে সব: ॥ বহেদারণাক 1২1৫১ 


৭ তগ্িজ্ঞনেন পরিপশ্/ণ্তি ধীরা আনন্দরূপমমৃতং যখ্বিভাতি । 
মুপ্ডক ।২৫/৯ 


১৭ 


খন! হয়েছে। তার কারণটি বুঝতে আমাদের পূর্বে উদ্ধৃত তৈত্তিরায় 
উপশিষদের একটি বচনের পুনরায় উদ্ধৃত করতে হবে। তাতে বলা! 
হয়েছে “রসে বৈ সঃ রসং হোখায়ং লব্ধানন্দী ভবর্তি', তিনি রসম্বরূপ, 
তিনি রস আম্বাদ করে আনন্দে রূপান্তরিত হন ॥। এখানে রস শব্দটি 
একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনও শিল্পবস্তর মধ্যে যে 
স্ববষম। বিরাজ করছে তাকে আশ্বাদ করে আমরা আনন্দ পাই। 
শিল্লে বিধৃত এই স্ুবমাকে রসও বল। হয়: কারণ তার প:রচয় পেয়ে 
মণ রমিত ব। রসে আগ্নুত হয়। এখানে শিল্পবন্ত, তার আশ্রিত স্থৃযমা 
বা রস এবং তাকে আান্বাদন করে যে রসানুভূতি বা আনন্দানুভূতি, 
সবই এক হয়ে গেছে। সুতরাং বিশ্ব'শন্ররূণী ব্রহ্মকে রম বলে ধারণ! 
করতে উপানষদের খাষর বাধে ন।॥ রস হতেই রসোপলব্ধি এবং তা 
হতেই অমৃত বা আনন্দ আহ্বাদ হয় বলে রস বা অমৃত ব আনন্দকে 
এক বলতেও বাধে ন।। যিনি শিল্প, তিনিই শিল্প রমিক। তাই 
শিল্পে তিনি রম এবং শিল্পরসিকরূপে তিনি আনন্দ আস্বাদন করে 
“আনন্দী ভবতি | ন্ুতরাং আমর! এই [সদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি 
যে উপনিষদের একটি চিন্তায় অমৃত আনন্দের সমার্থবোধক হয়ে 
গেছে। 

উপনিষদে মৃত্যু ও অমৃত সম্বন্ধে আলোচন। হয়েছে । এক পধায়ে 
বল। হয়েছে মৃত্য আছে, কিন্তু মৃত্যু ব্রহ্ম বা আত্মাকে স্পর্শ করে না। 
আর এক পধায়ে বলা হয়েছে মৃহ্যকে খীকার করে নিয়েও আনন্দ ব! 
অম্তির আম্বাদ পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে ব্রদ্ষের ছুটি অবস্থার কথ। 
এসে পড়ে। প্রথম হলে। অমূর্ত বা দিতায়বিহন একক অবস্থা । তা 
হলে। সুষ্টিপ্রবাহন প্রবতিত হবার পুৰ অবস্থা । দ্বিতীয় হলো। ব্রন্ষের প্রকট 
রূপের অবস্থা । সেখানে তিনি বু ছারা খণ্ডিত এবং বিচিত্রিত। 
ত্রন্মের অমূর্ত অবস্থায় মৃত্যু তাকেস্পর্শ করতে পারে না, কারণ সে 
'অবস্থায় তিনি স্থষ্টিপ্রবাহের বহিভূতি এবং তাকে বিশেষণ দিয়ে ভূষিত 
কর! যায় না। দ্বিতীয় অবস্থায় দ্বৈতভাব আরোপিত হওয়ায় তাতে 


১৩৩ 


বু আছে, স্থপ্টির প্রবাহ আছে, কাজেই স্থান-কালের প্রভাব আছে। 
এই অবস্থায় মৃতু! আছে, কিন্তু অস্বত বা আনন্দের উপাদাণরূপে ত৷ 
বর্তমান । বিশ্বশিল্প ততট। চিত্রশিল্লের মত কেবল স্থাণাশ্ররী শিল্প নয়, 
তা কালাশ্রয়ী শিল্পও বটে । সেই অর্থে তাকে নাটোর সঙ্গে ব ছায়া 
শিল্পের সঙ্গে তুলন। কর! যায়। বিশ্বনাট্যে শানা ঘটনার সংঘাত 
আছে: নানা অভিজ্ঞতা, সুখ-হুখ, আশা-নৈধাশ্য, জগ্ম-মৃহ্য সে 
অভিজ্ঞতার অঙ্গ । এখানে মৃত্যু আছে কিন্ত অখণ্ড দৃষ্টি দিয়ে দেখলে 
তার দাহিক। শক্তি থাকে না, তা আনন্দ অনুভুতির অঙ্গ হয়ে যায়। 
এই হলো উপনিষদের প্রতিপাছ্। 


সুতরাং আমরা ছুই পর্যায়ে আলোচনা করবণ। প্রথমে ত্রন্ষের 
অমূর্ত রূপের কথ ধরা যাঁক। এই বচনটি হতে দেখ যাবে ব্রদ্মের ছুই 
অবস্থাব ছুটি রূপের উল্লেখ করা হয়েছে £ 


ব্রন্ষের ছুটি রূপ, মূর্ত এবং অমূর্ত, মর্তা এব* অমৃত, স্থির এবং 
গতিণীল, সন্তাবান এবং সন্তাহীন ।৮ 


স্পইতঃই এখানে স্প্টিপূৰ বীজসন। অবস্থায় অবস্থিত ব্র্মেৰ উল্লেখ 
কর! হয়েছে এবং স্থগ্রিরপে "তার গতিশীল মূ্ঠ প্রকাশের সহিত সেই 
নীজ অনস্থার তূলন! করা হয়েছে। অমূর্ভ অবস্থায় তরঙ্গ মরণশাল 
নয়, কারণ সেখানে তিনি একক এবং অদ্বিতীর বীজ সন্ভাবপে অবস্থিত ; 
কাজেই তিনি স্থাণু, গতিশীল নন। অপরপক্গে নিশবকপে প্রকট 
াবস্থায় তিনি স্মস্টির ধারার মধো গতিশীল । ঘূর্ভ অবস্থায় ভিনি 
স্থানকালে বিধৃত নন, তাই তিনি সন্তাবান নন, অথচ প্রকট বিশ্বরূপে 
তিনি স্থান-কালে বিধৃত হয়ে সম্তাবান্‌। ূ 

এই অমূর্ত রূপের খুব সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ একটি ব্ণন। 
আমরা পাই কঠ উপনিধদে । সেখানে:বলা হয়েছে, এই অবস্থায় 


৮. দ্ধে বাব ব্রহ্ষণো রূপে নূর্তং চৈবামৃতধ চ মর্তাং চামূর্তং চ স্ছিতং চ 
যচ্চ সচ্চ তাচ্চ ॥ বৃহদারণ্যক ২1৩1১ 


৯? 


1৩ন 'শবগুণহীন, স্পর্শগুণহীন, রসগুণহীন, গন্ধগুণহীন, আদিহীন 
এবং গপ্তহীন? ।৯ 

লক্ষ্য কর! যেতে পারে যে এখানে নেতিবাচক ভাষায় তাকে 
বর্ণনা কর। হয়েছে। কারণ এখানে তিনি বীজরূপী অব্যপদেশ্য 
সন্ত । সেই কারণে তার ওপর কোনও গুণ আরোপ ঝরা যায় না; 
তাকে কোনও বিশেষণ দিয়ে ভূষিত করা যায় ন।॥ সেই ভন্ই বল! 
হয়ে থাকে এই বীজ অধূত্ আত্মাকে নেতিবাচক কথ। দিয়ে ধারণা 
কর] ছাড়। উপায় নেই। এই প্রসঙ্গে বৃহদারণ্যক উপনিষদের এই 
এচনটি দেখ! যেতে পারে £ 

“এঠ আত্মা এ নয় ও নয়। তিনি অগৃন্য, তাই তাকে গ্রহণ করা 
যায় ন। :ং অশীর্ষ, তাই তাকে শীণ করা যায় নাঃ তিনি অসঙ্গ, তাই 
তাকে সঙ্গ দেওয়। যায় নং তিনি হনুভূতিহীন, তাই তাকে বাথা 
দেওয়া যায় না, তাকে বিনাশ করা যায় না।১১* 

এই অগূর্ত অবস্থায় ব্রহ্ম স্থ।ন কালে বিধৃত নন; কাজেই ইন্দরিয়- 
গ্রাহা বিশ্বে অবস্থিত বস্তর যে গুণগুলি আছে তাদেৰ তার ওপর 
প্রয়োগ করা যায় না। স্থপ্টিপ্রবাহে সৃষ্টি আছে, ধ্বংস আছে, 
পরিবর্ধন আছে, ক্ষয় আছে: কিন্ত যেহেতু তিনি স্থান-কালের উর্ধে 
তার ক্ষয় নেই। সেইজন) তাকে অক্ষয় বল। হয়েছে। বৃহদারণ্যক 
টউপানষদে তাই তাকে এইভাবে ধর্ণনা করা হয়েছে। 

“তিনি ( যাজ্ঞবঙ্্য ) বললেন £ গাগি, এই হলেন সেই অক্ষর ধার 
সম্বন্ধে ব্রহ্মবিদ্গণ বলেন যে তিনি অস্থুল, অণু নয়, অহুন্ব, অদীর্ঘ, 
অলোহিত, তৈলগুণসম্পন্ন নন, বায়ু নন, আকাশ নন তিনি সঙ্গহীন, 
রসহীন, গন্ধহীন, চক্ষুহাীন, শ্রোত্রহীন, বাকাবজিত, মনবজিত, তেজ- 

৯১ অশব্দমস্পর্শমপমবায়ং তথারসং 'নতামগম্ধবচ্চ যৎ ॥ অনাদানন্তং মহতঃ 

পরং ধ্রুবম: ॥ কঠ ।১1৩।১৫ 


১০ এয নোত নেগ্যাত্বাৎগৃহ্যো নহি গৃহাতেহশীযোঁ ন হি সজ্জতেহ্বসতো 
ণ ব্যথ্যতে ন রিষ/তি ॥ ব্‌হদারণ্যক 181২5 


১৩৫ 


বঙ্জিত, প্রাণহীন, মুখহীন, মীত্রাহীন, ছিদ্রহীন, তার বাইরে অভিব্যক্তি 
নাই, তিনি কিছু ভক্ষণ করেন না, তীকেও কেহ ভক্ষণ করে না?।১১ 
স্থতরাং বোব। যায় যে এই অমূর্ত অবস্থ। হলে। ব্রচ্মেব স্বস্তি পুব অবস্থা । 
যেহেতু সে অবস্থায় তিনি স্থষ্টিপ্রবাহের অঙ্গীভূত নন, সেহেতু তিশি 
স্থ(ন-কাের অতীত, জম্ম মৃত্যু অতীত, জবা তাকে স্পর্শ করে না, 
ওন না ভোগা না তোক্তা। ; এই ভন্থাই তাকে অক্ষর বলা হয়েছে। 
এই জঙ্তই ত,কে বিষৃত্যু বলা হয়েছে। সেই জন্যই মন্তাত্র বল। 
হয়েছে, এই অবস্থায় তাকে আহোরাত্রি মাঙক্রম কবে ন।, জবা) 
মৃত্যু, শোক,ন্ুকৃত, দৃদ্কৃত এবাও তাকে স্পর্শ কবে ন।।১২ 

কঠ উপনিষদে স্পষ্টতই বল! হয়েছে যে ত্রন্মোর এই অমৃত বা 
অক্ষর অবস্থায় তিনি মৃত্যুদ্বাণ। স্পৃই হন না, কাবণ তিনি জন্স-মৃত্যুর 
উধের্ব। নচিকেতা যমকে যে প্রশ্ন করেছিলেন প্রেঙায্ম।র মৃত্যুব পর 
কি হয় তাই তাকে বলতে হবে * সেই প্রসঙ্গেই যম এই কথাগু'ল 
বলেছিলেন। তবে জীবাত্ব। সম্বন্ধে এই উক্ত করা হয়নি । নচি.কতা 
কথোপকথনের মধ্যে তার প্রশ্ন পরিবঠিত করেছিলেন। সেই বিশেষ 
প্রশ্ন প্রসঙ্গে এই কথাগুলি নচিকেতা বলেছিলেন - 'ধমের উধ্বেঃ 
অধর্মের উধ্র্ধে এই কৃত অকৃত সমান্বত ( সংসারের ) উদের্ব ষ। দেখত 
পান তাই আমাকে বলুন 1১১৩ 

এই প্রমঙ্গেই যম ধাকে আক্ষর বল। হয়েছে তব কথ! উল্লেখ কবে 
ার সম্পর্কে বলোছলেন এই অক্ষ ব্রহ্ম নিত্য এবং শাশ্বত, তিনি 
মৃহ্রার উবের্ব। প্রাসঙ্গিক মন্তবাটি এই £ 

১১. লস. হোবা চৈতদ: বৈ তনক্ষরং গার্গি হঞ 1 অভিদন্তামূলমনপ্বহুস্বমত 

দীঘ'মলোহিওমস্নেহমন্ছায়ম তমোহবাদ্দনাবাশমসদনরসনগধন ক্ষ 


মগ্রোতমবাগ মনোহতেজক্কমপ্রাণ্মধুখমমান্মনম্তরমবাহাং ন ওুশনাতি 
কিং চন নতদ*শাতি কশ্চণ ॥ বৃহদারণ্যক 151৮৮ 

১২, নৈতং সেত্সহোরারে তনতো এ জরা ন মৃত্ার্ন পোকো ন শ্কৃতং ন 
দক্কেতম:। ছান্দোগা 1৮18৯ 


১৩. অন্যন্ত ধদিন্যানত্রাধ্মদনানাস্াৎ কৃতাকৃতাং ॥ অনান্ত ভুভা্চ মৎ পশ্যসি 
তদবদ ॥ কঠ 1১২1৯৪ 


৯৩৬ 


“এই প্রজ্ঞাময় সত্ত! জম্মান না, মরেন না, ইনি (স্থানে ) কোথাও 
অবস্থিত নন, ইনি কোথাও অতীতে ছিলেন না। ইনি অজ, নিত্য, 
শাশ্বত, পুরাণ, শরীর হত হলেও তিনি হত হুন ন11,১৪ 

এইভাবে দেখা যায় ত্র্মের ছুটি রূপের প্রসঙ্গে যেটি অমূর্ভ রূপ 
সে সম্বন্ধে উপনিবদে বল! হয়েছে যে সে অবস্থায় তিনি মৃত্যু দ্বারা 
আক্রান্ত হন না। কারণ, ষে ভাবে এইরূপ কলিত হয়েছে সেখানে 
মৃত্যুর অন্রপ্রবেশের স্বযোগ নাই। এখানে ব্রহ্ম স্থান-কালের উধ্বে” 
স্প্টিপ্রবাহের মধ্যে জড়িত নন; একক, অসঙ্গ, বিঘূর্ত সত্তা । এটি স্ৃষ্টি- 
পুর্ব অবস্থা । কাজেই এখানে জন্ম-মরণ, নুখ-ছখে, তোক্তা-ভোগ্য 
প্রভৃতির আবির্ভাবের অবকাশ নাই। এখানে তিনি স্থাণু এবং জেই 
কারণেই অক্ষর । 

এখন আমর! ব্রঙ্গের মৃত্ত অবস্থায় মৃত্যু ও অমৃতের কি সম্বন্ধ কল্পন। 
কর! হয়েছে তার আলোচনা করতে পারি! তার প্রস্ততি হিসাবে 
আমরা এই প্রসঙ্গে পূর্ববর্তা অধ্যায়ে আনন্দতব্বের ব্যাখ্যায় যা! বলেছি 
তার সংক্ষেপে পুনরুল্লেখ করতে পারি। একক মসঙ্গ ব্রহ্ম রস- 
অভিল।ষী হয়ে এই স্ষ্টি প্রবাহ প্রবতিভত করলেন। তখন বহু বিচিত্র 
বস্ত্র সমাবেশে গঠিত এই বিশ্ব এল। তার! পরস্পর ভোক্ৃ-ভোগ্য 
সম্বন্ধে যুক্ত হল। মানুষের মনে চেতন! এল। তার সুখবোধ এল, 
হুঃখবোধ এল । জন্ম এল, মৃত্যু এল। তার মৃত্যুশোক এল । 

এখন এই পরিবেশে মৃত্যু এবং অম্ৃতের সন্বন্ধটি উপনিষদের 
পরিকল্পনায় কি রকম দাড়ায় তা দেখে নিতে হবে। স্মপ্টিপ্রবাহই 
ব্রন্মের মূর্ত রূপ। যখন স্থপ্টি আছে, তখন ধবংসও আছে। যখন জন্ম 
আছে, তখন মৃত্যুও আছে। যখন সুখ আছে, তখন হঃখও আছে। 
উপ্ননিষদে এ সবই ম্বীকৃত। কাজেই ব্রন্ষের মুর্তরূপে মৃতু; ষে আছে 
তাও স্বীকৃত। কিন্তু তা বলে অমৃত যে নেই, তা নয়। 

১৪, ন জায়তে দ্রিয়তে বা বিপশ্চিম্বয়ং কুতশ্চিন্ন বভুব্‌ কঁচিং ॥ অজো 'নিতাঃ 

শাম্বতো হয়ং পঃরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে । কঠ ১২১৮ 


১৩৭ 
উপানহদ ১ 


তার কারণ এখানে অন্ত আনন্দ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, মরণহীন 
অর্থে নয়। ব্রদ্মের অমূর্ত অবস্থায় তাকে বিমৃত্যু বলে বর্ণনা! করা 
হয়েছে; কিন্তু মূর্ত অবস্থায় তাকে আনন্দরূপ এবং অমৃত বলে বর্ণনা 
করা হয়েছে। তার একটি কারণ আছে। উপনিষদের পরিকল্পনায় 
হুথ-ছ্ঃখ, আশা-নৈরাশ্ঠ, হাসি-কাল্প।, জন্ম-মৃত্যুকে আনন্দ বা অমৃতের 
উপাদানরূপে গ্রহণ কর! হয়েছে। 

কি করে স্ুখ-ছুঃখ, জন্ম-মৃত্যু আনন্দের বা অমৃতের উপাদান হয়ে 
যায়, ত। বুঝতে হলে আমাদের আবার আনন্দের সংজ্ঞার উল্লেখ করতে 
হয়। ছুই পক্ষ যখন খেলে তখন একপক্ষ হারে আর এক পক্ষ জেতে। 
সেখানে যে পক্ষ হারে তার ভাগ্যে হু) আর যে পক্ষ জেতে তার 
ভাগ্যে স্ুখ। যারা এই ছুই পক্ষের সমর্থক তাদের ভাগ্যেও তাই 
ঘটে। আর যদি কেউ নিরপেক্ষ দর্শক থাকেন, তার ভাগ্যে সেই 
দুর্দভ বস্তুটি জোটে যাকে উপনিষদে বলে আনন্দ বা অমৃত ॥ তার 
কারণ তিনি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে খেলার রস গ্রহণ করেন। 
একদলের হার ও অপব দলের জিত তাব কাছে অর্থহীন ; খেল! 
কতখানি জমে উঠল তাই তিনি দেখেন। অর্থাৎ তিনি খণ্ডিত দৃষ্টিভজি 
নিয়ে বিষয়টিকে দেখেন না, অখণ্ড দৃষ্টিভজি নিয়ে দেখেন । 

এখন আমর! ব্রচ্মের মূর্তবপে ব। দ্বৈতভাব মণ্তিত প্রবহমান স্ষ্টিরূগী 
ব্রদ্গে মৃত্যু কি ভাবে আনন্দ ব অমৃতের উপাদান হয়ে যায় সে বিষয় 
আলোচনার জন্য প্রস্তুত হয়েছি। আমর! ইতিপূর্বেই আলোচন! 
করেছি, উপনিষদের চিন্ত। অনুসারে রসের আম্বাদনের জন্য ব্রহ্ম 
আপনার উপর দ্বৈতভাব আরোপ করে বিশ্ব হলেন। তাঁর এই 
বিশ্বরূপই আনন্দরূপ ; কারণ তা শিল্প এবং আনন্দরূপ বলে তা৷ 
অমৃত । 

ব্রঙ্মোর এই দ্বৈতভ্ভাব মণ্ডিত মূর্তরূপের অবস্থায় মৃত্যু স্বীকৃত ; তবে 
তাকে আনন্দের উপাদান হিসাৰে গ্রহণ কর! হয়েছে। ্থপ্টিপ্রবাহে 
জন্ম আছে মৃত্যু আছে, ভাল আছে মন্দ আছে, হাসি আছে কাঙ্গ 


১৮ 


আছে। তাদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে সুখ-হখ বোধও আছে। কারও 
ভাল হলে সুখী হই, ভাগ্যে ভাল কিছু জুটলে খুশী হই, উৎসবে মন 
উৎফুল্ল হলে হাসি। অপর পক্ষে ঘনিষ্ঠ প্রিয়জনের মৃত্যু হলে শোকে 
অভিভূত হই, ভাগ্যে মন্দ ঘটলে ছুঃখ পাই, অবস্থা! প্রতিকূল হলে মন 
খারাপ হয়ে যায়। এ সবই স্বীকৃত। তবে উপনিষদের চিন্তায় এই 
সুখ-ছুখ বোধ আপেক্ষিক। দৃষ্টিভঙ্গির উপর তার অস্তিত্ব নির্ভর করে। 
এক দৃষ্টিভঙ্গিতে সুখবোধ, ছুঃখবোধ আছে, আর এক দৃষ্টিভজিতে তা 
নেই। এক দৃষ্টিভঙ্গিতে জন্মে সুখ এবং মৃত্যুতে শোকবোধ আছে। 
আর এক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই সুখ-ছুঃখ বোধের উপরে ওঠা যায় এবং ফলে 
শোকর বা মৃত্যুর দাহিকাশক্তি থাকে না। সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে য! পাই 
ত1 আনন্দ বা অন্ত । সুখ-হুঃখ তখন সেই আনন্দ বা অমৃতের উপাদান 
হয়ে যায়। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গির ভিতর দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে তবে আমরা 
আনন্দ বা অম্বত আন্বাদের অধিকারী হই। 

প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি হল বিচ্ছিন্ন ব| খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি। সেখানে মানুষ 
তার নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডির মধ্যে নিজেকে স্থাপন করে বিশ্ব- 
প্রবাহকে দেখে বলে সে মুখ-ছুঃখবোধের অধীন হয়। এই প্রসঙ্গে 
আমর! যে উপমাটি ব্যবহার করেছি তা ম্মরণ করতে পারি। যে 
খেলোয়াড় নিজের দলের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে খেল দেখে, সে জিতে সুখ 
পায়, হেরে ছুঃখ পায়। আর যে দর্শক নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কেবল 
শিল্প হিসাবে খেল। দেখে, তার রস গ্রহণ করতে চেষ্টা করে, তার কাছে 
হারজিত অর্থহীন; হারজিতকে উপাদান করে খেলায় যে সৌন্দর্য 
পরিশ্ফুট হল তাকেই সে গ্রহণ করে। সে তাই হারজিতের উধের্ব উঠে 
খেলাকে সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখে বলে সে খেলা দেখে আনন্দ 
পায়। সে আনন্দেএকপক্ষের জয় এবং অপর পক্ষের পরাজয়ের সমানই 
তাৎপর্য, তারা উভয়েই সে যে আনন্দ আস্বাদ করে তার উপাদান । 

অনুরূপভাবে আমর! যখন ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, অখণ্ড বিশ্ব 
হতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা ভাবি, 


১৩৪ 


তখন সুখ ছুঃখের ঘবারা আমাদের মন আন্দোলিত হয়। তখন আমর! 
অনুকূল কিছু ঘটলে সুখ পাই, হাঁসি, উৎসব করি, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের 
জন্ম হলে উল্লসিত হই। উপনিষদ একে খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি বলে। 

উপনিষদ আরও বলে, বিশ্বকে সন্থু চিত, বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হতে ন। দেখে, 
যদি অথ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখি, তা হলে তার মধ্যেই আমর আনন্দের 
বা অম্বতের আস্বাদ পাই । স্খ-ছুঃখ, আশা-নৈরাশ্ঠ, জন্ম-মৃত্যু তখন 
এই আনন্দ বা অধুতের উপাদান হয়ে যায় । ফলে ছঃখ তখন আমাদের 
বিচলিত করে না, মৃত্যুশোক আর গীড়া দেয় না। তাই উপনিষদ বলে, 
ষে মানুষ কৃপ্টিধারাকে অথণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে পারে সে সৃখ- 
হুংখ, হাসি-কান্না, জন্ম-মৃত্যুর সংঘাতের শাগালের বাহিরে চলে যায়। 
তখন সে আনন্দ আম্বাদ করে এবং এই আনন্দই অস্ত, অমরত্ব নয়। 
এই বিচ্ছিপ্ন বা খণ্ড দৃষ্টিভঙ্গিকে উপনিষদে মোহ বা অবিদ্ভ। বলা 
হয়েছে। এবং অখণ্ডের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্তৃতি বা একত্বের দৃষ্টিভঙ্গি বল। 
হয়েছে। মূর্ত বিশ্বরূগী ব্রদ্মের মধ্যে ছুই-ই সত্য । দৃষ্টিভঙ্গির পার্থকোর 
উপর তাদের উপলব্ধি নির্ভর করে। 

আমর! এখানে বলেছি যে ব্রন্ধের মূর্তপ্রকাশ ছই বিভিন্ন দৃর্টিভঙগি 
অনুসারে ছুই পৃথক আকার নেয়! তাদের একটি রূপ পাই বিশ্লিষ্ট ব৷ 
খণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে এবং অপরটি পাই সামগ্রিক বা অখণ্ড দৃষ্টি- 
ভঙ্গি দিয়ে দেখে। উপনিষদের ধারণায় ছুটি রূপই সত্য এবং ছুটি বপকে 
না জানলে ব্রদ্মের সম্পুর্ণ পরিচয় পাওয়। যায় না। ছুটি রূপকে পৃথক 
করে গ্রহণ করলে তার মূর্ত রূপের পরিচয় আমর| ঠিক পাই না, আমর! 
বিভ্রান্ত হই । এই প্রসঙ্গে উপনিষদের এই শ্লোকটি দেখা যেতে পারে £ 

“ধারা অবিদ্ভার উপাসনা করেন তার! অন্ধকর! অন্ধকারে প্রবেশ 
করেন। তার থেকে যেন বেশি অন্ধকারে প্রবেশ করেন ধারা 
( কেবল ) বিদ্যাকে গ্রহণ করেন ৮১ « | 


১৫. অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেখবিদ্যামুপাসতে ॥ ততো ছয় ইব তে তমো 
য উ বিদ্যায়াং রতাঃ ॥ ১২১০।৯ ব.হদারণ্যক 18181১9 


999 


এই বচনটির মধ্যে খানিকট! অস্পষ্টতা আছে॥ তাই এ বিষয়ে 
একটু মালোচনার প্রয়োজন । প্রশ্ন ওঠে অবিদ্ভা বলতে কি বুঝি। 
এটা নিশ্চিত যে অবিস্তার অর্থ জ্ঞানের অভাব নয়। কারণ এই 
প্রসঙ্গে ঈশ উপনিষদে বলা হয়েছে যে অবি্ধ। একরম বলে এবং বিষ্চ। 
অন্যরকম বলে ।১৬ তারা ছটি বিভিন্ন ব্যাখ্যা । এখন আমরা অবিষ্ধা 
বলতে কি বুঝি তা অনুসন্ধান করে দেখতে পারি । 

আচার্ধ শঙ্কর তার ভাষ্যে অনিষ্াাকে মায়ার প্রতিশব্দ হিসাবে 
বাহার করেছেন। ভগবান বুদ্ধও অবিষ্ঠ! শব্দটির ব্যবহার কবেছেন। 
তার দৃঢ় ধারণ ছিল জীবন ছৃঃখময় এবং এই আত্যস্তিক ছুঃখময় 
জীবনের কারণগুলি বিশ্লেষণ করে তিনি বারোটি কারণ পেয়েছিলেন । 
তাদের তিনি দ্বাদশ নিদ!ন বলেছেন। এই দ্বাদশ নিদানের মূলে 
আছে অবিষ্ভা ॥ সুতরাং অবিষ্ভা হল সেই মিথ্যাজ্ঞান য1 অহংবোধের 
মূলে। কাজেই দেখা যাঁয় যে অহংবোধ ব। দ্বৈতভাবের ভিত্তিতে বিশ্ব- 
সন্থন্ধে যে ধারণা মনে ফুটে ওঠে তাকে উভয়েই অবিষ্তা বলেছেন। 

উপনিষদ একরকম তাই ক্লে, আবাব বলেও না॥। বলে এই 
অর্থে যে দ্বৈতভীব আরোপিত হলে ব্যক্তি বিশেষ সাধারণত খণ্ডিত 
দৃষ্টিভঙ্গি ঘাব৷ প্রভাবান্বিত হয়। কাজেই নিজেব সীমিত স্বার্থের 
দুষ্টিভজি হতে দেখে বলে সে বিশ্বকে বিচ্ছিন্ন আকারে দেখে । ফলে 
সে সুখ-হুংখবোধে আন্দোলিত হয়, মৃত তার কাছে গভীর শোকের 
কাবণ হয়। এই বিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্ব সম্বন্ধে যা ধারণা, তাকেই 
উপনিষদে অবিচ্া বলেছে। তবে পরবর্তীকালে বুদ্ধ বা শঙ্করের 
চোখে তার যে হেয়ত্বের ধারণ। ফুটে উঠেছিল ৩। উপনিষদে খধিকে 
স্পর্শ করে নি। তাদের ধারণা এই সম্ভাব্য দৃষ্টিভঙ্গি ছুটি বিশ্বসন্তার 
মূর্তরূপের পরিচয় দেয় হুভাবে। উভয়েই সত্য। বিষ্ঞ। সামগ্রিক 
দৃষ্টিভঙ্গিগ্রস্থত ধারণা! এবং অবিষ্া বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রন্থত ধারণা 


১৬, ঈশা 1১০ 
১৪১ 


ছুইকে নিয়ে বর্ষের মূর্তরপের সম্পূর্ণ পরিচয় মেলে ॥ শুধু একটাতে 
আংশিক পরিচয় মেলে। সুতরাং অবিদ্ভ। অবজ্ঞার বিষয় নয়। এই 
প্রসঙ্গে একটি বিষয় উল্লেখ কর! প্রয়োজন । উপনিষদে যে অর্থে 
অবিগ্।। ও বিদ্ভার উল্লেখ হয়েছে তাদের সমার্থবোধক আরও ছুটি শব্ধ 
ব্যবহার করা হয়েছে। উপনিষদের প্রাসঙ্লিক বাণীর আলোচনায় 
তাদের সহিত আমাদের পরিচয় হবে ॥ তাই প্রস্তুতি হিসাবে তাদের 
এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কথ। ছুটি হল নানাত্ব ও 
একন্ব। বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্বকে দেখলে আমর! নানাতকে 
পাই। সেখানে শোকে আমর! বিচঙ্গিত হই, মৃত্যুর আঘাতে আমরা 
কাতর হই। আর সামগ্রিক ব অথগ্ড দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে, আমরা 
একত্বকে পাই । সেখানে ছুখ-শোক আমাদের স্পর্শ করে না, তারা 
আনন্দের উপাদান হয়ে যায়। স্বুতরাং অবিদ্া নানাত্ব-বোধের সম- 
স্থানীয় এবং বিদ্যা একত্ববোধের সমস্থানীয়। 

উপনিষদে তাই বারবার বলা হয়েছে, হৃংখ, তাপ, শোক, বিশেষ 
করে মৃত্যুশোক দ্বারা আমর! গীড়িত হই তখনি, যখন নানাত্বের 
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনকে দেখি । এর। থাকবেই, তবে এদের আঘাত 
অতিক্রম করতে প্রয়োজন অখণ্ড বা ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি । বিশ্বের 
অভিজ্ঞতা! একটি নাট্যের মতো; সুখ-ছুঃখ, জন্ম-মৃত্যু তার উপাদান। 
তাদের আঘাত এড়াতে হলে রসিকের ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি চাই। একটা 
উদাহরণ দেওয়া যাক। আমরা যখন নাটক দেখি, তখন মনকে 
উৎফুল্ল করে এমন অভিনয়ও দেখি, আমার মনকে ভারাক্রান্ত করে 
এমন অভিনয়ও দেখি। যে নাট্যরসিক বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভি দিয়ে 
নাটকের ঘটনাগুলি দেখেন, তিনি প্রথম ক্ষেত্রে 'প্রফুল্ল হন, দ্বিতীয় 
ক্ষেত্রে বিষঞ্ন হন। এর অতিরিক্ত একটি দৃষ্টিভর্গি আছে, যেখানে 
দর্শক নাট্যের সমগ্র রল উপলব্ধি করতে উৎসুক । তিনি শিল্পরসিকের 
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে চান, অভিনয়ের মধ্যে একটি সামগ্রিক স্ুমিতি 
বিরাজ করে কিনা। তিনি নিলিপ্ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই নাটকের 


৭8২ 


ঘটনাগুলি দেখেন। ভাই, বিশেষ চরিত্রের ভাগ্যোদয়ে উৎফুল্ল 
হন ন। ব। বিশেষ চরিত্রের ছুর্ভাগ্যে কাতর হন না। ধারা বিচ্ছিন্ন 
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নাটক দেখেন, তারা পান, অবস্থা অনুসারে সুখ ব! 
হুঃখ, আর ধিনি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নাটক দেখেন, তিনি পান 
আনন্দ। সেখানে চরিত্র বিশেষের সুখ-্ছুঃখ, সেই আনন্দের উপাদান 
হয়ে ধাড়ায়। অনুরূপভাবে উপনিষদে বল! হয়েছে, যিনি অখণ্ড 
বা একত্র দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সংসারকে দেখেন সত্তাকে শোক ব্যথিত 
কবে না বা মৃত্যুর আঘাত স্পর্শ করে না। 

এইবার উপনিষদের বচন হতে আমাদের এই প্রতিপাগ্ঠের সমর্থন 
কতখানি পাই, দেখে নিতে পারি। উপনিষদে এই প্রসঙ্গে যে 
বাণীগলি পাই তাদের ছুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একশ্রেণীর বাদী 
জোর দিয়েছে অখগ্ দৃষ্টিভঙ্গির বা একতববোধের উপর তা৷ বলে, এই 
একত্ববোধ মনে পরিস্ফুট হলে মৃত্যুর আঘাত আব আমাদের স্পর্শ করে 
না। আব একশ্রেণীব বচন আছে যা বলে, নানাত্ব এবং একত্ব এই 
ছুটি দৃঙ্গিভঙ্গির মধ্য দিয়েই আমাদের যেতে হবে ; কারণ উভয় দৃষ্টি- 
ভঙ্গিই সত্য এবং স্থষ্টিধারাৰ উপর প্রযোজা। খণ্ডিত দৃ্ঠিভজির মধ্য 
দিয়ে মৃত্যুর আঘাত পেয়ে, ভাবপর অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গিতে উত্তীর্ণ হয়ে 
অমৃত্ত বা আনন্দের আম্বাদ গ্রহণ করতে হয়। ছুটি নিয়ে পরিপূর্ণতর 
অভিজ্ঞতা লাভ হয়। আমর! প্রথম শ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আমাদের 
আলোচন৷ আরম্ভ কবব। 

বর্তমান প্রসঙ্গে এই বচনটি দেখ যেতে পারে; “যে অবস্থায় 
উপলব্ধি হয়েছে ষে সকল জীবেই আত্মা আছেন, সেখানে একত্ব 
অনুভব করবার ফলে শোকও থাকে না মোহও থাকে না 17১? 

এখানে একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়ে পড়ে । উপনিষদের 
মূল তত্ব বলে অহৈতৃক আনন্দ আন্বাদেব জগ্য মূল সতত! নিজের উপর 


১৭, যগ্সিন সব্বাণি ভূতান্যাস্মৈবাভুদ বিজানতঃ ॥ তন্ত কো মোহঃ কঃ শোক 
একত্বমনযপশ্যতঃ॥ ঈশ ৭ 


১৪ 


দ্বৈতভাঁব আরোপ করে স্থষ্টিগ্রবাহে পরিবর্তিত হলেন। তাতে ভোক্তা - 
ভোগ্য সম্বন্ধে সংযুক্ত হলে! বু জীৰ ও"বছ বন্ত। প্রাণীর জন্ম-ৃতার 
ছন্দে প্রাণের ধারা প্রবাহিত হল। প্রাণের ধার! অঙ্ষু্ন, কিন্তু বিশেষ 
জীব বিনাশশীল ; তার মৃত্যু আছে। ফলে তার আত্মীয়ের মৃত্যু শোক 
ভোগ আছে। দ্বৈতবোধ হতেই এই শোকবোধ। সামগ্রিক'দৃষ্টিভঙ্গি 
নিয়ে দেখলে উপলব্ধি হবে বিশ্বে যে মহানাট্য অভিনীত হচ্ছে তার 
চরিত্র ও নাট্যকার অভিন্ন । তার উদ্দেশ্ট, বিশ্বশিল্প রচনার মধ্য দিয়ে 
আনন্দ আন্বাদন। সেই দৃষ্টিভঙ্গি যদি নিজের মনে ফোটাতে পারি, 
তা হলে হঃখ-শোক তার দাহিকা শক্তি হারায় ॥ বিচ্ছিন্ন দ্বৈতবোধের 
মোহ হতেই শোক। একত্বের অথগুতাবোধ তা হতে আসে যুক্তি । 

উপরের বচনে মৃত্যুশোকের পৃথকভাবে উল্লেখ নাই * কিন্তু নিচের 
বচনে তার উল্লেখ পাই : 

“যিনি যথার্থ দেখেন, তিনি মৃতু, রোগ ও হুখ দেখেন ন।। 
যিনি যথার্থ দেখেন তিনি ( অখগুভাবেই ) সব দেখেন এবং 
সর্বতোভাবে অখগ্ডকে পান ।৮১৮ 

যথার্থ দেখার অর্থ হল যে সব দেখা বা স্যস্টিধারার অখগ্ুরূপ 
দেখা, তা এই বচনেই বলা হয়েছে। অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গির ফলে মৃত্য, 
রোগ ও ছুখ সমগ্রের অঙ্গীভূত হয়ে যায় এবং ফলে আনন্দের 
উপাদান হয়ে যায় বলে এগুলির আঘাত মনকে স্পর্শ করে না। 

আর একটি বচনে কেবল মৃত্যুর কথাই বিশেষ করে আলোচিত 
হয়েছে । বলা হয়েছে, “মন দ্বারা এই কথা উপলব্ধি করতে হবে যে 
বিশ্বে পুথক বলে কিছু নেই । মত্যু হতে মৃত্যুর শোক অনুভব করেযে 
বিশ্বকে নানার মতে। দেখে 1১১৯ 

* রহ লা 


১৯. মনসৈবেদমাগুব্যং নৈহ নানাস্তি কিন । মৃত্যোঃ স মৃত্যুং গচ্ছতি 
ব ইহ নানেব পশ্যতি ॥. কঠ ॥২/১/১ বৃহদারণাক উর্পানিষদেও একই 
বচন আছে, কেবল 'গাচ্ছতি, চ্ছানে 'আগ্নোতি' আছে। 8188১৯ 


588 


জীবনের ধারা গ্রথিত হয় জন্ম এবং মৃত্যু দিয়ে । বাক্তিবিশেষ 
আসে যায়; প্রাণের ধার! নিত্য প্রবাহিত থাকে। খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি 
দিয়ে ( নানা ইব ) দেখলে মরণে শোক আছে; কিন্ত অথণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি 
দিয়ে দেখলে মৃত্যু প্রাণধারার উপাদান । তখন মৃত্যুশোক মনকে 
স্পর্শ করতে পারে না। 

দ্বিতীয় চিন্তাটি মৃত্যুকে পরিহার করতে বলে না, খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি 
হতে মৃত্যুর শোককে অনুভব করে, তারপর অথগ্ড দৃষ্টিভঙ্গিতে উত্তীর্ণ 
হয়ে অমৃতের আম্বাদ পেতে বলে । দ্বিতীয় অবস্থায়ও মৃত্যু থাকে, 
তবে সেখানে ত1 আনন্দের উপাদান হয়ে যায়। একই পৃথিবী ভূপৃষ্ঠ 
হতে একরকম দেখায়, আবার উপরে উঠলে আর একবকম দেখায়! 
ছটিই তার রূপ। ছুটিকে দেখলে তার সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায়। 
তাই ঈষ উপনিষদে বল! হয়েছে, খণ্ডিত দৃষ্টিতির মধ্য দিয়ে অথগ্ড 
দৃষ্টিভঙ্গিতে উত্তীর্ণ হয়ে অমুতের আস্বাদ গ্রহণ করতে হয়। এই 
ভাবনাটি ছুই পৃথক বচনে বিভিন্ন ভাষায় স্থাপিত হয়েছে। 

প্রথমে বলা হয়েছে £ যিনি তাকে জানেন তার কাছে বিদ্যা ও 
অবিদ্য। উভয়েই তিনি (ব্রহ্ম )। অবিগ্ার দ্বারা মৃত্যুর শোক ভোগ 
করে বিদ্যার বাব! অমৃত আম্বাদ করতে হয়।”২* 

আচার্য শঙ্কর তার ভাষবে “অবিদ্াকে? কর্ম বলে অমুবাদ করেছেন। 
আ[মর। এবিষয়ে পৃবেই আলোচনা করেছি । উপনিষদেব ভাবধারার 
সঙ্গে শক্তি রক্ষা করলে, তাকে নানাত্ববোধ বা খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি বলাই 
সঙ্গত হবে। নুতরাং বিছ্ু। হবে একত্ববোধ ব। অখণ্ড দৃষ্টিবোধ। 

একই চিন্ত। উপনিষদেব অন্থা একটি শ্লেরকে ভিন্ন ভাষায় বন্পিত 
হয়েছে। শ্লোকটিৰ খালা অনুবাদ এই--“ষিনি তাকে (কত্রহ্ম) 
জানেন, তার কাছে সন্ভৃতি (প্রাণের ধারা ) ও বিনাশ উভয়ই তিনি। 
বিনাশের মধ্য দিয়ে মৃত্যুণোক ভোগ কয়ে সম্ভৃতির বা প্রাণধারার 


২০, ববিদ্যাং চা 'বিদ্যাং চ যস্তছেদোভয়ং সহ। 
আবদায়া মৃত্যুং তীর্থ বিদায়ামতমন্নুতে ॥ ঈশ 1 ১১ 


৭8৫ 


অথণ্ডতত। বোধের সাহায্যে অসৃত আম্বাদ করতে হয়।২১ 

সন্ভূতি শব্দটি শঙ্কর “অসন্ভুতি' ধরে নিয়ে অব্যাকৃত প্রকৃতি বলে 
ব্যাখ্যা করেছেন। এ ব্যাখ্যা কষ্টকল্লিত। সম্ভুতির সরল অভিধ! 
অর্থ ভরণ ( শব্'কল্পদ্রম )। সুতরাং বর্তমান প্রসঙ্গে সম্ভূতির অর্থ 
হবে প্রাণের ধারা যাকে আশ্রয় করে জগ্ম-মৃত্যুর ছন্দ দোলায়িত, যা 
জীবনকে ভরণ করে। প্রাণের ধার! নিত্য, ত৷ হতে মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন 
করে দেখলে মৃত্যুর শোক আছে। তাকে প্রাণধারার অঙ্গ হিসাবে 
দেখলে, তা অথগ্ু দোলায়িত প্রবাহ । তখন তা অমৃত। 


তিন 
রবাদ্দ্নাথের মৃত্যু সন্পরকিতি চিদ্তা 


রবীন্দ্রনাথের জীবনে মৃত্যু বার-বার হানা দিয়েছে। বেশির ভাগ 
ক্ষেত্রেই অপরিণত বয়সে একান্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় তার মনে মর্মান্তিক 
বেদন। ঘটিয়ে পৃথিবীর বুক হতে সরে গেছেন ॥ এই অভিজ্ঞতার আর্ত 
যখন তার মাতা সারদ। দেবীর মৃত্যু (২৭ ফান্তুন ১২৮১ / ১০ মার্চ 
১৮৭৫ ) ঘটে । তখন তার বয়স চোদ্দ বন্ধর অতিক্রম করেনি । সে 
শোক তাকে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল, কিন্ত তার মনকে তেমন 
গভীরভাবে নাড়। দিতে পারেনি । একথ। তিনি “জীবনস্থৃতিতে” উল্লেখ 
করেছেন। তারপর অল্পকালের ব্যবধানের মধ্যেই পরিবারে পর-পর 
তিনটি মৃত্যু সঙ্ঘটিত হয়। তার বড়দিদি সৌদামিনী দেবীর স্বামী 
সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় মার। যান (২৪ ভগ্রহায়ণ ১২৯৫ | ডিসেম্বর 
১৮৮৩ )। পরের বছর ( ৮ বৈশাখ ১২৯১ / ১৯ এপ্রিল ১৮৮৪) তার 
বৌঠান কাদঘ্বিনী দেবী আত্মহত্যা করেন এবং তার ছুমাস পরেই তার 
তৃতীয় ভ্রাত। হেমেন্দ্রনাথ অকালে মারা যান (২৪ [জ্যৈষ্ঠ ১২৯১ 
টন ১৮৮৪ )1 এগুলির মধ্যে বৌঠানের আকন্মিক মৃত্যু তাকে সর্বাধিক 


সচ্ভুতিং চ বিনাশং চ যস্তছ্েদোভয়ং সহ 
মত্যুং ং তি সিতযাম তুলে ॥ ঈশ ॥ ১৪ 


১৬ 


আঘাত করে। কাদস্বরী দেবী ভার স্েহ ও সাহচর্য দিয়ে এই 
দেওরটিকে এমন ঘিরে রেখেছিলেন যে তার অন্তর্ধান রবীন্দ্রনাথের 
জীবনে বিরাট শুন্যতার স্থপ্ি করেছিল। তার চিহ্ন ভার নান! 
কবিতার মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ান আছে। এ বিষয় ভার মানসিক 
প্রতিক্রিয়৷ “পুষ্পাঞ্জলি' নামে একটি স্থতি-অর্ধ্যে লিপিবদ্ধ ছিল; 
কিন্ত সে রচন! তার গ্রঞ্ছবলীতে স্থান পায়নি । 

পরবতী জীবনে বারবার তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মৃত্যুশোক শাকে 
সহা করতে হয়েছে । তার পত্রী মৃণালিনী দেবীকে'তিনি হারান নভেম্বর 
১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে (৭ অগ্রহায়ণ ১৩০৯ )। পরের বছর তার দ্বিতীয়! 
কন্যা রেণুকা মারা যান (ভাত্র ১৩১০ / সেপ্টেম্বর ১৯*৩)। 
তার পিতৃবিয়োগ ঘটে (৬ মাঘ ১৩১১/ ১৯ জানুয়ারি ১৯০৫ )। 
তিন বছরের মধ্যে তার কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ কলেরায় আক্রান্ত 
হয়েমার! যান ( ৭ অগ্রহায়ণ ১৩১৪ / ২৪ নভেম্বর ১৯০৭)। জ্োষ্ঠা 
কন্যা মাধুরীলতা। মারা যান (২ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৫ | ১৬ মে ১৯১৮)। 
কনিষ্ঠা কন্া মীরাদেবীর একমাত্র পুত্র নীতীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় 
(৭ শ্রাবণ ১৩৩৯ / ৭ আগষ্ট ১৯৩২ ) জারমানীতে পরলোকগত হয়। 

যিনি জীবনে এতবার একান্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের একের-পর-এক 
হারিয়েছেন, ধরে নেওয়া যায় তার সংবেদনশীল হৃদয়ে তিনি মৃত্যুর 
তীত্র আঘাত অন্থুভব করেছেন । কিন্তু বাহিরে তার বিশেষ প্রকাশ 
দেখ। যায় না; এমনকি রচনায়ও না । কেবল একটি বড় ব্যতিক্রম পাই 
সার পত্রীর ক্ষেত্রে । মুণালিনী দেবীর মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই তার 
স্মরণে নিবেদিত কতকগুলি কবিতা একত্রিত করে তিনি 'ম্মরণ' নাম 
দিয়ে প্রকাশ করেন । তিনি শোককে সংহত করতে পারতেন। গীতায় 
যাকে বলে স্থিতধী তিনি তাই ছিলেন। নিজের ব্যক্তিগত শোককে 
তিনি অন্যের কাছে আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে কুঠাবোধ 
করতেন । তার রুচির সঙ্গে এবং আদর্শের সঙ্গে তা সামগ্রস্ত রাখত না । 
এই প্রসঙ্গে তার নিচে উদ্ধৃত কাব্যাংশটি লক্ষ্য কর! যেতে পারে £ 


48৭ 


ছুঃখের দিনে লেখনীকে বলি-__ 
লজ্জা দিয়ো না। 
সকলের নয় যে-আঘাত 
ধোরে! না সবার চোখে। 
চেকো ন৷ মুখ অন্ধকারে, 
রেখো ন। দ্বারে অর্গল দিয়ে ।২২ 
স্থতরাং ধার জীবনে মৃত্যু এমন বার*বার আঘাত হেনেছে, তিনি 
যে মৃত্যু সম্বন্ধে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হবেন, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু 
নাই। মানুষের জীবনে পরিবারে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মৃত্যু যে শোক 
সঞ্চার করে, তার তীব্রতার সঙ্গে আর কোনও শোকের তুলন। চলে 
না। রবীন্দ্রনাথ একাধারে কবি ও মনীষী ছিলেন ॥ তার সংবেদন- 
শীলত। ডাকে যতই আঘাত হেনেছে, তার প্রজ্ঞা তাকে ততই মৃত্যু- 
রহস্ত ভেদ করবার চিন্তায় আকৃষ্ট করেছে । ফলে তার সাহিত্যে, 
বিশেষ করে তার কাব্যে সে চিন্তাকে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। 
এই চিন্ত। তাঁকে ক্রমশ পরিণত সিদ্ধান্তের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। 
ফলে তার রচনার মধ্যে তার মৃত্যু সম্পফিত চিন্তাব পরিণতির পথে 
এগিয়ে যাবার একটি ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে । 
আমর! তার রচনা হতে চিন্তাকণ। সংগ্রহ করে সেই ইতিহাসটিকে 
উদ্ধার করবার চেষ্টা করব । 
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু স্পফিত চিন্তায় অগ্রগতির পথে আমরা কয়েকটি 
অবস্থা পাই। প্রথমটি প্রশ্নের অবস্থা । সেখানে দেখি মৃত্যুর পর 
মানব-আত্মার ভাগ্যে কি ঘটে, এ-নিয়ে তার মনে নান! প্রশ্ন উদ্দিত 
হয়েছে। তারপর দেখি একটা স্পষ্ট ধারণ! ফুটে উঠেছে যে মৃত্যুর 
পর ব্যক্তিজীবনের সব শেষ হয়ে যায় না। তারপর দেখি, মৃত্যুর 
প্রকৃতি সম্বন্ধে চিস্ত। ক্রমশ সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করেছে । এই অবস্থায় 


২২, পুনশ্চ, বিশোক। 
২৪৮ 


চিন্তা ছুটি ভিন্ন পধায়ে অগ্রসর হয়েছে। একটি পর্যায়ে মানুষের 
ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হতে মৃত্যুকে দেখা হয়েছে। অপর পর্যায়ে সমগ্র 
বিশ্বজুড়ে যে স্থপ্টিধারা প্রবাহিত তার লঙ্গরূপে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি হতে 
মৃত্যুকে দেখা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও আবার চিন্তার ছটি 
স্তর পাই। প্রথম অবস্থায় ব্যক্তিগত দৃষ্টিভজি হতে মৃত্যুকে একটি 
অবাঞ্ছিত ব্যাপার বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে একটি 
বিষাদের ভাব জড়িত। দ্বিতীয় স্তরের চিন্তায় এই বিষাদের ভাৰ 
তিরোহিত। সেখানে মৃত্যু জীবনের সমাপ্তিমচক একটি আকাতিক্ত 
বস্ত রূপে কল্পিত হয়েছে। ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি মৃত্যুকে অন্য- 
রূপে দেখেছেন। তা প্রাণধারার তরঙ্গেন ছন্দের মতো, তা নৃত্যের 
তালের মতো, সমগ্র বিশ্ব জুড়ে যে আনন্দধার প্রবাহিত জন্মে সঙ্গে 
হাত মিলিয়ে মৃত্যু তার উপাদানের ভূমিকা গ্রহণ করেছে । এর বেশি 
এই শবস্থায় বলবার দরকার নাই।॥ বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করবার 
পক্ষে এইটুকু পরিচয়ই যথেষ্ট বলে মনে হয় । 
মৃত্যু সম্পকে রবীন্দ্রনাথের মনে যে নাণ! প্রশ্ন উঠেছিল তার 
সুন্দর তালিক। পাওয়। যায় এচত্র।” কাব্যগ্রন্থের “মৃত্যুর পরে" শীষক 
কবিতাটিতে। এটি রচিত হয় এপ্রিল ১৮৯& শ্রীস্টাবধে। তখন পরিবারে 
কোন৪ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মৃত্যু ঘটেছে বলে আমাদের জানা নাই। 
সম্ভবত ঘটে থাকবে । সেই প্রসঙ্গে নানা প্রশ্ন তার মনে জেগেছে। 
এই কবিতায় তিনি এক জায়গায় বলেছেন, 
গিয়েছে কি আছে বসে জাগিল কি ঘুমাল সে 
কে দিবে উত্তর। 
পৃথিবীর শ্রান্তি তারে ত্যজিল কি একেবারে 
জীবনের জ্বর । 
আরো নান। প্রশ্ন তুলে তিনি কবিতাটির শেষ অংশে বলেছেন, 
চিরকাল এই সৰ রহস্য আছে নীরব 
রদ্ধ-ওষ্ঠাধর। 


১৪৪ 


জগ্মান্তরে নবপ্রাতে সে হয়ত আপনাতে 
পেয়েছে উত্তর । 
যে চলে গেছে সে হয়ত উত্তর পেয়েছে, হয়ত পায় নি; কিন্ত 
মৃত্যুশোক তো৷ একান্তই ছুধিষহ । তাই মনকে এই সংশয়াকুল অবস্থা 
হতে উদ্ধার করতে এমন একটা নিশ্চিত বিশ্বাসের প্রয়োজন হয়ে পড়ে 
যা বলবে, মৃত্যুর অর্থ সব শুন্ত হয়ে যাওয়া নয়, নিশ্চয় একটা কিছু 
থাকে । মনকে সাস্তবনা দেবার জন্থ এইরকম বিশ্বাসবোধের প্রয়োজন 
আছে। রবীন্দ্রনাথ যে তার প্রয়োজনীয়তা বোধ কবেছিলেন তা 
তার উক্তি হতে সমধিত হয়। 
এই প্রসঙ্গে কণিকার" অন্তভূক্তি “মৃত্যু, এই ক্ষুদ্র শ্লোকটি লক্ষ্য 
করা যেতে পারে: 
ওগো মৃত্যু, তুমি যদি হতে শুম্যময় 
মুহুর্তে নিখিল তবে হয়ে যেত লয়। 
এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় ভাষায় নিচের কাব্যাংশে ধ্বনিত হয়েছে £ 
নিবিড় সে সমস্তের মাঝে 
অকম্মাৎ আমি নেই। 
” একি সত্য হতে পারে। 
উদ্ধত এ নাস্তিত্ব যে পাবে স্থান 
এমন কি অণুমাত্র ছিদ্র আছে কোনোখানে। 
সে ছিদ্রকি এতদিনে 
ডুবাতো৷ না নিখিলতবণী 
মৃত্যু যদি শুন্য হত,'**** 1২৩ 
রবীন্দ্রনাথ একট! বিশ্ব(সের ওপর নির্ভর করেই মৃত্যুশে!কে সাল্তবন। 
খোজেন নি; মৃত্যু বাপারখান! কি ত৷ তার প্রজ্ঞার সাহায্যে বুঝতে 
চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে মৃত্যু সম্বন্ধে তার নানী চিন্তা যে 
বিক্ষিপ্ত আকারে ছড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে ছুটি দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়। 
২৩, পুনশ্চ, সৃত্যু। 


১৫ 


যায়। এ-বিষয় পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমটি ব্যক্তি বিশেধের 
বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। দ্বিতীয়টি সমগ্র নৃষ্টিধারাকে জড়িয়ে নিষ্ধে একটি 
সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি । আমর! প্রথমে ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন দৃ্টিভলি 
নিয়ে আলোচন৷ করব। 

«সোনার তরী'র প্রথম কবিতাখানিতেই এই বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির 
উল্লেখ আছে ।॥ সেখানে বণিত নদীর মাঝখানে যে ছোট ক্ষেত, তা 
ব্যক্তিবিশেষের জীবনের প্রতীক । ব্যক্তিবিশেষ জীবনে শ্রম করে যে 
সঙ্গতি গড়ে তোলে, তাই হলে। সেই ক্ষেতে উৎপাদিত ধান। আর 
তরী বেয়ে যে এল, সে হল সমাজের প্রতীক । যখন মৃত্যুর আহ্বান 
আসে, তখন ব্যক্তিবিশেষ যে সম্পদ উৎপাদন করেছে, সমাজ তা 
নিয়ে নেয়, কিন্তু তাকে নেয় না; মৃত্যু তাকে হরণ করে নিয়ে যায়। 
আপাতদৃষ্টিতে কবিতাটি হেঁয়ালির মতে। ঠেকে ; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার 
একটি ভাষণে নিজেই তার এই ব্যাখ্য। দিয়েছেন ।২৪ অর্থাং 
এখানে একটি রূপকের সাহায্যে তার বক্তব্য বল। হয়েছে। এই 
প্রসঙ্গে তার এই মন্তব্যটি দেখ! যেতে পারে £ 

“সংসার সবই নেবে, একটি কণাও ফেলে দেবে না। কিন্তু যখন 
মানুষ বলে “ওইসঙ্গে আমাকেও নাও, আমাকেও রাখো” তখন 
সংসার বলে, “তোমার জন্তে জায়গা কোথায়? তোমাকে নিয়ে 
আমার হবে কী? তোমার জীবনের ফসল যা কিছু রাখবার তা 
সমস্তই রাখব, কিন্তু তুমি তে। রাখবার যোগ্য নও” 1” 

এটি একটি রূঢ় সত্য কথ।। ব্যক্তিবিশেষের দিক হতে দেখলে তা 
অত্যন্ত পীড়াদায়ক। কিন্তু সমাজের লক্ষ্য হলে। সমষ্টিকে দেখা, ব্যক্তি- 
বিশেষকে ত৷ সমষ্টির কল্যাণের জন্ত ব্যবহার করে। তারপর যখন 
তার কাজ ফুরিয়ে যায়, যৃত্যুমুখে সমাজ তাকে ঠেলে দেয়। ব্যক্তি- 
বিশেষের দৃষ্টিভঙ্গি হতে তিনি তাই উপদেশ দিয়েছেন, এই অবস্থাকে 


২৪. শান্তানকেতন, তরী বোঝাই । 
১৫১ 


স্বীকার করে নেওয়! ছাড়া উপায় নাই। ধরে।নিতে হবে জীবন যে 
ভোগ করি মৃত্যুর হাতে তাকে ভুলে দিতে হবে খাজনা রূপে ॥ তিনি 
তাই বলেছেন, «এই যে জীবনটি ভোগ করা গেল অহংটিকেই 
তার খাজনা -স্বরূপ মৃত্যুর হাতে দিয়ে হিসাব চুকিয়ে দিতে হবে।” 
পরব্তাঁ অবস্থায় দেখি এই ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হতে যে বিষাদ ব! 
হতাশ! স্জত হয়, তাকে তিনি কাটিয়ে উঠেছেন । একটি অভিনব 
চিন্তাই সেট। সম্ভব করেছে। রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন ব্যক্তির জীবনকে 
সমগ্রকপে দেখলে মনে হবে, সারাজীবন যেন মরণের প্রস্তুতি । 
মায়ের কোলে যে মেয়ে জন্মগ্রহণ করে ধীবে ধীরে বড় হয়, শিক্ষা ও 
সাধনা করে সে নিজেকে নানা গুণে সঙ্ভিত করে তোলে একদিন 
পতির সঙ্গে মিলনের জন্য । জীবন যেন সেই বালিকা এবং মরণ যেন 
সেই আকাঙজ্ার ধন, পতি। এই উপলব্ধি হলে মরণকে আনন্দের 
সঙ্গেই মন গ্রহণ করতে পারে । কবির ভাষায় £ 
যা পেয়েছি, য| হয়েছি, যাকিছু মোর মাশ। 
ন। জেনে ধায় তোমার পানে সকল ভালবাস।। 
মিলন হবে তোমার সাথে, 
' একটি শুভ দৃষ্বিপাতে 
জীবনবধূ হবে তোমার নিত্য-অনুগতা। ।২৫ 
তাই তিনি বলেছেন, মরণ যেদিন তার কাছে আসবে তাকে তিনি 
সমগ্র জীবনের সঞ্চিতধন দিয়ে স্বাগত জানাবেন ; কারণ সারাজীবনটাই 
ত মরণের জন্য প্রস্ততি । মরণই ত জীবনের পরিপুর্ণত। সম্পাদন করে £ 
যা-কিছু মোর সঞ্চিত ধন 
এতদিনের সব আয়োজন 
চরম দিনে সাজিয়ে দিব উহারে 
মরণ যেদিন আসবে আমার ছয়ারে ।২৬ 


২৫, গীতাঞ্জলি, ১১৬ 
২৬. গাতাঞ্জলি, ১১৪ 


৯৫২ 


পরের সুরের চিন্তায় দেখি রবীঙ্জনাথের মৃত্যু স্বন্ধে ধারণা আরও 
পরিণত রূপ পেয়েছে । সেখানে সামগ্রিক বা অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে 
তিনি মৃত্যুকে দেখেছেন । ফলে মৃত্যুর এক নৃতন রূপ প্রকট হয়ে 
উঠেছে। ব্যক্তি বিশেষের জীবনের ওপর তা যবনিকা টেনে দেয় 
বলে তা হুতে যে শোক উদ্ভুত হয়, তা তখন আর সার মনকে গীড়। 
দেয় না। তিনি মৃত্যুকে জীবনধারার আবশ্ঠিক অঙ্গরূপে দেখেছেন । 
সে পরিকল্পনায় মৃত্যু জীবনকে বিনাশ করে না, জীবনকে ধারণ করে। 
প্রাণীবিশেষ যায়, প্রাণধারা অব্যাহত থাকে! মৃত্থ্যু প্রাচীনকে 
সরিয়ে দিয়ে যা 'নিত্যকালের চির পুরাতন” তার নবীন বেশে প্রকাশ 
হবার সুযোগ এনে দেয়। সুতরাং মৃত্যুই প্রাণের ধারক এবং বাহক। 
ফলে পরিণত হলে ফুল যখন ঝরে পড়ে, তখন যেন ফুলের মৃত্যু ঘটে ; 
কিন্ত সেই ফল হতেই নূতন গাছ জন্মলাভ করে নৃতন করে ফুল 
ফোটায়। সুতরাং জীবন হলে! ফুল এবং মরণ হলে! ফল। জীবনের 
ফুল ফোট। হলেই মরণের ফল ফলে। প্রাণধারার তারা আবন্তিক 
অঙ্গ। 

সুতরাং এই ভাবে অখগ্ড দৃষ্টি দিয়ে দেখলে মৃত্যুর শোকের আর 
দাহিকা শক্তি থাকে না। জীবন ও মৃত্যু ছুইই প্রাণধারার অঙ্গ হয়ে 
যায়। এই কথাটি নানাভাবে রবীন্দ্রন।থের কাব্যে বর্ণাট্য এবং 
চিত্তাকর্ষক ভাষায় বণিত হয়েছে! ফলে কোথাও জম্ম ও মরণকে 
পাঁতোল! ও পা-ফেলার সঙ্গে তুলনা! করা হয়েছে, কোথাও সাগরের 
জোয়ার ভাটার সঙ্গে তুলনা কর! হয়েছে, কোথাও নদীর তরঙ্গের সঙ্গে 
কোথাও বাঁশীর স্বরলহরী ও রন্ত্রের সঙ্গে । 

এইবার আমর! এই ছুটি চিন্তাকে রবীন্দ্রনাথের বাণী চয়ন করে, 
তার মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করবার প্রস্তাব করি। 

প্রাণের ধারাকে যে মৃত্যু নবীন রাখে, এই চিন্তাটি বোধহয় 
দীতালির' কবিতাগুলির মধ্যে প্রথম 'আত্প্রকাশ করে। 
'গীতাঙ্জলিতে' দেখি খণ্ড দৃষ্টিভঙ্গিতে মৃত্যুকে জীবনের পরিপূর্ণতা রূপে 


১৫৩ 


কল্পনা করা হয়েছে। এখানে দেখি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হতে অথ 
ৃষ্টিতঙ্গিতে উত্তরণ ঘটেছে। এখানে জন্ম ও মৃত্যুকে এক সঙ্গে দেখা 
হয়েছে প্রাণের ধারার অবিচ্ছেস্ত অঙ্গরূপে। প্রাণধারার ধারাবাহিকতা 
এবং সজীবতা রক্ষণে উভয়েরই ভূমিকা আছে। জীবন প্রাণধারাকে 
নবীনরূপে প্রকাশ দেয়। পরে সেই নবীনরূপ কালের স্কুল হত্তাব- 
লেপনের ফলে তার সজীবতা হারায় জরার প্রভাবে । তখন মৃত্যু 
এসে জরার জড়ত্বকে সরিয়ে দেয়; ব্যক্তিগত জীবনের ওপর যবনিকা। 
টেনে দিয়ে নবীনরূপে জীবনের পুনরাবিভাবের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। 
সুতরাং ব্যক্তিবিশেষের জীবনের ওপর যখন মৃত্যু এসে ছেদ টেনে 
দেয়, তখন প্রাণের ধারার ছেদ ঘটে না, ব্যক্তিগত জীবনের 
পরিসমাপ্তি ঘটে। তারপর সেই মৃতুার অধার উত্তীর্ণ হয়ে নবীন 
জীবন নৃতন মানুষ রূপে জন্মগ্রহণ করে। স্থতরাং অন্ধকারের মধ্য 
দিয়ে আলোকের উত্তরণের মতো মৃত্যুর ভিতর দিয়ে যেন প্রাণধারার 
উত্তরণ ঘটে । জীবন হল ফুল এবং মরণ হল ফল এবং সেই মরণরূগী 
ফলের থেকে নৃতন জীবনের সূত্রপাত ঘটে। তাই রবীন্দ্রনাথ 
বলেছেন ঃ 
ফুরায় ষা তা ফুরায় শুধু চোখে_ 
অন্ধকারের পেরিয়ে ছুয়ার যায় চলে আলোকে । 

পুরাতনের হাদয় টুটে 

আপনি নৃঙন উঠবে ফুটে, 

জীবনে ফুল ফোট। হলে, 

মরণে ফল ফলবে ।২? 
এই কথাটি রবীন্দ্রনাথ একই কাব্যগ্রস্থে অন্থভাবে প্রকাশ 

করেছেন । বিশেষ জীবনকে মৃত্যু হরণ করে সত্য; কিন্ত প্রাণের 
ধারাকে ব্যাহত করে না। উপরে প্রযুক্ত উপমাতেই তা! পরিস্ফুট। 


২৭, গীঁতালি। ৩৮ 
১৫৪ 


ফুল খন ঝরে যায় তখন ফল ধরে। তার অর্থ ফুল ফোটার শেষ 
হওয়া নয়, ফুল ফোটা! অব্যাবহত থাকে । ফলের মধ্যে নূতন গাছের 
বীজ থাকে য। আবার নূতন করে ফুল ফোটাবে। এই অর্থে মৃত্যু 
প্রাণের ধারাকে ব্যাহত করে না, তাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে। 
তাই তিনি বলেছেন, 
মৃত্যু মাপন পাত্রে ভরি বহিছে যে প্রাণ 
সেই ত তোমার প্রাণ ॥২৮ 

ঠিক বলতে এই তৰবটি রবীন্দ্রনাথের মনে অলক্ষ্যে গড়ে উঠেছিল 
এবং পরে তিনি তার বিষয় সচেতন হয়েছিলেন ॥ তাই দেখি তার 
অনেকগুলি প্রতীকধর্মী নাট্যে তা বার-বার আত্মপ্রকাশ করেছে। 
তত্বটি হল এই। জরাকে সরিয়ে দিয়ে প্রাণধারার সজীবতাকে অক্ষুঃ 
রাখতে হলে আমাদের মৃত্যুর দ্বারস্থ হতে হবে। মৃত্যুর ভূমিকা হল 
প্রাণের সজীবতাকে জর! হতে মুক্ত করা, প্রাচীনকে নবীন করে 
তোল।। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিচে উদ্ধৃত উক্তিটি প্রণিধান- 
যোগ্য £ 

*“শারদোংসব' হতে “ফান্ধনি' পর্যন্ত যতগুলি নাটক লিখেছি, যখন 
বিশেষ করে মন দিয়ে দেখি তখন দেখতে পাই, প্রতোকের ভিতরকার 
ধুয়োটা একই ।”২৯ সেই ধুয়োটা৷ হল জরা যখন ছড়িয়ে বসে 
প্রাণকে দলন করে নিজীব করতে চায়” তখন মুতার মধ্য দিয়ে সে 
জরা হতে মুক্ত হয়ে প্রাণ আবার সজীবতা ফিরে পায় ॥ এই তববটি 
সহজ করে বোঝাতে রবীন্দ্রনাথ বসন্তের কচিপাতার কথা উল্লেখ 
করেছেন। তাদের আগমন সম্ভব হতো! না যদি না জরাগ্রস্ত পুরাতন 
পাত ঝরে পড়ে তাদের আগমনের পথ প্রস্তুত করে দিত। ত্বার 
প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই £ 

“বসস্তের কচিপাতায় এই যে পত্র, এ কাদের পত্র? যে-সব পাতা 


২. গীতালি, ৯৯ 
২৯. আত্মপারচয়, ৩ 


১৫৫ 


ঝরে গিয়েছে, তারাই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আপন বাদী পাঠিয়েছে। তারা 
যদি শাখা জাকড়ে থাকতে পারত, তা হলে জরাই অমর হতো--তা 
হলে পুরাতন পু'খির তুলে।ট কাগজে সমস্ত অরণ্য হলদে হয়ে যেত, 
সেই গুকনে। পাতার মরমর শব্ষে আকাশ শিউরে উঠত ॥ কিন্ত 
পুরাতনই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আপন নবীনতাকে প্রকাশ করে, এই তে 
বসম্তের উৎসব ।৮৩* 

দ্বিতীয় চিন্তা বলে অথণ্ড দৃষ্টিভঙ্গিতে জন্ম এবং মৃত্যু প্রাণধারার 
অঙ্গ হয়ে যায়। প্রাণধারার মধ্যে ষেন একটি ছন্দ আছে। সেই 
ছন্দের তাল রক্ষা করে জম্ম এবং মৃত্যু । আমাদের এই অনন্যসাধারণ 
কবি সেই ছন্দের সুষমাকে পরিস্ফুট কববার জন্য নানা উপম প্রয়োগ 
করেছেন। তাদের কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে স্থাপন কর! যেতে 
পারে। 

এই আলে ।চন। “কণিকার অন্তভূক্তি একটি চিস্তাকণ৷ দিয়ে শুর; 
হতে পারে। তাতেই রবীন্দ্রনাথের চিস্তায় অখগু দৃষ্টিভঙ্গিতে জগ্ম- 
মৃত্যুর রূপ কেমন পবিশ্ফুট হয়ে উঠেছে, তার পরিচয় সংক্ষেপে পাওয়া 
যেতে পারে।॥ চিন্তাকণ।টিতে জীবনকে খেলাবপে কল্পনা করা হয়েছে 
এবং চলার ক্ষেত্রে যেমন পা-তোলা ও পা-ফেল। অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ হয়ে 
ধাড়ায়, বল হয়েছে, জন্ম-মৃত্যু তেমন জীবনের অবিচ্ছি্ন অঙ্গ £ 

জন্ম মৃত্যু দৌহে মিলে জীবনে খেল।, 
যেমন চলার অঙ্গ পা-তোলা। পা-ফেল। ।৬১ 

বিশ্ব ব্যাপ্ত করে যে প্রাণের ধার! প্রবাহিত তার মধ্যে যে ছন্দ 
তিনি আবিষ্কার করেছেন, তার সঙ্গে সমুদ্রের জোয়ার ভাটার তুলন। 
কর! হয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রাণের ধারা যেন সমুদ্র; তা দোলায়িত 
হচ্ছে জন্ম ও মৃত্যুর ছন্দে। জন্ম যেন জোয়ার, ভাটা যেন মৃত্যু £ 


৩০. আত্মপরিচয়, ৩ 
৩১, কাঁণকা, জীবন 


১৫৬ 


সেই প্রাণ চুপে চুপে 
বনুধার মৃত্বিকার প্রতি রোমকুপে 
লক্ষ লক্ষ তৃণে তৃণে স্থশরে হরষে, 
বিকাশে পল্লবে পুষ্পে বরষে বরষে, 
বিশ্বব্যাপী জন্ম-মৃতা সমুদ্র দোলায় 
ছুলিতেছে অন্তহীন জোয়ার ভাটায় |, 

'পরিশেষের' ছুটি কবিতায় এই চিন্তা! একটি নৃতন ভঙ্গিতে স্থাপিত 
হযেছে। তাতে বল। হয়েছে, স্যট্টিধারার মধ্যে সন্তার রূপ আছে-আর- 
নাই ভাবে প্রকটিত। সুতরাং স্থষ্টিধারার মধ্যে প্রলয় নিরম্তর ঘটে 
চলেছে; কিন্তু সেই প্রলয়ই সৃষ্টিধারাকে বহন করে চলেছে নৃতন 
জীবন এনে দিয়ে ॥ স্থষ্টি যেন নদী, প্রলয় তার তরঙ্গেব ছন্দ £ 

“নয় নয়' এই বাণী ফেনাইয়! মুখরিয়া উঠে 
মহাকাল সমুদ্রের পরে! 
সেই স্বরে 
রুদ্রের ডম্বকধবনি বাজে 
অসীম অন্বর মাঝে-_ 
'নয় নয় নয়?। 
ওরে মন, ছাড়ে! লোভ, ছাড়ে! শোক, ছাড়ো ভয়। 
স্ষ্টি নদী, ধারা তারি নিরস্ত প্রলয় ।৩৩ 
একই কবিতায় তিনি বলেছেন, বিনাশের শ্োতের মাঝেই 
অস্তিত্বের হাসি ফুটে ওঠে । সুতরাং জীবন যেন গান, তা যুটেওঠে 
মরণের বীণার তারে £ 
মরণের বীণ। তারে উঠে জেগে 
জীবনের গান ; 
নিরস্তর ধাবমান 
চঞ্চল মাধুরী । 


৩২. নৈবেদ্য, ২৬ ৩৩. পাঁরশেষ, ধাবমান 


৯৫৭ 


আর এক জ্বায়গায় দেখি রবীন্দ্রনাথ একটি জটিল উপমা প্রয়োগ 
করে বোঝাতে চেয়েছেন, মৃত্যুর ভিতর দিয়েই প্রাণের বৈচিত্র্যময় লীলা 
প্রবাহিত হয়। উপমাটা এই ॥ যে হাওয়। বাশির রন্ধ্রে ঢুকে নির্গত 
হয়, ত৷ নানা সুর ফুটিয়ে তোলে । হাওয়া যেন প্রাণের ধারা, বাশীর 
রন্ধ যেন মৃত্যু । এই মৃত্যুর বার অতিক্রম করেই হাওয়া সুরে পরিণত 
হয়। সেই সুর হল নবজীবনের প্রতীক। রবীন্দ্রনাথের মস্তব্যটি 
এখন স্থাপন কর! যেতে পারে £ 
রঙ্ধ্রে রন্ধ্রে হাওয়া যেমন স্থুরে বাজায় বাঁশি 
কালের বাঁশির মৃত্যুরন্তধ্ধে সেই মত উচ্ছ্বাস 
উৎসারিছে প্রাণের ধারা। 
সেই প্রাণেরে বাহন করি আনন্দের এই তত্ব অন্তহার। 
দিকে দিকে পাচ্ছে পরকাশ। 
পদে পদে ছেদ আছে তার নাই তবু তার নাশ ।৩৪ 
রবীন্দ্রনাথের চিন্ত। কিন্তু এইখানেই থামেনি ॥ ত। আরও এগিয়ে 
গেছে। উপরের আলোচনায় দেখি, মৃত্যু সম্বন্ধে ছটি দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপিত 
হয়েছে ঃ একটি ব্যক্তিবিশেষের খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি, অপরটি জীবন-মৃত্যুকে 
জড়িয়ে নিয়ে অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি । রবীন্দ্রনাথের প্রতিপাগ্ঠ হল বিচ্ছিন্ন দৃষ্ি- 
ভঙ্গিতে পরিচিতের বা আত্মীয়ের মৃত্যুতে শোক উপলব্ধি হয়। অপর- 
পক্ষে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে সেই শোক আনন্দের উপাদান 
হয়ে যায়। জন্ম ও মৃত্যু ছুই জড়িয়ে প্রাণের ধার । সেদিক থেকে 
দেখলে মৃত্যুও জন্মের সমান মূল্য, মৃত্যু নবজম্মের পথ উন্মুক্ত করে দিয়ে 
প্রাণধারাকে সজীব করে তোলে, “মৃত্যু শান জীবনকে শুচি করে? 
তোলে। তা হলে কি প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি বর্জনীয় এবং দ্বিতীয় দৃষ্টিভজিই 
কেবল গ্রহণীয়? 
রবীন্দ্রনাথ ত! বলেন না। তিনি বলেন উভয় উপলব্িই জীবনে 


৩৪. আকাশ প্রদীপ, পাখীর ভোজ 
১৮ 


সত্য; উভয়কেই স্বীকার করে নিতে হয়। শোকের অভিজ্ঞতার মধ্য 
দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে তবেই শোকাতীত অবস্থায় পৌছাতে হয়। খণ্ডের 
মধ্যে একটি অশান্তির সুর লেগে আছে। অশাস্তি সেই পরম সত্যে 
উত্তরণের পথ । তাই তিনি বলেছেন দ্ুদ্রত্বই রুদ্রের চরম পরিচয় নয়, 
রুদ্রের একটি প্রসন্ন মুখও আছে। তাই তার প্রকৃত রূপ। রুদ্রত্ের 
স্পর্শ নিয়ে সেই পবম পরিচয়টিকে পেতে হবে। তার প্রাসঙ্গিক 
মন্তব্যটি এই £ 
“রুদ্রতাই যদি রুদ্রের পরম পরিচয় হত, তা হলে এই অসম্পুর্ণতায় 
আমাদের আত্মা কোথাও আশ্রয় পেত না--তা হলে জগৎ রক্ষা পেত 
কোথাও? তাইতো মানুষ তাকে ডাকছে, রুদ্র যন্তে দক্ষিণং মুখং 
তেন মাং পাহি নিত্যম্--রুদ্র, তোমার যে প্রসন্ন মুখ, তার দ্বারা 
আমাকে রক্ষ। করে! ॥। চরম সত্য এবং পরম সত্য হচ্ছে এই প্রসঙ্গ 
মুখ। সেই সত্যই হচ্ছে সকল রুত্রতার উপরে। কিন্তু এই সত্যে 
পৌছতে গেলে রুদ্রের স্পর্শ নিয়ে যেতে হবে ।॥ কুদ্রকে বাদ দিয়ে যে 
প্রসন্নতা, অশাস্তিকে অস্বীকার করে যে শান্তি, সে তো৷ স্বপ্নুঃ সে সত্য 
নয় ।7৩ ৪ 
একটি সুন্দর কবিতায় তার এই দৃষ্টিভঙ্গি বাণী পেয়েছে। তার 
প্রাসঙ্গিক অংশ এখানে উদ্ধৃত করে এই আলোচনা শেষ করা যেতে 
পারে £ 
সে ঝড় যেন সই আনন্দে চিত্ত বীণাগ তারে 
সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত নাচাও যে ঝংকারে। 

আরাম হতে ছিন্ন কবে 

সেই গভীরে লও গে। মোরে 

অশান্তির অন্তরে যেথায় 

শান্তি স্বমহান ।৩৬ 


৩৫, আত্মপারচয়, ৩ 
৩৬. গীতাঞ্জাল, ৭৪ 


১৫৯ 


চার 
উভয় চিন্তার তুলনা 

উপরে আমর! উপনিষদের এবং রবীন্দ্রনাথের মৃত সম্বন্ধে চিন্তা 
পাশাপাশি স্থাপন করেছি॥। এখন সময় হয়েছে তাদের পরস্পরের 
তুলনা করবার ॥ সেকাজ ইতিমধ্যেই সহজ হয়ে গেছে; কারণ, 
আমর! প্রসঙ্গক্রমে লক্ষ্য করে থাকব যে এখানে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা 
উপনিষদের অত্যন্ত কাছে ঘেষে এসেছে। কাজেই বিস্তারিত 
আলোচনার প্রয়োজন হবে ন।॥ সংক্ষেপে উভয় চিন্তার সাদৃশ্য লক্ষ্য 
করতে পারি। মূল কথা রবীন্দ্রনাথের চিন্ত। এখানে একরকম 
উপনিষদের চিন্তার অনুসরণ করেছে। 

আমর! দেখব মৃত্যু সম্বন্ধে উভয় ক্ষেত্রেই তিনটি মূল চিন্তা অছে। 
বিষয়টি ছুটি স্তব হতে দেখা হয়েছে । একটি স্তরে ব্যক্তিগত দুঠিভঙ্গি 
প্রাধান্ত পেয়েছে ২ অন্ত স্তরে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্ত পেয়েছে। 
প্রথমটিকে উপনিষদ নানার দষ্টিভঙ্গি বলেছে এবং ববীন্দ্রনাথ খণ্ডের 
দৃষ্টিভঙ্গি বলেছেন । দ্বিতীয়টিকে উপনিষদ একদ্বের দৃষ্টিভঙ্গি বলেছে 
এবং রবীন্দ্রনাথ অখণ্ডের দৃষ্টিভঙ্গি বলেছেন। উভয়ই সতা, তাবা 
একই বিষয়কে বিভিন্ন রূপে দেখায়। প্রথমটিতে মৃত্যুর শোক অনুভূত 
হয়; দ্বিতীয়টিতে সে শোক অনুভূত হয় ন।, মৃত্যু আনন্দের উপাদানে 
পরিণত হয়। প্রথমটিতে অশাস্তি পাই এবং দ্বিতীয়টিতে শাস্তি বিরাজ 
করে। এ যেন একটি ভূখণ্ডকে ছুই স্তবে দেখার মতে । তার মধ্য 
থেকে দেখলে একরকম দেখি; পাঁশেখ পাহ।ড়ে উঠে উপর থেকে 
দেখলে আর একরকম দেখি। মধ্যে থেকে দেখি, ভূমি উন্নত, আনত, 
কোথাও ডিবি, কোথাও নালা, কোথাও সমতঙস ভূমি; স্বস্তিতে 
পদক্ষেপ কর! যায় না। আর উপরে উঠলে দেখি,সেই উন্নত আনত 
ভাব তেমন পরিস্ষুট নয়ঃ তারা যেন পাশাশাশি বিরাজ করে এক 
অখণ্ড সৌন্দর্যের বিস্তার ঘটিয়েছে। ছুভাবে দেখলেই বিষয়টির পরিপূর্ণ 
পরিচয় পাওয়। ঘায়। 


১৬৬ 


এই হুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ফলেই তিনটি পৃথক চিন্তা গড়ে ওঠে। 

(১) খগ্ডবোধের মধ্যে মৃত্যুশোক আছে। সেখানে তা হতে 
অব্যাহতি নেই। 

(২) অখগুবোধের মধ্যেওষৃত্যু আছে, কিন্তু সেখানে তার ভূমিকা 
পরিবন্তিত হয়ে যায়। মৃত্যু সেখানে আনন্দের উপাদান 
হয়ে যায়। 

(৩) তৃতীয় চিন্ত। বলে, উভয় চিন্তার মধ্য দিয়েই মানুষের যেতে 
হবে, কারণ উভয়েই সত্য। স্মৃতরাং খগডবোধের মধ্য দিয়ে 
মুত্যুশে।ক ভোগ করে, অখণ্ড বোধের সাহায্যে আনন্দ বা 
অমুতে উত্তীর্ণ হতে হবে। 

প্রথম চিন্তাটি আগে ধর। যাক। ত! বলে খগুবোধের ফলেই 

আমর প্রিয়জনের মৃত্যু ঘটলে শোক পাই। এই স্তরের দৃষ্টিভঙ্গিতে 
শোকের আঘাত হতে পরিত্রাণ নাই ॥ এই প্রসঙ্গে আমরা আর 
একবার উপনিষদের এই বচনটির প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করতে পারি-_ 

“মৃত্যু হতে সে মৃত্যুর (“শাক ) অনুভব করে ষে বিশ্বকে নানার! 

খণ্ডিত রূপে দেখে ।”৩ 

এখানে স্পষ্টতই বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বল! হয়েছে । আরও 

একটি লক্ষণীয় বিষয় যে এই বচনটি ছুটি উপনিষদে স্থান পেয়েছে, 
বৃহদারণ্যকে ও কঠে। 

তার অনুরূপ চিন্ত! হিসাবে রবীন্দ্রনাথের কিছু মন্তব্য স্থাপন করা 

যেতে পারে। “নৈবেছ” হতে উদ্ধৃত এই কাব্যাংশটি এই প্রসঙ্গে দেখ! 
যেতে পারে-- 
“মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, ছখে সে হয় ছুঃখের কৃপ 
তোমা হতে যবে স্বতন্ত্র হয়ে আপনার পানে চাই 1৮ 
৩৭, মৃত্যোঃ স মৃত্যুং গচ্ছতি (বিকঙ্গে 'আগ্নোতি' ) ষ ইহ নানেব 


পশ্যাতি ॥ কঠ ২১১১ ও বৃহদারণ্যক 818১৯ 
৩৮. নৈবেদ্য, ৯৪ 


১৬১ 


“নৈবেস্ঠ-এর আর একটি কবিতার মধ্যে একই চিস্তার প্রতিধ্বনি 
পাই। প্রাসঙ্গিক অংশটি এই-_ 
“তোমাতে রয়েছে কত শশী ভানু, 
কভু না হারায় অণু পরমাথু-_ 
আমার ক্ষুদ্র হারাধনগুলি রবে নাকি তব পায়? 
অল্প লইয়া থাকি, তাই মোর যাহা যায় তাহা যায় ১৯ 
উভয় ক্ষেত্রেই একই দৃষ্টিভঙ্গি; বিচ্ছিষ্ন আকারে দেখলে 
প্রিয়জনকে হারানোর শোক অনুভব করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ এই 
কথাই অন্য প্রসঙ্গে এইভাবে বলেছেন-_ 

'খগ্ুতার মধ্যে কদর্ষতা, সৌন্দর্য একের মধ্যে; খগ্ডতার মধ্যে 
প্রয়াণ, শান্তি একের মধ্যে ; খণ্ডতার মধ্যে বিরোধ, মঙ্গল একের 
মধ্যে; তেমনি খগণ্ডতার মধ্যেই মৃত্যু, অমৃত সেট। একের মধো 178 * 

স্তরাং আমর! দেখি, এধানে রবীন্দ্রনাথের চিন্ত। উপনিষদেব 
চিন্তার অনুসরণ করেছে । উপনিষদে যাকে নানাত্ব বলেছে, প্রবীন্নাথ 
তাকে খণ্ডত! বলেছেন। এই খণ্ডতা ব। নানান্বের বোধ হতে আমরা 
মৃত্যুশোক দ্বার৷ আক্রান্ত হই। 

দ্বিতীয় চিন্তা হল, একত্বের ব। অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখলে মৃত্যু 
আনন্দের উপাদান হয়ে যায়। এই প্রসঙ্গে উপনিষদের ছুটি বচন 
প্রণিধানযোগ্য ॥ প্রথমটি বলে--যে অবস্থায় এই জ্জান উপলব্ধি 
হয়েছে যে সকল জীবই আত্মান্বরূপ সেখানে একত্ব অনুভব করবার 
ফলে, কোথায় শোক, কোথায় মোহ ?'৪১ 

একত্বৰোধ হলে শোক থাকে না, এই কথ। এখানে বল। হয়েছে। 
নিচের বচনে অতিরিক্ত উল্লেখ হয়েছে যে একত্ববোধ পরিস্ফুট হলে 


৩৯. নৈবেদ্য ১৭ 

৪9০, ধর্ম। প্রাচীন ভারতের এক 

৪১. ৮৯৭১০ পঞএটিিনিনিদন্নিনির 
একস মনু পশ্যতঃ। ঈশ।৭ 


৯৬২ 


মৃত্যুশোকের দাহিক! শক্তি লোপ পায়। এ-বচনটির অংশ পূর্বে স্থাপন 
করা হয়েছে; এখানে সমগ্র বচনটি উদ্ধৃত কর! হচ্ছে । “মনের দ্বারাই 
এই কথ। উপলব্ধি করতে হবে যে বিশ্বে নান। বলে কিছু নেই। মৃত্যু 
হতে সে মৃত্যুশোক অনুভব করে যে বিশ্বকে নান। আকারে দেখে ।৪ 

এই বচন ছুটিতে একত্ববোধ পরিক্ফুট হলে মৃত্যুশোক হতে বা 
সকল শোক হতে পরিত্রাণ ঘটে, এই কথাই বল! হয়েছে । আরও 
একটি বচন উদ্ধৃত কর! হবে যেখানে জন্ম ও মৃত্যুর সমান মূল্য দেওয়া 
হয়েছেঃ উভয়কেই আনন্দের উপাদান হিসাবে গ্রহণ কর! হয়েছে। 
কাজেই জন্মের প্রেরণা যেমন আনন্দ, তেমন আনন্দের আকর্ষণে জীব 
মৃত্যু বরণ করে, এই কথা নল! হয়েছে । বচনটি এই-_ 

€ বরুণের পুত্র ভূ&) জানলেন ব্রহ্মই আনন্দ। আনন্দ হতেই 
এই জীবসকল জন্মগ্রহণ করে। জন্মগ্রহণ করে আনন্দের জন্য 
জ্ীবনধারণ করে। (মৃত্যুর পর ) আনন্দেই প্রতিগমন করে এবং 
প্রবেশ করে ॥৪৩ 

এই বচনটির তাৎপর্য খুব গভীর ॥ জন্ম ও মৃত্যু এখানে আনন্দের 
উপাদানরূপে পরিকলিত হয়েছে। ্ৃষ্টির প্রবাহ যেন বিশ্বনাট্য। 
নাট্যকার, নাট্যের চরিত্র এবং নাটো আশ্রিত যে রস সবই ব্রহ্ম । 
তাই জন্মেও আনন্দ মৃতুযুতেও আনন্দ। ম্ৃতরাং জন্ম ও মৃত্যু আনন্দের 
উপাদান । 

আশ্চর্য লাগে ভাবতে যে রবীন্দ্রনাথের মনেও একই চিস্তার উদয় 
হয়েছিল । তারও ধারণ। হয়েছিল যে অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখলে, 
জন্ম মৃত্যু, সুখ-ছুঃখ, হাসি-কান্না। আনন্দের উপাদান হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন 

9২. মনসৈবেদমাপ্তব্যং নেহ নানাস্তি কিন ॥ 

মৃত্যোঃ স মৃত্যুং গচ্ছতি ষ ইহ নানেব পশ্যাতি ॥ কঠ ২১১১ 
বৃহদারণ্যক ৪)8/১৯ : 
৪৩, আনন্দো ব্রম্মোত ব্যজানাং॥ আনন্দাদ্ধ্যেব খাঁতবমানি ভূতানি 


জায়গ্তে॥ আনন্দেন জাতানি জাবান্ত। আনন্দং প্রযল্ত্যভিসং- 
বিশন্তি ॥ তোতিরীয় ॥ ৩৬ 


১৬৩ 


ব্যক্তিস্বার্থের সংকুচিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে, তাদের মনকে আঘাত 
করবার শক্তি থাকে, কিন্ত অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখলে থাকে না। 
উপনিষদে যাকে নানাত্ব বলেছে তাকে তিনি খণ্ডত। বলেছেন। 
আর উপনিষদে যাকে একত্ব বলেছে তাকে তিনি অখণ্ডতা বলেছেন। 
একত্ববোধ বা অখগুবোধে উত্তীর্ণ হলে আনন্দলাভ হয়, এই কথ 
উভয়েই বলেছেন। এই প্রসঙ্গে নিচে উদ্ধৃত রবীন্দ্রনাথের রচিত 
একটি সংগীতের অংশ লক্ষ্য কর! যেতে পারে-_ 
“হাসিকান্ন। হীরাপান্না দোলে ভালে, 
কাপে ছন্দে ভালো-মন্দ তালে তালে । 
নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু পাছে পাছে 
তাতা থৈ থৈ তাত। থে থৈ তাত৷ থে থৈ 18৪ 
এই ভাবনায় হাসি-কান্ন1, ভালো-মন্দ, জন্ম-মৃত্যু যেন নৃত্যের 
উপাদান হয়ে গেছে। আনন্দ উভয়েরই প্রেরণ। । 
এই প্রসঙ্গে 'গীতাঞ্জলি'র একটি কবিতা উল্লেখ করা যেতে পারে। 
সেখানে ছয়টি খতুর আবর্তনকে কেন্দ্র করে একই চিন্তা পরিস্ফুট 
হয়ে উঠেছে। কোনও খতুর ভাঙার পালা, কোনও খতুর গড়ার 
পালা । গ্রীষ্মের দারুণ দাবদাহের পর আসে বর্ষার জলের প্রাণমঞ্চারী 
ধারা; তার ফলে শরতে প্রকৃতির বক্ষে ধৃত প্রাণধারার সঙ্জীবত। ফুটে 
ওঠে। তারপর হেমস্তে সে সজীবতা ম্লান হয়ে শীতে তা অন্তহিত 
হয়। তখন গাছ তার পাত ঝরিয়ে দিয়ে রিক্ত হয়ে ঈাড়ায়। কিন্তু 
তাও এক প্রস্ততি বসস্তের পুষ্পপত্রের বর্ণাঢ্য রূপের প্রকাশের জন্য । 
এইভাবে চলে অবিরাম ধারায় প্রকৃতির বক্ষ জুড়ে হাসি ও কানা, 
ধ্বংস ও নবজীবনের গ্রন্থন!। রবীন্দ্রনাথের ধারণায় তার প্রেরণা হল 
এই আনন্দ। তারই আকর্ষণে মৃত্যুর দিকে প্রাণপ্রধাহ আকৃষ্ট হয়ে 
বারবার ফিরে আসে নবজীবনের তথা মৃত্যুর পথ্ে। প্রাসঙ্গিক 
কাব্যাংশটি এই-_ 
88, অরুপরতন । গীতবিতানশবচিন্ত ও 


২৬? 


!সেই আনন্দ চরণ পাঙে 
ছয় খতু যে নৃত্যে মাতে 
প্লাবন বহে যায় ধরাতে 
বরণ-গীতে গন্ধেরে-_ 
ফেলে দেবার ছেড়ে দেবার 
মরবারই আনন্দেরে 18 * 


ধ্বংস, মৃত্যু- এরা ত প্রাণধারারই ছন্দ; তারা আনন্দ-ধারারই 
ছন্দ। তাই তিনি নিজেকে এই কবিতাতেই আহ্বান জানাচ্ছেন সেই 
আনন্দন্বত্যে যোগ দিতে এই বলে-- 

“পারবি নাকি যোগ দিতে এই ছন্দেরে, 

খসে যাবার ভেসে যাবার 
ভাঙবারই আনন্দে রে ।, 

এখন আমর! তৃতীয় চিন্ত।/য় আসতে পারি। তা বলে খগ্ডবোধ ও 
অখগডবোধ-_উভয় চিন্তার মধ্য দিয়েই মানুষকে আসতে হবে, কারণ 
উভয়েই সত্য। প্রথম চিন্তার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় চিন্তায় উত্তীণ হলেই 
আনন্দের বা অমুতের পরিপূর্ণ আন্বাদ মেলে । 

উপনিষদে খগ্ডবোধ বা নানা বোধকে অবিদ্ভাও বল। হয়েছে । এই 
ব্যাখ্যার সপক্ষে যুক্তি এই অধ্যায়ের প্রথম অংশেই দেওয়া হয়েছে। 
স্থতরাং তা পুনরুল্লেখের এখানে প্রয়োজন নাই। তবে যে প্রসঙ্গে এই 
ব্যাখ্যা দেওয়। হয়েছে তার এখানে তুলনামূলক আলোচনার জন্ 
সংক্ষেপে পুনরুল্লেখের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বর্তমান আলোচনায় 
উপনিষদের একটি বাণীর পুনরুল্পেখ করলেই আমাদের উদ্দেশ্টা সিদ্ধ 
হবে। বচনটি এই-_ 

'যিনি তাকে জানেন, তার কাছে অবিদ্যা ওবিদ্ধ। উভয়েই তিনি। 


86. গা'তাজলি ৩৬ 
১৬৫ 


অবিষ্ঠার দ্বারা মৃত্যুর শোক ভোগ করে বিষ্ভার দ্বারা অমৃত লাভ কর! 
যায় ।”৪৬ 

এখানে অবিষ্তা ও বি! ছুটি বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হতে লব্ধ বিশ্বসন্বদ্ধে 
ধারণা স্থচিত করে। একটি নানার দৃষ্টিভ্গ, অপরটি একছের দৃষ্টিভঙ্গি । 
নানার দৃষ্টিভঙ্গিতে মৃত্যুর আঘাত আছে; কিন্ত একত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে 
তা অমৃত আন্বাদের ব। আনন্দের অঙ্গীভূত হয়ে যায়। এখানে আর 
একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি আছে। তা বলে অবিষ্ঠা বিশ্বসস্থন্ধে 
যে পরিচয় দেয় তাও ব্রপ্গেরই পরিচয়, আবার বিদ্যা বিশ্ব সম্বন্ধে যে 
পরিচয় দেয় তাও ব্রন্মেবই পরিচয় । তাই বল! হয়েছে, 'উয়ং স হ। 
স্থৃতরাং তাৎপর্য হল উভয় পরিচয়ের মধ্য দিয়েই মানুষকে যেতে হবে। 
তবেই বিশ্বের পরিপূর্ণ রূপটির আম্বাদন হবে। 

এখানেও আমরা দেখব যে এই উভয় দৃষ্টিভঙ্গি হতে মৃত্রাকে দেখার 
প্রয়োজনীয়ত৷ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ সচেতন হয়েছেন। তার 
বক্তব্য হল মৃত্যুর শোকের মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে তবেই মৃত্যুর দ্বিতীয় 
রূপের আস্বাদ সার্থক হয়ে ওঠে। এই প্রসঙ্গে তার ব্যক্তিগত 
অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি মৃত্যুর আঘাতে প্রথমে কতখানি ভেঙে 
পড়েছিলেন এবং পৰে ব্যাপক অখগুবোধের মধ্য দিয়ে কেমন করে 
নূতন দৃষ্টিভঙ্গিতে উত্তরণ ঘটেছিল তাব সুন্দব বর্ণনা পাওয়া যায় ডঃ 
অমিয় চক্রবতাঁকে লিখিত একটি চিঠিতে । তার প্রাসঙ্গিক নংশ 
উদখধূতকরে এই আলোচন৷ শেষ করা যেতে পাবে-_-আমার জগৎ শুহ্ঠ 
হল, আমাৰ জীবনের সব সাধ চলে গেল। এই শুম্থতার কুহক 
কোনোদিন ঘুচবে এমন কথা আমি মনে কবতে পারি নি। কিন্তু তার 
পর সেই প্রচগড বেদনা থেকেই আমার জীনন মুক্তির ক্ষেত্রে প্রথম 
প্রবেশ লাভ কবল ॥ আমি ক্রমে বুঝতে পারলুম, জীবনকে মৃত্যুর 
জানল।র ভিতর থেকে না দেখলে তাকে সত্যবপে, দেখ! যায় না। 


৪৬. বিদ্যাং চ বিদ্যাং চ যস্তছেদো ভয়ং সহ॥ আঁব্দায়া মত্যুং তণস্থ 
বিদায়ামতসম্নুতে ॥ ঈশ ১ 


১৬৬ 


ধৃত্যুর আকাশে জীবনের যে বিরাট যুক্ত রূপ প্রকাশ পায়, প্রথমে তা 
বড়ে। ছুঃসহ। কিন্তু তারপর তার ওঁদার্ধ মনকে আনন্দ দিতে থাকে । 
তখন ব্যক্তিগত জীবনের স্ুখ-হঃখ অনস্ত স্যষ্টির ক্ষেত্রে হাক্ষা হয়ে দেখা 
দেয়।৪? 


8৭. আঁময় চক্রবতরঁকে লিখিত ৮ই আষাঢ় ১৩২৪-এর পন্ত 


১৩৭ 


৭৭1৭৭ বত অধ্যায় ৭2 
শ্রেয়ততৃ 
প্রাথামক কথা 


মানুষের জীবন খুব ব্যাপক ক্ষেত্রে প্রতিষ্িত। সে চিন্তা করে, 
অনুভব করে এবং কর্ম করে। চিন্তার প্রেরণা জ্ঞান। তার পরিবেশকে 
মান্নুষ ভাল করে জানতে চায়। তার জন্তই তার চিন্তা করতে হয়! 
সেই চিন্তার আনুষঙ্গিক ফল জ্ঞান । পুরুষা ণুক্রমে সঞ্চিত এই জ্ঞান 
হতেই দর্শন, বিজ্ঞান ও ইতিহাস গড়ে উঠেছে। প্রত্যক্ষ জ্ঞানের যা 
বিষয়ীভৃত হতে পারে না তার অনুসন্ধান করে দর্শন। প্রত্যক্ষ 
অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের সাহায্যে যে জ্ঞান সপ্ত 
হয় তাই বিজ্ঞান নামে পরিচিত । আর যে জানের শাখ। মানুষের 
অতীত সম্বন্ধে নিজেকে নিযুক্ত করে তাকে আমর! বলি ইতিহাস। 
মানুষের অনুভূতি ছুই স্তরে। একটি ইন্দ্রিয়ের স্তরে, অপরটি 
হৃদয়ের স্তরে। ইন্ড্রিয়ানুভৃতি সুখের হতে পারে ব৷ যন্ত্রণাদায়ক হতে 
পারে। প্রথমটির প্রতি মানুষের মন আকৃষ্ট হয়, কারণ ত সুখকর। 
তা স্বভাবত কামনার বিষয় হয়ে দাড়ায় বলে তাকে প্রেয় বলতে 
পারি ॥ দ্বিতীয় স্তরে যে অনুভূতি তার সঙ্গে ইন্ড্রিয়ের প্রতাক্ষ সংযোগ 
নেই॥ মনের মধ্যে তার উদয় হয়। কারও সহিত বিবাদ' হলে তার 
প্রতি বিদ্বেষের অনুভূতি জাগে । কাউকে ভাল লাগলে: তার প্রতি 
প্রীতির অনুস্ভূতি সঞ্চারিত হয়। কেউ মহৎ কাজ করলে তার প্রতি 
শ্রদ্ধার অনুভূতি ফুটে ওঠে । কেউ ঘ্বণ্য কাজ করলে তার প্রতি দ্বার 


১৬৮ 


অনুভূতি জাগে ॥ অনুরূপভাবে প্রকৃতি ও মানুষের মনে নান! অস্ুভভূতি 
সঞ্চার করতে পাবে। মেঘে আচ্ছন্ন দিনে মনে বিষাদের অনুভূতি 
জাগে। বসস্তের বাতাসের প্রথম স্পর্শ বা দূর হতে ভেসে আসা 
ফুলের গন্ধ পুলকের অনুভূতি জাগায় । 

তৃতীয়ত মানুষ কাজ করে। ত। তার ইচ্ছাশক্তি দ্বার! গ্রণোরদিত। 
তার জ্ঞানশক্তি ও অনুভূতিশক্তি ও তার কাজকে প্রভাবান্বিত করে। 
যে ইন্দরিয়ান্ৃভূতি সুখকর তার স্মৃতি তার পুনরুদ্রেকের জন্য মানুষের 
কর্মশক্তিকে আকর্ষণ করে। যাকে গ্রীতি করি তার কল্যাণের জন্ত 
কষ্টসাধ্য কাজও আমরা করি । আবার একটি মানসিক আদর্শকে 
জীবনে রূপায়িত করতেও আমরা কাজ করি। প্রথম ছটি ক্ষেত্রে 
ইন্জরিয়ান্ভূতি কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে, আর তৃতীয় ক্ষেত্রে জ্ঞান আমাদের 
কর্ণকে নিয়ন্ত্রণ করে । সুতরাং জ্ঞান, অনুভূতি ও কর্ম পরম্পর জড়িত। 
কর্ম ও জ্ঞান অনুভূতিকে প্রভাবান্বিত করে। কিন্তু সে বিষয় এখানে 
আলোচন! প্রাসঙ্গিক হবে না বলে তা অবতারণ। করবার প্রয়োজন 
নাই। 

শ্রেয়ততের প্রয়োগক্ষেত্র হল মানুষের ইচ্ছাধীন কর্ম। তার লক্ষ্য 
হল কি ভাবে মানুষের ইচ্ছাধীন কর্মগুলি নিয়ন্ত্রিত করা উচিত, তা 
নিধারণ করা । অর্থাৎ তা নীতিশান্ত্রে একটি মৌলিক সমস্যার 
সমাধান করতে চেষ্টা করে। সে সমস্তা প্রশ্ন উত্থাপন করে £ কোন 
নীতি অনুসারে মানুষের ইচ্ছাধীন কর্মগুলি নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। 
অর্থাৎ মানুষের জীবনের লক্ষ্য কি হওয়। উচিত। কারণ সে লক্ষ্যই তো 
কোন্‌ নীতি গৃহীত হবে তা ঠিক করে দেবে ॥ কোথায় যাব ঠিক হলে, 
তবেই তো! পথ বলে দেওয়া সম্ভব হয় ॥ এই লক্ষ্যকে আমাদের দেশের 
নীতিশাস্ত্রের পরিভাষায় পুরুষার্থ বলে! পশ্চিমে এই প্রসঙ্গে যে 
পরিভাষিক শব্দটি ব্যবহৃত হয় তা হল 'সামাম বোনাম'১। তারও 
অর্থ একই। 


৬, 90121108009 


১৬৯ 


এখন মানুষ ইচ্ছাধীন কাজগলি করতে ছ'জোড়া দোটানায় পড়ে। 
একদিকে তার দেহ আছে এবং মন আছে । দেহে ইন্দ্রিয় আছে; 
তারা ইন্দরিয়স্থখকর অন্নুভূতির প্রতি আকৃষ্ট হয়। অপরদিকে মন 
অন্ত ধরনের তৃপ্তি চায়; তা এমন কাজ চায় যা মনের তৃপ্তি সাধন 
করে। এই দোটানাকে অবলম্বন করে নীতিশাস্ত্রে ছুটি বিপরীত মতের 
দবন্ব দেখা! যায়। একটি মত বলে ইন্দ্রিয় তৃপ্তিই মানুষের পুরুযার্থ 
হওয়। উচিত। যাবৎ জীবেৎ স্ুখং জীবেং। অন্ত মতটি বলে ভোগের 
জীবন ত্যাগ কর, কারণ তাতে সুখের থেকে যন্ত্রণা বেশি । একটি হল 
ভোগবাদ এবং অপরটি হল ত্যাগবাদ বা সন্ন্যাসবাদ। 

অপরদিকে মানুষ সামাজিক জীবও বটে। সে বনে এক বাস 
করে না, সমাজে বাস করে। তার প্রতিটি ইচ্ছাধীন কর্ম যেমন তার 
স্বার্থের সঙ্গে জড়িত, তেমন সমাজের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত ॥। এমন 
কাজ আছে যা ব্যক্তিবিশেষের মঙ্গল সাধন করে । যেমন, কোন 
ব্যক্তি যদি কঠোর পরিশ্রম স্বীকার করে বিদ্ধা আয়ন্ত করে, ত| হলে 
তার মানসিক উৎকর্ষ সাঁধিত হবে এবং তার বিদ্ার সুফল সমাজেরও 
কল্যাণ সাধন করে। আবাব এমন কর্ম আছে যা ব্যক্তিবিশেষের 
স্বার্থ বর্ধন করে, কিন্তু সমাজের স্বার্থহানি ঘটায় । কেহ যদি অন্যকে 
বঞ্চিত করে প্রভৃত ধন সঞ্চয় করে, তা হলে এমন ঘটে। সুতরাং প্রশ্ন 
ওঠে £ ব্যক্তির স্বার্থ দেখব, না সমাজের স্বার্থ দেখব । এই দোটানাকে 
ভিত্তি করে ছুটি বিপরীত মত গড়ে ওঠে। একটি বলে স্বার্থ বড়, 
অপরটি বলে পরার্থ বড়। এইভাবে স্বার্থ ও পরার্থের ছন্দ এসে পড়ে। 

মনে হয়, এই ছু'জোড়া বিরোধী মত একটি বিশেষ নীতি প্রয়োগ 
করে এক জোড়া বিরোধী মতে রূপস্তিরিত করা ঘায়। তার আলোচন। 
কর এখানে প্রয়োজন হয়ে পড়ে, কারণ তা হলে নৈতিক সমস্থ 
সম্বন্ধে উপনিষদের দৃষ্টিভঙ্গির সহিত পরিচিত হওয়া সহজ হবে । দেহ 
যা! চায় ত| হল ইন্দ্রিয় সথখভোগ। আবার ইন্দ্রিয়ন্থখ অর্থেই ব্যত্তি- 
বিশেষের ইন্ত্রিয় সুখ; নুতরাং তা! ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুজ। 


১৭০ 


কাজেই ব্যস্ডিম্বার্থের অন্বেষণ এবং ইন্জরিয়সথখ অন্বেধণ_-এই ছি দৃষ্টি- 
ভজিব প্রকৃতি একই হয়ে দাড়ায়। এই ছুটি আদর্শের সংযোগে যে 
নূতন আদর্শটি পাই তাকে উপনিষদ প্রেয়বাদ বলে । কারণ, যা! ইন্জরিয়- 
সুখকর তাই হল প্রেয়; তার প্রতি মন স্বভাবতই আকৃষ্ট হয়। তার 
সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে স্বার্থপর 
করে গড়ে তোলে এবং পরার্থ সম্বন্ধে উদাসীন করে। 

অপরপক্ষে মনের দেহের প্রতি একটি বিরৌধভাব আছে। ইন্ড্িয়- 
খে আকর্ষণ মনকে কাজ করবার অবসর দেয় না। তাই তা ইন্দ্রিয়- 
সংঘমের পক্ষপাতী । তা দৈহিক স্ুখভোগকে স্ুল মনে করে; 
কারণ, সেখানে মানুষ পশুর সমপরধায়ে পড়ে । মানসিক সুখ মানুষের 
স্বভাবের সঙ্গে বেশি সঙ্গতি রক্ষ। করে ; কারণ, মানুষ জ্ঞানশক্তি-মগ্ডিত 
জীব। ফলে মনের আকর্ষণ এসে পড়ে ইক্জিয়বৃত্তি নিরোধের প্রতি । 
মনের এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সমষ্টিগত কল্যাণে আত্মনিয়োগ করবার 
উপযুক্ত করে গড়ে তোলে । তাই দেখি যারা সঙ্গযাসী তারা সহজেই 
সাধারণের কল্যাণের কাজে আকষ্ট হয় । আমাদের রামকৃ্চ মিশনের 
সন্ন্যাসী সম্প্রদায় এবং খ্রীস্টান পার্রিদের তাই আমর! সর্জনীন 
কল্যাণমূলক কাজে এত উৎসাহভরে যোগ দিতে দেখি। সুতরাং 
সম্নাসবাদের সহিত পরার্থবাদের একটি প্রকৃতিগত সাদৃশ্য আছে। 

স্থতরাং একদিকে পাই প্রেয়বাদ যা ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থকে 
প্রাধান্য দেয় এবং অপরদিকে পাই সন্গ্যাসবাদ য1 ইন্দ্রিয়নিরোধ করে 
মানসিক সাধনপথে তৃপ্তি খোজে । মোটামুটি দেখা যায় এদের 
বিরোধ ছুই ভিত্তিতে গড়ে ওঠে । প্রথম, দেহের সঙ্গে মনের বিরোধ 
এবং দ্বিতীয়, স্বার্থের সঙ্গে পরার্থের বিরোধ। আমরা যদি কল্যাণের 
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জিনিসটি দেখি, সমস্যাটি আরও সরল রূপ নেয়। মূল 
প্রশ্ন হল ব্যক্তির সুখ বা! তৃপ্তি নয়, গোষ্ঠীর সুখ ব তৃপ্তি নয়, ব্যক্তির 
কল্যাণ বা গো্চীর কল্যাণ। দেহ ও মনের সহিত সম্বন্ধ এত ঘনিষ্ঠ 
যে উভয়ের কল্যাণ পরম্পর জড়িত। স্বৃতরাং ব্যক্তিবিশেষের সম্পর্কে 


১৭১ 


স্রোগ বা ত্যাগের সংঘাতের পগমাধান নির্ভর করে সমগ্র ব্যক্তির 
কল্যাণের ওপর । অন্ুরূপভাবে বল। যায়, ব্যক্তি সমাজ হতে পৃথক নয়, 
তার অঙ্গীভূত। ঠিক বলতে কি তাদের মধ্যে মূলত বিরোধ নেই। 
ব্যক্তির কলাণেও সামশ্রিক কল্যাণ সাধিত হয়; আবার সামগ্রিক 
কল্যাণ ব্যক্তির কল্যাণের অনুরূপ পরিবেশ রচন৷ করে।॥ সম্কৃচিত 
দৃষ্টিভঙ্গি হতে দেখলেই একটা বিরোধ এসে পড়ে। ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি 
দিয়েই তার সমাধান করতে হয়। তাকে আমরা সামগ্রিক কল্যাণের 
দৃষ্টিভঙ্গি বলতে পারি । উপনিষদে তাকেই শ্রেয় বলা হয়েছে। তার 
আদর্শ অনুসারে পুরুষার্থ হল সামরিক কল্যাণ। একধারে দেহ ও 
মনকে নিয়ে সমগ্র মানুষের ; অন্যধারে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে নিয়ে সকল 
মানুষের । 

স্রতরাং প্রেয় হল তাই য। সমগ্রের নয়, অংশের তৃপ্তি খোজে। 
যেহেতু তা অংশের স্বার্থ সংরক্ষণে উৎস্থক, কল্যাণ তার নাগালের মধ্যে 
আসে না। কারণ, কল্যাণ সামঞ্জস্যের ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে। 
সুতরাং আমরা দেখব, যাকে প্রেয় বলি তা কি ব্যক্তির ক্ষেত্রে, কি 
সমাজের ক্ষেত্রে সঙ্গুচিত দৃষ্টিভঙ্গি হতে প্রেরণা পায়। দেহের স্বার্থ 
মনের স্বার্থ হতে বেশি আকর্ষণের বস্তব। তাই তা প্রেয়। অন্ুবূপ- 
ভাবে সমাজের ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থ সামাজিক কল্যাণের থেকে সাধারণত 
বেশি আকর্ষণের বন্ত ৷ ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে সমগ্র ব্যক্তির 
কল্যাণ এবং ব্যষ্টি ও সমঘ্তির কল্যাণ--উভয়ের সামগ্জস্তের মধ্যেই 
সমাধান পাওয়া যায়। য1 সামঞ্জস্যের মধ্য দিয়ে সামগ্রিক কল্যাণ 
সাধন করে তাই শ্রেয়। সেই কারণে শ্রেয় আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণের 
বিষয় নয় ; বুদ্ধিশক্তির সাহায্যে তার কল্যাপকরতা৷ উপলব্ধি করলে 
তবেই ত। আকর্ষণের বস্তু হয়। 

তাই উপনিষদ বল্গে-_- 

ভ্রোয় এবং প্ররেয় ভিন্ন জিনিস) তারা মাঞুষকে নানাভাবে 
মাকর্ষণ করে। তাদের মধ্যে শ্রেয়কে গ্রহণ করলে কল্যাণ হয়, 


৯৭৭ 


আর ষে প্রেয়কে গ্রহণ করে সে পুরুষার্থ হতে ভরষ্ট হয়।ং 


ছ্ই 
উপানধদের শ্রেক্সবাদ 


এই শ্রেয়বাদের পরিকল্পন! সঙ্গ্যাসবাদ হতে পৃথক । আবার তা ভোগ- 
বাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে পৃথক । ভোগবাদে ব্যক্তিবিশেষের স্ুখই ব্ড় 
আকর্ষণ। সল্ন্যাসবাদ ঠিক তার বিপরীত; তা সকল সুখ বর্জন করে 
কৃচ্ছ,সাধনের এবং একাস্তিক সংযমের উপদেশ দেয়। উপনিষদ 
সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে কৃচ্ছ,সাধন করতে উপদেশ দেয় নি। 
নিরবচ্ছিন্ন ভোগেরও উপদেশ দেয় নি। তাতে বল হয়েছে জীবনে 
ভ্যাগেরও প্রয়োজন আছে, ভোগেরও প্রয়োজন আছে; উভয়ের 
সামঞ্জস্যের মধোই জীবন সার্থকতা মণ্ডিত হয়। ভূঁমিকে উর্বব করতে 
হুলে, প্রথমে প্রয়োজন তাকে ভালভাবে কর্ষণ করা । সেই কর্ষণ হল 
জীবনের ত্যাগের দিক। কিন্তু কর্ষণ করে জমি ফেলে রেখে দেবার 
কোনও অর্থ হয় না। তাতে বীজ বপন করে শস্য উৎপাদন করতে 
হয়, তবেই ত। সার্থক হয়। সেইরূপ জীবনে ত্যাগটাই সর্বস্ব নয়। 
ত্যাগের পর যে-পথে ভোগ জীবনকে সার্থকতা মণ্ডিত করবে সে-পথে 
ভোগের প্রয়োজন আছে। ইন্ড্রিয়গুলির বিষয়ের প্রতি আসক্তি 
আছে সত্য ; কিন্তু তাই বলে ইন্জ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের সম্পুর্ণ বিচ্ছেদ 
আমাদের আদর্শ হবে না। আমাদের আদর্শ হবে, ইন্ড্রিয়গুলিকে 
নিয়ন্ত্রিত করে বিষয়ের সহিত সংযুক্ত করা, যাতে শ্রেয় লাভ হয়। 
ইক্ক্রিযদমনের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন আছে ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের 

এই ভাবনাটি কঠ উপনিষদে একটি উপমার সাহায্যে সুন্দর 
ব্যাখ্যা কর! হয়েছে । সেখানে ইন্দ্রিযগুলিকে অশ্বের সহিত তুলন। 


২ অন্যচ্ছেয়োহনাদুতৈব প্রেয়স্তে উভে নানার্ধে পুর্ষং সিনীতঃ | 
তয়ো শ্রেয় আদদানস্য সাধু ভবাত হায়তেথ্থাঁদ্‌ ষ উ প্রেয়ো বণদতে ॥ 
কড় ॥ ৯২৯ 


৯৭৩ 


কর! হয়েছে । অশ্বকে ইচ্ছামতো! ছেড়ে দিলে সে গন্তব্পথে না গিয়ে 
উদ্দেশ্বহীনভাবে বিচরণ করে। সেইরকম ইন্দ্রিয়গুলিকে অনিয়ন্ত্রিত 
ভাবে বিচরণ করতে দিলে তারা নানা সুখকর অনুভূতির প্রতি আকৃষ্ট 
হয়। শ্রেয়ের পথে তাদের পরিচালিত করতে হলে ভাল সারথির 
মতে। তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে ॥ নীতিবুদ্ধি এখানে সারথির সঙ্গে 
তুলনীয় ॥ যার নীতি সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান নেই তার মনে একাগ্রতা 
আসে না, লক্ষ্য ঠিক থাকে না। তাই যেমন ছষ্ট অশ্বগুলি সারধির 
বশে থাকে না, তেমনি ইন্ড্রিয়গুলি তার বশে থাকে না। আর যে 
বিবেচনাশক্ধির সাহায্যে শ্রেয়ের পথ ঠিক করে নেয় এবং তার প্রতি 
মনকে নিবিষ্ট করে, ইন্জ্রিয়গলি তার বশে থাকে ; যেমন ভাল অশ্ব 
সারথির বশে থাকে ।ৎ 

এই ইন্জিয়গুলিকে শ্রেয়ের পথে পবিচালিত করতে উপনিষদ 
ছুটি জিনিসের ব্যবহারের উপদেশ দেওয়া হয়েছে। শশ্বকে নিয়ন্ত্রণ 
করে ঠিকপথে পরিচালিত করতে প্রথমে প্রয়োজন গন্তব্-পথ ঠিক 
করে নেওয়া; দ্বিতীয়ত প্রয়োজন তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রগ্রহ বা 
লাগামের। জীবনের পথে ইন্দ্রিযরূপী অশ্বগুলিকে পরিচালিত করতে 
প্রয়োজন বুদ্ধিশক্তির প্রয়োগের । ত। পথ নির্দেশ করবে যেমন রথের 
ক্ষেত্রে সারথি পথ নির্দেশ করে । আর ইন্দ্িয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য 
প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তির। তত প্রগ্রহের মতো৷ তাদের ঠিকপথে চালিত 
করবে) 

আমর দেখব শ্রেয়বাদ দেহ ও মনের দ্বন্দের, তথ স্বার্থ ও পরার্থের 
দ্বন্দের মীমাংসা খু'জেছে সামশ্রিক কল্যাণের আদর্শের£সাহায্যে। তা 
যা মনকে আকৃষ্ট করে, অর্থাৎ য। প্রেয়, তাকে প্রত্যাখান করেছে আর 


৩. যস্ববিজ্ঞানবান: ভবত্যয:ন্তেন মনসা সদা ॥ তস্যোশ্িয়ান্যবশ্যানি দক্টাম্যা 
ইব সারথেঃ ॥ বস্তু বিজ্ঞানবান: ভবতি যুষ্ধেন মনসা সদা ॥ তস্যোন্রিয়ান 
বশ্যানি সদস্যা ইব সারথেঃ ॥ কঠ ॥ ১/০৫-৬ 

৪. বাদ্ধিং তু সারাথং বাদ্ধ মনঃ প্রগ্রহমের চ ॥ কঠ॥ ১৩1৩ 


১৭8 


যা মঙ্গল আনে তাকে গ্রহণ করেছে। অর্থের দিক হতেও শ্রেয় 
কল্যাণ ও মঙ্গলের সমার্থ বোধক । এ কথা যেমন মান্থুষ-বিশেষের 
মধ্যে দেহ ও মনের অন্ত্থন্ সম্পর্কে খাটে, তেমন অপরদিকে ব্যক্তির 
ও সমাজের স্বার্থের যে বিরোধ সে সম্বন্ধেও খাটে । যা একদিকে দেহ 
ও মনের এবং অপরদিকে স্বার্থের এবং পরার্থের সামগ্রিক কল্যাণসাধন 
করবে তাই হল শ্রেয়ের আদশ । 

এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে উপনিষদ বলে জীবনে 
ত্যাগেরও প্রয়োজন আছে ভোগেরও প্রয়োজন আছেঃ উভয়ের 
সামগ্রস্তের মধ্যেই জীবন সার্থকত। মণ্ডিত হয়। উপনিষদে যে 
ইন্ড্রিয়নিগ্রহ নয়, ইন্দ্রিয় সংযমের দিকে বেশি দৃষ্টি দেওয়া হত তার 
একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় বৃহদারণ্যক উপনিষদে বিত একটি 
কাহিনীতে । শেক্সপীয়ার প্রস্তর খণ্ডের মধ্যে উপদেশের বাণী খুঁজে 
পেয়েছিলেন।ৎ উপনিষদের খষিও শুধু মনীষী নয়, কবি ছিলেন। 
প্রাকৃতিক ঘটনার মধ্যে তিনিও ভাবগর্ড বাণী খুঁজে পেতেন। 

বৃহদারণ্যক উপনিষদে গল্প আছে প্রজাপতি সমাবর্তনের সময় 
নিজের তিন শিষ্যকে উপদেশ দিচ্ছেন। দৈত্য শিষধাকে বলছেন 
“দামাত' অর্থাৎ আত্মদমন কর; মানুষ শিষাকে বলছেন “দত্ত' অর্থাৎ 
দান কর; আর দেবতা শিষ্যকে বলছেন “দয়ধবম্ঠ অর্থাৎ দয়া কর। 
দৈত্য স্বভাবত ক্রোধপরায়ণ * তাই তাকে আত্মদমনের উপদেশ । 
মানুষ স্বভাবত লোভী; তাই তাকে দান করতে উপদেশ। আর 
দেবতা অসীম শক্তির আধার ; তাই তাকে দয়। করতে উপদেশ যাতে 
না সেই শক্তির অপপ্রয়োগ ঘটে ॥। এখন সাধারণ মানুষ আমরাও 
ক্রোধপরায়ণ হই, লোভী হুই, ক্ষমতার পদ্দে আসীন হই। স্থৃতরাং 
এই উপদেশ আমাদের সকলেরই উপর প্রয়োগযোগ্য । খষি বলেন, 
তাই নাকি বর্ধার দিনে আকাশের বুকে যখন শিছ্যৎ খেল করে এবং 


&. 105 60000165 8 0655১ 0095 ঠা) 10010105 1019015, 56100005 1 
860569 200 2০০৫ 0) 2৬61 0)008,-485 ০ [866 1৮ 
১০ []) 5০996 ] 


৯৭৫ 


মেঘ গুরু গুরু গর্জন করে, তখন সেই গুরু গুরু ধ্বনির মধ্য দিয়ে 
বিহ্যৎ প্রজাপতির সেই উপদেশ বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে দেয়।৬ যা 
লক্ষা করবার, তা হল এখানে আত্মদমনের কথ। বল। হয়েছে, সঙ্গ্যাসের 
কথ! বল। হয় নি। 

সেকালে আত্মদমনের জন্যই শিক্ষাজীবনে ত্রহ্মচর্ধ পালনের ব্যবস্থা 
ছিল। ত৷ সন্ন্যাসের প্রস্তুতি নয়, গৃহস্থ-জীবনের প্রস্ততি । এ বিষয় 
তৈত্তিরীয় উপনিষদে স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায়। সেখানে দেখ যায় 
সমাবর্তনের দিনে আচার্য এই বলে অস্তেবাসী ব। শিষ্যকে উপদেশ 
দিচ্ছেন--“সত্য কথ বলবে । ধর্ম আচরণ করবে । বেদ পাঠ হতে 
বিরত হবে না॥ আচার্ধকে প্রিয় উপহার দেবে। বংশধারাকে 
অব্যাহত রাখরে।+ এখানে বংশধারাকে অব্যাহত রাখার উপদেশটি 
খুব তাংপর্ষপূর্ণ। শিষ্য শিক্ষাকালে ব্রহ্মচর্য আশ্রমে অবস্থানের পর 
আদর্শ সংসারী রূপে সংসারধর্ম পালনের উপযুক্ত হয়েছেন। তাই 
গুর তাকে উপদেশ দিচ্ছেন গার্স্থ্য আশ্রমে প্রবেশ করতে। পুরে 
কৃচ্ছ সাধন করে শিষ্য ভোগের জীবনের উপযুক্ত হয়েছেন । ভবিষ্যতে 
প্রয়োজন হলে আত্মসংঘম তার পক্ষে সহজ হবে। ভোগের জন্যই 
কৃচ্ছ সাধনের প্রয়োজন; তা সংযমের সহিত ভোগ সহজসাধ্য করে। 
জীবনে ত্যাগেরও স্থান আছে, ভোগেরও স্থান আছে। শুধু ভোগ বা 
শুধু সন্ন্যাস সামগ্রিক কল্যাণের পরিপস্থী। 

এখন প্রশ্ন ওঠে সামগ্রিক কল্যাণ কোন্‌ কর্মদ্বারা সাধিত হয়, 
কোন কর্ণ শ্রেয়ের পথে আমাদের নিয়ে যায়, তা নির্ধারণ করব কি 
করে। ত| নির্ধারণ করবার জন্ক উপনিষর্দে একটি নীতিও স্থাপন 
কর! হয়েছে। সেটিও পাই তৈত্তিরীয় উপনিষদে বণ্িত সমাবর্তনের 
দিনে দেওয়া আচার্ষের উপদেশ হতে। তিনি বলৈছেন, যা অনবদ্ধ 


৬, তদেতদেবৈষা দৈব বাগনুবদাঁত স্তখায়তদর্দদ ইতি গামাত দত্ত দয়ধ্যমাতি 
তদেতয়ং শিক্ষেদ: দমং দানং দয়ামাত । বৃহদারণ্যক | ঠা 


৭. সতাং বদ ॥ ধ্মং চর ॥ গ্বাধ্যায়ান মা প্রমদঃ ॥ আচাষরি প্রিয্ং ধনমাহতা 
প্রজাতষ্তুং মা ব্যবচ্ছেখসঃ।॥ তৈতিরীয় ॥ ৯২ 


১৭ 


কর্ম তাই হল কর্তব্য কর্ম।” তাকেই গ্রহণ করতে হবে। এখানে 
দেহের স্বার্থ বা মনের স্বার্থের প্রশ্থ ওঠে নাঃ ব। ব্যক্তিস্বার্থ এবং 
সমাজের স্বার্থের প্রশ্ন ওঠে না। এখানে সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমন 
একটি নীতি স্থাপিত হয়েছে য৷ সামশ্র্িক কল্যাণ সাধন করে। তাই 
হল অনবদ্ধ কর্ম যার কোন দৃষ্টিভঙ্গি হতেই দোষ ধর! যায় না। তা 
একদিকে দেহের ও মনের কল্যাণ-সাধন করবে, অপরদিকে স্বার্থ ও 
পরার্থের সংঘর্ষের সমাধান করবে, এমন কাজ করতে উপদেশ দেবে যা! 
ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েরই কল্যাণ-সাধন করে ॥। এই উপদেশ অস্তে- 
বাসীর উদ্দেশে প্রদত্ত হলেও তা সমাজের সকল মানুষের উপর 
প্রযোজ্য । 

উপনিষদের নৈতিক সমস্তার আলোচনায় কাজেই এমন একটি 
নির্দেশ পাই যার প্রয়োগে জীবনের নৈতিক সমস্তার সমাধান করা 
সহজ। জীবনে যখনই কোন বিপরীত আকর্ষণের দোটানায় পড়া 
যায় তখনই এই নীতির প্রয়োগে কর্তব্যপথ নির্ধারণ কর! সম্ভব হয়। 
এই নীতিকে কর্মের অনবস্ভতা, নীতি বলতে পারি। একমাত্র কাণ্ট- 
এর দর্শনের সঙ্গেই এর তুলনা চলতে পারে। তিনিও এমন একটি 
নীতি স্থাপন করে দিয়ে গেছেন যা দোটানায় পড়লে পথ নির্দেশ 
করতে পারে । তিনি,নীতির নির্দেশকে “ক্যাটিগোরিকাল ইমপারেটিভ' 
বলেছেন।৯ তার মতে নৈতিক বিচারবুদ্ধি শুধু বলে না, "এটা করা 
উচিত' ; তা স্পষ্টতই বলে «এটা করতেই হবে। এটি একটি নির্দেশ । 
তার বাধ্যবাধকতা গুণ নির্দেশ করতেই তিনি এই পরিভাষাটি ব্যবহার 
করেছেন। 

এখন কোন্টা করতে হবে সে বিষয় নির্দেশ খু'জতে তিনিও 
উপনিষদের মতে। একটি নীতি স্থাপন করেছেন যার সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ 


৮. যান্যনবদ্যানি কমমাণি ॥ তানি সোবতব্যানি। নো ইতরাণ ॥ 
তোত্রীয় ॥ ১১১২ 


৯ (48068011091 1107506156 


৪৭ 


সম্ভব। সে নীতিটি বলে; এই কথ! মনে রেখে কাজ কর যে প্রতি 
মানুষের তোমার নিজের রূপে হক বা অন্তের বপে হক, স্বার্থ 
সমানভাবে সংরক্ষিত হওয়া উচিত এবং কখনও তাকে অন্ত উদ্দেশ্যে 
ব্যবহার করা উচিত নয়।১* অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষেরই স্বার্থ 
শ্রদ্ধার সহিত সংরক্ষিত হওয়। উচিত ₹ নিজের স্বার্থ হতে অন্তর স্বার্থ 
কম মূল্যবান নয়। সকলেরই ব্যক্তিগত ন্ার্থ সমান মূল্য পাবে, 
কারও স্বার্থের হানি ঘটিয়ে নিজের স্বার্থ সংরক্ষণ কর! চলবে না । 

কাণ্ট-এর প্রস্তাবিত এই রীতির কার্ধকারিতার বিষয় কিছু 
আলোচন। করা যেতে পারে। ব্যক্তিবিশেষের দিক থেকে দেখলে 
প্রশ্ন ওঠে ব্যক্তির স্বার্থ প্রাধান্য পাবে, না অন্য ব্যক্তি ব। গোষ্ঠীর স্বার্থ 
প্রাধান্য পাবে । অথণৎ স্বার্থ বড় হবে ন1 পরার্থ বড় হবে । কাণ্ট-এর 
প্রস্ত/বিত নীতি বলে তাদের কোনটিই অন্তের ক্ষতি করে প্রাধান্ত 
পাবে না; তার! সকলেই সমান প্রাধান্য পাবে ॥। কার স্বার্থ প্রাধান্ত 
পাবে, সে প্রশ্থ এখানে অবান্তর ; ত৷ বলে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে 
দেখে যে কাজ কারও স্বার্থের হানি ঘটাবে ন। মনে হবে, সেই কাজ 
করতে হবে । 

সামগ্রিক কল্যাপই এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত; কেবল ব্যক্তি- 
বিশেষের বা কেবল গোষ্ঠীর, কল্যাণ নয়। স্ৃতরাং দেখা যায় এই নীতি 
ব্যক্কিন্বর্ধ এবং গোষ্ঠীস্বার্থ, অর্থাৎ স্বার্থ ও পরার্থের বিরোধ সমাধানের 
শক্তি রাখে; এখানে তার প্রযুক্তি সুফলপ্রদ। 

কিন্তু মনে হয় আর একটি যে ঘন্ব আছে সে বিষয়ে কাণ্ট-এর 
নীতি আলোকপাত করে ন। সে ঘন্ব হল ব্যক্তিমানুষের আভ্য্ত- 
রীণ ছন্ব; দেহের স্থার্থের সঙ্গে মনের স্বার্থের ছন্ব। এ বিষয় 
সম্ভবত কাণ্ট-এর দৃষ্টি পৃথকভাবে আকৃষ্ট হয় নি। এখানেই ত্বপনিষদের 
নীতির অতিরিক্ত উৎকর্ষ; কারণ তার নীতি এ দ্বন্বেরও মীমাংসা 


১9, 5০ 50৮ 85 00 159810 10102)320115+ /17201)61 £ঠে 000 ০ 06180 
০1 19 0086 0 203061)61) 815/8599 8৪ 1) €130১ 00৮৩] 29 & 00629, 
(07085 ০৫ 5159098] 1688০, 


করে দিয়েছে। শ্রেয় বলে দেহ ও মন--এদের কারও বিশেষ 
স্বার্থ আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়। দেহ-মন জড়িয়ে সমগ্র 
মানুষটির যা কল্যাণ সাধন করবে তাই শ্রেয় । এমন কাজই করতে 
হবে। যা দেহের দিক তথা মনের দিক হতে অনবদ্য হবে, সেই কাজ 
করবে । সুতরাং উপনিষদের শ্রেয়তত্ব কান্ট-এর “ক্যাটিগোরিক্যাল 
ই্পারেটিভ' তত্ব হতে মারও ব্যাপক এবং উপনিষদের নীতি ছুটি মূল 
নৈতিকসমন্তারই সমাধান করবার ক্ষমতা রাখে । 

উপনিষদের নীতির আর একটি বৈশিষ্ট্য হল তা নীতির ক্ষেত্রে 
হৃদয়বৃন্তিকে বর্জন করে না। তা মানুষকে দয়া করতে এবং প্রীতি 
করতে উৎসাহ দিয়েছে । ঠিক বলতে কি হুদয়বৃন্তিকে ব্যবহার করে, 
কর্তব্যকর্মকেও প্রিয় করে নিয়ে নীতির কঠোরতা দূর করতে চেয়েছে । 
ব্যক্তির স্বার্থ ও পরার্থের দ্ন্দে তার প্রয়োগের বিশেষ সার্থকতা 
আছে। প্রতি মানুষই নিজের স্বার্থের সম্বন্ধে বেশি সচেতন, কাজেই 
নিজের শ্বাথসংরক্ষণে বেশি তৎপর থাকে । ফলে স্বার্থের সহিত 
পরার্থের সংঘাত ঘটে । 

উপনিষদে এই সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়েছে একটি বিচিত্র 
পথে। এই পরিকল্পনায় বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তি--উভয়কেই ভূমিকা! 
দেওয়া হয়েছে, কোনটিকেই বর্জন করা হয় নি) ঠিক বলতে কি 
তাদের পরস্পর পরিপূরক ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। মূল ভূমিকা 
দেওয়া! হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিকে, আর তাকে প্রেরণা দেবার ভূমিক। দেওয়া 
হয়েছে হাদয়বুত্তির ওপর । 

কি ভাবে এটা সম্ভব হতে পারে তা বুঝতে্হলে কিছু আলোচনার 
প্রয়োজন । মোট কথায় উপনিষদে বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে হৃদয়বৃদ্ভির 
পরিবর্তন চেয়েছে এবং হুদয়বৃত্তির প্রসারের সাহায্যে স্বার্থ এবং 
পরার্থের দ্বন্দের মীমাংস! খু'জছে। মানুষের হৃদয়বৃত্তির চ্‌ড়াস্ত বিকাশ 
পাই স্রেহ, প্রীতি ও ভালবাসার বিস্তারে ॥ এই ভালবাসাকে বিস্তার 
করেই স্বার্থ পরিশোধিত হতে পারে। সেটা সম্ভবও বটে। কারণ সকল 


১৭৪ 


মানুষের মধ্যেই স্বার্থ এবং পরার্৫থবোধ উভয়ই ক্রিয়াশীল। এমন কি 
একাস্ত স্বার্থপর সমাজবিরোধী মানুষও ক্ষেত্রবিশেষে সহজেই স্বাথ- 
ত্যাগ করতে পারে এবং পরার্৫ে আত্মত্যাগ স্বীকার করতে পারে। 
সম্ভানের জন্য যে কোন মা আত্মতাগ করতে পারে; ডাকাত পিতাও 
করতে পারে । প্রিয়জনের জন্য প্রেমিক সর্বন্ব ত্যাগ করতেও দ্বিধা- 
বোধ করবে না। 

কেন এমন হয়? তার উত্তর হল এ সব জায়গায় ব্যক্তির স্বার্থ 

ংকুচিত গণ্ডি অতিক্রম করে অগ্চের স্বার্থকে নিজের করে নিয়েছে! 

মা যখন সন্তানের জন্থ ত্যাগ স্বীকার করেন, তখন তার কষ্টবোধ হয় 
না। কারণ, সন্তানের স্বার্থ তার স্বার্থের সহিত একীভূত হয়ে 
গেছে ; কিন্ব। বল! যায় মায়ের স্বার্থ বিস্তারলাভ করে সন্তানের 
স্বার্থকে নিজের করে নিয়েছে । প্রেমিক যখন প্রেমাম্পদের জন্ত 
আত্মত্যাগ স্বীকার করে তখন তার কাছে প্রেমাস্পদের স্বার্থ নিজের 
স্বার্থের অধিক প্রিয় হয়ে উঠেছে। এমন হয়, কারণ এদের মধ্যে 
গভীর প্রীতির সম্বন্ধ গড়ে উঠেছে । 

আমাদের এই প্রতিপাষ্ঠের সমর্থনে একটি সচরাচর দৃষ্টি উদাহরণ 
স্থাপন করা যেতে পারে। একটি ছোট মেয়েকে হয় তো কেউ 
ভালবেসে কতকগুলি টফি উপহার দিয়েছে। প্রতিবেশী বালক- 
বালিক। যদি এসে তার ভাগ চেয়ে বসে, সেন্হয় তো দেবে না। কিন্তু 
বাড়িতে এসে নিজের ভাই-বোনদের মধ্যে না চাইলেও সে ভাগ করে 
তাই খেতে দেবে । আচরণের মধ্যে এই ভিন্নতার কারণ হল 
প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার প্রীতির সম্বন্ধ তত গভীর নয়; আর 
পরিবারের ছেলেমেয়েদের আপনজন মনে করে বলে তাদের প্রতি 
তার প্রীতি গভীর হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই তাদের সঙ্গে ভাগ 
করে একট! ভাল জিনিস ভোগ করতে তার বাধা আসে ন।। 

উপনিষদ এই পথেই স্বার্থ ও পরাথে'র ছ্বন্থের মীমাংসা খু'জেছে। 
তা বলে যখন সকল জীবকে ব্যাপ্ত করে একই মহাসতা গ্রচ্ছল্পভাবে 


১৬ 


বিরাজম[ন, তখন সকলেই সকলের আত্মীয় । সকল মানুষই একই 
পরিবারের সন্তানের মতো । এইভাবে ত্রন্গের প্রকৃতির পরিচয় হতে 
যখন সকলের মধ্যে একত্ববোধ বিকাশলাভ করবে তখন তা হতে 
পরস্পরের ঘনিষ্ঠতাবোধও পরিস্ফুট হবে। তখন সকলেই সকলকে 
আত্মীয়েব মতো! ভালবাসবে এবং ফলে স্বার্থের সংঘাত আর থাকবে 
না। 

বৃহদারণ্যক উপনিষদে যাজ্ঞবক্ক্য মৈত্রেয়ীকে বলেছেন, জায়ার 
নিকট যে পতি প্রিয় হয় তা পতির কারণে নয়; পতির কাছে যে 
জায়! প্রিয় হয় তাজায়ার কারণে নয় ইত্যাদি । তিনি বলেছেন 
তারা প্রিয় হয়, তার কারণ সকলকে ব্যাপ্ত করে একই আত্ম বর্তমান 
আছেন ।+১১ এখানে আত্মা কথাটির দ্বার সব কিছু ব্যাপ্ত করে ষে 
সত্তা আছেন ( অর্থাৎ ব্রহ্ম )তাকেই স্ৃচিত কর! হয়েছে । বলা 
হয়েছে এই সব কিছুই সেই আত্মা ,১১২ উপনিষদে সাধারণত 
আত্মাকে ব্রচ্গের প্রতিশব্দ হিসাবে বাবহার করা হয়ে থাকে। 
সুতরাং যাজ্ঞবন্থ্যের উক্তির মর্ম হল এক অথগ্ড সত্তার অঙ্গীভূত বলেই 
আমরা পরম্পরের প্রিয় হই। 

ঈশ উপনিষদে এই তব্টি অবলম্বন করে সকল মানুষকে 
পরস্পরের সহিত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মতে ব্যবহার করতে উপদেশ 
দেওয়া হয়েছে। এখানে অথগুতাবোধ হতে বা একাত্মতা বোধ হতে 
গ্রীতির প্রেরণ দেওয়া এবং গ্রীতিবোধ হতে স্বার্থকে পরিশোধিত 
কররার উপদেশ দেওয়া হয়েছে ॥। যেহেতু সকলেই একই মহাসন্তার 
প্রকাশ, সকলেই সকলের ভাইবোনের মতে।। স্ৃতরাং স্বার্থপরের 
মতো একাকী সম্পদ ভোগ করবার কোন অর্থ হয় না । তাই সেখানে 


১১ ন বা অরে পত্যুঃ কামায় পাঁতঃ প্রিয়োভব্যাত্বনস্ত কামায় পাতঃ প্রয়ো 
ভবাঁত ন বা অরে জায়াম়ৈ কামায় জায়া “প্রিয়া ভবত্যাত্মনস্তু কামায় জায়া 
প্রিয়া ভবাত ॥ বৃহদারণাক ॥ 81৫1৬ 

১২. ইদং সবং ষদয়মাত্মা ॥ বৃহদারণ্যক ॥ 8168৭ 


১৮১ 


পরস্পর ভাগ করে ভোগ করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। ধুক্তি হল 
বিশ্বেযা কিছু আছে সবই তে৷ একই মহাসত! দ্বার! পরিব্যাপ্ত। 
স্ৃতরাং উপদেশ দেওয়। হয়েছে ত্যাগের সহিত ভোগ করতে 
হবে। কারও ধন অপহরণ করতে নাই । নিজের মানুষের জিনিস 
কি অপহরণ কর! উচিত নাকি 1১৬ 

এদিক হতে বিবেচনা! করলে উপনিষদের দৃষ্টিভঙ্গির একটি স্বাতস্তর 
আছে। তা! ভালভাবে বোঝ। যাবে গীতা ও কাণ্ট-এর নৈতিক 
আদর্শের সঙ্গে তুলনা করলে । এ বিষয় অপরপক্ষে গীত ও কাণ্ট-এর 
আদর্শ পরম্পরের কাছাকাছি এসে গেছে । সুতরাং এখানে একটি 
সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক আলোচন৷ দিলে উপনিষদের দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্রয 
আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে । 

গ্রথমে গীতার কথা ধরা যাক। গীতার আরম্তই একটি নাটকীয় 
পরিস্থিতির মধো। অজুনি যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, ধাদের 
সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন তার৷ সকলেই তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় । তাদের 
সঙ্গে একটি গ্রীতির ও মমতার সংযোগ আছে। তাই তাদের সঙ্গে 
যুদ্ধ করতে তার মন চাইল না । বিষয়টি হল হদয়ধৃত্তির সঙ্গে কর্তব্য- 
বোধের ছন্ব। প্রথম অবস্থায় হাদয়বৃত্তিই জিতল । অজু বললেন 
এদের হত্যা করতে আমার ইচ্ছে করছে ন।। পুথিবী কেন সমগ্র 
ভ্িলোকের আধিপত্যের জন্যও মারব ন1।১৪ 

তার পর শুরু হল শ্রীক্ণের উপদেশ । তার তাৎপর্য হল কর্মত্যাগ 
করতে নেই এবং কর্মফল কি হবে ভেবে কর্তব্য সম্পাদন হতে বিরত 
হতে নেই। তোমার সম্পর্ক কর্মের সঙ্গে, তার ফলের সঙ্গে নয়।১৫ 
সুতরাং এই নীতির ভিত্তিতে কৃষ্ণ উপদেশ দিলেন : অগ্যাত্মচেতনার 


১৩. ঈশাবাস্যমিদং সর্বং বংকিংচ জগত্যাং জগং ॥ তেন ত্যন্কেন ভুঞ্ীথা মা 
গৃধঃ কস্যগ্বিদ্ধনম্‌॥ ঈশ ॥১ 

১৪, গীতা ॥ ১৫৩৫ 

৬৫. গীতা ॥ ২9৭ 


১৮২ 


খারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে, আমার উপর সকল কর্মের ফল হ্স্ত করে, 
ইন্ড্রিয়ের প্রতি অনাসক্ত থেকে এবং মমতাহীন হয়ে বিকার হতে 
মুক্তিলাভ কর এবং যুদ্ধ কর।১৬ অর্জুন সেই উপদেশ গ্রহণ 
করলেন। 

সুতরাং গীতায় ছুটি ভিনিস দেখি । প্রথম, ত৷ সুখ-ছুঃখ, আশা- 
আকাজ্ষা! ত্যাগ করতে বলেছে, কর্মফলে অনাসক্ত থেকে কর্ম 
করতে বলেছে। দ্বিতীয়, তা মমতাবোধ অর্থাৎ হৃদয়বৃত্তিকে ত্যাগ 
করতে বলেছে । অবশ্য তার ব্যতিক্রম আছে। ঈশ্বরের ক্ষেত্রে ভক্তি 
সিদ্ধ বলে গৃহীত হয়েছে; কিন্তু তাতে আমাদের প্রতিপাগ্ঠটি ক্ষু হয় 
ন1। গীতার স্পষ্ট নির্দেশ হল “কর্তব্যকর্ম সম্পাদনে হৃদয়বৃত্তি দ্বার। 
প্রভাবান্বিত হবে না।» “নিম্ম' হয়ে কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে । 

আমরা দেখি, গীতার এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কাণ্ট-এর দৃষ্টিভঙ্গির 
আশ্চর্য রকম মিল আছে। তিনিও হৃদয়বৃত্তিকে বর্জন করে 
নিরাসক্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করতে উপদেশ 
দিয়েছেন। তার ধারণায় মানুষ হুই জগতের জীব । সে রক্তমাংসের 
দেহধারী জীব হিসাবে ইন্দ্িয়ন্থখকর অনুভূতির প্রতি আকৃষ্ট হয়। 
অপরপক্ষে প্রজ্ঞাবান জীব হিসাবে সে বিশুদ্ধ বুদ্ধিশক্তির দ্বারা 
পরিচালিত হয়। প্রজ্ঞাবন্তাই তার বৈশিষ্ট্য । সুতরাং তার কর্তব্য 
হল ইন্ড্রিয় স্থখের আকাঙ্ক্ষা নয়, বিশুদ্ধ কর্তব্যবোধের দ্বারা কর্মজীবন 
পরিচালিত কর! । প্রজ্ঞার নির্দেশ অনুসারে মানুষ কর্তব্য সম্পাদন 
করবে, ইন্জ্রিয়স্থখের আকর্ষণ পে ত্যাগ করবে এবং হাদয়বৃত্তির প্রভাব 
হতেও সে নিজেকে মুক্ত রাখবে । 

স্থতরাং আমর! বলতে পারি যে গীতা ও কান্ট নীতি হতে 
হাদয়বৃত্তিকে বর্জন করতে চেয়েছেন । তার! কেবল কর্তব্যবোধের দ্বার 
পরিচালিত হয়ে কর্মসম্পাদনের আদর্শকে গ্রহণ করেছেন। অপরপক্ষে 


১৬. ময়ি সবাঁণি সংন্যস্যাধ্যাক্চচেতসা । নিরাশীর্ণমমো ভূত্বা যুধাস্য 
বিগতজবরঃ ॥ গীতা ॥ ৩৩০ 


১৮৩ 


উপনিষদ, কর্তব্পথ কি ভাবে: নির্ধারিত হবে তার যেমন একটি 
পথনির্ধেশক নীতি দিয়েছে, তেমন কর্তব্য কর্মকে সহজসাধ্য কররি জন্ত 
হাদয়বৃত্তিরও সহায়তা কামনা! করেছে । অখগুবোধ হতে সর্জনীন 
প্রীতিসঞ্চার হলে নিঃম্বার্থভাবে কর্ম কর! সহজ হয়, এই তার ধারণা । 
মমতাবোধকে বর্জন করার প্রয়োজন নেই ; কারণ তাও একটি শ্তি- 
মান প্রেরণ! হয়ে কর্মশক্তিকে পরিবধিত করার ক্ষমতা রাখে। তাই 
উপনিষদ দয়া প্রীতি মমত৷ প্রভৃতি হদয়বৃত্তিগুণকে সাদরে গ্রহণ 
করেছে। 


তিন 
রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতত্ব 


উপনিষদের শ্রেয়তত্বের অনুরূপ তত্ব রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় পাওয়া যায় 
বলে মনে হয় না। কিন্তু তার চিস্তার মধ্যে একটি তত্ব আছে যা 
শ্রেয়বাদের বেশ কাছাকাছি আসে । তাকে আমর! বিশ্বমানব তত্ব 
বলতে পারি। এই তত্বের মুল বক্তব্য হল এই যে সকলমানুষের 
মধ্যে একটি সত্তা আছেন যিনি মানুষের অন্তরে গোপন থাকেন। 
তিনিই. মানুষের মনে যা-কিছু মহৎ আকৃতি তার প্রেরণা যোগান ॥ 
তারই ফলশ্রুতি হল মানুষের কীতিময় ইতিহাস। তাঁরই আহ্বানে 
ব্যকিমানুষ শিল্পী হয় ॥। তিনি ঠিক প্রতোক মানুষের যোগফল নন। 
তিনি বিশেষ মানুষের মধ্যে থেকে, তাকে অতিক্রম করেন এবং 
সকল মানুষের মনকে ব্যাপ্ত করে থাকেন । এই ওন্বটি হুরহ। রবীন্দ্র- 
নাথের নান! লেখার মধ্যে তার সম্বন্ধে মন্তব্য ছড়িয়ে আছে। সেগুলি 
একত্রিত করে সুসংবদ্ধ আকারে এখানে সাজাবার চেষ্টা হবে । 

তার আগে এই তন্বটির নাম নিয়ে কিছু আলোচনার প্রয়োজন 
বোধ করি ॥ রবীন্দ্রনাথ একই ধারণাকে বোঝাতে যে পরিভাষা 
প্রয়োগ করেন, অনেক সময় ত। একটি নির্দিষ্ট নামে সীমিত থাকে না, 
অর্থাৎ একই তত্ব বোঝাতে তিনি অনেক শবের ব্যবহার করেন। 


৯৮৪ 


বর্তমান আলোচনায় দেখব এই বিশ্রাট ঘটেছে অতিমাত্রায়। ফলে 
একটি জটিল বিষয় জটিলতর হয়ে পড়েছে । সেই কারণে মনে হয় 
আলোচনার সুবিধার জন্য প্রথমেই যে নামগুলি এই তত্বটিকে বোঝাতে 
ব্যবহার কর। হয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের পরিচিত হবার প্রয়োজন 
আছে । তার ফলে পরবর্তী আলোচনায় ষখন তার মন্তব্য উদ্ধৃত করে 
স্থাপন করা হবে তখন তাদেব মধো পরস্পরের বৈসাদৃশ্য হেতু বিভ্রান্তি 
স্থষ্টি করবে না। তাতে তাকে বোঝ। আমাদের সহজ হবে ।॥ নুতরাং 
প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানবকে সুচিত করতে যে-সব বিকল্প পরি- 
ভাষার ব্যবহার করেছেন তাদের একটি তালিক। দেবার প্রস্তাব করি। 

সকল মানুষকে ব্যাপ্ত করে এবং তাদের অতিক্রম করে ষে অভিনব 
সন্তার রবীন্দ্রনাথ পরিকল্পন। করেছেন তাকে তিনি বিশ্বমানব বলে 
অভিহিত করেছেন এবং তার সমার্থবোধক শব হিসাবে “বড়ো-আমি, 
কথাটিরও ব্যবহার করেছেন।১৭ বড়ো-আমি কথাটির তিনি অনেক ক্ষেত্রে 
ব্যবহার করেছেন, বিশেষ করে তার "শান্তিনিকেতন" -এর ভাষণমালায়। 
তার ধারণায় মানুষের মধ্যে ছুটি সত্ত। আছে £ একটি ছোট-আমি 
এবং অপরটি বড়ো আমি । ছোট-আমি ব্যক্কিবিশেষের স্বার্থ নিয়ে 
ব্যস্ত আর বড়ে।-আমি সকল মানুষের কল্যাণের প্রতি আকৃষ্ট । 

একেই তিনি অন্তাত্র মহামানব বলেছেন ।১৮ ভা কোন মহান 
ও বিশিষ্ট মানুষকে বোঝায় না: যে সত সকল মানুষের কল্যাণ 
কামনা করে তাকে স্ুচিত করে। 

তার ইংরাজি আলোচনায় এই বিশ্বমানব সত্তাকে সুচিত করতে 
তিনি অনুরূপভাবে একাধিক পারিভাষিক শব্ধ ব্যবহার করেছেন । 
তাঁকে তিনি “নৃত্রিম ম্যান” বলেছেন ।১৯ তার বাংল! প্রতিশব 
হিসাবে তারই ব্যবহৃত "মহামানব শব্দটিকে ব্যবহার করতে পারি। 


১৭. আত্মপাঁরচয় ৩ 
১৮. আত্মপাঁরচয় ৫ 
১৯, 50101621296 11902 1২618210001 21919 01১90, 4 
১৮৫ 


উপানিবদ--১২ 


একই প্রসঙ্গে ভাকে সূচিত করতে তিনি (ইউনিভার্সাল ম্যান। কধাটির 
ব্যধহার করেছেন।২* তার প্রতিশব্ হিসাবে তার বিশ্বমাৰব 
পারিভাষিক শব্দটিকে ব্যবহার করতে পারি। অন্যত্র তিনি এই সন্তাকে 
স্থুচিত করতে “ম্যান দি ইটারনাল' কথাটির ব্যবহার করেছেন ।২১ 
তার কোন বাংল। পারিভাষিক শব! তিনি ব্যবহার করেন নি। তাঁকে 
সনাতন মানব বলে অনুবাদ করতে পারি। ব্যক্তিমান্ধুষের লয় আছে; 
কিন্ত এই মানুষের লয় নেই, কারণ তার অবস্থিতি সকল মানুষকে 
নিয়ে। সকল কালের সকল মানুষের মধ্যে তিনি বিরাজমান । 

এখন আমর! রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানব তত্বের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন 
তাকে পরিষ্কার করতে চেষ্টা করব। তার ধারণায় প্রতি ব্যক্তিমান্ুষের 
মধ্যে ছুটি পৃথক কিন্ত পরস্পর সংযুক্ত সত্ত। অবস্থান করে। তাদের 
একটি দৈনন্দিন সাংসারিক জীবনধারণ নিয়ে ব্যাপূত। কাজেই তার 
দৃষ্টিভঙ্গি সংকুচিত ॥। অতিরিক্তভাবে তাঁর মধ্যে একটি পুথক মানব 
সন্ত আছেন, তিনি ব্যক্তিজীবনের সংকুচিত দৃষ্টিভলির উধের্ব উঠে 
সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ কামনা করেন। তাকে তিনি মহামানব 
বলেছেন! ছুই অর্থে তিনি মহামানব। প্রথমত তিনি সকল 
ব্যক্তিমানুষকে'ব্যাপ্ত করে আছেন। দ্বিতীয়ত তিনি ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের 
উধের্ব উঠে সকল মানুষের কল্যাণসাধন করতে আহ্বান জানান । তার 
আহ্বানে কৰি নিজে সাড়! দিয়েছিলেন । প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই £ 

“আমি বিশ্বাস করেছি মানুষের সত্য মহামানবের মধ্যে যিনি “সদা 
জনানাং হৃদয়ে সঙ্গিবিষ্টং। আমি আবাল/-অভ্যন্ত একান্তিক সাহিত্য 
সাধনার গণ্ডিকে অতিক্রম করে একদা সেই মহামানবের উদ্দেশে 
যথাসাধ্য আমার কর্মের অর্থ্য, আমার ত্যাগের নৈবেছ্থ আহরণ 
করেছি । ২২ 


২০, (001/5189] 71909 36115100০৫6 21812, 003919। সু 
২১, 2181 216 2061091) (6118800 0৫671182) 01১80, 19 
২২. আত্মপরিচয় ৩ 


১৮৬ 


উপরে উদ্ধত রবীজ্্নাথের মন্তব্যে উপনিষদের বটনের উদ্ধৃতি 
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ।* রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস এই মহামানব বা বিশ্বমানব 
ব! নিত্যকালের মানব প্রতি মানুষের মনের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থিত 
অছেন। আরও বোঝ। যায় এই সত্ত। মানুষকে আত্মত্যাগে উৎসাহিত 
করে। স্পষ্টই স্বীকৃত, রবীন্দ্রনাথ এই সন্তার নিকট আত্মত্যাগের 
প্রেরণ পেয়েছেন । 

এই সত্তাকে তিনি মানব বলে আখ্য! (দিয়েছেন । অথচ ব্যক্তিমানব 
হতে তিনি স্বতন্ত্র। তিনি অন্তরে আছেন, কিন্তু ব্যক্তিমানবকে 
অতিক্রম করে আছেন। তিনি সকল মানুষে আছেন। মানুষ যায়, 
মানুষ আসে, কিন্তু তিনি নিত্য ; তাই তিনি সর্ককালীন। এই প্রসঙ্গে 
রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্যটি লক্ষ্য কর! যেতে পারে : “আমাদের অন্তরে 
এমন কে আছেন, যিনি মানব অথচ বিনি ব্যক্তিগত মানবকে অতিক্রম 
করে “সদ! জনানাং হৃদয়ে সন্গিবি্ঠ, যিনি সর্বকালীন মানব । ২৩ 

এখন প্রশ্ন ওঠে, ব্যক্তিমানৰ ও বিশ্বমানবের মধ্যে সম্বদ্ধটা! কি 
ধরনের? ব্যক্তিমানব মনের যোগফল কি বিশ্বমানব মন? রবীন্দ্রনাথ 
স্পষ্টই বলেছেন, তা নয়। বিশ্বমানৰ মন ব্যক্তিমানব মনের গাণিতিক 
সমষ্টিমাত্র নয়। তার ধারণা এদের মধ্যে একটি আশ্রয় ও আশ্রিতের 
সম্বন্ধ বর্তমান ॥। বিশ্বমানব মন ব্যাপক এবং তার মধ্যে ব্যক্তিমানব 
মন আশ্রিত। তার প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই ; “বলব বিশ্বমানব আছে। 
কিন্তু সকল মানুষের মন সমষ্টিভূত হয়ে বিশ্বমানব মনের মহাদেশ স্যষ্ট, 
এ-কথ! বলব না। ব্যক্তিমন বিশ্বমনে আশ্রিত, কিন্ত ব্যক্তিমনের 
যোগফল বিশ্বমন নয় ॥ ২৪ 

রবীন্দ্রনাথের চিন্তাটিকে সহজবোধ্য করতে একটি উপম! ব্যবহার 
করলে সুবিধা! হবে। ব্যক্তির সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অর্থে জাতির 
ভূলনা' করা! যেতে পারে। বহু ব্যক্ধি একটি ভৌগোলিক খণ্ড 


২৩, মানুষের ধর্ম । ভূমিকা 
২৪, মানুষের ধর্ম ২ 


১৮৭ 


অধিকার করে একটি জাতি গড়ে তোলে । ব্যক্তির ফেমন নিজের 
স্বার্থের গণ্ডির মধ্যে নানা আশা-আকাঙ্। ক্রিয়াশীল, তেমন জাতির 
ক্ষেত্রে জাতির সামগ্রিক কল্যাণের সহায়ক নানা আশা-আকাজ্ষাও 
ক্রিয়াশীল হয়। ওই জাতির অবস্থিতি এক বিশেষ ভূখণ্ডে নয়, সেই 
ভূখণ্ডে যে মান্ুষগুলি বাস করে তাদের মনের মধ্যেই । জাতিবোধ- 
রূপে তা জাতির অন্তভূক্ত প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অবস্থিত এবং ব্যক্তি- 
মানুষকে অবলম্বন করেই ত। ক্রিয়াশীল । জাতি গড়ে তোলবার এবং 
জাতির স্থার্থরক্ষার জন্ প্রয়োজন হলে আত্মত্যাগ করবার প্রেরণ! 
জাতির অন্তভূ'ক্ত ব্যাক্তির মনে উদয় হয়ে তাকে তার ক্ষুদ্রন্বার্থের গণ্ডি 
ডিডিয়ে বৃহত্তর কল্যাণকর্ধে প্রণোদিত করে। 

আমার মনে হয় বিশ্বমানব ও ব্যক্তিমানবের যে পরিকল্পন। 
রবীন্দ্রনাথ করেছেন তার সঙ্গে ব্যক্তি ও জাতির স্বন্ধের তুলনা চলতে 
পারে। ব্যক্তি অস্থায়ী; সে জন্মায়, মরে যায়? কিন্তু জাতি নিত্য। 
সেইরূপ ব্যক্তিমানব অনিতা; সে জম্মায়,। চলে যায়। কিন্তু 
রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পনায় বিশ্বমানব নিত্য । জাতির মনের কোন 
স্বতন্ত্র অবস্থিতি নেই। তার ব্যক্তিমনেই অধিষ্ঠান ॥ যাকে জাতীয়তা- 
বোধ বলি তা জাতিমনের অস্তিত্ব স্চিত করে। অনুরূপভাবে 
রবীজ্নাথের পরিকগ্পনায় বিশ্বমানব মনের ব্যক্তির বাহিরে অবস্থিতি 
নেই। ভিনি “সদ। জনানাং হৃদয়ে সঙ্লিবিষ্টঃ। একটি জাতি তার 
অন্তভূর্ত মানুষগ্ুলির সমষ্টি নয়, তাদের অতিরিক্ত কিছু । তার 
কর্মক্ষেত্র ব্যাপকতর, সমগ্র জাতির কল্যাণ তার কামনার বস্ত । এই 
হিসাবে জাতির মন ব্যক্তির মনকে, অতিক্রম করে। অনুরূপভাবে 
দেখি রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পনায় বিশ্বমানব ব্যক্তিমানবের সমষ্টি নয়, 
তাদের অতিক্রম করে এবং এক ব্যাপকতর ক্ষেত্রে তা! ক্রিয়া করে। 
ঠিক বলতে কি জাতির কর্মক্ষেত্র এবং আদর্শ হতে বিশ্বমানবের 
কর্মক্ষেত্র এবং আদর্শ অনেক ব্যাপক । তা বিশেষ ভূখণ্ডের দ্বার 
চিহ্নিত জাতীয়ভাবোধে অনুপ্রাণিত গোষ্ঠীর স্বার্থকে অতিক্রম করে 


৯৮৮৮ 


সমগ্র মানবজাতির কল্যাণকে আদর্শ বলে গ্রহণ করে। স্পষ্টতই এটি 
একটি মহান আদর্শ এবং মানুষ হিসাবেই মানুষের কল্যাণ এখানে 
' উদ্দেশ্ট বলে স্থাপিত হয়েছে। 

রবীন্মনাথের ধারণায় যদিও এই বিশ্বমানব প্রতি মামুষের মনের 
মধ্যেই অবস্থান করেন, সাধারণ ব্যক্তিমান্থুষ তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করে 
না। তার অস্তিত্ব অনুভূত হয় আকম্মিকভাবে যখন কোন মহৎ 
প্রেরণ এসে ব্যক্কিমানুষকে মহৎ কর্ম-সাধনের জন্য আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ 
করে। তার প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই £ 

“একটি ব্যাপক চিত্ত আছে যা ব্যক্তিগত নয়, বিশ্বগত। সেটির 
পরিচয় অকম্মাৎ পাই ॥। একদিন আহ্বান আসে। অকল্মাৎ মানুষ 
সত্যের জন্য প্রাণ দিতে উৎসুক হয়। ২« 

রবীন্দ্রনাথের ধারণায় এই মহামানব ব। বিশ্বমানব কল্পনা নয়, 
একান্তই বাস্তবভাবে স্ত্য। অবশ্য স্বীকার্ষ, কল্পনার সাহায্যে তার 
প্রকৃতিকে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে ; কারণ তার ব্যক্তিমানুষের মন ভিন্ন 
পৃথক অবস্থিতি নেই। তবে তার অর্থ এই নয় যে তিনি মানুষের 
মনের স্থষ্টি। ঠিক বলতে কি তিনি ব্যক্তিমান্ুষ হতেও বেশি বাস্তব; 
কারণ তার অবস্থিতি আরও ব্যাপকক্ষেত্রে, ব্যক্তিমামুষের মনকে 
'অতিক্রম করে সকল মানুষের মনে পরিব্যাপ্ত। এই কথাগুলি পাই 
তার রিলিজিয়ন অফ ম্যান" গ্রন্থে । তার প্রাসঙ্গিক অংশের বাংলা 
অনুবাদ এখানে স্থাপিত হল; “মহামানবের ধারণ! আমাদের কল্পনা 
শক্তির সাহায্যে গড়ে নিতে হয় ; তবে তা আমাদের মনের স্য্ট পদার্থ 
নয়। তিনি ব্যক্তিমান্ুষ হতে বেশি বাস্তব; তার ব্যাপক ব্যক্তিত্ব 
ব্যক্তিমনকে অতিক্রম করে আমাদের প্রত্যেককে ছাড়িয়ে যায় ।,২৬ 

এখন প্রশ্থ ওঠে, এই বিশ্বমানৰ মনের ভূমিকা কি? রবীন্দ্রনাথ 
তারও একটি উত্তর দিয়েছেন। তার ধারণায় এই বিশ্বমানব মনের 


২৫ মানুষের ধর্ম। সংযোজন, মানব সত্য 
২৬ 26118100০৫6 709০) 04১9 2011 11105৮5 ৪06 


১৮৯) 


কাজ হল সকল ব্যক্তিমানুষের মধ্যে অবস্থান করে তাদের মহৎ কর্মে 
প্রেরণ! দিয়ে নিন্ধের চরিতার্থতা খোজা । তিনি মানবজাতির সামঞ্সিক- 
ভাবে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন চান। এবং তারই প্রেরণায় ব্যক্তিমামুষ 
জ্ঞান বা প্রেমের ক্ষেত্রে মানুষের উৎকর্ সাধনের জন্ত আত্মনিয়োগ 
করে। মানুষের সকল মহৎ কর্ম তথা কীতির তিনি প্রেরণ! । 
মানুষের এই সামশ্রিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য তিনি ব্যক্তিমামুষের 
মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন ॥ যে বাক্তিমান্ুষের মন তার এই প্রেরণায় 
সাড়া দেয় সে মহামানবের তৃপ্ডিসাধন করে। তার প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি 
এই £ “বিশ্বমানবের জ্ঞানের সাধনা, প্রেমের সাধনা, কর্মের সাধন। 
মানুষকে গ্রহণ করতে হয়েছে। সমস্ত মানুষ প্রত্যেক মানুষের মধ্যে 
আপনাকে চরিতার্থ করবে বলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।”২* 

তিনি আরও বলেছেন যে জ্ঞান, প্রেম ও কর্মে মহত প্রেরণ! দেওয়া 
ছাড়া অতিরিক্তভাবে এই' বিশ্বমানব মন ব্যক্তিমানুষকে শিল্পস্্টি ও 
সাহিত্যরচনায় উৎসাহিত করে। সুতরাং তার ধারণায় বিশ্বমানব 
মনের চরিতার্থতা সাধনের ভগ্তাই ব্যক্তিমানুষ সাহিত্য ও শিল্প স্যরি 
করে। তার প্রাসঙ্গিক সস্তব্যটির বাংল। অনুষাদ এই : 

“বিশ্বমানবকে প্রকাশ করবার আকৃতি হতেই আমরা শিল্প ও 
সাহিত্য স্থষ্টি করি ।২৮ 

সুতরাং এই বিশ্বমানবের শরষ্টার ভূমিকাও আছে। কাজেই 
রবীন্দ্রনাথের ধারণায় মানুষের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে ভাতেই সেই 
নিত্যকালের বিশ্বমানব, ব্যক্তিমানব--অতিক্রামী মানবের প্রকাশ 
সংঘটিত হচ্ছে। যিনি শিল্পী তার কর্তব্য হল তার শিল্পকর্মে সেই 
বিশ্ববানবরূপী শিল্পীকে আবিষ্কার করা, অনুভব করা! এবং প্রকাশ 
করা। তার মূল মন্তব্যটির বাংল! অনুবাদ এই দীড়ায়। 

মানুষের উচিত তার দকল শিল্পকর্মে সেই বিশ্বমাঝবরগী শিল্পীকে 

২৭ শাশ্তিনিকেতন। নববর্ষ 

২৮ 761181020০6 2192) 00১90 3015 880 বৈ 


১টি 


আবিষ্কার করা, অনুভব করা এবং প্রকাশ কর । মানুষের যে সংস্কৃতি 
গড়ে উঠেছে তা হয়ে দাড়ায় অতিক্রামী মানবের বিরামহীন 
আবিষ্কার ২৯ 

মনে হয় এই বিশ্বমানব-সন্তার পরিকল্পনাটির অঙ্কুর আকারে তার 
প্রথম জীবনে প্রৌডত্বের সীমা অতিক্রম করবার আগেই আবির্ভাব 
ঘটেছিল। পরে শেষ জীবনে তা পরিণত রূপও পায়। যখন তিনি 
“হিবার্ট বক্তৃতা” দেন তখন তা পরিণতি লাভ করেছিল । তার প্রমাণ 
হিসাবে আমর! “চিত্রা'র অন্তর্ভুক্ত “এবার ফিরাও মোরে" কবিতাটির 
উল্লেখ করতে পারি। তার মর্মকথা হল--সংসারে যখন নান। অভাব- 
অনটন, তখন কল্পনর অধীনতা স্বীকার করে কাব্যচর্চা শোভ। পায় 
না। তাই কল্পনার কাছে আবেদন সর্বজনীন কল্যাণের কাজে 
আত্ম-নিবেদনের জন্ তাকে যেন সংসারে ফিরতে দেওয়া হয়। 

এই প্রসঙ্গেই তিনি অনুভব করেছেন মানুষের মধ্যে এমন এক 
শক্তি আছে যার আহ্বানে সকল মহৎ মানুষ ব্যক্তিত্বার্থ অতিক্রম করে 
মহুৎকর্মে আত্মনিয়োগ করেছে। “তারি লাগি রাজপুত্র পরিয়াছে 
ছিন্নকম্থা, বিষয়ে বিরাগী পথের ভিক্ষুক । শুধু তাই নয়-_ 


“তারি পদে মানি সঁপিয়াছে মান, 
ধনী স'পিয়াছে ধন, বীর স'পিয়াছে আত্মপ্রাণ, 
তাহারি উদ্দেশে কবি বিরচিয়া লক্ষ লক্ষ গান 
ছড়াইছে দেশে ।, 
পরে এই জন্তাকে তিনি বিশ্বমানব বলেছেন, সনাতন মানব 
বলেছেন, মহামানব বলেছেন এবং তার প্রকৃতি সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট 
ধারণা দেয় এমন মস্তব্যও তার সম্বন্ধে করেছেন । আমাদের আগের 
আলোচনায় তার সমর্থন পাওয়া যাবে। তবে যখন এই কবিত! 
লেখেন তখন এই সত্তার সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণ! তার মনে গড়ে ওঠে নি। 


২৯ 1611810% ০£ )441% ০150 150 186 এ 


বট১ 


তাঁ না হলে তিনি বলবেন কেন-” 
কে সে? জানি নাকে। চিনি নাই তারে-- 
শুধু এইটুকু জানি--তার লাগি রাত্রি অন্ধকারে 
চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগ্গাস্তর পানে 
ধড়-বঝঞ্চা, বজপাতে, জালায়ে ধরিয়া সাবধানে 
অন্তর প্রদীপখানি 1, 
এখন আমরা ছোট করে এক জায়গায় বিশ্বমানব-তত্ব সম্বন্ধে 
রবীজ্নাথের চিন্তা স্থাপন করতে পারি! মোটামুটি মনে হয় তার 
ধারণায় মানুষের মধ্যেই ছটি পৃথক সত্তা আছে £ একটি ব্যক্তিমানব, 
অপরটি বিশ্বমানব। ব্যক্তিমানব সংসারে নিজের সুখ-দুঃখ, আশা- 
আকাজ্ষ।, অভাব-অনটন নিয়ে ব্যস্ত। তার দৃষ্টিভঙ্গি খুব সংকুচিত । 
নিজের স্বার্থ তার কর্তব্যকে নির্ধারণ কবে। তাব অতিরিক্ত আর 
একটি সন্ত! মানুষের মনের মধ্যেই আছে। তা প্রতি মানুষে থেকেও 
ব্যক্তিমান্যকে অতিক্রম করে। তার দৃষ্টিভঙ্গি খুব ব্যাপক । তার 
আকৃতি হল মানুষকে প্রেরণ। দিয়ে সর্জনীন কল্যাণের কাজে, 
সাহিত্যে এবং শিল্পস্থট্টিতে উৎসাহিত করা । তাই মানুষকে উন্নততর 
জীবনের প্রতি আকৃষ্ট করে । তাকে ব্যক্তিমানুষ হঠাৎ আবিষ্ষাব করে 
যখন কোন মহৎ কর্মের প্রতি সে ছুবার আকর্ষণ অনুভব করে। 
একেই তিনি বিশ্বমানব, মহামানব, সনাতন-মানব, বড়ো-আমি প্রভৃতি 
শক দ্বারা চিহ্চিত করেছেন। 
রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক চিন্তায় একটি অনুরূপ তত্ব আছে, যাকে 
জীবনদেবতাতত্ব বল! যায়। তার সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। সেই 
পার্থক্য পরিষ্কার জানা না থাকলে আমাদের জ্ঞানে তস্পষ্টতা এসে 
পড়বে । সেটি এখানে তাই সংক্ষেপে পরিষ্কার করে নেবার প্রয়োজন 
হয়ে পড়ে। 
জীবনদেবতাতত্বের বিষয় ঈশ্বর, মানুষ নয়। ঈশ্বরের ছুই ভিন্ন 
পর্যায়ে প্রকাশ আছে বলে রবীন্দ্রনাথের ধারণা । একটি হল কাজের 


১৪৯২ 


প্রকাশ; সেখানে তিনি বিশ্বকে নিয়ন্ত্রিত করেন। সেখানে তিনি 
নৈধ্যক্তিক সত্তা এবং অসীম ॥ তার আর একটি প্রকাশ আছে যাকে 
তিনি প্রেমের প্রকাশ বা আনন্দের প্রকাশ বলেছেন। তার ধারণায় 
নৈব্যক্তিক বিশ্বসত্তাই ব্যক্তিরগী হয়ে প্রতি মানুষের সহিত প্রীতির সম্বন্ধ 
স্থাপন করতে উৎস্থক ॥। যে এই আহ্বানে সাড়৷ দেয় তিনি ব্যক্তিরূপে 
নিজেকে সীমিত করে তার হাদয়ে অধিষ্ঠান নেন। তাই হল "সীমার 
মাঝে অসীমের' প্রকাশ । আমাদের এই প্রতিপাগ্ঠের সমর্থনে 
রবীন্দ্রনাথের ছুটি মন্তব্য উদ্ধৃত করা যেতে পারে । 

তার 'শাস্তিনিকেতন' গ্রন্থের 'ন্তভূক্তি 'বিধান' শীর্ষক ভাষণে তিনি 
বলেছেন £ “কিস্ত তিনি ত শুধু বিধাতা নন, “স এব বন্ধুঃ, তিনিই যে 
বন্ধু। বিধাতার প্রকাশ ত বিশ্বচরাচরে দেখছি, বন্ধুর প্রকাশ 
কোনখানে ? বন্ধুর প্রকাশ ৩ নিয়মের ক্ষেত্রে নয়, সে প্রকাশ আমার 
অন্তরের মধ্যে, প্রেমের ক্ষেত্র ছাড়া আর কোথায় হবে ? 

তার “হিবার্ট বক্তৃতামালায়'তিনি বলেছেন £ “আমার মনে হল 
আমি অবশেষে আমার নিজের ধর্ম, মানুষের ধর্মকে পেয়েছি; যেখানে 
যিনি অসীম তিনি বাক্তিরূপে সীমিত" হয়ে আমার প্রেম ও 
সহযোগিতা লাভের জন্ত আমার কাছে আসেন। 

আমার এই চিন্তা পরবর্তীকালে ফাকে জীবনদেবতা বলেছি 
তাকে উদ্েশ করে রচিত কতকগুলি কবিতায় প্রকাশ করেছি ।৩, 


চার 
উভয় চিন্তার তুলনা 


এখন আমরা শ্রেয়বাদের সঙ্গে বিশ্বমানব-তথ্বের তুলনা করতে পারি। 
স্পষ্টই বোঝ। যায় তারা ভিন্ন জিনিস। তবে তার। কাছাকাছি আসে 
এবং এক জায়গায় একরকম পরম্পরকে ছু য়েযায়। শ্রেয়বাদের 


৩৩ ৭06 1২6118100০৫ 0199) 16 15190 
১৪ 


আদর্শ হুল সামগ্রিক দৃতিভ্গি হতে মানুষকে কল্যাণের পথে পরিচালিত 
কর!। সে কল্যাণ ব্য-্-বিশেষের দৃষ্টিভঙ্গি হতে একদিকে যেমন 
মনের ও দেহের কল্যাণ খোজে, তেমন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি হতে ব্যক্তির 
ও সমাজের কল্যাণ খেশাজে। এই উদ্দেশ সাধনের জন্য ইচ্ছাপ্রপোদিত 
কর্ম কিভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে তার একটি নির্দেশক নীতি ত৷ 
স্থাপন করেছে। তা হল কর্মের অনবন্ভতা। তার উপদেশ, সকল 
দৃষ্টিভঙ্গি হতে য। অনুমোদনযোগ্য হবে তাই করতে হবে । 

রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানব-তত্ব খানিকটা! ভিন্ন মহলের জিনিস। তা 
কেবল কল্যাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। তা মানুষের স্বাঙ্গীণ মাত্ম- 
বিকাশের প্রেরণ! কোথ৷ হুতে আসে, তাই নির্দেশ করছে । তা বলে 
মানুষের একটি সংকুচিত জীবন আছে এবং একটি ব্যাপকতর জীবন 
আছে। সেই সংকুচিত জীবনই সাধারণ ব্যক্তিবিশেষের আকাঙিক্ষত 
জীবন । তাকে নিয়ন্ত্রিত করে মানুষের মধ্যে যে ছোটো-আমি আছে 
তাই। মার তার অতিরিক্তভাবে তার মধ্যে একটি বড়ো-আমি 
আছে। ত৷ ব্যক্তিমনকে অতিক্রম করে সকল মানুষের মনে আছে। 
তাই মানুষকে সকল মহৎকর্মে প্রণোদিত করে। তার আহ্বানে 
সাড়! দিয়েই ব্যক্তিমানুষ তার সংস্কৃতি গড়ে তোলে । 

সুতরাং বলতে পারি যে জীবনদেবতা ও বিশ্বমানব ভিন্ন সন্ত] । 
একটির সঙ্গে সংযোগ ঈশ্বরের, অপরটির সঙ্গে সংযোগ মানুষের । 
দ্বিতীয়ত, বিশ্বমানব-তত্ব কেবল নৈতিক সমস্তা নিয়ে জড়িত নয়, 
মানুষের সকল পথে বিকাশের সম্ভাবনা নিয়ে জড়িত। কেবল 
আহ্ুযঙ্গিকভাবে সর্বজনীন কল্যাণ ও তার আলোচনার বিষয়। 
সামগ্রিক স্বার্থের জন্ ব্যক্তিম্বার্থের বিসর্দনেও বিশ্বধানব প্রেরণ। 
দেয়। শুধু এখানেই মনে হয় শ্রেয়বাদের সঙ্গে তার সংল্পীর্শ ঘটেছে। 

তবে উপনিষদের নৈতিক চিন্তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার ছুটি 
ক্ষেত্রে বিশেষ সাদৃশ্ত দেখ! যায়। তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে 
দেওয়া যেতে পারে । আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে উপনিষদ 


১7$ 


সংঘমের উপদেশ দিয়েছে, কিন্তু সঙ্গ্যাসের উপদেশ দেয় নি, সংসার* 
জীবনকে পরিহার করতে বলে নি। দ্বিতীয়ত, আমর! লক্ষ্য করেছি, 
স্বার্থ ও পরার্ধের দ্বন্বে উপনিষদ হদয়বৃত্তির ব্যবহার করেছে। 
উভয়ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথের চিন্তা উপনিষদের অনুগামী! তিনিও 
সংযম শিক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু বৈরাগ্য অনুমোদন করেন নি। তিনিও 
স্বার্থপরতা বোধ পরিশোধিত করে পরার্থ বোধ জাগিয়ে তুলতে 
চেয়েছেন। উভয়েই অখণ্ডবোধ হতে সকল মানুষের প্রতি প্রীতির 
সঞ্চার কর। যায় বিশ্বাস করেন এবং তাই, প্রীতির সাহাষ্যে 
স্বার্থবোধকে পরিশোধিত করতে উপদেশ দেন। রবীন্দ্রনাথ স্বার্থকে 
বিস্তার করে পরার্থে সঞ্চারিত করতে বলেছেন। তার ধারণা তাতে 
ব্যক্তিগত সুখের বাসন। ছড়িয়ে গিয়ে লয় হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিষয়টির 
আলোচন। প্রসঙ্গত পরবর্তী অধ্যাত্মে মানবিকতার বিষয় আলোচনা 
সুত্রে আপনি এসে পড়বে । সুতরাং এ বিষয় বর্তমান অধ্যায়ে 
আলোচনা! কর! হবে না। এখানে উপনিষদ ও রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় 
বৈরাগ্য বা সঙ্নযাসকে যে গ্রহণ কর! হয় নি সে বিষয়টির আলোচনায় 
সীমাবন্ধ থাকবে। 

এখানে সঙ্গ্যাস অর্থে হবে কর্মসন্গ্যাস এবং ইন্দ্রিয় নিগ্রহ, অর্থাং 
সংসার ত্যাগ করে, ভোগস্থখ ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেকে 
ডুবিয়ে দেওয়।। এর পিছনে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ক্রিয়াশীল থাকে। 
তা বলে, সংসার অসার, সংসার মায়া, সংসার ছুঃংখ ও যন্ত্রণার কারণ । 
অদ্বৈতবার্দী বৈদাস্তিক বলেন, এই মায়াময় সংসার ছেড়ে ব্রন্গে 
মনোনিবেশ কর। “মায়াময়মিদমখিলং হিতা ব্রহ্গপদং প্রবিশাশ্ড 
বিদ্িত্বা ।* যোগবার্দী সঙ্গ্যাসী বলেন, সংসারে সুখ নেই; কাজেই 
নারীকে বর্জন কর; নারীকে বর্জন করলে সংসারকে ত্যাগ করা হবে; 
এবং সংসারকে ত্যাগ করতে পারলে সুখী হবে । এস্রিয়ং ত্যক্তব৷ জগৎ 
ত্যক্তং, জগৎ ত্যক্তং। সুখী ভবেং। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রাচীন উপনিষদও 
গ্রহণ করে নি, রবীজ্নাথও গ্রহণ করেন নি। 


১৯৫ 


এই সম্পর্কে উপনিষদের চিস্তা এই গ্রস্থের প্রথম অংশে ইতিমধ্যে 
আলোচিত হয়েছে। তবু তুলনার প্রস্ততি হিসাবে কিছু পুনরাবৃত্তি 
প্রয়োজন হবে। জশ উপনিষদের প্রথম অংশের ছুটি কথার উল্লেখ 
করলেই আমাদের চলবে । তাতে আছে, 'ত্যক্তেন ভুীথান । এই 
তাৎপর্যপূর্ণ বচনটি একেস্বরবাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে ব্যাখ্যা কর! হয়, ঈশ্বর 
যা দেন তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাক। উচিত । কিন্তু প্রাচীন উপনিষদ ত 
একেশ্বরবাদ গ্রহণ করে নি; তা প্রচার করেছে যাকে বলা হয় 
সর্বেশ্বরবাদ ; অর্থাৎ সেখানে এঁশী শক্তিকে নৈব্যক্তিক সর্বব্যাগী 
সন্তারূপে কল্পন! কর! হয়েছে । কাজেই সঙ্গত অর্থ হবে ত্যাগের সহিত 
ভোগ কর! উচিত; ভাগ করে ভোগ কর। উচিত। কারণ সকলেই 
এক অখণ্ড মহাসন্তার অঙ্গ । তার অব্যবহিত পরেই যে বচনটি পাই 
ত৷ বলে £ 'কুর্ধল্সেবেহ কর্ানি জিজীঘিষেৎ শতং সমাঃ । অর্থাৎ সংসারে 
থেকেই কর্ম করতে হবে শত বৎসর জীবনধারণের ইচ্ছ। পোষণ করে। 
সন্ন্যাস নয়, কর্মকেই এখানে গ্রহণ করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। 
অপরপক্ষে ভোগ করতেও নিষেধ করা হয় নি; অন্যের স্বার্থ দলিত 
করে ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই উপনিষদে সংযমের 
শিক্ষা দেওয়। হয়েছে, বিশুদ্ধ সঙ্গ্যাসের নয়। 

এ বিষয় আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথের চিন্তা তার অস্থুসরণ করেছে। 
উভয়ের চিন্তায় আশ্চর্যরকম সাদৃশ্য দেখ! যায়। রবীন্দ্রনাথ দেখি 
সংযমকে গ্রহণ করেছেন জঙ্গ্যাসকে করেন নি। তিনি একথা 
বলেন ন! ষে ত্যাগের মোটেই প্রয়োজন নেই । তিনি বজেন সন্্যাসের 
জন্তাই সন্ন্যাস আকর্ষণের বিষয় নয়। তিনি স্বীকার ধরেন শিক্ষার 
অঙ্গ হিসাবে সংঘমের প্রয়োজন আছে । তা মনকে সংযত হতে শিক্ষা 
দেয়। কিন্তু তার ভূমিক। মুখ্য নয়, গৌণ। তীর ধারণীয় সঙ্গ্যাসকে 
মুখ্য লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করলে ত৷ হয়ে দাড়ায় আত্মবঞ্চনার সাধন! । 
ভার প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই £ “আত্মহত্যা ত সাধনার বিষয় হইতে 
পারে না, আত্মার বিকাশই সাধনার লক্ষ্য। বসত শিক্ষাকালে 


১৬ 


রগ্থচর্ধ পালন শুফতার সাধন! নয়। ক্ষেত্রকে মরুছূমি করিবার জী 
ঢাষা খাটিয়া মরে না। রসের জন্তই এই নীরসত। শ্বীকার করিয়া 
লইতে হয়।+ ৩১ 

তার এই দৃষ্টিভঙ্গি “নৈবেন্'-এর একটি কবিতায় বেশ দৃপ্তভাষায় 
ঘোষিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ অস্তর দিয়ে অনুভব করেছিলেন যে রূপ, 
রস, শব্দ, স্পর্শ, গন্ধ দিয়ে গড়া এই ধূলিময় ধরণী মায়৷ নয়, প্রপঞ্চ 
নয়; এর মধ্োই বিশ্বসন্তার প্রকাশ। সংসারই সেই অথণ্ড সত্বার 
সহিত মিলনের উপযুক্ত ক্ষেত্র । সুতরাং ইন্জ্রিয় নিরোধ করে তার 
সহিত সংযোগ ছিন্ন করা আত্মপ্রবঞ্ণন! হয়ে দাড়ায়। তাই তিনি 
সংসার হতে পালিয়ে যাবার উপদেশের পিছনে কোন যুক্তি 
দেখেন নি। 

তার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ ঘোষণা করেছেন এইভাবে _ 


ইন্জ্রিয়ের দ্বার 
রুদ্ধ করি যোগাসন, সে নহে আমার । 
য। কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে গন্ধে গানে 
তোমার আনন্দ রবে তার মাঝখানে । 


মনে হয় রবীন্দ্রনাথের এই দৃষ্টিভঙ্গি তার নিজের মতিগতির পথে 
গড়ে উঠেছিল | কারণ এইচিন্তার উন্মেষ ঘটেছে দেখাযায় তার একান্ত 
তরুণ বয়সে রচিত একটি নাট্যে। তাকে অবলম্বন করে গার এই 
চিন্তাটি তিনি পরিস্ফুট করতে চেষ্টা করেছেন । নাটকটির নাম 'প্রকৃতির 
প্রতিশোধ”, রচনাকাল ১৮৮৪ খ্রীস্টাব্দ। কাহিনীতে আছে, এক 
অছৈতবাদী সন্ন্যাসী সংসারকে মায়। জ্ঞান করে ত্যাগ করে সিদ্ধিলাভ 
করলেন। তিনি পরিভ্রমণে রত অবস্থায় একটি অনাথা অস্পৃশ্য 
বালিকাকে দেখতে পেয়ে তাকে আশ্রয় দিলেন। ফলে তার সহিত 
একটি ন্েহের সম্বন্ধ গড়ে উঠল। তখন একটি অন্তত্ধন্থের সৃত্রপাত 


৩১. সাহিত, সৌন্দর্য 


১৯৭ 


হল । তাকে মাঁয়াজ্ঞানে ত্যাগ করলেন; কিন্ত হৃদয়বৃত্তি আবার 
প্রবল হয়ে তাকে তার কাছে টেনে আনল । কিন্ত তখন বড় দেরি 
হয়ে গেছে ; বালিক। তখন নিদারুণ শোকের আঘাতে মার! গিয়েছে । 
মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা না! করে অধ্যাত্বসাধনা করতে 
যাওয়ায় প্রকৃতি এমন ভাবেই প্রতিশোধ নিয়েছিল। এ ফেন 
অদ্বৈতবাদ আঙ্িত দর্শনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। নাটকটির তাৎপর্য 
রবীন্্রনাথ এইভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন £ 

“শেষ কথাটা এই দীড়ালো শৃম্ততার মধ্যে নিবিশেষের সন্ধান 
বার্থ; বিশেষের মধ্যেই সেই অসীম প্রতিক্ষণে রূপ নিয়ে সার্থক, 
সেইথানেই যে তাকে পায়, সেই যথার্থ পায় ॥ 


99৮ 


গণ সপ্তম অধ্যায় ৭৭ 
মানবিকতা 


এক 
উপানিঘদে্র দানাবিধতা 


মানবিকতা কথাটি দর্শনের পরিভাষ। হিসাবে নৃতন স্স্টি হয়েছে; 
কিন্ত তা এত বিভিন্ন রকম অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যে আমরা তাকে 
কোন্‌ অর্থে ব্যবহার করব সে সম্বন্ধে একটি সু্পষ্ট ধারণা করে নেওয়া 
অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তা না হলে চিন্তায় অস্বচ্ছতা এসে 
পড়বে । রিউমস সঙ্কলিত দর্শনের অভিধানে তার সাতটি অথ দেওয়া 
হয়েছে ।১ তাদের কোনোটি পাঠনের প্রসঙ্গে, কোনোটি নীতিশান্ত্রের, 
ফোনোটি দর্শনশান্ত্রের, কোনোটি ধর্মতত্বের প্রসঙ্গে ব্যবহাত হয়েছে। 
এদের সব ক'টির বর্তমান ক্ষেত্রে বিস্তারিত পরিচয় দেবার প্রয়োজন 
নেই। আমরা বর্তমান আলোচনায় তাকে ধর্মতত্ব সম্পকিত 
পারিভাষিক শব হিসাবে ব্যবহার করব । মানবিকতার এই প্রসঙ্গে 
অর্থ দীড়ায়, তা সেই চিন্তাকে বোঝায় যা মানুষের কল্যাণকেই 
ধর্ম-আচরণের মূল অবলম্বন হিসাবে পরিগণিত করে। বর্তমান 
আলোচনায় সেই অর্থেই এই পারিভাষিক শব্দটিকে ব্যবহার করব। 
এই ধরনের মানবিকত। ছুই শ্রেণীর হতে পারে ॥। মানবজাতির 
কল্যাণ ও সেব৷ ঈশ্বরচিস্তার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে, নাও পারে। 
ঈশ্বরকে স্বীকার করে নিয়ে মানবিকত। প্রচার করা যেতে পারে। 
আবার ঈশ্বরকে বর্জন করেও মানৰিকত৷ প্রচার করা যেতে পারে। 
আমাদের দেশের চিন্তায় ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করে মানবিকতা প্রচারের 
একটা এঁতিহা গড়ে উঠেছিল। মগ্ুসংহিতায় পাচ শ্রেমীর হজ 


৯19,109, 1২৮/০০০৪--0/০১৫০ 0৫6 20080080905, 


১9৬8 


ঈম্পাদন করতে গৃহীকে উপদেশ দেওয়া হত £ দেবধগর, খযিষ্জ, 
পিতৃবন্ঞ, নয ও ভূৃতযজ্ঞ।২ অর্থাৎ সেখানে মান্ুষেব কল্যাণমূলক 
কাজকেও ধর্মীচরণের অঙ্গ বলে পরিগণিত কর! হয়েছে ॥। এই 
দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের চিস্তায়ও অনুপ্রবেশ করেছিল। মানুষকে 
নরনারায়ণ বল! হয় । অর্থাৎ তাদের মধ্যে এই সংস্কার বর্তমান 
যে মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরেব প্রকাশ ॥ গরীব মানুষকে দরিঞ্রনারায়ণ 
বল। হয়। অর্থাৎ অবহেলিত মানুষের মধ্যে যে ঈশ্বরের বিশেষ 
প্রকাশ সে সংস্কারও তাদের মধ্যে বর্তমান। এখানে মানবিকতা 
ধর্মকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছিল । 

আব এক শ্রেণীর মানবিকত| আছে যা ঈশ্বরকে বর্জন করে গড়ে 
উঠেছিল । তার ভালে। দৃষ্টান্ত ফরাসী দার্শনিক কৌত-স্থাপিত 
মানবিকতা । তার দর্শন গড়ে উঠেছিল একটি হতাশার মনোভাৰ 
থেকে। তিনি ধর্ম--তথা দর্শনের ওপর আস্থা হারিয়েছিলেন এই 
ধারণায় যে তাবা নিশ্চিত নির্ভরযোগ্য জ্ঞান পরিবেশন কবতে অক্ষম । 
তার ধারণায় তারা ঈশ্বব সম্বন্ধে সুস্পষ্ট জ্টান দিতে পারে না । সেইজন্য 
যার অস্তিত্ব সন্বন্ধে আমর। নিশ্চিত হতে পারি সেই মানুষকেই তিনি 
ঈশ্বরের আসনে বসাবার প্রস্তাব করেছিলেন এবং ঈশ্বরের উপাসনার 
পরিবর্তে মহামানবকে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং সর্মানবের সেবাকেই 
ধর্মাচরণের প্রকৃ্ রীতি বলে প্রচার করেছিলেন ।* 

প্রাচীন উপনিষদের চিন্তায় যে মানবিকতার বিকাশ ঘটেছিল 
তাকে এই ছুই শ্রেণীর কোনোটিরই অন্তরক্ত কর! যায় না; কারণ 
উপনিষদের চিন্তা অনন্সাধারণ। তা৷ একদিকে ব্যক্তিরগী ঈশ্বরকে 
যেমন গ্রহণ করে নি, তেমন ঈশ্বরকে মানবিকতার আদর্শ হতে বর্জনও 
করে নি। কারণ উপনিষদের খ্িব প্রেরণ ছিল: হৃদয়বৃত্তি নয়, 
ুদ্ধিবৃণ্তি, ভক্তি নয় জ্ঞান-পিপাসা। ব্রক্মকে জানবার ছুর্বার কৌতুহল 

২. মন:সংাহতা-”49২১ 


৩. 2888986 (০/০$০-০5/০৬ 61011050005 


» 


তাদের, মনীষ! দিয়ে বিশ্বের মৌলিকসত্তার স্বরূপ উদধাটন করতে 
উৎসাহিত করেছিল । সভাকে ঝ্ানবার জন্ত তারা উৎকণ্ঠিত 
হয়েছিলেন । তাই তাদের প্রীর্থনা-বানীতে ভক্তির স্পর্শ আদৌ নেই। 
তারা এই ইচ্ছ! প্রকাশ করেছিলেন যে বিশ্বস্ত! যেন তাদের এমন 
ধীশক্তি দেন যাতে তারা ভার বরেণ্য ভর্গ ধীশক্তি দ্বারা গ্রহণ করতে 
পারেন। তারা বলেছিলেন, “তিনি ধীশক্তির সহিত আমাদের যুক্ত 
করুন ( ধিয়ো। যো নঃ প্রচোদয়াৎ )।৪ 

এই পথে অগ্রসর হয়ে তার! ব্যক্কিত্ব-বিশিষ্ট ঈশ্বরকে খুজে পান 
নি। তীর! পেয়েছিলেন 'এক অব্যক্ত শক্তির পরিচয় ধার পৃথক 
সন্তারপে কোনো প্রকাশ নেই। তিনি ইঞ্জ্রিয়গ্রাহা বিশ্বের সকল 
বস্তর মধ্যেই প্রচ্ছন্নভাবে বিরাজমান, বিশ্বে যা-কিছু আছে সবই তাকে 
আশ্রয় করে আছে। তিনি সব-কিছু ব্যাপ্ত করে আছেন। তিনি 
যোগস্থত্ররূপে বিশ্বকে অখণ্ডততা মণ্ডিত করেছেন। তাকে তাই ব্রঙ্গ 
বল হয়েছে । যিনি সব থেকে বিরাট, সবকিছু ব্যাপ্ত করে আছেন 
তিনিই তো ব্রহ্ম ॥ কিন্তু সেই জন্যই তিনি নৈব্যক্তিক-সতা । সুতরাং 
উপনিষদের পরিকল্পনায় ঈশ্বর বাক্তিত বিশিই নন, তিনি বিশ্বের 
ধারক এবং নিয়ন্ত্রক মহাশক্তি। 

উপনিষদের মানবিকতা৷ এই সর্বেশ্বরবাদের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে। 
সকল বস্ত যে একই মহাসত্তার প্রকাশ এই বোধই উপনিষদের 
মানবিকতার মূল প্রেরণ ॥ যেহেতু সেখানে হৃদয়বৃত্তি প্রবলভাবে 
সন্ক্রিয় ছিল না, জ্ঞানপিপাসাই চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত করেছে, সেখানে 
ঈশ্বরকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা-নিবেদনের বা সেবা! করবার কোন ইচ্ছাই 
লক্ষিত হয় না। ভক্তিতত্ব থেকে পরমাত্মার প্রকৃতি আলোচনাই 
সেখানে বড় আকর্ষণ। কাজেই তার মধ্যে আনুষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি 
কোনো অন্ুরাশ লক্ষ্য করা যায় না। এখানেই বেদের সংহিতা 
অংশের সঙ্গে তার পার্থক্য । সেই কারণে বেদের সংহিতা! অংশকে 

8৪ বূহধারণযক ॥ ৩৪৩৪৬ প্রার্থনাটি খগ্‌ষেদ হতে নেওয়া । 


২১ 
উপাঁনিষদ..১৩ 


কর্মকাণ্ড বল। হয় এবং উপনিষদ অংশকে জ্ঞানকাণ্ড বঙ্গ হয় । 

এখানেই বল হয়েছে যে উপনিষদকে অবলম্বনকরে যে মানবিকতা 
গড়ে উঠেছে তার ভিত্তি বিশ্বের অখগুতাবোধ। বিশ্বসত্তা শুধু সকল 
বন্ততে নয়, সকল জীবের মধ্যেই অন্তর্যামী রূপে বর্তমান ॥ তিনি 
শুধু বর্তমান থাকেন না, নিজে অগ্রকট থেকে তাদের ক্রিয়াকলাপ 
নিয়ন্ত্রিত করেন। এই জন্য তার আর এক নাম অন্তর্যামী। এই 
প্রসঙ্গে বৃহদারণ্যক উপনিষদের এই বচনটি উদ্ধৃত কর! যেতে পারে, 
“যিনি সকল জীবের মধ্যে অবস্থিত থেকেও তাদের থেকে পৃথক, ধার 
উপস্থিতি বিভিন্ন জীবের! লক্ষ্য করে না, ধার সকল জীব শরীরম্বরূপ, 
ধিনি সকল জীবের অভ্যন্তরে থেকে তাদের নিয়ন্ত্রিত করেন, তিনি 
হলেন তোমার সেই অন্তর্ধামী অমৃত-আত্মা ৷ ৫ 

এখানে সকল জীবকে ব্রঙ্গের শরীরস্বরূপ কল্পনা করা হয়েছে । 
তিনিই ঘে সকল জীবের অজানিত থেকে তাদের মধ্যে অবস্থান করে 
তাদের বিভিন্ন প্রাণক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন সে-কথ! আর এক জায়গায় 
আরও স্প্ই করে বল। হয়েছে। সেখানে বল। হয়েছে ব্রহ্ম নিজে 
অখণ্ড থেকেও .বিভিল্ন জ্রীবের মধ্যে ক্রিয়া করে বিভিন্ন রূপ নেন। 
নিশ্বাস-প্রশ্বীস রূপে তিনি প্রাণ হন, কথা বলে তিনি বাক্য হন, দেখে 
চচ্ষু হন, শুনে কর্ণ হন, চিন্তা করে মন হন।॥ মানুষ ভাবে এগুলি 
বিভিন্ন ক্রিয়া; কিন্তু এগুলি একই প্রাণশক্তির বিভিন্ন গ্রকাশ। 
প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই £ 

“খণ্ড আকারে তিনি প্রাণধারণ করে প্রাণ হন, কথা বলে বাক্‌ হুন, 
দেখে চক্ষু হন, শুনে শ্রোত্র হন, মনন করে মন হন। এগুলি তার 
কর্ম সম্পফিত দাম। এই কারণে যে তার পৃথক পৃথক ভাবে 
উপাসনা করে দে তাকে (ঠিক ) বোঝে না॥ খণ্ড আকারেই তিনি 


৫, যঃ সর্বেষু ভুতেধু 'তিষ্ঠন: সর্বেভ্যো ভ্‌তেভ্যোহ্তরো যং সর্বাণি 
ভূতোনি ন বিদুঃ বসা দর্বাণি ভূত।নি শরারং ষঃ সর্বান ভূতানাম্তরো 
যময়তোষ ত আত্মাস্তর্যযামৃত ইতি ॥ বৃহদারণ্যক ॥ ৩1৭১৫ 


১৪, 


পৃথকভাবে এদের মধ্যে অভিব্যক্ত হন । তাকে আত্মারপেই উপাসন। 
করতে হয়; এখানেই তারা সব এক হয়ে যায়। অতএব এই সব 
অধিগত করতে হবে এই বুঝে যে ( এরা সব) আত্ম । এর দ্বারাই 
সব কিছু জানা যায়।* 
“ ব্রন্ষের এই প্রাণক্রিয়া রূপে আবির্ভাবের পরিকল্পনার সহিত 
বেগম পরিকল্পিত প্রাণশক্তির" সুন্দর তুলনা চলে। বেগস-এর 
পরিকল্পনায় একই বিরাট প্রাণশক্তি সকল প্রাণীদের মধ্যে ক্রিয়াশীল 
হয়ে প্রাণধারাকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে । তাকেই তিনি 
ঈশ্বর বলেছেন। উপরের মন্তব্যে ব্রন্গের প্রাণশক্তিরূপে প্রকাশকে 
অখণ্ড আত্মারূপে পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রাণশক্তিই সকল জীবকে 
যুক্ত করে অখণ্ড রূপ দান করছে । 
মনে হয় এই হাখণ্ডতা বোধ হতেই উপনিষদে জীবহিংসার বিরুদ্ধে 
প্রতিবাদ ঘোষিত হয়ে ভারতীয় চিন্তায় অহিংসাতত্বের জন্মলাভ 
হয়েছে। এই অহিংসাতবই ভগবান বুদ্ধের চিন্তায় একটি মূলনীতি 
হিসাবে পরবর্তীকালে গৃহীত হয়েছিল। এই তন্বটি উপনিষদে একটি 
স্বন্দর চিন্ত।র মধ্যে গড়ে উঠেছে। তার একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় 
এখানে দেওয়া হবে । 
প্রাসঙ্গিক তত্টি ঘোর আঙ্গিরস দেবকীপুন্র কৃষ্ণকে বলেছিলেন 
বল! হয়েছে। কাহিনীটি এইরূপ £ মানুষের জীবনকে সোমযাগের সঙ্গে 
তুলনা কর! হয়েছে । এই সোমযাগ পাঁচদিন ধরে হত। প্রথম 
দিন দীক্ষা, পরের তিন দিন উপসং॥ শেষের দিনটি প্রধান। তার 
তিনটি অংশ-_প্রাতঃ সবন, মধান্দিন সবন ও তৃতীয় সবন। এই দিনই 
৬. অকৃৎস্নো হি স প্রাণম্েব প্রাণো ভবাঁত বদন: বাক: পশ্যংশ্ক্ষুঃ শম্বন্‌ 
শ্লোন্ং মশ্বানো মনস্তান্যস্যৈতাঁম কর্মনামানোব স যোহ্ত 
একৈকমূপাস্তে ন স বেদাকৃতস্নো হোযষোহত একৈকেন ভবতাাত্ে 
ত্েবোপাসীতান্্ হোতে সর্বে এবং ভবাষ্তি তদেতত পদনীয়মপ্য সবস্য 


যদয়মাতআানেন হোতৎ সর্বং বেদ। বৃহদারণাক ॥১৪৪1৭ 
৭. হিলা। ৬1০1, 


২৯৩ 


স্ঠোত্রগান ও শান্ত্রপাঠ করতে হয়। তাঁর সঙ্গে তুলন। করে মামুষের 
জীবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। জীবনের প্রথম চবিবশ 
বছর--প্রাতঃ সবনের সহিত, দ্বিতীয় চুয়া্লিশ বছর মধ্যন্দিন সবনের 
সহিত এবং শেষের আটচল্লিশ বছর তৃতীয় সবনের সহিত তুলনীয় । 
মানুষের আয়ু অত্যন্ত দীর্ঘ করে ধরা হয়েছে । 

সুতরাং এখানে আশ্রমের চারটি অংশকে তিনটি সবনের সঙ্গে 
সংযুক্ত করে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগ দীক্ষা। 
সংবত, কৃচ্ছ_সাধনের জীবনই দীক্ষা । ত। ব্রক্ষচর্য আশ্রমের সহিত 
তু্গনীয়। উপসৎ ভোগের জীবনকে স্ুচিত করে। অর্থাং তা সংসার 
আশ্রমের সমস্থানীয়। তৃতীয় অংশে স্তোত্র ও শান্ত্রপাঠের বাবস্থা 
হয়েছে; অর্থাৎ তাকে বানপ্রস্থ ও যতি আশ্রমের সঙ্গে তুলন। করা 
হয়েছে। তখন শ্রাস্ত্রর্চাই অবলম্বন হয়। যজ্ঞ করলে দক্ষিণাও 
দিতে হয়। তারও এখানে ব্যবস্থা আছে। এই যজ্ঞেব শেষে 
গোমলতা ছেঁচবার পাত্রগুলিকে জলে ভাসিয়ে দিতে হয়। তাকে 
অবভূথ বল! হত। মৃত্যুকে অবস্ভথ বলে কল্পনা করা হয়েছে। তা 
জীবন-যজ্জের সমাপ্তি স্বুচিত করে। 

বর্তমান প্রসঙ্গে আমাদেব বিশেষ সম্পর্ক মানুষের জীবন-যজ্ঞের 
জন্য যে দক্ষিণার ব্যবস্থা হয়েছে তার সঙ্গে। এই দক্ষিণার ব্যবস্থা 
আজীবন স্থায়ী । মানুষের, নীতিনিয়ন্ত্রিত জীবনই দক্ষিণা ? তার অঙ্গ 
হল তপস্তা, দান, সরলতা, অহিংসা ও সত্যভাষণ।৮ 

এখানে অহিংসার টল্লেখ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ । বিশ্বে যে প্রাণের 
ধারা প্রবাহিত তার মধ্যে যে বিশ্ব-সন্তারই বিশেষ প্রকাশ আছে এই 
বোধ হতেই অহিংস! প্রচারে খষি প্রেরণা পেয়েছিলেন মনে হয়। 
প্রানী ব্রন্মের বিশেষ প্রকাশ, কাজেই তাকে হুনন কিরতে নেই--- 
এই ধরনের একটা বোধ তাদের মনে উদয় হয়ে থাঞ্চবে। সুতরাং 


৮. প্রাসাঁক বচনাটি এই--অথ বতপো দান মার্জবমাহাসা সত্যকনাঁমাতি 
তা অগ্য দাক্ষিণাঃ ॥ ছান্দোগ্য ॥ ৩/১৭/৪ 


২৪ 


অথণ্ডত! বা বিশ্ববোধ হতেই অহিংসাতত্বের উদ্ভব হয়েছে। 

ভগবান বুদ্ধের মধ্যে এই চিন্তা! বিশেষ বলবতী হয়ে আত্মপ্রকাশ 
করেছিল। তার কারণ কারপ্যই তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। সম্ভবত 
এই গুপনিষদ্দিক চিন্তাদ্বারাও তিনি প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন । ত্রক্ষ- 
তত্বের সঙ্গেও যে তার পরিচয় ছিল, তার প্রমাণ তার বচন হতে পাওয়া 
যায়। এই প্রসঙ্গে তার একটি বহুল-প্রচারিত-বাণীর মূল পালি হতে 
অনুবাদ এখানে দেওয়া যেতে পারে। 

“মা যেমন একটি মাত্র পুত্রকে নিজের আয়ু দিয়ে রক্ষা করেন, 
সমস্ত প্রাণীর প্রতি তার অনুরূপ অপরিমিত মনোভাব পোষণ করবে । 
উধের্ব, অধে, চতুর্দিকে, সর্বলোকে বাধাহীন, হিংসাহীন, বৈরভাবহীন 
অপরিমিত অনুরূপ মনোভাব এবং মৈত্রী পোষণ করবে। দণ্ডায়মান, 
চলমান, উপবিষ্ট এবং শয়ান অবস্থায় যে পর্যস্ত না নিদ্রা আসে এইরূপ 
স্মৃতি অধিষ্ঠিত হয়ে থাকাকে ব্রদ্মবিহার বলে 1৯ 

এখানে ছুটি শব্দ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ । প্রথম মায়ের সন্তানের 
প্রতি মমতার দৃষ্টান্তের প্রয়োগ এবং সর্বজীবের প্রতি মমতা বহনকে 
্রহ্মবিহার বলা। মা সন্তানকে এত ভালোবাজেন সন্তান ও তিনি 
একই বলে। সন্তানকে তিনি নিজেব থেকে পৃথক জ্ঞান করেন না।। 
সুতরাং অপৃথকজ্ঞানেই বুদ্ধ বিশ্বের সকল প্রাণীকে দেখতে বলেছেন। 
সেই জন্তই তাকে ব্রহ্মবিহার বলেছেন। সকল জীব ব্রদ্ষের বিশেষ 
প্রকাশ; সুতরাং এই অথগুবোধ হতেই মমতারোধ প্রণোদিত 
আঁচরণকে ব্রহ্মবিহার বলা যায়। অন্তের প্রতি কল্যাণচিস্তা বহুন 


৯. মাতা যথা নিষং পৃত্তং আয়ুসা একপুতমনুরকখে এবমপি 
সব্বভূতেষু মানসং ভাবয়ে অপারমানং। 
মেত্9 সত্বলোকাস্মং মানসং ভাবয়ে অপাঁরমাণং। 
উদ্দং অধো চ 'তাঁরধণ অসাম্বাধং অবেরমসপত্তং। 
[িটঠং চরং নিসিমো যা সয়ানো বা যাবং স বিগতমিদ্ধো 
ধতং সাতিং অধিটঠেষ্যং বক্ষমেতং বিহারামধবাহ। 
/ মেতানুত্ব 


ত$৫ 


এবং কল্যাণকর আচরণ ত্রদ্ধের মধ্যে বিচরণের সমস্থানীয় হয়ে ধাড়ায়। 
এ-হতে প্রমাণ হয় যে উপনিষদের ভাবধারার সহিত তিনি পরিচিত 
ছিলেন এবং অথগুবোধ হতে সম্ভবত তিনি মমতাপুর্ণ আচরণের উপদেশ 
দিয়েছিলেন। 

নীতির ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বার্থের সহিত অগ্ ব্যক্তির বা গোম্ঠীর 
স্বার্থের যে সংঘর্ষ দেখ। যায় তা একটি সমন্তা। উত্থাপন করে। প্রতি 
মানুষই নিজের স্বার্থ সম্বন্ধে বেশি সচেতন ; কাজেই স্বভাবতই নিজের 
স্বার্থনংরক্ষণের প্রতি বেশি নজর দেয়। এইভাবে স্বার্থের সঙ্গে পরার্থের 
সংঘাত নীতিশাস্ত্রে একটি মৌলিক সমস্যা হয়ে ঈাড়ায়। 

উপনিষদে এই সমস্যার সমাধান খোজ। হয়েছে এই অখগ্ডবোধ 
হতে যে প্রীতি সঞ্জাত হয় তাকে ভিত্তি করে। এই পরিকল্পনায় 
বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তি উভয়কেই পরস্পর পরিপূরক ভূমিক৷ দেওয়া 
হয়েছে। প্রধান ভূমিক। দেওয়া হয়েছে হৃদয়বৃত্তিকে আর তাকে 
প্রেরণ। দেবার ভূমিক। দেওয়। হয়েছে বুম্ধিবৃত্তিকে। এই পরিকল্পানাটি 
সত্যই অভিনব। স্মৃতরাং এই তত্বটিকে সহভবোধ্য করবার জন্ত একটু 
আলোচনার প্রয়োজন । 

সংক্ষেপে ৰল। যায়, উপনিষদ বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে হদয়বৃত্তির 
পরিবর্ধন চেয়েছে এবং হাদয়বৃত্তির প্রসারের সাহায্যেই স্বার্থ ও 
পরার্থের দ্বন্দের মীমাংসা করেছে। মানুষের হৃদয়বৃত্তির শ্রেষ্ঠ বিকাশ 
পাই স্নেহ, প্রীতি ও ভালোবাসার বিস্তারে। এই ভালোবাসাকে 
বিস্তার করেই স্বার্থ পরিশোধন হতে পারে, সেট। সম্ভবও বটে; কারণ 
পকল মানুষের মধ্যেই স্বার্থ ও পরার্থবোধ উভয়ই ক্রিয়াশীল । এমন 
কি সাধারণ ম।ম্ুষও বিশেষ ক্ষেত্রে স্থার্থত্যাগ সহজেই করতে পারে 
এবং পরার্ধে অনেক আত্মত্যাগ স্বীকার করতে পারে। সন্তানের জন্য 
এমন ত্যাগ নেই যা তার মা করতে প্রস্তত নয়; প্রিয়জনের জন্ত 
প্রেমিক সর্বস্বত্যাগ করতেও দ্বিধাবোধ করবে না। 

কেন এমন হয়? তার উত্তর হল, এসব জায়গায় ব্যক্তি-বিশেষের 


২৬ 


স্বার্থ সঙ্কুচিত ক্ষেত্র অতিক্রম করে অন্যের স্বার্থকে নিজ্জের করে 
নিয়েছে । ম! যখন সন্তানের জন্য ত্যাগন্বীকার করেন, তার কষ্টবোধ 
হয় না। কারণ, সন্তানের স্বার্থ তার স্বার্থের সহিত একীভূত হয়ে 
গেছে। প্রেমিক যখন প্রেমাম্পদের জন্য আত্মত্যাগ স্বীকার করে 
তখন তার কাছে প্রেমাস্পদের স্বার্থ নিঙ্গের স্বার্থের অধিক প্রিয় হয়ে 
ওঠে। এমন হয়, তার কারণ এদের পরস্পরের মধ্যে প্রীতির সম্বন্ধ 
গড়ে উঠেছে । 

আমাদের প্রতিপান্তের সমর্থনে একটি সচরাচর দৃষ্ট উদাহরণ 
ব্যবহার কর! যেতে পারে। ধর! যাক, একটি ছোট মেয়েকে কেউ 
ভালোবেসে কতকগুলি টফি উপহার দিয়েছেন । প্রতিবেশী বালক- 
বালিকার যদি এসে তার ভাগ চায়, বলে, “আমায় একট! দে না, 
সে হয় তো দেবে না। কিন্তু বাড়িতে এসে ভাই-বোনের! ন! চাইলেও 
সে তাদের মধো বিতরণ করে দেবে । তার আচরণের এই ৰিভিম্নতার 
কারণ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রীতির সম্বন্ধ গড়ে ওঠে নি, তাদের সে 
আপনজন বলে মনে করে না, আর পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে 
প্রীতির সম্বন্ধ আছে বলে তাদের আপনজন মনে করে। সেই 
কারণেই তাদের সঙ্গে ভাগ করে ভোগ করতে তার কোন কষ্ট হয় ন1। 

উপনিষদ এই পথেই স্বার্থ ও পরার্থের ছন্ৰের মীমাংসা করেছে। 
ত। বলে, যখন বিশ্বের সকল জীব, সকল বস্তুকে ব্যাপ্ত করে একই 
মহাসত্ত। প্রচ্ছন্লভাবে বিরাজমান, তখন সকলেই সকলের আত্মীয় । 
সকল মানুষই একই পরিবারের সন্তানের মতো। কাজেই সকলকেই 
ভালোবাসবে এবং সকলকেই প্রীতি করবে। এই অথগুবোধ বা 
একত্ববোধ হুতেই এইভাবে সকলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাবোধ উপলব্ধি 
হবে; তখন সকলের সঙ্গে প্রীতির সম্বন্ধ গড়ে উঠবে । ফলে স্বার্থের 
সংঘর্ষ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে । 

এখন আমাদের এই প্রাতিপাস্ভের সমর্থনে উপনিষদ হতে কিছু 
সমর্থক-বচন উদ্ধৃত করবার প্রস্তাব করি। বৃহদারণ্যক উপনিষদে 


৩৭ 


যাজ্জবন্ধ্য মৈত্রেয়ীকে বলছেন, জায়ার নিকট যে পতি প্রিয় হয় ও 
পতির কারণে নয়, মায়ের নিকট যে পুত্র প্রিয় হয় ত। পুত্রের কারণে 
নয় ॥ তিনি বলছেন, তার প্রিয় হয় তার কারণ সকলকে ব্যপ্তি করে 
একই আত্ম! বর্তমান আছে বলে ।১* 

ঈশ উপনিষদে এই তন্বটিকে আরও পরিষ্কার কবে ব্যাখ্য। কর! 
হয়েছে। সেখানে এই তন্বটি প্রথমে ঘোষিত হয়েছে যে ঈশ্বর কর্তৃক 
সব-কিছু আচ্ছাদিত, অর্থাৎ তিনি বিশ্বের সব-কিছু পরিব্যা্ড করে 
আছেন। এই যুক্তির ভিত্তিতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে ত্যাগের স্থিত 
ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ অন্থকে বঞ্চিত করে ভোগ করবে ন৷, 
সকলের সঙ্গে ভাগ করে ভোগ করবে । আরও বল! হয়েছে যে সেই 
কারণেই অস্তের সম্পদ অপহবণ করতে নেই । ব্রচ্ষের সর্বব্যাপকতার 
ভিত্তিতে এই যে উপদেশ দেওয়া হয়েছে তাব মাঝখানে আর-একটি 
যুক্তি উহা রয়ে গেছে। ধ্বন্তর্থের সাহায্যে সেটি স্থচিত হয়েছে । তা বলে 
যেহেতু সকলেই একই অথণ্ড ঈশ্বরের অঙ্গীভূত সেহেতু সকলেই 
পরস্পরের একাস্ত আপনজন । তা] যদি হয়, স্বার্থপবের মতো! একা- 
এক! কোনও ভোগ্যবস্ত ভোগ করতে নেই, ভাগ করে ভোগ করতে 
হয়। একই কারণে কারও সম্পদ অপহরণ করার অর্থ হয় ন!। 
আপনার মানুষের সম্পদ কি কেউ অপহরণ করে নাকি ১১ অর্থাং 


১০. ন বা অরে পত্যুঃ কাষায় পতিঃ 'প্রিয়ো ভবাঁত আত্মনস্তু কামায় পাতিঃ 
প্রয়ো ভবাঁত ন বা অরে জায়ায়ৈ কামায় জায়া প্রিয়া ভবাঁত আত্মন্তু 
কামায় জায়া প্রিয়া ভবাঁতি ন বা অরে পত্রানাং কামায় প্রাঃ প্রিয়া 
ভর্তি আত্মনস্তু কামায় পূত্রাঃ প্রিয়া ভবন্তি ॥ বৃহদারণ্যক ॥ 
২81৫৩ ও 8161৬ 

এখানে 'আত্মনঃ'--এর অর্থ শনজের' নয় ; তা বন্ধের প্রতিশব্দ 
হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে ব্রদ্বকেই নির্দেশ করে। তা 'চ্পন্ট হয়ে যার 
পরের ডীন্ততে। সেখানে বলা হয়েছে, 'ইদং সং [বদয়মাত্মা' অর্থাৎ 
এই সব কিছ. জাড়য়ে যান আছেন তান আত্মা । 

১৯ ঈশাবাসামিদং সর্বৎ বতকিণ জগত্যাং জগৎ ॥ তেন ত্যান্তেন ভুঞীথা মা 
গৃধঃ বস্যদ্বিদ্ধনম-:॥ ঈশ। ১ 


৮ 


এখানে অথগুজ্ঞান হতে পরস্পরের প্রীতি সঞ্চারের চেষ্টা হয়েছে । সেই 
গ্রীতি সঞ্চার হলে মানুষের মন স্বার্থপরতা দোষ হতে যুক্ত হতে পারে । 
সুতরাং এখানে পাই অথণ্ডতাজ্ঞান হতে প্রীতির সঞ্চার এবং গ্রীতিহেতু 
পরার্থপরতার উদ্রেক । 

একই প্রসঙ্গে এখানে আর-একটি উপদেশ দেওয়া হয়েছে হ 
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ । বল। হয়েছে, সংসারে কাজ করতে করতে শতবর্ষ 
জীবন ধারণ করতে মনে ইচ্ছা! পোষণ করতে হবে ।১২ সুতরাং দেখ৷ 
যায় এই বচনে সংসার হতে সরে যেতে বলা হয় নি; বরং কর্মময় 
দীর্ঘজীবন যাপন করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে । নিজেকে স্বার্থপরতা 
দোষ হতে মুক্ত রেখে, সকলের কল্যাণ সংরক্ষিত হয় এমন কর্ম করে 
সংসারজীবন যাপন করতে হবে। সুতরাং এই ছুটি উপদেশকে অবলম্বন 
করে যে-তন্ব স্থাপিত হয়েছে তা বলে অখগুবোধ হতে প্রীতি, গ্রীতি 
হতে পরার্থবোধের উদ্রেক এবং এই পরার্থরোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে 
কর্মময় জীবন--এই হল আদর্শ জীবনের চারটি উপাদান । 

এই হল উপনিষদে প্রচারিত মানবিকতা । তার পরিণত রূপে 
ত৷ বলে মানুষের তিনটি মৌলিক কর্তব্য পালন করা! উচিৎ £ দম, দান 
এবং দয়া । বিষয়টি বৃহদারণাক উপনিষদে একটি সুন্দর গল্পকে 
অবলম্বন করে ব্যাখ্যা কর! হয়েছে । তার বিস্তারিত বিবরণ এখানে 
নিপ্রয়োজন। শুধু এইটুকু বললেই হবে যে সেখানে পাই, গুরু 
সমাবর্তনের দিনে শিষ্কাকে উপদেশ দিচ্ছেন-_-আত্মদমন করবে, দান 
করবে এবং দয়া! করবে। এই গুরু হলেন স্বয়ং ব্রক্মা॥ তাই একটি 
প্রাকৃতিক দৃশ্টের একটি কাব্যময় ব্যাখ্যা দিয়ে বল! হয়েছে যে এই 
মহান উপদেশের সকল কালে, সকল দেশে প্রয়োগ আছে বলে নাকি 
প্রতি বংসর মেঘে ঢাক! দিনে স্তনয়িত্বয বজ্ররূপে ঘোষণ। করে 


৯২. কুবমেবেহ কমণি জিজশীবষেং শতং সমাঃ। ঈশ।॥ৎ 
২৯ 


দে দ₹।১৩ তা ফেনবিশ্ববাসীকে বলতে চায় স্বার্থকে, বিছেষকে, 
ক্রোধকে সংহত কর, নিজের সম্পদ অন্যকে দান করে ভাগ করে ভোগ 
কর আর অবহেলিতকে দয়া কর। 

এই হল সংক্ষেপে উপনিষদের মানবিকতা । ব্যক্তিরপী জ্ঞান 
করে এখানে ঈশ্বরকে সেবা! করবার প্রশ্ন ওঠে নি। কারণ, তখনও 
ভারতীয় দর্শনে একেশ্বরবাদের বিকাশ ঘটে নি। ব্রদ্ষ সেখানে 
সর্বব্যাপী, প্রচ্ছন্ন, নৈব্যক্তিক সন্তারপে পরিকল্লিত। তিনি মনীষ! 
দ্বারা অধিগম্য ব্রহ্ম, তিনি ভক্তিমার্গে লভ্য ঈশ্বব নন। তবু এই 
নৈব্যক্তিক ঈশ্বরের এখানে একটি ভূমিকা আছে। তিনি মানুষে 
মানুষে সন্বন্ধসূত্র হিসাবে বর্তমান । এই অখগুবোধকে অবলম্বন করে 
যে পারস্পরিক গ্রীতি গড়ে উঠতে পাবে তাকে ভিত্তি করে এই 
মানবিকতার পরিকল্লন1 ॥। তার আদর্শ হল সকলের প্রতি প্রীতি বহন 
করে, স্বার্থপরায়ণ ন! হয়ে, সামগ্রিক কল্যাণকন্নে আত্মনিয়োগ করতে 
হবে । 


রবশন্দুনাথের মানাবকতা 


রবীন্দ্রনাথেব মানবিকত। ভাব নিজন্ব মতিগতির পথে গড়ে উঠেছে। 
দেখা যায় দুটি চিন্তা তার মনে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল এবং তাদের 
প্রভাবে তাব নিজন্ব ম[নবিকত৷ গড়ে উঠেছিল । তাদের একটি হল-_ 
তার এই ধারণ! যে সংসার হতে সরে গিয়ে সন্ন্যাস অবলম্বন করে যুক্তি 
পাওয়! যায় না, সংসারের মধ্যে থেকেই মুক্তি সাধনা করতে হবে। 
দ্বিতীয় চিন্ত। হল--ঈশ্বরকে সেবার পাত্র হিসাবে ন! £পলে ঈশ্বরের 


১৩. তদেতদেবৈষা দৈবী বাগনূবদাত স্তনায়ত রদ দ হাতদামাত দত্ত 
দয়ধ্বামাতি তদেতয়ং শিক্ষেদ দমং দানং দয়ামাতি ॥ 
স্প্বৃছ্দারণাক 161২৩ 


২৯ 


সহিত মিলন পরিপূর্ণ হয় না। শুধু গ্রীতির সম্বন্ধে নয়, কর্মের সম্বন্ধে 
তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে । প্রথম চিন্তা কাকে সঙ্গ্যাসবাদের 
প্রতি বিমুখ করেছিল । দ্বিতীয় চিন্তা তাকে জীবনদেবতা হতে 
দুরে সরিয়ে এনেছিল । ঈশ্বরকে সেবার সম্বন্ধে পেতে চেয়ে ভিনি 
বাঁকে বিশ্বমানবের সেবার ভিতর দিয়ে পেতে চেয়েছেন। এইভাবে 
নিজন্ব চিন্তার পথে তার মানবিকতা-তত্ব বিকাশ লাভ করেছিল । 
স্বৃতর]ং আমরা! প্রথম এই ছুটি চিন্তার সহিত পরিচিত হয়ে নেব । 
“নৈবেছ্া'এর একটি কবিতার আরম্ভ হয়েছে এইভাবে-_ 
বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি, সে আমার নয় । 
অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময় 
লভিব মুক্তির স্বাদ। 
তার মর্মবাণী হল সংসার ত্যাগ করে, কর্ম ত)াগ করে সংসার হতে 
পলাতক হয়ে মুক্তি পাওয়। যায় না। তাতে নিজের মধ্যে নিজেকে 
গুটিয়ে নেওয়া হয়। মুক্তি আসে নিজেকে বিশ্বের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে। 
এই প্রসঙ্গে 'গীতাঞ্জলি'র একটি কবিতার অংশ স্থাপন করা যেতে 
পারে 
মুক্তি, ওরে মুক্তি কোথায় পাবি, মুক্তি কোথায় আছে? 
আপনি প্রভু স্থষ্টি বাধন পরে বীধা সবার কাছে। 
এ হতে প্রমাণ হয় বিশ্বধারায় প্রককতিই হল বন্ধনের মধ্য দিয়ে মুক্তি 
খেজা। তার ধারণায় বিশ্বসত্ত। নিজেই কর্ম ত্যাগ করেন নি? তিনি 
মুক্তিলাভের জন্ত নিজেকে স্থ্টির বন্ধনে বেঁধেছেন । তিনি তাই 
বলেছেন--“একদিকে বন্ধন না মানলে অন্থদিকে মুক্তি পাবার জো 
নেই। ব্রহ্ম একদিকে আপনার সত্যের দ্বারা বদ্ধ, আর একদিকে 
আপনার আনন্দ দ্বারা মুক্ত। আমরাও সত্যের বন্ধনকে যখন সম্পূর্ণ 
স্বীকার করি, তখনি মুক্তির আনন্দকে সম্পূর্ণ লাভ করি ১৪ 


৯৪ শাদ্তিনকেতন। বর্ম যোগ 
২১১ 


এখানে সত্যের বন্ধন মানে সংসারের বন্ধন । ব্রদ্ম নিজেকে নিয়মে 
বেঁধে স্থপ্তিধারার মধ্যে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে মুক্তি খুঁজেছেন। সেই 
মুক্তিই তার আনন্দরূপটি পরিস্ফুট করছে। আত্মস্থ হয়ে, আত্মসমাহিত 
হয়ে নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নিয়ে যদি তিনি অবস্থান করতেন, 
ত হলে সেটাই তো হত বন্ধন। নিজেকে নিয়মের মধ্যে বেঁধে, 
সৃষ্টির প্রবাহের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে তবেই তো তিনি আনন্দের 
আম্বাদ পেলেন। স্মৃতরাং স্থ্টির অস্তনিহিত তব্বই হুল বন্ধনের মধ্যে 
মুজির অন্েষণ। 

এখন প্রশ্ন হল, ব্যক্তি-মানুষের পক্ষে সেট কিভাবে জন্ভব হতে 
পারে। তিনি তার জন্তাব্যত৷ বোঝাবার জন্য একটি উপম৷ ব্যবহার 
করেছেন। প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই £ 

“আমাদের জীবনের বীণাতেও কর্মের সব মোট। তারগুলে। ততক্ষণ 
কেবলমাত্র বন্ধন, যতক্ষণ তাদের সত্যের নিয়মে ফ্ুব করে ন। তুলতে 
পারি। কিন্তু তাই বলে এই তারগুলিকে খুলে ফেলে দিয়ে শুহ্যতার 
মধ্যে, ব্যর্থতার মধ্যে নিক্ষিয়তালাভকে মুক্তি ৰলে ন1।+১* ৬. 

বীণার তার বাধলে তবেই ত৷ সুরের বঙ্কার তুলতে পারে, তাতেই 
তার সার্থকতা, তাতেই তার মুক্তি। তারগুলে৷ খুলে রেখে দিলে ত৷ 
প্রকাশের মুক্তি হতে বঞ্চিত থেকে যায়। ঠিক সেইভাবে সংসার হতে 
সরে গেলে মুক্তিলাভ হবে না, নিজেকে প্রকাশের আনন্দ হতে বঞ্চিত 
করার তা সামিল হবে। মুক্তি মিলবে সংসারে থেকে কর্ম করে। 
তাতেই মুক্তি, তাতেই আনন্দের আস্বাদন। কর্মসঙ্গ্যাস মানে 
নিক্রিয়তা, ত৷ শৃশ্যতার সাধন] । 

এখন সকল কর্ণই যে মুক্তি এনে দেবে সে কথা তিনি৷ .বলেন না। 
ভিনি বলেন, যে কর্ম সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করট্টে সেই কর্মই 
বন্ধনের মধো মুক্তির আম্বাদন এনে দিতে দমর্থ; অষ্ঠ। কর্ম নয়। 


১৫, একই। 
২৯৭ 


্বার্থবোধ প্রণোদিত কর্ম সে-শ্রেদীর কর্ণ নয়) তা মানুষের জীবনকে 
সঙ্কুচিত করে তোলে। যে-কর্ম সর্বজনীন কল্যাণ আনে সেই কর্মই 
মুক্তির কর্ণ। একেই তিনি কর্মযোগে বিশ্বসন্তার সঙ্গে এক হবার 
সাধন] বলেছেন এবং বিশ্বতানে তান মিলাবার সাধন! বালছেন। তার 
চিন্তায় সেটি কিভাবে সম্ভব হয় তার এখানে একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাথ্যা 
দেবার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। 

রবীআ্নাথের ধারণায়, মানুষের মধ্যে ছুটি আমি আছে--একটি 
£ছোটো-আমি' এবং অপরটি “বড়ো-আমি। এই ছোটো-আমিকে 
তিশি অহং বলেছেন এবং বড়ো-আমিকে তিনি আত্ম! বলেছেন । 
তাদের অতিরিক্ত আরও একটি 'আমি' আছেন? তাকে তিনি “সবার 
চেয়ে-বড়ো-আমি' বলেছেন। তিনিই বিশ্বসত।। “ছোটো-আমি, 
হল আত্মকেন্দ্রিক; সে কেবল নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। নিজের 
নুখ-হুঃখ, নিজের আরাম, নিজের সম্পদ এদের চিন্তাই তার মনকে 
ভরে রেখে দিয়েছে । মানুষের আর একটি দিকও আছে য৷ তাকে 
বাহিরের দিকে টানে ॥। সে বিশ্বের সঙ্গে কর্মের যোগ, শ্রীতির যোগ 
স্থাপন করতে চায়। তাই জন্তই তা৷ বড়ো-আমি। একটি স্থার্থাঙ্ধ, 
অপরটি পরার্থে আত্ম-নিয়োগে উৎস্থৃক। 

রবীন্দ্রনাথ “ছোটো-আমি'র পরিচয় দিতে এই বলেছেন £ 

“মামর। প্রত্যেকেই একদিকে অত্যন্ত ছোটো, আর একদিকে 
অত্যন্ত বড়ো । যেদিকটাতে আমি কেবলমাত্র আমি'' কেবল আমার 
সুখ-ছুখ, আমার আরাম, আমার প্রয়োজন, আমার ইচ্ছা-সে 
দিকটাতে আমি সবাইকে বাদ দিয়ে আপনাকে একান্ত করে দেখতে 
চাই--৫স দ্দিকটাতে আমি বিন্দুমাত্র ; সেদিকটাতে আমার মতো 
ছোটো আর কে আছে 7৮১৯ 

একই ভাষণে “বড়ো-আমি' সম্বন্ধে তিনি বলেছেন £ 


১৬. শাদ্তিনিকেতন। জাগরণ 
২১৩ 


£আর যে দিকে আমার সঙ্গে সমস্তের যোঁগ, আমাকে নিয়ে বিশ্ব- 
বরঙ্ধাণ্ডের পারপুর্ণতা ষে দিকে সমস্ত জগত আমাকে প্রার্থনা ঝরে 
সেইখানে আমার চেয়ে বড়ো! আর কে আছে? 

তাদের অতিরিক্ত যে একটি সত্ত। আছেন তাকে তিনি কোথাও 
'মহা-আমি' বলেছেন, কোথাও “সবার-চেয়ে-বড়ো-আ মি বলেছেন । 
তিনিই বিশ্বস্ততা বা পরমাত্মা। রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি 
এই-_“আত্মার পরিপূর্ণ সত্যটি আছে পরমাত্মার মধ্যে। আমার 
আমি দেই একমাত্র মহা-আ মিতেই সার্থক ।১ 

এই সার্থকত। লাভ হতে পারে মহা-আমির ইচ্ছার সঙ্গে নিজের 
ইচ্ছাকে সংযুক্ত করে সেই ইচ্ছাসাধনে আত্মনিয়োগ করে। তাকেই 
তিনি বলেছেন, বিশ্বতানে যে সুর বাজে নিজের বীণাকে সেই সুরে 
বাধা । বিশ্বসত্ত! সমস্ত বিশ্বকে ধারণ করছেন এবং পোষণ করছেন। 
তিনি অবিরাম বিশ্বজনীন মঙ্গলকর্মে নিযুক্ত । তাই তে। তাকে বল৷ হয় 
“এষ দেবে। বিশ্বকর্মা? । এখন মানুষের সার্থকতা তার ছোটো-আমি, 
ছোটো আশা-আকাজ্ষার মধ্যে নিজেকে সঙ্কুচিত করে না-রেখে, 
নিজের মধ্যে যে বড়ো-আমি আছে তার আহবানে সাড়া দিয়ে 
বিশ্বজনীন মজ্গলকর্মে আত্ম-নিয়োগ করায়। সেখানেই তাব মুতি, 
সেখানেই তার সার্থকতা । যেদিন মানুষ ৩। পারে সেদিন তার 
জীবনে “বড়ে।-দিন' আসে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “সকল স্থার্থের, 
সকল অহঙ্কারের অতীত সেই আমার বড়ো-আমিকে সকলের চেয়ে 
বড়ো-আমির মধ্যে ধরে দেখবার দিনই হচ্ছে অ।মাদের বড়ো! দিন ।*১৮ 

এখন এই 'ছে!টো-আমিকে “বড়ো আমি'র মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে 
নিজের আত্মাকে “মহা-আমি'র সহিত যুক্ত করে নিজেকে সার্থক করবার 
কৌশলট। কি ? রবীন্দ্রনাথ বলেন, তা হল, নিজের “ছোট-আমি'কে 
ঘিরে যে ক্ষুদ্র বাসনাগুলি আছে তাদের বিস্তার করে দিতে হবে। 


১৭. শাশ্তিনিকেতন ॥ বৈরাগ্য 
১৮, শাস্তিনিকেতন। জাগরণ 


২১৪ 


অর্থাৎ বিশ্বজনীন কল্যাণ কামনাই নিজের ব্যক্তিগত কামনার স্থান 
নেবে। সকলের কল্যাণ যদি নিজের কল্যাণের মতে। প্রিয় হয়ে ওঠে, 
তা হলে আমার বাক্তিগত স্ার্থপ্রণোদিত কর্ণ বলে কিছু থাকবে না। 
ত1 বিস্তারলাভ করে বিলয় প্রাপ্ত হবে। তখন মানুষের মন স্বার্থ 
প্রণোদিত বাসন] হতে মুক্ত হয়ে বিশ্বজনীন কর্মে আত্মনিয়োগ করে 
সার্থক ছবে। তাকেই তিনি বলেছেন “বিশ্বতালে নাচা" এবং “বিপুল 
প্রাণে বাচা ।” তার প্রাসঙ্গিক বচনটি এই-_ 
রত্তু আমার বিশ্বতলে নাচবে যে, 
হাদয় আমার বিপুল প্রাণে বাচবে যে, 
কাপবে তোমার আলে। বীণার তারে সে, 
তুলবে তোমার তারামণির হারে সে, 
বাসন। তার ছড়িয়ে গিয়ে লয় হবে ।১৯ 
এই চিন্তা থেকে রবীন্দ্রনাথের মনে জ্ঞান-প্রেম-কর্ম-আনন্দের 
আদর্শ গড়ে উঠেছিল । নিজের স্বার্থবোধ প্রণোদিত বাঁসনাকে ত্যাগ 
করে সাধারণ মানুষ তে। স্থুখ পায় না; তার পক্ষে এইভাবে আত্মত্যাগ 
করাও কষ্টকর হয়। কারণ, সবার চেয়ে নিজেকেই সে ভালোবাসে । 
রবীন্দ্রনাথ বলেন আত্মত্যাগ সম্ভব হয় যদি আমাদের প্রীতির 
ক্ষেত্রের বিস্তার ঘটাই। যাকে প্রীতি করি তার জছ্য স্বার্থত্যাগ করতে 
কষ্ট হয় না, বরং ভালো লাগে। মা সন্তানের জন্ক কত পরিশ্রম 
স্বীকার করেন, কিন্তু তাতে কষ্টবোধ হয় না; কারণ, সন্তানকে 
পরম আত্মীয় জ্ঞান করেন। ম্ৃতরাং এ আত্মত্যাগে কষ্ট নেই, 
আনন্দ আছে। এ হতে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে পড়ে। 
আত্মীয়তাজ্ঞান প্রীতির উদ্রেক করবার সামর্থ্য রাখে। 
স্থতরাং দেখ। যায় প্রীতি এবং কল্যাণকর্মের মধ্যে একটা পরস্পর 
সংযোগ আছে; একটি অপরের সহায়তা করে। তাই রবীন্দ্রনাথ 


৯৪৯, গণতালি, ৭১ 


১৫ 


বলেন বুদ্ধিবৃততি, হাদয়বৃত্তি এবং কর্ণবৃত্তি পরস্পর লহায়ক। বুদ্ধিবৃত্তির 
সাহায্যে ঘদি সকল মানুষের সহিত একটি একাত্বতাবোধ মনে পরিস্ফুট 
হয়, ত! হলে বিশ্বের মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ সথারিত হবে, 
আমাদের প্রীতিব ক্ষেত্র বিস্তার লাভ করবে। ফলে বিশ্বজনীন কর্মে 
আত্মনিয়োগের ইচ্ছা আপনি আসবে। তাতে কষ্টবোধ তো থাকবেই না, 
বরং আনন্দ আসবে । স্থতরাং পাই অখগুবোধ হতে গ্রীতি, প্রীতি হতে 
বিশ্বজনীন কর্মে আকর্ষণ এবং সেই কর্ম সাধনে আনন্দ। এই হল 
সংক্ষেপে জ্ঞান-প্রেম-কর্ম-আানন্দ তত্ব । এখন রবীন্দ্রনাথ কিভাবে তার 
প্রতিপান্ভট স্থাপন কবেছেন তার একটি সংক্ষিপ্ত পৰিচয় দেওয়া হবে। 

তিনি বলেন, মান্ুষেব নিজের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রেখে তৃপ্তি 
নেই। বিশ্বেব মধ্যে নিজেকে নানাভাবে ছড়িয়ে দেবার তার একটি 
স্বাভাবিক আকৃতি আছে। সেই জন্তই জে তার তিনটি মূল বৃত্তিব 
সাহাব্যে নানাভাবে বিশ্বের সহিত সংযোগ স্থাপনে উৎস্থক হয়। তার 
নিজস্ব মন্তব্য এই__ 

“আমাদের যথার্থ তাৎপর্ধ আমাদের নিজেদের মধ্যে নেই, তা 
জগতে সমস্ভের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে । সেই জন্ত আমবা বুদ্ধি দিয়ে, 
হনয় দিয়ে ও কর্ম দিয়ে কেবলই সমস্তকে খু'জছি, কেবলই সমন্ডতের 
সঙ্গে যুক্ত হতে চাচ্ছি; নইলে যে নিজেকে পাইনে। আত্মাকে সর্বত্র 
উপলব্ধি করব, এই হচ্ছে মাত্মার একমাত্র আকা ।৭ « 

তার এই প্রতিপান্ধের সমর্থনে তিনি কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন 
করেছেন । তিনি বলেন, নিজেকে ব্যাপক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেবার 
জন্যই মানুষ নানা! গোষ্ঠী স্থাপন করেছে। এ ইচ্ছা হতেই পরিবার 
গড়ে উঠেছে, সমাজ গড়ে উঠেছে, রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। এট গোষ্ঠীগুলি 
বৃহৎ হতে বৃহত্তর ক্ষেত্রে ক্রমশ মানুষকে প্রীতির মধ্য দিয়ে, কর্মের মধ্য 
দিয়ে, সেবার মধ্য দিয়ে নিজেকে ছড়িয়ে দেবার স্থযোগ নেয়। তার 


২০, শাস্তিনিকেতন। দিন 
২১৩ 


ভাঙ্গায় £ 'এই কারণেই যানবাত্ম বনু প্রাচীন যুগ হর্ডে গৃহ বল, সদাঞ্জ 
বল, রাজ্য বল, বা-কিছু স্ষ্টি করেছে, তার ভিতরকার একটিমাত্র মূল 
তাৎপর্ধ এই থে মানুষ একাকিত্ব পরিহার করে বন্ছর মধ্যে, বিচিত্রের 
মধ্যে আপনার নান। শঙ্জিকে নানা সম্বন্ধে বিভৃত করে দিয়ে নিজেকে 
বৃহ ক্ষেত্রে উপলব্ধি করবে--এই তার যথার্থ সুখ ।২১ 

মানুষের এই ম্বাভাবিক আকৃতিকে ভিত্তি করেই রবীন্দ্রনাথ তার 
জান-প্রেম-কর্ম-আনন্দ তন গড়ে তুলেছেন । স্ৃতরাং মানবজীবনের 
সার্থকতা, ক্ষুত্র অহংবোধ প্রণোদিত হয়ে কেবল নিজের স্বার্থ সংরক্ষণের 
কাজে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে বুদ্ধিবৃত্ধি, হাদয়বৃত্তি ও কর্মবৃত্তির 
প্রয়োগের মধ্য দিয়ে বাহিরের জগতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করায়। 
বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে নিজের সহিত বিশ্বের মানুষের সঙ্গে একাত্মতাবোধ 
উপলব্ধি করা তার প্রথম সোপান । তা হতেই অন্যের প্রতি 
প্রীতির সঞ্চার হৰে এবং সেই শ্রীতির ভিত্তিতে যে মমন্ববোধ সঙ্জাত 
“হবে তা সর্বজনীন কল্যাণকর্মে শুধু প্রেরণ। দেবে না, ভাকে সহঙ্গসাধ্য 
করে তুলবে । 

এইভাবে জ্ঞান, কর্ম ও প্রেমের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সহিত যোগ 
স্থাপিত হলে শুধু তার স্বাভাবিক ইচ্ছ। চরিতার্থ হয় না,একটি অতিরিক্ত 
লাভ এসে পড়ে । সর্বজনীন কাজ করে সে আনন্দ অনুভব করে। 
তাতে শুধু ভার সার্থকত৷ নয় আনন্দও আছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন £ 

আমাদের 'দেশের সমাজের সমস্ত ক্ষুত্রত৷ বিচ্ছিন্নত! দূর করে জ্ঞানে, 
প্রেমে ও কর্মে ভূমার প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে মানবাত্মা কখনোই 
বলিষ্ঠ ও আনন্দিত হতে পারে না ।৭ ৭ 

এখন প্রশ্ন ওঠে পরার্থে আত্মনিয়োগ করলে নিজের স্বার্থকে 
অবহেল। করা হয়। তাতে আনন্দ আসবে কি করে? রবীশ্রনাথ 
তায় উত্তরে বলেছেন, এমনটি ঘটে, তার কারণ সেব্য ও সেবকের মধ্যে 

২১, শাশ্তিনকেতন। 'দিন 

২২, শাম্তানফেতন। দিন 

২১৭ 
উপাঁনষ্-১৪ 


একটি গ্রীতির সম্বন্ধ গড়ে ওঠে বলে । মা সন্তানের সেবা করে আনা 
পায়, প্রেমিক প্রেমাম্পদের জন্য ত্যাগ শ্বীকার করে আনন্দ পায়, তার 
কারণ এখানে পরম্পরের মধ গ্রীতির সঞ্চার হেতু ঘনিষ্ঠ মমত্ববোধ 
গড়ে উঠেছে । গ্রীতি আছে বলেই স্বার্থত্যাগে আনন্গা আছে। তার 
-প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই £ 

“ম্েছ, প্রেম, দয়া, দাক্ষিণ্য আমাদের পরস্পরের যোগকে 
স্বেচ্ছাকৃত, আনন্দময় অর্থাৎ জ্ঞান ও প্রেমময় যোগরূপে জাগিয়ে 
তুলছে। আমর! দায়ে পড়ে নয়, আনন্দের সঙ্গে স্বার্থ বিসর্জন 
করছি। মা ইচ্ছ। করেই সন্তানের সেবা করছে, মানুষ অন্কভাবে নয়, 
সঙ্ঞানে প্রেমের দ্বারাই সমাজের হিত করেছে ।ও 

স্তরাং এই আদর্শে কার্ধকারণ লম্বন্ধে গ্রথিত কয়েকটি জিনিস 
পাই। বিশ্বের সহিত অখগ্ডতাবোধ হতে সকলের প্রতি গ্রীতি আসে। 
প্রীতির স্থশর হলে স্বার্থকে উপেক্ষা করে পরের কল্যাণসাধনে 
উৎসাহ আসে। এই প্রকৃতির সধজনীন কল্যাণকর্মে আত্মপ্রয়োগে 
কষ্টবোধ থাকে না, বরং আনন্দবোধ জাগে। সুতরাং জ্ঞান, কর্ম ও 
প্রেমের সংযুক্ত সাধনাই আনন্দলোকে উত্তরণের পথ। নিজেকে 
্বার্থের গপ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখার জন্তাই স্ুখ-হুঃখ বোধ। তার 
বাইরে এসে নিজেকে সর্বজনীন কল্্যাণকর্মে ছড়িয়ে দিতে পারলে 
আমরা আনন্দ-আন্বাদনের অধিকারী হই। তাই তিনি বলেন, 
দসমগ্রতার মধ্যেই এত আনন্দ ; বিচ্ছিষ্নতার মধ্যেই ছুখে দুর্বলতা! 1 ২৪ 

দ্বিতীয় যে চিন্তাটি রবীন্দ্রনাথকে মানবিকতার আদর্শে আকৃষ্ট 
করেছিল তার জন্ম হয়েছিল তার সাধনজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। 
আমর! দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচন! করেছি যে জানের পথে তিনি 
প্রকৃতির মধ্যে এক প্ররচ্ছন্প সত্তার উপস্থিতি করেছিলেন। 
সেখানে তিনি তাকে জেনেছিলেন, একাস্ত আপন করে, ব্যকিগত 


২০, শাস্তিনিকেতন। দিন 
২৪, শান্তিনিকেতন । সমগ্র এক 


৯৮ 


ঈর্বন্ধের মধ্য দিয়ে পান নি। ভাই সাধনজীবনৈ এল জীবনদেবতা- 
তত্ব। সেখানে গ্রীতির সম্বন্ধে প্রচুর আনন্দ তিনি পেলেন? কিন্তু 
একটা অভাব রয়ে গেল। জীবনদেবতা হাদয়বৃত্ধিকে তৃপ্তি দেন, কিন্ত 
ধর্মসাধনায় কর্মবৃত্তিকে প্রয়োগের স্থুযোগ দেন না; কারণ তার তে! 
কোনে পৃথক সন্ত! নেই, তিনি 'অরূপরতন” | অথচ যাকে ভালোবাসি, 
প্রীতি করি তাকে সেবা করতেও ইচ্ছা করে। 

এই অভিজ্ঞতা থেকে ভার ধারণ। হয়েছিল, আদর্শ ধর্ম হবে তাই 
য! মানুষের তিনটি মূলবৃত্তিকে প্রয়োগ করবার যুগপৎ স্থযোগ এনে 
দেবে। বুদ্ধিবৃত্তি, হৃদয়বৃত্তি ও কর্মবৃত্তি দিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে যে 
মিলন সম্ভব তাই আদর্শ মিলন। সেই কারণে তিনি এই সিদ্ধান্তে 
উপনীত হুলেন যে ঈশ্বরের সঙ্গে সেবার সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে 
তার কোনে মূর্ত প্রকাশকে সেবার পাত্ররূপে গ্রহণ করতে হবে। 

এখন প্রশ্ন ওঠে, তার কোন প্রকাশকে সেবার পাত্ররূপে নির্বাচন 
কর! হবে। বিশ্বসত্তার মূর্ত প্রকাশ ছুই রূপে । এক জড়রূপে- যেমন 
জল, স্থল, গ্রহ, নক্ষত্র । আর এক জীবরূপে-_-যেমন ইতর প্রাণী ও 
মান্ুষ। যা জড় তার সঙ্গে আমাদের সেবার সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে 
না। কারণ--“জল, স্থল, আকাশ, গ্রহ-নক্ষত্রের সহিত আমাদের 
হৃদয়ের আদান-প্রদান চলে না, তাহাদের সহিত আমাদের মঙ্গলকর্মের 
সম্বন্ধ নাই ।'২* 

সুতরাং বাকি থাকে জীব। কিন্তু সকল জীবের সঙ্গে ত গ্রীতি 
আদান-প্রদানের সম্পর্ক পরিপূর্ণভাবে গড়ে তোল। যায় না। তা যায় 
কেবল মাচুষের সঙ্জে। তাই রবীন্দ্রনাথ এই সিদ্ধান্ত করলেন যে 
মানুষের নিকট বিশ্বসন্তার সব থেকে ঘনিষ্ঠ প্রকাশ মানুষরূপে। 
সুতরাং মানুষের মধ্য দিয়ে জ্ঞান, গ্রীতি ও সেবায় ঈশ্বরের সঙ্গে 
সংযোগ স্থাপন করতে হবে। 


২৫, ধর্ম। ধর্মগ্রচার 
২১৯ 


ার এই প্রতিপাটি সহজ করে বোঝাবারজন্ত ভিনি একটি ডপম। 
প্রয়োগ করেছেন। নারীর জঙ্গে সন্তানের মাতৃসত্থদ্ধের সহিত ঈশ্বরের 
তক্ষের নিকট মানবরপে প্রকাশের তুলন1 করেছেন । কোন বিশেষ 
নারীর নানারপে প্রকাশ থাকে ; কোথাও তিনি কন্তা, কোথাও পদ্বী, 
কোথাও মা। তার সন্তানের নিকট যে প্রকাশ ঘনিষ্ঠ এবং প্রত্যক্ষ 
ত। হল মাতৃরূপে; অন্ত প্রকাশ তার কাছে অর্থহীন। সেইকপ 
ঈশ্বরের প্রকাশ নানাভাবে । জুড়ে তীর প্রকাশ আছে, ভক্তের হাদয়ে 
জীবনদেবতারপে তার প্রকাশ আছে, নান! জীবরূপে তার প্রকাশ 
আছে। কিন্ত মানুষের নিকট যে-প্রকাশ ঘনিষ্ঠ এবং তাৎপর্যপূর্ণ তা 
হল মাতৃরূপে প্রকাশ। সেই জন্থ তার ধারণায় মানুষের মধ্য দিয়ে 
ঈশ্বরকে জান দ্বারা, গ্রীতি বারা, সেবার দ্বারা একসঙ্গে পাওয়া যায়! 
তার যুক্তি তিনি এইভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন 

“মাতা যেমন একমাত্র মাতৃসম্বন্ধেই শিশুর সর্বাপেক্ষা নিকট, 
সর্বাপেক্ষ। প্রত্যক্ষ, সংসারের সহিত তাহার অন্যান্থ বিচিত্র সম্বন্ধ শিশুর 
নিকট অগোচর এবং অব্যবহার্ষ, তেমনি ত্রন্ম মানুষের নিকট একমাত্র 
মনুষ্যত্বের মধ্যেই সর্বাপেক্ষা সত্যরূপে, প্রত্যক্ষরূপে বিরাজমান--.এই 
সন্নন্ধের মধ্য দিয়াই আমরা তাহাকে জানি, তাহাকে গ্রীতি করি, 
তাহার কর্ম করি ।+২৬ 

মান্ুবরূপে ঈশ্বরের যে প্রকাশ তাকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরের সঙ্গে 
সংযোগ রবীন্দ্রনাথের ধারণার পরিপুর্ণতম হয়, কারণ তার মধ্যে দিয়ে 
একসঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তি, হৃদয়বৃত্তি ও কমবৃত্তির যুগপৎ প্রয়োগ সম্ভব হুয়। 
ফলে সবগুলি বৃত্তির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকে ঘনিষ্ঠরপে পায় যায়। সেটা 
সম্ভব হয় এইভাবে £ প্রথমত, বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যেই এই উপলব্ধি সম্ভব 
ষে মানুষের নিকট ব্রদ্ষের ঘনিষ্ঠতম প্রকাশ প। এইভাবে 
বুদ্ধিবন্তির প্রয়োগ এসে পড়ে। দ্বিতীয়ত, মানু গ বাতাস, 


হ৬. ধর্ম । ধর্প্রচার 
বত 


জলের মতে জড় বন্ত নয়; সে হাদয়বৃত্তি-বিশিষ্ট জীব। কাজেই তার 
সঙ্গে হাদয়বৃত্তির আদান-প্রদান সম্ভব । এইভাবে যখন মানুষকে 
একাস্ত আপনজন জ্ঞানে গ্রীতি করি, তখন হাদয়বৃত্তির প্রয়োগ সম্ভব 
হয়। তৃতীয়ত, মান্ুবরূপেই তাকে বিশ্বজনীন কর্মের মধ্য দিয়ে সেব! 
করবার স্থুযোগ মেলে, অন্যভাবে মেলে না। এখানে কর্মবৃত্তির 
প্রয়োগের ক্ষেত্র মিলে যায়। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ঈশ্বরকে 
পরিপূর্ণরপে সকল মৌলিক বৃত্তি দিয়ে পাওয়া যায় মানুষের মধ্য 
দিয়েই । তীর প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এই ঃ 

'আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি, কর্মবৃত্তি, আমাদের সমস্ত শক্তি সমগ্রভাবে 
প্রকাশ করিলে, তবে আমাদের পক্ষে আমাদের অধিকার যথাসম্ভব 
সম্পুর্ণ হয়। এই অন্ত ব্রচ্মের অধিকারকে বুদ্ধি, গ্রীতি ও কর্মদ্ারা 
আমাদের পক্ষে সম্পূর্ণ করিবার ক্ষেত্র মন্গুযাত্ব ছাড়া আর 
কোথাও নাই ।২? 

এই উপলব্ধির ফলে যেন সাধনজীবনে রবীক্নাথের জীবনদেবত- 
তত্বের প্রতি আকর্ষণ শিথিল হয়ে গিয়েছিল। জীবনদেবতার সঙ্গে 
মিলন হুজনের সঙ্গে মিলন, তাতে হাদয়বৃত্তির তৃপ্তি আছে প্রচুর, কিন্ত 
সেবাবৃত্তির প্রয়োগের স্থযোগ নেই, কারণ তিনি অরূপ সম্ব!। 
ধর্মসাধনায় কর্মের কল্যাণরূপ বিশ্বমানবের কল্যাণে আত্মনিয়োগ 
করলেই পরিস্ফুট হয়, সীমার মাঝে অসীমের মিলনে হয় না। তাই 
দেখি সাধন-জীবনে এক সময় একাকী বসে ব! বিজনে বসে ঈশ্বরের 
ধ্যানের প্রতি তার আকর্ষণ কমে গেল, মনের মন্দিরে জীবনদেবতার 
সঙ্গে মিলনের আকাজ্ষাও শিথিল হয়ে গেল। পরিবর্তে তিনি 
চাইলেন বিশ্ব-মানবের মধ্যে তার যে প্রকাশ সেইখানেই তার সঙ্গে 
মিলতে । আমাদের প্রতিপান্ভের সমর্থনে এই কাব্যাংশটি স্থাপন 
কর। হল : 


৭৫. ধর্ম। ধর্ম প্রচার 
২১ 


বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিহারো 
সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারে! । 
নয়কে। বনে, নয় বিজনে, 
নয়কো আমার আপন মনে, 
সবার যেখায় আপন তুমি হে প্রিয়, 
সেথায় আপন আমারো ।২৮ 
এখন প্রশ্ন ওঠে, বিশ্বমানবের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সহিত মিলন কি 
ভাবে সংঘঠিত হবে। তার ধারণায় সেটা সম্ভব হবে কর্মবৃত্তির 
প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। বিশ্বের মানুষকে ঈশ্বরের ঘনিষ্ঠতম প্রকাশ- 
রূপে উপলব্ধি করতে হবে, তাদের সঙ্গে প্রীতির সম্বন্ধ স্থাপন করতে 
হবে এবং বিশ্বজনীন কল্যাণকর্মে আত্মনিয়োগ করে বিশ্বমানবের 
সেবা করতে হবে। তিনি এই প্রসঙ্গে উপদিষদে ব্যবহৃত একটি শব 
প্রয়োগ করে বলেছেন, ভক্তকে “বিশ্বকর্মা হতে হবে। তার ধারণায়, 
যে কেবল ব্যক্তিবিশেষের কল্যাণসাধন না করে সাধারণভাবে , 
মানুষের কল্যাণসাধন করবে সেই বিশ্বকর্মা হবে। অর্থাৎ য| 
বিশ্বজনীন কল্যাণ আনে তা করাই হল বিশ্বকর্মা হওয়া ॥ যে কাজ 
সাধারণের কল্যণি আনে তা৷ সামান্য হলেও বিশ্বজনীন । এমন কাজই 
বিশ্বকর্মার আদর্শকে রূপায়িত করে : কারণ তিনি বিশ্বের মানুষের জন্য 
কাজ করেন।২৯ 
সুতরাং দেখা যায়, এই চিস্তার সুত্র ধরে রবীন্দ্রনাথ একই সিদ্ধান্তে 
উপনীত হয়ে তার মানবিকতাতত্ স্থাপন করেছেন। সংসারে থেকেই 
মুক্তিসাধনার অন্বেষণে তিনি জ্ঞান-গ্রীতি-কর্ম-আনন্দ তন্ককে পেয়েছেন। 


২৮ গাীতাঞজালি। ৯৮ | 

২৯, 4১11 901 0026 68 20০00, 1800/65৮61 ৪2811 0) ৫6৮ 0 8047 
56188] 10 01)31:80167. 3301) ০৫ 081065 101 156113881008 
0 & 715/0/2/18) 0১০ ড০1-9০0167 আ1১০ 010 0 9]]. 
2918107০724) 9081659] (08019, 


খ্খ২ 


অপরদিকে ধর্মসাধনার ক্ষেত্রে ঈশ্বরকে সব কটিবৃত্তি দিয়ে পরিগর্ণরূপে 
পাবার চেষ্টা হতে তিনি বিশ্ব-সাথে যোগের তত্ব ব। বিশ্বকর্মাতত্ধ স্থাপন 
করেছেন। মুলত উভয়ে একই তব। ত! বলে ঈশ্বরকে আবিার 
করতে হবে বিশ্বমানবের মাঝে, তাকে শ্রীতি করতে হবে মানুষকে 
শ্্রীতি করে এবং তাকে সেবা করতে হবে মানুষের সেবা করে। ঈশ্বর 
জ্ঞানে বিশ্বমানবের সেবা, বিশ্বমানবের কল্যাণে আত্মনিয়োগই শ্রেষ্ঠ 
ধর্ম। নুতরাং রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তার পরিণত রূপে মানবিকতাকে 
পাই। 


তিন 
উভয় চঞ্তার তুলনা 


মানবিকত। সম্বন্ধে উপনিষদের ও রবীন্দ্রনাথের চিন্তার যে বর্ণনা দেওয়। 
হয়েছে তা৷ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে পড়ে যে উভয় চিন্তার মধ্যে ঘনিষ্ঠ 
সাদৃশ্ত আছে। সে-সাদৃণ্ত কতখানি গভীর তা ভালে! করে বোববার 
জন্য একটি তুলনামূলক আলোচনা কর! যেতে পারে। মানবিকতা 
সম্বন্ধে এই ছুই চিন্তার অন্তভুক্ত যে বিষয়গুলি আছে তাদের পৃথক 
করে নিয়ে প্রত্যেকটি সম্বন্ধে পথক আলোচন! করলে এ বিষয় 
আমাদের ধারণা আরও স্বচ্ছ হয়ে উঠবে । 
মানবিকত। সম্পর্ষিত মূল চিস্তাুলি হল এই £ 
(ক) ঙ্স্যাসবাদকে প্রত্যাখ্যান করে কর্মময় জীবনকে বেশি মূল্য 
দান; 
(খ) অখগুতাবোধের প্রয়োজনীয়ত।; 
গে) অথগজ্ঞান থেকে অন্য মানুষের প্রতি প্রীতি সঞ্চার ; 
(ঘ) প্রীতি হতে অন্তের কল্যাণকর্মে আকর্ষণ; 
(ও) আত্মত্যাগে আনন্গবোধ। 
এখন এদের প্রত্যেকটি সম্বন্ধে আমর পৃথক তুলনামূলক 
আলোচন। করব। 
২২৩ 


(ক) প্রথমে সঙ্স্যাসবাদকে গ্রহণ না করে কর্ময় সংসারজীবনের 
কথ! ধর! ধাক। এই আলোচন! রবীজ্রনাথের একটি কবিতার অংশ 
উদ্ধৃত করে আরভ্ভ হতে পারে। পূর্বের অনুচ্ছেদে তার উল্লেখ 
হয়েছে। তবু বর্তমান প্রসঙ্গে তার একটু বিস্তাপ্িত উদ্যৃতির 
প্রয়োজন হয়ে পড়েছে £ 

মুক্তি? ওরে, মুক্তি কোথায় পাবি, 
মুক্তি কোথায় আছে। 
আপনি প্রভু স্প্টিবাধন পরে 
বাঁধা সবার কাছে। 
রাখে! রে ধ্যান, থাক রে ফুলের ডালি, 
ছি'ড়,ক বস্ত্র, লাগুক ধূলা-বালি, 
কর্ণযোগে ভার সাথে এক হয়ে 
ঘর্ম পড়,ক ঝরে ।** 

ব্তব্য হল, বিশ্বসন্তা নিজেই কর্মের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে 
রেখেছেন, কর্ম করেই তিনি মুক্তি খু'ঁজছেন। সুতরাং মান্ুষেরও কাকে 
অন্থুসরণ করতে হবে, সংসার থেকে পলাতক হলে চঙগবে না, সংসারে 
থেকে কর্মময় জীবন যাপন করতে হবে। 

আমর! দেখব উপনিষদে উভয় ধরনের চিন্তাই আছে। স্থপতি 
কর্মে যে ব্রহ্ম নিত্য লিপ্ত আছেন, তাই যে তাকে বিশ্বে আত্মপ্রকাশে 
আকর্ষণ করে, সে-কথা সেখানে স্পষ্ট করে বল! হয়েছে । একটি 
শ্লোক বলছে, “তিনি বিশ্বকৃং তিনি এই সবকিছুর অষ্টা, বিশ্ব তারই 
এবং তিনিই বিশ্ব ।৩১ আর একটি বচন আছে, “এই মহাত্মা দেবতা 
বিশ্বকর্ম! এবং সর্ধদ। বিভিন্ন ব্যক্তির হৃদয়ে অধিষ্ঠিত আর্চুছন।”*২ 

৩০. গীতাঞ্জলি ।১১৯ 
৩১. স ঝ্বিকৎ সহ সর্বস্য কতাঁ তস্য লোকাঃ স উ লোক এব। 
স্প্রঠ্দারণাক 86888১৩ 


৩২ এব দেষো 'বিদ্বকর্মা মহাত্মা গদা জনানাং হয়ে সাঁধাবদ্টঃ। 
--দ্যৈতাখ্বতর 198৭ 


৪ 


উত্তয়ের অর্থই এক। অঙ্গ সব সময় স্ষ্টিকর্ষে নিজেকে বাত 
রেখেছেন। ভিনি বিশ্বকে শ্তি করেছেন বলে বিশ্বকৎ এবং বিশ্বকে 
সংরক্ষণ করবার জন্ফ নিয়ত কাজ করে যান বলে তিনি বিশ্বকর্ম।। 
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে বিশ্বকর্মণ শবটি রবীন্রনাথের 
বিশেষ ভালে। লেগেছিল । তাই মানুষকে কমযোশী হতে উপদেশ 
দিতে গিয়ে তিনি তাকে *বিশ্বকর্ম' হবার উপদেশ দিয়েছেন । বিষয়টি 
ইতিপূর্বে উল্লেখ কর! হয়েছে । 

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ভার অনুসরণে মানুষকে কর্মময় জীবনযাপন 
করতে হবে। একেই তিনি বলেছেন কর্ম যোগে বিশ্বসভার 'সঙ্গে 
মিলিত হওয়া! । জঙ্ন্যাসগ্রহণ না৷ করে কর্মময় জীবনগ্রহপের আদর্শ 
যে উপনিষদে গৃহীত হয়েছিল সে বিষয় প্রথম অনুচ্ছেদে বিস্তারিত 
আলোচনা হয়েছে। এখানে শুধু উদাহরণম্বরূপ ঈশ উপনিষদের 
সেই বচনটির আর একবার উল্লেখ করলেই যথেষ্ট হবে : 'কুর্বপ্পেবেহ 
কর্মাণি জিজীবিষেং শতং সমাঃ। এই সংসারেই কর্মরত অবস্থায় 
থেকে শত বৎসর আয়ু কামন। করতে হয়। 

(খ) পরের কথ হচ্ছে, বিশ্ববোধের প্রয়োজনীয়ত1 ৷ বিশ্বসতী! যে 
সবাইকে নিয়ে সবার মধ্যে ছড়িয়ে আছেন এ উপলব্ধি উপনিষদের 
চিন্তার মূলকথ।। ছান্দোগ্য উপনিষদ বলছেন £ “এই সব কিছুই ব্রচ্ম, 
ব্রঙ্মেই তাদের উৎপত্তি, পরিপোষণ এবং লয় ।” ৩৩ রবীন্দ্রনাথ নিজে 
এ-বিষয়ে বিশেষভাবে অবহিত ছিলেন । এই প্রসঙ্গে রবীন্রনাথের 
নজর মন্তব্যটি লক্ষ্য কর। যেতে পারে £ 

পরমাত্মার যোগে সকলের সঙ্গেই যোগ উপলব্ধি করা, সকলের 

মধ্যেই প্রবেশ লাভ করা, এইটেকেই ভারতবর্ষ মনুষ্যত্বের চরম 
সার্থকতা বলে গণ্য করেছিলেন 1৪ 

এই প্রসঙ্গে তিনি একটি কথ। উত্থাপন করেছেন যা বর্তমান 


৩৩. ছাল্জোগ্য ॥৩7১৪৪১ 
৩৪. শাস্তিনিকেতন। বিশ্ববোধ 


১১৬ 


আলোচনায় বিশেষ তাৎপধপুর্ণ হয়ে, পড়ে। কথাটি উপঘিষদের 
একটি শ্রসিদ্ধ বাদী থেকে তার মনে জেগেক্ছিল। বাগীটির . বাংল! 
অনুবাদ এই দাড়ায় £ 

কে (ত্রহ্গকে ) পেয়ে খধিগণ জ্ঞানতৃপ্ধ ও কৃতার্থ হয়ে 
বাসনাযুক্ত হন এবং প্রশাস্ত হন। সেই বীরগণ সেই সর্বগতকে 
(স্রক্ষকে ) সর্বত্র পেয়ে ব্রদ্মের সহিত যুক্ত হয়ে সকলের মধ্যেই প্রবেশ 
করেন ঃ ৫ 

এই বচনটির তাৎপর্য খুব গভীর । ত৷ বলে জ্ঞানের পথে ব্রঙ্গের 
সর্বব্যাপিত। উপলদ্ধি করে এই ক্রহ্গজ্ঞানী খবিদের মনে যে অখগ্ুতা 
বোধের উদয় হয়, তা তাদের মনকে একটি ব্যাপক্তর মহত্তর জীবনের 
জঙগ প্রস্তুত করে তোলে । তার! স্বার্থপ্রণোদিত বাসনা হতে মুক্ত হন 
এবং পর্বত্র ব্রচ্গের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি অন্থুভব করেন। 

তাই রবীন্দ্রনাথের ধারণায় এই বিশ্ববোধ প্রন্ফুটিত হলে মানুষ 
যুক্তাত্মা? হয়, অর্থাৎ ব্রন্ষের সর্তত্র অবস্থিতি অনুভব করে। তা তিনি 
যাকে “বিশ্ব সাথে য়োগের' জীবন বলেছেন, সেই জীবনের উপযুক্ত 
করে মানুষকে গড়ে তোলে । সুতরাং জ্ঞান-প্রেম-কর্ম-আনন্দের 
সাধনায় এই বিশ্ববোধ একটি প্রস্ততিপর্ব। ত৷ মানুষকে বিশ্বমানবকে 
প্রতি করতে এবং সর্বজনীন কর্ণ করতে প্রম্তত করে তোলে । তাই 
তিনি বলেছেন, 'সেই সকল ধীর, সেই সকল যুক্তাত্বাদের প্রণাম করে 
তাদেরই পথ আমর। অনুসরণ করব। সেই হচ্ছে একের সঙ্গে যোগের 
পথ, সেই হচ্ছে সকলের মধ্যেই প্রবেশের পথ, জ্ঞান, প্রেম এবং কর্মের 
চরম পরিতৃপ্তির পথ । ৩৬ 

সুতরাং দেখা যায় বিশ্ববোধের প্রয়োজনীয়ত। সম্বন্ধে রর্বাজ্্রনাথ যে 


৩৫. সমপ্রাপোনং খবয়ো জানতৃণাঃ কৃতাত্মানো ঘাঁতরাগাঃ প্রশাস্তাহ । তে 
দর্বগং সর্বতঃ প্রাপ্য ধারা হৃক্তাত্মানো সর্বমেবাবিশদ্তি ॥ 


সস্মহৃডক ৪৩২৫ 
৩৬. শাশ্তিমিকেতন। ধারহহাতা 
১৫১০ 


চিন্তা রেখে গেছেন তা স্পষ্টতই উপনিষদের বাদী থেকে লব্ধ । এর 
প্রেরণ! উপনিষদই। এখানে রবীশ্রনাথ উপনিষদের চিন্তা সম্পূর্ণভাবে 
অনুসরণ করেছেন এবং সে-কথা উপরে উদ্ধৃত বচনে স্বীকারও ' 
করেছেন। 

(গ) তার পরের কথা হল, অখগুজ্ঞান ব1 বিশ্ববোধ থেকে 
মানুষের প্রতি প্রীতি সঞ্চারিত হয় ॥ এবিষয়েও উভয় চিন্তা একই পথ 
ধরে চলেছে। এই প্রসঙ্গে একটু আগে উপনিষদের যে বাণীটি আমরা 
উল্লেখ করেছি ভার আর একবার উল্লেখ করা ঘেতে পারে । তাতে 
বল। হয়েছে জ্ঞানত্ৃপ্ত হয়ে খধিগণ ত্রহ্মের সহিত একত্ব উপলব্ধি করে 
সকলের মধ্যে প্রবেশ করেন 'ধুক্তাত্মানঃ সর্বমেবাবিশস্তি ।' তার অর্থ 
এই ফাড়ায় যে সকলের সহিত একত্ব অনুভব করে সকলের সহিত 
প্রীতির সম্পর্ক অনুভব করেন। রবীন্দ্রনাথ সেই অর্থেই তাকে 
গ্রহণ করেছেন । এ-বিষয় আরও স্পষ্ট ঘোষণ। রবীন্দ্রনাথের নিজের 
বচনে পাই। এই প্রসঙ্গে তার নিচে উদ্ধৃত উক্তিটি লক্ষ্য করা 
যেতে পারে £ 

“এই যে বৃহৎ আমি, সামাজিক আমি, স্বাদেশিক আমি, মানবিক 
আমি, এর প্রেমের জোর এত যে এই চৈতগ্ঠ যাকে যথার্থভাবে 
অধিকার করে সে এই বৃহতের প্রেমে নিজের ক্ষুদ্র-আমির সুখ-হুঃখ, 
জীবন-মৃত্যু সমস্ত অকাতরে তুচ্ছ করে।” *" 

(ঘ) তার পরের কথা হল, প্রীতি থেকে কল্যাণকর্ষে আকর্ষণ 
আসে। যে আমার অত্যন্ত আপনজন, তার কল্যাণ আমার নিজের 
কল্যাণেরই সামিল হয়ে গেছে। সুতরাং অন্তের কল্যাণ সাধনের 
প্রতি আকর্ষণ সহজ হয়ে ওঠে । ঈশ উপনিষদে যে ত্যাগের সহিত 
ভোগ করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, তার প্রেরণা হল সমগ্র বিশ্বের 
সহিত একত্ববোধ, কারণ একই মহান জন্তা সকলের মধ্যেই 
বিরাজমান, “ঈশাবান্তমিদং সর্যম্‌।* 

৩৭ শাস্তিনিকেতন। সমগ্র এক 


২৭ 


রবীজনাখের ধারণা, মনে বিশ্ববোধ জাগ্রত হলে সকলের সঙ্গে 
ভাগ কয়ে ভোগ করবার ইচ্ছা আস! এবং অন্থকে বঞ্চিত করে ভোগ 
করবার ইচ্ছা না৷ আসাই স্বাভাবিক। মনের এক অবস্থায় উপনিষদের 
এই অমুশাসনকে জীবনে প্রতিফলিত করতে পারছেন না বলে তিনি 
ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই বলে £ 
ভাই যে তুমি ভাইয়ের মাঝে, প্রত, 
তাদের পানে তাকাই না যে তবু; 
ভায়ের সাথে ভাগ করে মোর ধন 
তোমার মুঠা কেন ভরি নে।*৮ 
(৪) শেষ কথা হল, বিশ্ববোধ জাগ্রত হঙ্গে সবজনীন কল্যাণকর্ে 
আত্মনিয়োগ করে আনন্দ পাওয়া যায়। পরার্থকে স্বার্থের সহিত 
এক করে নেওয়াকেই উপনিষদে শ্রেয়কে গ্রহণ করার সমস্থানীয় বলে 
উল্লেখ কর! হয়েছে । রবীন্দ্রনাথ যাকে বড়ো-আমির আহ্বান বলেছেন 
এ হুল তাই। কঠ উপনিষদে যম প্রথমে নচিকেতাকে বিশ্বতদ্বের 
জ্ঞানলাভের আকুতি হতে নিরস্তভ করবার জন্ফ অনেক ভোগ-সথুখের 
প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। নচিকেতা ত। প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। 
তাই ধম অত্যন্ত খুশি হয়ে তাকে বলেছিলেন, প্রেয়কে ত্যাগ করে 
তুমি ধীর বিচক্ষণ ব্যক্তির মতো! শ্রেয়কে গ্রহণ করেছ। ভোগ-সখ 
দে তো স্ুবর্ণময় শুঙ্থলম্বরপ। তুমি সেই “বিস্তময়ী শুষ্কা'কে 
প্রত্যাখ্যান করেছ। 
উপনিষদে স্বার্থান্মভাবে ইক্ক্রিযসেবাকে এখানে নিন্দা করা 
হয়েছে; কিন্ত পরকে প্রীতি করে নিংম্বার্থসেবায় যে আনন্দলাভ 
হয় সে-কথ। বলা হয় নি। অবশ উপনিষদের ভাবধারা । এই চিন্তার 
সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে। তাই মনে হয়, এ-চিন্তা খের 
নিজস্ব । 


৩৮. গাতাজাঙ 1৩৭ 
৭৭৮ 


এখন প্রশ্ন ওঠে, এই আনন্দের উৎস কোথা । আপাভদৃষ্টিতে 
মনে হবে তার উৎস শিল্প । যিনি শিল্পরচনা করেন আর ধিনি রসিক 
হিসাবে তাঁর রসগ্রহণ করবার উপযুক্ত সংবেদনশীল মন রাখেন 
উত্তয়েই এই আনন্দের অগ্থিকারী হুন। কিন্তু মনে হয়, আনন্দের 
অধিষ্ঠান আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে। মানুষের যে কটি মূল বৃত্তি আছে 
তাদের সকলকে অবলম্বন করেই আনন্দের উৎসের সন্ধান পাওয়। 
যায়। মানুষের মূল বৃত্তি তিনটি; কৌতৃহল বৃত্তি, অন্ুভূতি-বৃদ্ি 
ও ইচ্ছাবৃত্তি। কৌতৃহল-বৃত্তি দিয়ে আমর! জানি, অন্ুভূতি-ৃত্তি 
দিয়ে প্রীতি করি, ভক্তি করি, ইচ্ছা-বৃন্তি দিয়ে কর্ম করি॥ এই 
তিন পথেই আমর! আনন্দের সন্ধান পাই। কেমন করে পাই 
সেটা সংক্ষেপে দেখাতে চেষ্টা করব। 

কোনও রহস্ক-ভেদ করবার চেষ্টায় হঠাৎ কিছু একট! তথ্যকে 
আবিষ্কার করতে পারলে আমর। আনন্দ পাই । আফিমিডিস যখন চিন্ত। 
করতে করতে হঠাৎ পদার্থ বিশেষের নিজন্ব ভারৎ৯ সম্পর্কে রহস্ত- 
ভেদ করলেন তখন তিনি আনন্দে অধীর হয়ে বলে উঠলেন, 
“ইউরেকা ।* অহৈতুক প্রীতিকে অবলম্বন করেও এই আনন্দের উপলব্ধি 
আসে। এই পথে আনলোর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ পাই ঈশ্বরে অহৈতুক 
ভক্তির মধ্যে । মীরা বা শ্রীরামকৃষ্ণ এই পথের পথিক ছিলেন । কর্মের 
মধ্য দিয়েও এইভাবে আনন্দলাভ করা যায়। স্বার্থপ্রণোদিত হয়ে 
নয়, কেবল পরার্থপরতা৷ বোধ দ্বারা পরিচালিত হয়ে কোনও যহৎ কর্ম 
করলে এই আনন্দবোধ সঞ্চারিত হয় । একটি ভাল কাজ করলে যিনি 
ত৷ করেন তার মধ্যে একটি গভীর তৃপ্তির অনুভূতি আসে। সেই কর্মের 
প্রতিক্রিয়া! হিসাবে যে উল্লাসবোধ আসে তা ফেন “বিবেকচুড়ামণি'র 
ভাষার অন্গুসরণে ব্যক্ত কর! যায় এই বলে, 'ধত্র্যোহহং কৃতকৃত্যোইম্‌। 

ঝুতরাং আমর! দেখি মানবিকতার চিস্তায় রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের 


৩৯৬. 906৩100 8৬1৮ 
২৬৪ 


গর্য থেকে কাছে এসে পড়েছেন। উভয় চিন্তাই একই পথে প্রবাহিত। 
তত্বজ্ঞান থেকে একাত্বতাবোধ আসে;. একাত্মতাবোধ থেকে 
বিশ্বমানবের প্রতি প্রীতি সঞ্চারিত হয়। এই প্রীতিবোধ থেকে 
পরার্থে স্বার্থত্যাগের প্রেরণা পাওয়া যায় এবং ফলে আসে আনন্দ। 
অতিরিক্তভাবে উভয় চিন্তাই সল্স্যাসবাদ গ্রহণ করে নি; উভয়েই 
বিশ্বসন্তাকে সংসারের মধ্যেই আবিষ্কার করেছে । এইভাবে এখানে 
উপনিষদের চিন্ত! এবং রবীন্দ্রনাথের চিন্তা যেন হাত ধরাধরি করে 
একই পথে এগিয়ে গিয়েছে । 


গগগৃ৭2০ অষ্টম অধ্যায় ৭%%৭%?% 
আলোচন৷ 


এক 
পুবের সিদধান্তের গ্রম্থন 


আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলিতে উপনিষদের মূল চিন্তাগুলির সহিত 
রবীশ্ানাথের সমস্থানীয় চিন্তার তুলনা করেছি। বর্তমান অধ্যায়ে 
সে-সম্বন্ধে একটি সামগ্রিক আলোচন! করবার প্রস্তাব করি। 

যে মৌলিক চিন্তাগুলি সম্বন্ধে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা 
হয়েছে সেগুলি হল এই £ 

ব্র্ষবাদ, দ্বৈতভাবতত্,র আনন্দ ও অমৃততত, 
মৃত্যুরহস্য সম্বন্ধে চিন্তা, শ্রেয়ত ও মানবিকতা । 

বিভিন্ন অধ্যায়ে এই পৃথক চিন্তাগুলি সম্বন্ধে সবিস্তার আলোচন! করা 
হয়েছে; তাদের সিদ্ধান্তগুলির এখানে একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়। 
যেতে পারে। বর্তমান আলোচনার সুবিধার জন্য তাদের সবগুলিকে 
একত্র পাওয়। প্রয়োজন হয়ে পড়ে । 

প্রথম হল ত্রদ্গাবাদ সম্বন্ধে চিন্তা । আমরা দেখেছি প্রাচীন 
উপনিষদের চিন্তায় সমগ্র বিশ্বকে একটি অথগ্ড সন্তারপে কল্পনা করা 
হয়েছে। সেই মখণ্ড সত্তাকে ব্রহ্ম বল। হয়েছে, কারণ তিনি সর্বত্র 
ছড়িয়ে আছেন ; ভূমা বল। হয়েছে, কারণ তিনি বিরাট ; আত্মা বলা 
হয়েছে, কারণ তিনি সকলের অন্তরে প্রচ্ছন্নরূপে বিরাজমান । তিনি 
একাধারে বিশ্বের উপাদান-কারণ, নিমিত্ব-কারণ এবং রূপ-কারণ। 
উপনিষদের খষির পরিকল্পনায় তিনি নিজেকে দৃশ্যমান বিশ্বে পরিবতিত 
করেন বলে উপাদান-কারণ ; নিজেই এই পরিবর্তন নিজ শক্তি দিয়ে 
মংঘটন করেন বলে তিনি নিমিত্ত-কারণ ? যে রূপে তিনি প্রকাশ নেন 


২৩১ 


ডাও নিজের শুট বলে তিনি বীপ-কারগ। ভিসি অতিরিক্তভাবে উদ্দেন্ 
কারণও বটে; কারণ তিনি একটি বিশেষ উদ্দেশ্ট সাধনের জন্য 
নিজেকে বিশ্বে রূপান্তরিত করেন । কোনও ব্যবহারিক উদ্দোষ্ঠ কার 
নেই; কারণ ধার সব আছে তার কোনও অভার তো নেই। সে 
উদ্দেশ্য আনন্দ আস্বাদন। সুতরাং বিশ্বের মধ্যে উপনিষদের খষি 
এক আনন্দ-অভিসারী মহাসত্তার প্রকাশ দেখেছেন । তাই বিশ্বকে 
তিনি 'আনন্দরূপমম্থতং যদ্ধিভাতি' বলে বর্ণনা! করেছেন। 

অপরপক্ষে রবীজ্জনাথের চিন্তা গতিশীল । তার বার বার পাল 
বদল ঘটেছে। পারিবারিক প্রভাব, নিজের মতিগতি এবং মতিগতির 
পথে গঁপনিষদিক চিন্তার প্রতি তার স্বাভাবিক আকর্ষণ তাকে আকা- 
বাকা-পথে ভার সাধনজীবনে এগিয়ে নিয়ে গেছে । প্রথম জীবনে 
পারিবারিক ধর্মচর্চারীতি যে পরিবেশ গড়ে তুলেছিল তার প্রভাবে তিনি 
একেশ্বরবাদের নিরাকার ঈশ্বরের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন । কিন্তু সেই 
সাধনরীতি তার মনকে তৃপ্তি দিতে পারে নি; কারণ তিনি স্বাধীন- 
পথে এগিয়ে যেতে ভালোবাসতেন । তবে তা তার মনকে পৌরািক 
হিন্দুধ্মে প্রচলিত বিগ্রহ-পুজার প্রতি বিরূপ করে দিয়েছিল। তার 
ধারণায় ত1 ঈশ্বরকে নিয়ে ছেলেখেলার সামিল হয়ে দাড়ায় । মতি- 
গতির পথে এগিয়ে গিয়ে তিনি প্রকৃতির মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন শক্তির 
উপস্থিতি অনুভব করেছিলেন । তিনি সমগ্র বিশ্ব জুড়ে আছেন, বিশ্বকে 
নিয়ন্ত্রণ করছেন, কিন্তু স্তাকে দেখ! যায় ন।। তাকে তিনি রাখাল 
বালকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দে যখন হুপুরে ছায়াঘন স্থানে 
বিশ্রাম নেয় তখন তাকে দেখ যায় না, কিন্তু তার বাশি শোন বায়। 
বিশ্বের মধ্যে এই সত্তা আনন্দ আস্মাদনের জন্য প্রকাশ নিয়েছেন, 
নিজের ওপর দ্বৈতভাব আরোপ করে রছ ও বিচিত্র! হয়েছেন। 
এইভাবে তিনি এই অবস্থায় গপনিষদিক ব্রক্মবাদের অতি নিকটে 
এসে গেছেন । 

কিন্ত ভার মত্ভিগতির পথে ভিনি পরে অক্ষবাদের থেকে সরে 


৬২ 


এসেছেন। উপনিষদের করহ্থা নৈধ্যক্তিক সবা, ডাকে বুদ্ধিরৃ্ত দিয়ে 
গ্রহণ করে, তৃপ্তি আছে কিন্ত এ পরিকল্পনায় হাদয়বৃত্তির প্রয়োগের 
কোনও অবকাশ নেই। শুধু জানায় তৃপ্তি নেই, বিশ্বসতার সঙ্গে 
ব্যক্তিগত প্রীতির সম্বন্ধ স্থাপন করতে হবে। এই ধরনের একটি 
আকাঙ্ক্ষা! রবীন্দ্রনাথের মনকে লীড়িত করত। তিনি বিশ্বসত্তাকে 
শুধু জানতে চান নি, গ্রীতির সুত্রে পেতে চেয়েছিলেন? শুধু মনীষা 
দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে তাকে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন । এই পথে 
চিন্তা! স্কাকে তার অভিনব পরিকল্পনা জীবনদেবতাতথ্ব এনে দিয়েছিল । 
রবীন্দ্রনাথের ধারণায় ইনিই বিশ্বদেবতারই ব্যক্তিবূপী সংস্করণ । তিনি 
অশরীরী, কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের প্রণয়ের ভিখারী । বিশ্বের চারিদিকে 
যে এত সৌন্দর্ষের ছড়াছড়ি ত৷ ব্যক্তি মানুষের কাছে তার প্রেমলিপি । 
যে তাতে সাড়া দেয় তার হাদয়ে তিনি অধিষ্ঠিত হয়ে তার সঙ্গে 
গ্রীতির আদান-প্রদান করেন। বিশ্বসন্তার মধ্যে তিনি ছটি প্রকাশ 
ল্লক্ষ্য করেছেন। একটি কাজের প্রকাশ, অন্তটি আনন্দের প্রকাশ। 
তাই তিনি বলেছেন, বিশ্বদেবতা আছেন লোকে লোকে আর জীবন- 
দেবতা আছেন মানুষের হাদয়ে । 

এইভাবে রবীন্দ্রনাথ যেমন একদিকে তার বৈদিক পুর্বপুরুষদের 
অনুসরণে প্রকৃতির কবি হয়ে প্রকৃতির মধ্যে এক সবব্যাগী সস্তার 
আবিষ্কার করেছিলেন, তেমন পরবতকালে তার মতিগতির পথে 
জীবনদেবতাকে পেয়েছিলেন । সুতরাং উপনিষদের অনুবর্তা হয়ে 
তিনি ক্রক্মবাদের কাছে এসেও আবার জীবনদেবতার আকর্ষণে দুরে 
সরে গিয়েছিলেন । তবু উপনিষদের ব্রহ্মষকে একেবারেই ঠেলতে 
পারেন নি॥। তিনি বিশ্বসতীর কাজের প্রকাশরূপে তখনও সস্কুচিত 
ক্ষেত্রে তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন । 

দ্বিতীয় কথ। হল--ছৈতভাবতত্ব । উপনিষদের মুল চিস্তাধার। বলে 
বিশ্বনত্ত! রসের জন্য, অর্থাৎ আনন্দ উপলব্ধির জন্থ নিজের বিশুদ্ধ 
একত্বকে বর্ন করে আপনার উপর দ্বৈতভাব আরোপ করে বিশ্বে 


২৩৩ 


উপানব.” ১৫ 


কপান্তরিত হলেন। বিশ্বের বৈচিত্রময় রূপ প্রকট হতে ছুটি পক্ষ 
দরকার। একটি পক্ষ তার জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি দিয়ে অপর একটি পক্ষের 
সঙ্পে পরিচিত হবে তবেই ত বিশ্বের শব-স্পর্শগন্ধ-রসমগ্ডিত প্রকট 
রূপটি ধরা পড়বে । একটি জ্ঞাতা, অপরটি জে্রয়, একটি আ্াতা, অপরটি 
জ্রেয়, একটি শ্রোতা অপরটি শ্োতব্য, একটি রসয়িত! অপরটি রসিতব্য। 
এইরূপে দ্বৈতভাবের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বৈচিত্র্যময় রূপটি ধরা পড়ে। 

রবীজ্নাথও এই তত্বটি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনিও 
উপনিষদের অনুবর্তী হয়ে বলেছেন যে যা ছিল একক সস্তা, ত৷ 
আপনাকে ছুই করেছে এই বিচিত্র বিশ্বরূপে প্রকট হতে। একদিকে 
জ্ঞানেক্জ্িয় সমন্বিত মন ও অপর দিকে জ্ঞানেন্দ্িয়ের নিকট ধর! দেয় 
এমন পদার্থ, এই ছুয়ের মিলনের মধ্যেই বিশ্বের রূপটি ধর! পড়ে। 
তিনি তাই বলেছেন, ছুয়ের মিলনের আঘাতের মধ্য দিয়েই বর্ণ-গন্ধ- 
গীতময় বিশ্ব রচিত হয়ে চলেছে? 

রবীন্দ্রনাথ এইখানেই থামেন নি॥ বিশ্বের বৈচিত্র্যময় প্রকাশে 
মানুষের মন এইভাবে যে একটি সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে, সে বিষয় 
তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তাই তিনি মানুষের মন পেয়েছেন 
বলে একটি বিশেষ উল্লাস বোধ করছেন । সেই অহংকারবোধ তার 
কবিতায় ভাষ! পেয়েছে । তিনি বলেছেন তারই চেতনার পটে চুনি 
রাঙ। দেখায় এবং পাক্স। সবুজ হয় । সুতরাং আবিষ্কার করেছেন বিশ্ব 
রচনায় বিশ্বশিল্পী মানুষের চেতনাকেই পটরপে ব্যবহার করেছেন । 
সকল মানুষের হয়ে তাই তার অহংকার যে বিশ্বশিল্প রচনায় মানুষের 
চেতন! মুখ্য ভূমিক! গ্রহণ করে। 

এগুলি নূতন কথা । উপনিষদে তা বল! হয় নি। কারণ 
উপনিষদের দৃষ্টিভঙ্গি সামগ্রিক অথণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি । এক রকম বল! 
চলে বিশ্বসন্তার দৃ্টিভল্গি। তাই বিশেষ ছুটি ধত্তার একটি সত্তার 
উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয় নি। বিশ্বীশিল্লীর দৃর্টিভঙিতে 
কোনটির ভূমিকা গৌণ, কোনটির মুখ্য সে প্রশ্ন অবাস্তর। কারণ 


৩৪ 


অন্ষের আনলাময় রূপের শ্রকাশে উভয়েই সমান সহায়ক ॥। হিনি 
শিল্পী তার কাছে তুলির ভূমিকা বড়, কি পটের ভূমিকা বড়, সে প্রশ্ন 
ওঠে না। কারণ, উভয়েই তার দৃষ্টিভঙ্গিতে সমান প্রয়োজনীয় । 
রবীজ্জনাথ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মাত্র বিষয়টি দেখেছেন বলে 
মানুষের জন্ত তার অহংকার বোধ হয়েছে। 
সেযাই হোক, একথা নিশ্চিত বল! যায় যে এ-বিষয় রবীন্দ্রনাথের 
চিন্তা ও উপনিষদের চিন্তা মূলত একই । উভয়েরই প্রতিপাস্থ হল 
যে দ্বৈতভাব আরোপ না হলে বিশ্বের বৈচিত্রময় রূপ ধর! পড়ে না। 
সুতরাং আমরা এই সিদ্ধান্ত করতে পারি যে এই তত্বটি উভয় চিন্তাতেই 
স্বীকৃত। 
তৃতীয় কথা-নানন। বা অমৃততত্ব। সম্পকিত অধ্যায়ে যুজি 
দেখানো হয়েছে ষে উপনিষদে এই ছুটি কথ! সমার্থবোধক শব' হিসাবে 
ব্যবহার কর। হয়েছে । য। আনন্দরূ্প তাই শভামৃত। “আনন্দরূপমৃতং 
' যদ্ধিভাতি। বিশ্বে ব্ছবপে আত্মপ্রকাশের অন্তনিহিত উদ্দেশ্য হল 
আনন্দ আম্বাদন। তাই তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা হয়েছে আনন্দই 
ব্রদ্ষ, আনন্দ হতেই নানা জীব জন্মগ্রহণ করে, তাবপর জীবনধারণ 
করে এবং মৃত্যুর পর আনন্দেই ফিরে যায় । এখানে যা লক্ষ্য করবার 
তা হল জন্ম ও মৃত্যু ছুটিকেই আনন্দের উপাদান বলে স্বীকার কর! 
হয়েছে। তারা আনন্দের উপাদান হয়ে যায় যখন বিশ্বকে সামগ্রিক 
দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখি। যখন বাক্তিগত সৃখ-ছঃখের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখি 
তখন মৃত্যু হতে আমরা আঘাত পাই। কিন্তু জীবন-মরণকে জড়িয়ে 
নিয়ে তাকে আনন্দলীল। রূপে দেখলে মরণ আনন্দের উপাদান হয়ে 
যায়। তাই কঠ ও বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে, যে পৃথক 
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখে সেই মৃত্যু হতে শোক পায়; কিন্তু যে অখণ্ড 
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখে সে শোক পায় না। “মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্রোতি 
য ইহ নানেব পশ্যাতি । 
ঈশ উপনিষদদে এই কথাটি আরও পরিষ্কার করে বলা হয়েছে । 


২৩৫ 


সেখানে খগুজ্ঞানক্ষে অবিস্ত! বল হয়েছে। আর যে জান বিশ্বকে 
সামগ্রিকভাবে এক্যমগ্ডিত বলে উপলব্ধি করে, অর্থাৎ এক বিরাট 
আনন্দ-অভিসারী সম্ভার অভিলাষে জন্স-ৃতাকে জড়িয়ে নিয়ে এই 
বিপুল সৃষ্টি প্রবাহিত হয়েছে এইরূপ উপলদ্ধি করে তাকে বিদ্া বল! 
হয়েছে । তাই বলা হয়েছে, অবিদ্তার অবস্থায় আমর মৃত্যুর শোক 
অন্থভব করি এবং তারপর বিস্তার সাহায্যে আমর! অম্বতকে লাভ 
করি। “অবিষ্থয়া মৃত্যুং তীর্ব? বিদ্যয়ামৃতমশ্্তে ॥ এই অমৃত হল 
আনন্দ; বিশ্ব তালে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারলে আমরা জন্ম- 
মৃত্যুর দোলায় দোলানে। এই প্রাণের হিন্দোল খেলার আনন্দের 
অধিকারী হতে পারি। 

আমর! দেখেছি রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের আনন্দতত্বকে পরিপূর্ণরূপে 
স্বীকার করেছেন। তিনিও বলেছেন, যে সন্তার বিশ্বে বৈচিত্র্যময় 
প্রকাশ দেখি তিনি আনন্দ-অভিসারী। এ আনন্দ স্থপ্রির ধারার 
মধ্যে প্রবাহিত। স্ুখ-হুঃখ, ভাল-মন্দ তার অঙ্গ । উপনিষদ বলে, 
বিশ্বের মধ্যে আনন্দরূপে বিশ্বসন্তার প্রকাশ । তিনি “আনন্দরূপমৃতম্‌ 
তিনি বলেন, বিশ্ব জুড়ে “মানন্দ-যজ্ঞ” চলেছে। মানবজীবন হূর্লভ 
বন্ত, তা আনন্দযজ্ঞে নিমন্ত্রণশ্বরূপ। তার অধিকারী হতে, দরকার 
অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হওয়া। বিশ্বের মধ্যে আনন্দ-অভিসারী 
মহাসত্তার যে প্রকাশ তাকে তিনি “বিশ্বরূপের খেলাঘর বলে 
বর্ণনা করেছেন। 

এ বিষয় ছুই চিন্তা একই পথের অনুসরণ করেছে। তবে যা লক্ষ্য 
করবার তা হল এই যে রবীন্দ্রনাথের 'অনন্ত-সাধারণ, কাব্যশক্তি যেন 
এই চিন্তাকে আরও সুন্দরভাবে কল্পনার রং মিশিয়ে আরও বর্ণাটা 
ভাষায় প্রকাশ করে আরও চিন্ত/কর্ষকরূপে স্থাপম করেছে। এই 
প্রসঙ্গে লক্ষ্য করা যেতে পারে যে আনন্দতত্বটি ৰোঝবার জন্য তিনি 
ছুটি সুন্দর উপম! প্রয়োগ করেছেন। তিনি প্রথমত সৃষ্টিধারাকে 
খেলারপে অভিহিত করেছেন। খেলার উদ্দেগ্ত অহৈতুক আনন্দ, 


২৬ 


তা কোনও ব্যবহারিক উদ্দেশ্য স্বারা প্রভাবিত নয়। প্রোসঙ্গিক 
কাব্যাংশটি পূর্বে উল্লিখিত হলেও আবার উল্লেখ কর! যেতে পারে ২ 
এই জন্ম-মরণ খেলায় মোর! মিলি তারই রা 
এই ছুঃখ-স্খের জীবন মোদের তারই খেলার সঙ্গ 

দ্বিতীয়ত তিনি সৃষ্টিপ্রবাহকে এক মহানৃত্যের সঙ্গে তুলন! 
করেছেন। বিশ্বসত্ত। যেন নটরাজ, বিশ্বে বিধৃত স্থষ্টিপ্রবাহ যেন তার 
আনন্দনৃত্য । সেই ন্বত্যের সংঘাতে য1 জড় তার মাঝে প্রাণ প্রন্ষুটিত 
হয়ে চেতনার উদয় হয়; তখন স্ুখ-ছুঃখে তরঙ্গায়িত জীবনপ্রবাহ 
মধুময় হয়ে ওঠে। এখানেও প্রাসঙ্গিক একটি কাব্যাংশের 
পুনরুল্লেখের লোভ সংবরণ করা গেল না 


তব নৃত্যের প্রাণ বেদনায় বিবশ বিশ্ব জাগে চেতনায় 
যুগে যুগে কালে কালে স্থরে স্থুরে তালে তালে, 
স্থখে হুথে হয় তরঙ্গময় তোমার পরমানন্দ হে। 
তারপরের কথা হলো মৃত্যু সম্পক্কিত চিন্তা ॥ আমর! সম্পঞ্কিত 
অধ্যায়ে দেখেছি যে উপনিষদে মৃতু সম্বন্ধে তিনটি বিভিন্ন চিন্তা আছে। 
প্রথম চিন্তাটি বলে ব্রচ্মের স্থপ্টিপূর্ব বা স্বরূপে অধিষ্ঠিত অবস্থায় 
স্ষ্টিপ্রবাহ নেই ; কাজেই প্র/ণধারাও নেই, জন্ম-মৃত্যুও নেই। এটি 
স্থান-কাল-অতীত অবস্থা ; তাই স্খ-ছুঃখ, জীবন-মরণের স্পর্শ তাতে 
লাগে না। তাই ছান্দোগ্য উপনিষদে বল! হয়েছে এই অবস্থায় 
আত্মা অহো-রাত্র দ্বার। স্পৃষ্ট হয় না, জরা-মৃত্যু, শোক, স্ুকৃতিশহস্কৃতি 
দ্বারা স্পুষ্ট হয় না।১ 
বাকি ছুটি চিন্ত! বিশ্বরূপে প্রকট ব্রন্মের সম্পর্কে মৃত্যুর বিষয় 
চিন্তা । তার! বঙ্গে, মানুষ ছটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মৃতাকে দেখতে পারে। 
একটি হল খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি । তা! হল ব্যক্তি-বিশেষের নিজন্থ স্বার্থ বোধ 
দ্বারা সঙ্কুচিত দৃষ্টিভঙ্গি । একে রবীন্দ্রনাথের ছোটো-আমির দৃষ্টিভঙ্গির 


»* ছাশ্বোগা । ৮151৯ 
২৩৭ 


সঙ্গে তুলন! কর! বায়। উপনিষদ একে বলে নানার দৃষ্টিতঙ্গি ৰা 
অবিস্াা-প্রণোদিত দৃষ্টিভঙ্গি । এখানে মানুষ নিজের জীবন, নিজের 
স্বার্থকে পৃথক করে দেখে বলে তা নানার দৃষ্টিভঙ্গি । বিশ্বের সামগ্রিক 
একত্ববোধ দ্বার অনুপ্রাণিত নয় বলে ত৷ অবিস্তা । এই অবিস্থার দৃিভঙ্গি 
হেতু মানুষের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা থেকে শোকযোধ আসে । তাই বল। 
হয়েছে, মৃত্যু হতে সে মৃত্যুর আঘাত পায় যে নানাত্ববোধের দ্বার! 
প্রভাবিত হয়। “মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্রোতি য ইহ নানেব পশ্ঠাতি।' 

ছিতীয় চিন্তাটি বিশ্বের সামগ্রিক এক্যবোধ ৰা স্থষ্টির অখণ্ডতা- 
বোধ দ্বারা অন্ুপ্রাণিত। একে উপনিষদের বচনে একত্বের দৃষ্টিভজি 
বলে চিন্তিত কর! হয়েছে। তা৷ একত্বের দৃষ্টিভঙ্গি এই কারণে যে 
সমগ্র স্থপ্টিপ্রবাহকে একটি আনন্দ-অভিসারী মহাসত্তার অথণ্ড প্রকাশ 
বলে কল্পনা! করা হয়েছে। এখানে স্থখ আছে, দুঃখ আছে, তারণ্য 
আছে, জরা আছে, জন্ম আছে, মরণ মাছে ; কিন্তু সব জড়িয়ে একটি 
আনন্দময় প্রকাশ আছে। একে বিদ্যার দৃষ্টিভঙ্গি বলা হয়েছে, কারণ 
তা সামগ্রিক অখগ্ডতা বোধের দ্বারা অনুপ্রাণিত । তা বিস্তা, কারণ 
তা সমগ্র সত্যকে প্রকাশ করে, সত্যের অংশকে প্রকাশ করে না। 
অবিদ্ভাকে সম্পূর্ণতামণ্তিত করে বিদ্যায় উত্তীর্ণ হওয়া যায়। একে 
রবীন্্রনাথের সবার-চেয়েবড়ো-আমির দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুলনা! করা 
যায়। বিশ্ব যে মহাসত্বার আনন্দলালার প্রকাশ, এ তীরই দৃষ্টিভঙ্গি । 
এ-দুষ্টিভঙ্গিতে ভন্ম ও মরণ উভয়েই আনন্দের উপাদান হয়ে যায়। 
তাই ঈশ উপনিষদে বল। হয়েছে, যে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী হয়েছে 
তার কাছে সকল জীবকে, অর্থাৎ জীবনধারাকে জড়িয়ে নিয়ে এই বিশ্ব 
একই মহাসন্ত।র প্রকাশ বলে প্রতিভাত হবে। প্রাণের ধারার জগ্ম- 
মরণ উপাদদান। কাজেই একত্বের উপলব্ধি হলে ঠোক থাকে না, 
মোহ থাকে না। সম্পক্ষিত বচনটি এই প্রসঙ্গে আর-রকবার উদ্ধৃতির 
প্রয়োজন হয়ে পড়ে £ “যন্মিন্‌ সর্বানি ভূতানি আত্মৈবাড়ূদ বিজানভঃ ॥ 
তত্রক: মোহং কঃ শোক একত্ব-মনুপশ্তঃ ॥। 


১০৪ 


এই কথাটিয় ব্যাখ্যা করে ছান্দোগ্য উপনিধদে বলা হয়েছে যে 
যিনি সামশ্রিকভাবে বিশ্বকে দেখেন, তিনি বিশ্বে শুধু মৃত্যু বা শোক 
ব। হুঃখ দেখেন না; তিনি মৃত্যুর সঙ্গে জন্ম, শোকের সঙ্গে প্রকুল্লতা 
এবং ছঃখের সঙ্গে সুখকে দেখেন; তাই তিনি তাদের জড়িয়ে নিয়ে 
স্থপিধারার মধ্যে যে আনন্দ উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে তাকে দেখেন। 
গন পশ্টে। স্ৃতাং পশ্যতি ন রোগং লেভং হুঃখতাং সবং হি পশ্যঃ 
পশ্যাতি । ং 

ঈশ উপনিষদ এই ছুটি দৃষ্টিভঙ্গির কোনটিকেই প্রত্যাখ্যান করে 
নি। ত৷ বলে প্রথম দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দিয়ে মৃত্যুশোক ভোগ করে 
তারপর দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দিয়ে উত্তী হয়ে অমৃত বা আনন্দের 
অধিকারী হতে হয়। এ বিষয় পূর্বেই আলোচনা কর! হয়েছে। 
কাজেই তা সংক্ষেপে এখানে উল্লেখ করা৷ যেতে পারে । তাতে বল! 
হয়েছে, বিশ্বরূপে প্রকট ব্রদ্ষে, অর্থাৎ স্থষ্টিধারায় স্ভৃতি বা জগ্ম এবং 
বিনাশ ব৷ মৃত্যু উভয়ই আছে! খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে গিয়ে, 
মৃত্যুর দাহিকা শক্তি অনুভব করে তারপর অখগুদৃষ্টির মধ্যে দিয়ে উত্তীর্ণ 
হয়ে, মৃত্যু যে প্রাণের ধারাকে বহন করে এই উপলব্ধি করে অমৃতকে 
আন্বাদ করা যায়। “বিনাশেন মৃত্াং তীত্ব? সম্ভুত্যামৃতমঞ্্রতে ** 

আমর। দেখেছি, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুসম্পকফিত চিন্তা কয়েকটি অবস্থার 
মধো দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে তার পরিণত রূপটি পেয়েছিল। প্রথমে তিনি 
মৃত সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন তুলেছেন, উত্তর খুঁজে পান নি। তাই গীতার 
অনুসরণে তাকে একান্ত রহস্যময় বলে অনুভব করেছেন। তবু তিনি 
হতাশায় একেবারে ভেঙে পড়েন নি; তার একটি দৃঢ় ধারণ। হয়েছে 
ষে মৃত্যু শৃগ্ভ নয়। তাই তিনি 'পুনশ্চ-এর একটি কবিতায় বলেছেন £ 

নিবিড় সে সমন্তের মাঝে অকম্মাৎ আমি নেই। 
একি সত্য হতে পারে ? 


২. ছান্দোগ্য। ৭/২৬।২ 
২৩৯ 


পরবর্তাকালে দেখি সার সাধনজীবনের 'গীতাঞ্জলি'র যুগে 
রবীন্দ্রনাথের ধারণ! হয়েছে মৃত্যু জীবনকে পূর্ণতা প্রদান করে। একটি 
গ্রন্থের শেষ অধ্যায় যেমন সমাপ্তির সঙ্গে তাকে পরিপুর্ণতা৷ দেয়, তেমন 
মৃত জীবনের ওপর ছেদ টেনে দিয়ে তাকে পরিপূর্ণতামগ্ডিত করে। 
কাজেই মৃত্যুকে বর্ণনা করেছেন তার 'জীবনের শেষ পরিপুর্ণতা' বলে 
এবং একাস্তিক আগ্রহ ভরে তাকে হ্বাগত জানিয়েছেন । 

পরবর্তা চিন্তায় তার মৃত্যু সম্পকিত ধারণাটি পরিপূর্ণ রূপ 
পেয়েছে। এখানে তার ধারণা, বিশ্বসন্ত। বিশ্বে প্রকাশ নিয়েছেন 
আনন্দ আম্বাদের জন্য এবং প্রাণের ধারা তার আনন্দের লীলা । 
সে ধারায় জম্ম আছে, মৃত্যু আছে; কিন্তু উভয়কে জড়িয়ে নিয়ে 
আনন্দ আছে। খেলায় যেমন হারদ্ধিত আছে, চলায় যেমন পা- 
তোলা এবং পাঁফেল। আছে, জীবনধারায় তেমন জম্ম এবং মৃত্যু হুই-ই 
আছে। উভয়েই আনন্দলীলার উপাদান । “কণিকা'য় তাই তিনি 
জীবনধারাকে বর্ণনা করেছেন এইভাবে £ 

জন্ম মৃত্যু দৌহে মিলে জীবনের খেল! 
যেমন চলার অঙ্গ পাতোল।, পা-ফেলা। 

সুতরাং তার এই চিন্তার সঙ্গে উপনিষদের চিন্তার এক বিম্ময়কর 
সাদৃশ্য দেখ। যায়। উভয় চিস্তাই বলে স্থ্িধারার মধ্যে জন্ম ও মৃত্যু 
উপাদান। খণ্ডিত দৃষ্টিভজিতে মৃত্যুতে শোক আছে, সামগ্রিক দৃষ্টি- 
তঙ্িতে শোকের দাহিকা শক্তি থাকে না। তা এক আনন্গখেলার 
অঙ্গ হয়ে দ্াড়ায়। উপনিষদ যেমন বলেছে “মৃত্যোঃ দ মৃত্যুমাপ্রোতি 
য ইহ নানেব পশ্যতি,, রবীন্দ্রনাথ তেমনি তার অন্ুসরণে বলেছেন, 
“আমর! অল্ল লইয়! থাকি, তাই যাহা যায় তাহ! যায়। 

তারপর আসে উপনিষদের শ্রেয়তব্ব । আমর। দেখেছি উপনিষদের 
শ্রেয় আমাদের ইচ্ছাধীন কর্ম সম্পাদনে আমরা যে সকল সমহ্যার 
সম্মুখীন হই তার সমাধান করতে চেষ্টা করেছে। এই গ্াসঙে আমাদের 
হটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। প্রথম সমস্যা হল দেহের দাবিকে 


বি 


ধেশি মূল্য দেব, না মনের দাবীকে বেশি মূল্য দেব। দেহ গুল 
ভোগের মধ্য দিয়ে ইন্জ্িয়বৃত্তির সুখ চায়। মন মানসিক তৃপ্তি 
খোঙছ্জে। অপরদিকে আরও এক জোড়া পরম্পরবিরোধী দাবি এসে 
পড়ে। একদিকে আছে ব্যক্তি-মানুষ, অপরদিকে আছে সমাজ; 
কারণ মানুষ সামাজিক জীব । ব্যক্তিবিশেষের নিজের শ্বার্থ সমাজের 
সামগ্রিক স্বার্থ থেকে তার কাছে বেশি প্রিয়। তাই সে স্বার্থ 
ত্যাগ করতে কুষ্ঠা বোধ করে। এই মতিগতিকে ভিত্তি করে সমস্থ 
দাড়ায়, ব্যক্তির স্বার্থকে বেশি মূল্য দেব, না সমাজের স্বার্থকে বেশি 
মূল্য দেব? 

এইভাবে ছু'জোড়া বিরোধী দাবি এসে পড়ে ; বিশেষব্যক্তি সম্পর্কে 
ভার দেহের সঙ্গে মনের ছন্ব এবং ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে স্বার্থের 
সঙ্গে পদার্থের ছন্ব। উপনিষদ এই হুজোড়া সমস্যার সমাধান খু'জেছে 
ভার শ্রেয়ত্বের ভেতর দিয়ে। তা বলে, সঙ্কুচিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে 
বিষয়গুলি দেখলে দেহের ন্ুখ মনের সুখ হতে বেশি আকর্ষণ করে এবং 
নিজের স্থার্থ পরার্থ থেকে বেশি লোভনীয় বলে মনে হয়। যা! ব্যক্তি- 
বিশেষের কাছে বেশি আকর্ষণের তাকে উপনিষদ প্রেয় বলে। তাই 
যে সমগ্র ব্যক্তি-মানবের কল্যাণ না চেয়ে, কেবল তার দেহের সুখ 
চায় সে প্রেয়কে বরণ করে। অনুরূপভাবে যে নিজের স্বার্থের সঙ্গে 
সমগ্র সমাজের কল্যাণের বিরোধ বাধলে, নিজের স্বার্থকেই গ্রহণ করে 
সে প্রেয়কেই বরণ করে। 

কিন্তু তাতে কি ব্যক্তি-মান্ুষ, কি সমাজ, কারও কল্যাণ হয় না, 
উভয়েরই ক্ষতি হয়। অপর পক্ষে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখলে 
যা উভয় বিরোধী পক্ষের কল্যাণ সাধন করে, তাকে উপনিষদ শ্রেয় 
বলেছে। শ্রেয় আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণের বন্ত নয়; কিন্তু পরিণতিতে 
তা উভয়পক্ষেরই কল্যাণকর। তাই কঠ উপনিষদে বল্‌? হয়েছে 
শ্রেয়কে গ্রহণ করলে কল্যাণ হয়, আর যে প্রেয়কে বরণ করে সে 
সিদ্বিলাভ করে না। “তয়োঃ শ্রের় আদদানন্ত সাধু ভবতি হীয়তে 


খ$? 


অর্থাদ্‌ ব উ প্রেয়ো। বৃদীতে। ভাই উপনিষদ ভোগ বর্জন করতে 
বলে নি, উভয় পক্ষের দৃিভলি হতে যা গ্রহণ করতে বাধা মেই, তাকে 
গ্রহণ করতে বলেছে। যে কর্মে এই লক্ষণ আছে তাকে অনবন্ত 
কর্ম বল! হয়েছে। তাকেই গ্রহণ করতে বল! হয়েছে । তাই ত্যাগ 
করতে উপদেশ দেওয়। হয় নি, সংযতভাবে ভোগ করতে উপদেশ 
দেওয়। হয়েছে । আত্মত্যাগ করতে বল। হয় নি, আত্মদমন করতে 
বল! হয়েছে। 

অতিরিক্তভাবে স্বার্থের সঙ্গে পরার্ধেব যে ছন্দ তার সমাধান ও 
উভয়ের যা! কল্যাণ সাধন করে তাই, অর্থাৎ প্রেয় নয়, শ্রেয়কে গ্রহণ 
করে। তবে স্বার্থকে ত্যাগ করা অনেক সময়ে কষ্টসাধ্য হয়। তাকে 
সহজ করবার জন্ঠে উপনিষদ হৃদয়বুত্তির সাহায্য নিয়েছে । হাদয়বুদ্ির 
শ্রেষ্ঠ বিকাশ প্রীতিবোধে, মমতাবোধে। অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সকলকে 
'াপন জ্জান করলে গ্রীতি সঞ্চার হয়। অন্থের প্রত প্রীতির সঞ্চার 
হলে তার কল্যাণে স্বার্থত্যাগ করা সহজ হয়। ঈশ উপনিষদ তাই 
বলেছে, বিশ্বের সকলে একই মহ।সন্তার অঙ্গ্রূপ, কাজেই কাউকে 
বঞ্চিত করে ভোগ করতে নেই। যুক্তি হল, 'ঈশাবাস্তমিদং সম, 
ভার ভিত্তিতে উপদেশ দেওয়। হল, “তেন ত্যক্তেন তুজীথাঃ) 

আমরা প্রাসজিক ভধায়ের আলোচনা থেকে দেখি যে রবীন্দ্রন।থের 
চিন্তায় উপানষদের শ্রেয়তন্ব দাগ কাটে নি। তার অনুরূপ তত্ব তার 
চিন্তায় ঠিক পাওয়া যায় না। তবে তারু খানিকট। কাছে যায় এমন 
একটি তব তার চিন্তায় আত্মপ্রকাশ কবছে, তাকে আমর। বিশ্বমানব 
তব বলেছি। এই বিশ্বমানব কে, তার প্রকৃতি কি--এ বিষয় আমরা 
সম্পর্কিত অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি । এবানে সংক্ষেপে 
ত1 স্থাপন কর! যেতে পারে। 

রবীন্্রনাথ ধাকে বিশ্বমানব বলেছেন তাকে মহামামিব বলেছেন, 
সনাতন মানব বলেছেন এবং বড়ে।আমিও বলেছেন। তাঁর পরিকল্পনায় 
ব্যক্তি-মানবের মধ্যে ছটি মানৰ আছে । একটি ব্যক্তিবিশেষের আশা- 


২৪২ 


আকাঙক। পুরণে, তার স্থার্থ-সংরক্ষণে ব্যস্ত । অপরটি তার মধ্যেই 
্রচ্ছন্পভাবে বিরাজমান । ঠিক বলতে কি তিনি সকল মানুষের মধ্যেই 
বিরাজমান। তিনিই মানুষকে সকল মহৎ কর্মে প্রেরণ! দেন। তারই 
প্রেরণায় মানুষ শিল্পী হয়, স্থপতি হয়, কবি হয়, দেশনেত৷ হয়, 
চিন্তানায়ক হয় এবং আত্মত্যাগের প্রেরণ। পায়। তিনি ব্যক্তিবিশেষকে 
ব্যাপ্ত করে কিন্ত তাকে অতিক্রম করে আছেন। তিনি স্থানের উধ্বে 
কারণ তিনি প্রচ্ছন্পভাবে বিরাজম[ন । তিনি কালকে অতিক্রম করে 
তা।ছেন, কারণ তিনি মানবজাতির মধ্যে বিধৃত; ব্যক্তিমানুষের বিনাশ 
কে স্পর্শ করে না। মানুষের যা কিছু কীতি সবই তার প্রেরণা 
থেকে ব্যক্তি মানুষ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে । তিনি মানুষকে 
কল্যাণের পথেও আকৃষ্ট করেন। 

এখন আমরা বুঝতেঞ্জপারব তার এই পারকল্লিত সর্তাকে 
রবীল্রনাথ এতগুলি নাম দিয়ে চিহ্ৃত করেছেন কেন। তিনি 
বিশ্বমানন, কারণ সকল মাগ্ুষেব মধ্যেই তিনি প্রচ্ছন্লভ।বে বিরাজ 
করেন। তিনি মহামানব, কারণ তিনি সকল মানুষের যোগসমািকে 
অতিক্রম করেন। ।তনি সকল মানুষের গাণিতিক যোগফল নন; তিনি 
নিজে একটি শক্তি এবং সই শক্তি বাক্তি মানুষের মনো ক্রয়াশাল হয়। 
তিনি সনাতন-মানব, কারণ তিনি সমগ্র মানবজাতির প্রাণশক্িম্বরূপ। 
মানষ জন্মায়, মানুষ মব: কিন্তু মানবজাতির প্রাণের ধারার মধ্যে 
তিনি. নিত্য বিরাজিত। তিনি বড়ে।-আমি, কারণ তিনি ব্যক্তিমান্থুষের 
ক্ষুর্র আশা-ভা[কাজ্ষ।, "বারের সন্কুচিত বেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ নন; 
তিনি ব্যক্তিমান্ুষকে সকল মহৎ কর্মে প্রেরণা দেন। তিনিই মানুষকে 
সামগ্রিক কলাণের পথে আকর্ষণ করেন। 

এ থেকেই স্পই বাঝ। যায় উপনিষদের শ্রেয়তত্ব থেকে রবীন্দর- 
নাথের বিশ্বমানবতত্ব পৃথক । শ্রেয়তত্ব কেবল ইচ্ছাধীন কর্ম কি 
নীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে সে বিষয় উপদেশ দেয়। তার ক্ষেত্র 
খুব স্কুচিত। বিশ্বমানবতত্ব একটি অপ্রকট গ্রচ্ছল্প শক্তির কথ বলে, 


২৪৩ 


যা সহগ্র মানবজাতিকে তার মহৎ কীন্তির পথে এগিয়ে লিয়ে 
যায়। কাজেই তা প্রসঙ্গত শ্রেয়ের অনুকূল মনোভাব স্থষ্টি করে। 
একজন বিপদে পড়লে অন্তে যখন নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে 
উদ্ধার করতে এগিয়ে যায়, তখন রবীন্দ্রনাথ বলবেন এই মহামানব 
থেকেই সে তা করবার প্রেরণা লাভ করে। ম্ুৃতরাং বলতে পারা যায় 
এই তত্ব শ্েয়তত্বের পাশ ঘেষে চলে যায়ঃ তার অনুসরণ করে না। 

তবে উপনিষদের শ্রেয়তত্ব সম্পকিত অন্য ছুটি তত্ব রবীন্দ্রনাথের 
স্বীকৃতি পেয়েছে । প্রথম হল সন্ন্যাসকে উপনিষদ গ্রহণ করে নি, তবে 
সংমকে গ্রহণ করেছে । সংসারে থেকে, শ্রেয়ের পথ অবলম্বন করে 
জীবনধারণ করতে তা৷ উপদেশ দিয়েছে ॥ রবীন্দ্রনাথও সন্গ্যাসকে 
গ্রহণ করেন নি। তিনি বলেছেন, সংসারে থেকেই মুক্তির সাধন! 
করতে হবে। 

দ্বিতীয় তত্ব হল স্বার্থ ও পরার্ধের ছন্যে হৃদয়বৃত্তির ব্যবহার । 
উপনিষদ বিশ্বের সঙ্গে একত্ববোধের ভিত্তিতে সকলের সঙ্গে প্রীতি- 
প্রণোদিত আচরণ করতে উপদেশ দিয়েছেন । রবীন্দ্রনাথ এই চিন্তার 
অনুসরণ করেছেন। তিনি বলেন, অখগুবোধ থেকে অপরের প্রতি 
প্রীতির সঞ্চার হয়; প্রীতির সঞ্চার হলে অপরের জন্তে আত্মত্যাগ 
করা শুধু সহজ হয় না, আনন্দের হয়। তীর জ্ঞান-প্রীতি-কর্মতত্ের 
মধ্যে এই স্ুুরটি বিশেষভাবে সরব হয়ে উঠেছে। 

বাকি রইল মানবিকতা-তত্ব। উপনিষদের মানবিকতা এসেছে 
তার অখগুবোধ হতে। উপনিষদ অনুভব করেছে, একই সত্ত। নান। 
বেশ ধরে বিশ্বরূপ হয়েছে; একই মহাশক্তি প্রাণশক্তি হয়ে বিভিন্ন 
জীবরূপে প্রকাশ নিয়েছে । বিভিন্ন প্রাণীর দেহে কণ্ণা বলে সেই 
শক্তি বাক্য হয়, দেখে চক্ষু হয়, শুনে শ্রোত্র হয়, মনন ক্র মন হয়। 
এদের প্রত্যেককে পৃথক ভাবলে ভুল হবে। তাদের এঁকই আত্মার 
প্রকাশ বলে জানলে তারা! সব এক হয়ে যাবে। “আত্মেত্যুপাসীত 
অত্র হোতে সর্বে একং ভবন্তি।' এই একত্ববোধে সকল মানুষের প্রতি 


২৪৪ 


প্রীতিবোধ সঞ্চারিত হয় । তাই দান এবং অহিংস! অত্যাস করণে 
উপদেশ দেওয়া হয়েছে। শ্মৃতরাং উপনিষদে পাই অখগুবোধ থেকে 
একত্ববোধ, একত্ববোধ থেকে প্রীতিহেতু সর্বজনীন কল্যাণ-কর্মের প্রতি 
আকর্বণ। 

এখানে যেটি বিশেষ লক্ষ্য করবার তা হল উপনিষদে ব্যক্িরূগী 
ঈশ্বরের পরিকল্পনা নেই। ঈশ্বর এখানে ব্রহ্ম বা আত্মবা। ভিনি 
সর্বব্যাপী সন্ত। এবং বিশ্বেব মধ্যে বিশ্বরূপেই প্রকট। ভার কোনও 
পৃথক অস্তিব পরিকল্পিত হয় নি। তিনি বিশ্বকে যেমনটি যেখানে 
সাজে সেইভাবে স্টি করেছেন একথা উপনিষদে স্বীকৃত; কিন্ত 
অতিরিক্তভাবে একথ। বল। হয়েছে তিনি বিশ্বকে স্থষ্টি করে তাতে 
নিজেই প্রবেশ করলেন। “তৎ স্থষ্খ। তদেবানুপ্রাবিশৎ । স্থতরাং তিনি 
এক নৈর্বক্তিক সন্ত! হয়ে ধাড়ান। যিনি আদিত্যে এবং যিনি মানুষে 
উভয়েই এক সন্তা। তাই দেখি প্রাচীন উপনিষদে ভক্তির অনুরূপ 
কোনও অনুভূতি স্থান পায় নি। বিশ্বশিল্পরচনায় খষি বিন্ময় প্রকাশ 
করেছেন। রহস্ত-ঘেরা বিশ্বকে জানবার ভম্ত তীব্র আকৃতি প্রকাশ 
করেছেন। সেই রহস্তকে ভেদ করবার অদম্য কৌতূহল উচ্চারিত 
হয়েছে; কিন্তু ভক্তিনিবেদনের কোনও আকৃতি ফুটে ওঠে নি। 

তার কারণ, উপনিষদের খষি কৰি ছিলেন, মনীষী ছিলেন কিন্তু 
ভক্ত ছিলেন না। তার হ্ৃদয়বৃত্তি থেকে বুদ্ধিবৃত্তি ছিল প্রবলতর। 
তাই তার! ঘলতেন, দেখ, জান, জেনে আনন্দ পাও। জানার 
পুরস্কারই আনন্দ । তাই তাদের প্রার্থনা-বাণীতে কোনও ব্যক্তিরূগী 
ঈশ্বরের স্বতি রচিত হয় নি। কামন৷ পৃণের জহ্চে, অর্থাথা মনোভাব 
নিয়ে কোনও প্রার্থন। নিবেদিত হয় নি। তাদের যে প্রার্থনা-বাণী 
পাই তা পরমশক্তির কাছে এমন ধীশক্তি প্রার্থন। করে যাতে খষি 
তাকে বুঝতে পারেন । সবার বড় আকাঙ্ষ, জানব, 'ধীমহি।” কাজেই 
একমাত্র প্রার্থনা আমি যেন ধীশক্তি লাভ করি, 'ধিয়ো যে নঃ 
প্রচোদয়াৎ। সেকালের খধির সব থেকে বড় অহঙ্কারের বিষয়, 


6৫ 


আমি সেই পরমসত্ভাকে জেনেছি, 'বেদাহমেতম্‌। সুতরাং উপনিষদে 
ব্যজিরগী ভগবানের উপর ভক্তি থেকে মানবিকতায় মাকর্ষণ আসে 
নি; এসেছে সমগ্র বিশ্বকে জুড়ে অখণ্ড এঁক্যবোধ থেকে । 

অপর পক্ষে রবীন্রনাথের মানবিকতা-তত্ব গড়ে উঠেছে ছুটি বিভিন্ন 
তত্ব থেকে £ একটি হল অথগুবোধ বা এঁক্যতত্ব থেকে । অপরটি হল ধর্ম 
আচরণের আদর্শরূপের আবিষ্ষারের চেষ্ট। থেকে । সুতরাং তিনি ছুই 
ভিন্ন পথ ধরে গিয়ে মানবিকতার সন্ধান পেয়েছেন। প্রথম পথটি 
উপনিষদের পথের সঙ্গে তুলনীয় । িতীয় পথটি স্বতন্ত্র; তার সঙ্গে 
উপনিষদের মানবিকতার কোনও সংযোগ নেই। 

এই দ্বিতীয় পথ রবীন্দ্রনাথের শিক্জন্ব পথ। তার মতিগতির 
নির্দেশেই তিনি সেই পথকে অবলম্বন করেছিলেন । কারণ, রবীন্দ্রনাথ 
শুধু কবি ছিলেন না, একা স্তিকভাবে ঈশ্বরতক্ত কবি ছিলেন। সেই 
জন্তেই তিনি ঈশ্বরের সঙ্গে পরিপূর্ণতম মিলনের পথ আবিষ্কার করতে 
উৎসুক হয়েছিলেন এবং ফলে মানবিকতাকে আবিষ্কার করেছিলেন । 

মোটামুটি তার নিজের কথায় বল! যায় বিশ্বসত্তাকে তিনি শুধু 
জেনে সন্ত হতে পারেন নি। তিনি অতিরিক্তভাবে তাকে গ্রীতির 
সুত্রে এবং সেবার*পাত্ররূপে পেতেও চেয়েছিলেন । অর্থাং আমাদের 
যে তিনটি মুল বৃত্তি' আছে তাদের সব কটির সাহাযো উশ্বরের সঙ্গে 
যোগস্থৃত্র স্থাপন করতে চেয়েছিলেন । উপনিষদের ব্রহ্মতত্বের অনুরূপ 
তত্ব তিনি প্রথম জীবনে আবিষ্কার করেছিলেন। প্রকৃতির মধ্যে এক 
প্রচ্ছন্ন সর্বব্যাপী সন্তার উপস্থিতি তিনি অনুভব করেছিলেন। কিন্ত 
এ হল-তার মতে শুধু তাকে জানা ; অতিরিক্তভাৰে তাকে তিনি পেতে 
চেয়েছিলেন। এই পথেই তিনি তার জীবনদেবতাকে পেয়েছিলেন । 
ভার ধারণ।, ইনি বিশ্বসত্তার ব্যক্তিরূপী প্রকাশ। .এখানে তিনি 
ব্যক্তিবিশেষের প্রীতির কামনায় তার হাদরে অধিষ্ঠান নিতে উৎসুক । 

এই পথে রবীন্দ্রনাথ হাদয়বৃত্তির তৃপ্তি পেয়েছিলেন 'অস্তরের মধ্যে 
তার সঙ্গে প্রীতির সম্বন্ধ অনুষ্ভব করে। কিন্তু তাতেও গার পরিপূর্ণ 


৪৬ 


তৃপ্তিবোধ আসে নি। কারণ, জীবনদেবতা ব্যক্তিরগী হলেও তার 
নিজস্ব স্বতন্ত্র প্রকাশ নেই। কাজেই সেবার মধ্যে দিয়ে তাকে পাওয়। 
বায় না। শেষে রবীন্দ্রনাথ অন্থুভব করেছিলেন সেবার পাঅরূপে 
কে পেতে হলে মানুষের মধ্যে তার যে প্রকাশ সেই প্রকাশকে 
শ্রীতি করতে হবে, সেই প্রকাশকে সেবা করতে হবে। তাই তিনি 
জীবনদেবতাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, যেখানে তিনি বিশ্বমানবের 
মধ্যে বিরাজিত সেইখানেই গ্রীতির মধ্যে দিয়ে, সেবার মধ্যে দিয়ে 
বিশ্বনাথের সহিত মিলিত হবেন। বিশ্বসাথে যোগে যেখ। বিহারে, 
সেইখানে যোগ তোমাব সাথে আমারে। ॥ 


ছ্ই 
সিদধাম্ড 


সুতরাং আমর! দেখি রবীন্দ্রনাথ এক অবস্থায়, উপনিষদেব অতি কাছে 
এসেছেন, পবেৰ অবস্থায দূবে সবে গেছেন, আবাব নিজন্ব চিন্তার 
পরিণত রূপেব মধ্যে দিয়ে কাছে চলে এসেছেন। প্রথম জীবনে 
প্রকৃতির কবি হিসাঁবে তিনি সমগ্র বিশ্বেব মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন সন্তার 
উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। তার খন্থ দ্বার বখগ্ডিত বিচিত্র রূপের 
মধ্যে এক অখণ্ড একোব আবিষ্কাব করে যে শক্ত এই একা বিধান 
কবেছেন তিনি তাকে বিশ্ববপ বলে বণন। কবেছেন। উপনিষদ তাকেই 
ব্রহ্ম বলেছে এবং তাব বৈচিত্রাময় প্রকাশকে “আনন্দরূপমমূতম্‌, 
বলেছেন । এখানে রবীন্দ্রনাথ তাপ বৈদিক পৃরপুকষ যে-পথে 
গিয়েছিলেন সেই পথেরই অম্ুসরণ কবেছেন । 

দ্বিতীয় অবস্থায় দেখি ববীন্দ্রনাথ নিজের মতিগতির পথে এই 
ব্রক্মবাদ থেকে দূরে সবে এসেছেন ॥ তিনি বিশ্বসন্তাকে শুধু জানতে 
চান নি, তাকে প্রীতির সুত্রে পেতে চেয়েছেন। তার এই আকৃতি 
থেকেই তিনি 'জীবনদেবতা'কে তার হাদয়ের মধ্যে আবিষ্কার 


ত্৪৭ 


ধরেছেন। বিশ্বদেবত। নৈর্যক্তি ক-সত্ত। ৷ তিনি রবীজানাথের হাদয়বৃতিরে 
তৃপ্তি দিতে পারেন নি। জীবনদেবত! ব্যক্তিরূপী সত্তা, তার হতগ্্র 
প্রকাশ না থাকলেও তিনি ভক্তের মনে অধিষ্ঠিত হয়ে তার সঙ্গে 
শ্রীতির আদান-প্রদ্দান করতে পারেন। যিনি অসীম তিনি আনন্দ- 
আম্বাদনের জন্ক সীমার মাঝে ধরা দেন। যিনি বিধাতা হিসাবে 
বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি বন্ধু হয়ে হাদয়মন্দিরে ধরা দেন। 
এইভাবে তিনি উপনিষদের ব্রক্মবাদ থেকে ঘুরে সরে এসেছেন। 
অন্মাবাদের ক্রহ্ম নৈর্বযকিক-সত্ত।। রবীন্দ্রনাথ তার উপর একটি 
বিশেষ অবস্থায় ব্যক্রিত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রথম 
. প্রকাশটি কাজের প্রকাশ এবং দ্বিতীয়টি আনন্দের প্রকাশ । কাজের 
প্রকাশের মধ্যে বিশ্বদেবতাকে পাই; আনন্দের প্রকাশেব মধ্যে 
জীবনদেবতাকে পাই। এই জীবনদেবতা-তত্ব একটি অতিরিক্ত তন্ব। 
উপনিষদে তার স্বীকৃতি নেই। 

তৃতীয় অবস্থায় দেখি তার মানবিকাতত্বেব মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ 
আবার উপনিষদের কাছে সরে এসেছেন ॥ ছুই পথে তিনি তার 
মানবিকতাকে লাভ করেছিলেন। একটি হল ধর্মসাধনার পথ; 
অপরটি হল অখগুরোধের পথ। এ বিষয় এখনই আলোচন! করা 
হয়েছে। দ্বিতীয় পথটিতে তিনি স্পষ্টতই উপনিষদের চিস্তার অনুসরণ 
করেছেন। উপনিষদে বল! হয়েছে ব্রন্মের সর্বব্যাপিত্বের উপলব্ধি 
থেকে মানুষে মানুষে একত্ববোধ পরিস্ফুট হলে পরার্থে স্বার্থত্যাগ করা 
সহজ হয়। কাজেই এখানে পাই অখণ্ড জ্ঞান থেকে সকল মানুষের 
প্রতি গ্রীতি সঞ্চার এবং গ্রীতিবোধহেতু সর্বজনীন কল্যাণকর্মে উৎসাহ । 
রবীন্দ্রনাথের জ্ঞান-প্রেম-কর্মতত্ব এই পথের অনুসরণ ক্করেছে। এই- 
ভাবে পরিণত অবস্থায় রবীন্দ্রনাথের চিন্তা আবার উিপনিষদের খুব 
কাছে ফিরে এসেছে । 

এই আলোচন। থেকে বোঝ। যায়, রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের চিন্তার 
অন্ধ অনুগামী ছিলেন না। তিনি ম্বাধীনপথে চিন্তা করে, সাধন! 


২৪৮ 


করে, তার. নিজ তত্বে উপনীত হয়েছেন । এইভাবে অজানিতে 
তিনি কোথাও উপনিবদের অন্ুবর্তা হয়েছেন, কোথাও উপনিষদের 
চিন্ত1! থেকে দূরে সরে গেছেন। তবে একথা সত্য যে তিনি উপনিষদের 
প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন । 

প্রশ্ন ওঠে কেন এমন হল 1 কেন এত মিল, কেনই বা অমিল? 
মোটামুটি আমর। দেখি মিলই বেশি, অমিল সামান্য । উপনিষদের 
ব্ঙ্মবাদ তিনি অংশত গ্রহণ করেছেন, অংশত গ্রহণ করেন নি। কিন্তু 
উপনিষদের অন্য তত্বগুলির তিনি অস্থব্তা হয়েছেন। এইভাবে দেখি 
উপনিষদের ছৈতভাব তত্ব, আনন্দবাদ, মৃত্যু সম্বন্ধে চিন্তা এবং 
মানবিকতার তিনি অনুগামী হয়েছেন। কেবল দেখি উপনিষদের 
ঞ্েয়বাদের অনুরূপ তন্ব তার চিন্তায় গড়ে ওঠে নি। তার কারণ 
সম্ভবত নৈতিক সমস্তাগুলির বিভিন্ন দিক তার কাছে পরিষ্ফুট হয়ে 
ওঠে নি। স্বার্থ ও পরার্থের ছ্বন্ব তার নজরে এসেছে। তার সমাধান 
তিনি খুঁজেছেন সর্বজনীন প্রীতির মধ্যে দিয়ে । সুতরাং দেখা যায়, 
জীবনদেবতা-তত্বই একমাত্র অতিরিক্ত তত্ব । এখানে যেন উপনিষদের 
সধেশ্বরবাদের উপর একেশ্বরবাদের ভক্তিতত্ব আরোপিত হয়েছে। 
এখানেই রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ওপনিবদ্িক চিন্তা থেকে দুরে সরে 
এসেছে। 

এই বিগ্লেষণের পর কেন রবীন্দ্রনাথ সরে এসেছিলেন তার উত্তর 
দেওয়া সহজ্জ হয়ে পড়ে । উত্তর হল, তার মানসিক গঠন উপনিষদের 
খধির মানসিক গঠন থেকে কিছু ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। উপনিষদের 
খধি ছিলেন একাধারে কবি ও মনীষী । তাই উপনিষদের বচনে যেমন 
গ্রভীর দার্শনিক ত্য পাই, তেমন কাব্য পাই। ববীন্দ্রনাথ কবি ও 
মনীষী তে। ছিলেনই, অতিরিক্তভাবে ছিলেন হৃদয়বৃত্তিতে বিশেষ 
সম্ক্ধ। তাই তিনি শুধু মনীষ! দিয়ে সত্যকে জানতে চান নি, হাদয় 
দিয়ে তাকে প্রীতির সম্বন্ধে পেতে চেয়েছিলেন । এই মতিগতির ভিন্নত! 
হেতুই তিনি উপনিষদের খধির মত কেবল 'বেদাহমেতম্‌ বলে সন্ত 


২৪৯ 
উপানকা ২ 


হতে পারেন নি, বিশ্বসন্বাকে হদরবলতভ রুপে পেতে চেঃয়ছিলোস। 
তাই সার প্রেমপিপান্থ মন বিদেবতার মধ্যে জীবনদেবন্ডার অস্থি 
শাধিফার করেছিল । 

একটি বিষয় এই প্রসঙ্গে লক্ষ্য করা প্রয়োজন হয়ে গপড়ে। 
রবীন্দ্রনাথ অলক্ষ্যে উপনিষদের অন্যতম জেষ্ঠ ভাস্কার হয়ে বসেছেন । 
ভার কারণ ছুটি। প্রথম মূলত তার চিন্তা উপনিষদের চিন্তার অনুবর্তী। 
দ্বিতীয়ত সেই কারণে, তিনি উপনিষদের চিন্তার প্রতি একাতিক আনা 
গোষণ করতেন। তাই দেখি কাব্যে লে শ্রদ্ধা উচ্চুসিত হয়ে আত্ম- 
প্রকাশ করেছে। স্তার উপাসনা শ্রেণীর ভাষণগুলির মধ্যে উপনিষঙগের 
বাণী উদ্ধৃত করে নিজের চিন্তার তিনি সমর্থন খু'ঁজেছেন। এমন কি 
এক অবস্থায় উপনিষদ্দের ব্যাখ্যাকারের ভূমিকাও তিমি গ্রহণ 
করেছেন । তার প্রমাণ পাওয়া যায় "সাধনা নামক ভার ইংরাজি গ্রন্থে। 
১৯১৩ শ্রীস্টাব্ে তিনি মাঞ্চিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেকগুলি ভাষণ দেন। ভার 
বিষয় ছিল বুদ্ধের ও উপনিষদের বনের ব্যাখ্যা । উপনিষদের প্রতি 
প্রগাঢ় শ্রদ্ধাই তাঁকে এই ভূমিক! গ্রহণে উৎসাহিত করেছিল । 

এই প্রসঙ্গে সাধনার মুখবন্ধে গার একটি মন্তব্য বিশেষ 
প্রণিধানযোগ্য । ত। আমাদের, উপরের উক্তিকে সমর্থন করবে । 
মস্ত্ব্যটির বাংল! অম্বাদ এই ঠাড়ায় £ 

“আমার কাছে উপনিষদের শ্লোক এবং বুদ্ধের বাদী চিরদিন 
আধ্যাত্বিকতাগুণে সমৃদ্ধ এবং সেই কারণে সীমাহীন বিষ্তায়ের 
শঞ্তিধারণ করে মনে হয়েছে। আমি সেগুলিকে আমার নিজের 
জীবনে প্রয়োগ করেছি এবং ভাষণে ব্যবহার করেছি, কারণ তাদের 
আমার ব্যক্তিজীবন তথ! সকলের জীবনের কাছে তাৎপর্য জাছে হনে 
হয়েছে। 

উপনিষদের চিন্তার প্রতি রবীঙ্নাথের গভীয আধা সুদ্দরভাবে 
আত্মপ্রকাশ করেছে 'নৈষেন্-এরও অন্বরূর্ষি একটিফবিষ্কার অংশে? 


৩. নৈযেদা, &৭ 
বৰ 


হে সফল ঈত্বয়ের পরম টীশ্বয়, 
ভগোবন তরুচ্ছায়ে মেঘমজ্ জ্বর 
ঘোষণ! করিয়াছিল সবার উপনে 
অগ্নিতে, জলেতে, এই বিশ্বচরাচরে 
বনস্পতি ওষধিতে এক দেবতার 
অথণগ্ড অক্ষয় এক্য। সেবাক্য উদার 
এই ভারতেরি। 


উপনিষদের বাণীর এমন একটি উদার স্বর আছে যা স্ঠাকে 
বিশেষভাব মুগ্ধ করেছিল। তার বৈষয়িক সুখের প্রতি অনাসক্তি, 
ভার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, তার সন্গ্যাসবাদ পরিহার, ভার এই ধুলিময় 
ধরণীর মধ্যে আনন্দ ও 'মমৃতরূপের আবিষ্কার তার মনকে তার প্রতি 
বিশেবভাবে শ্রদ্ধাবিষ্ট করেছিল । তার মধ্যে মানুষের মনকে দৈনচ্দিন 
জীবনের ক্ষুত্রতা ও নীচতার উধের্ব আক করবাব ক্ষমতা দেখে তিনি 
বিশ্ময়াবিষ্ হয়েছিলেন । শুধু তাই নয়, তার মধ্যে তিনি বর্তমান 
কালের মানুষের বিক্ষুন্ধ মনকে শান্ত করবার শক্তিও আবিষ্কার 
করেছিলেন। বর্তমান যুগের সংঘাত ও সংঘষের অশান্তি এবং 
বৈষয়িক আসক্তির কদর্ধত। তার মনকে গীড়। দিয়েছিল । তাই 
“নৈবেন্-এর আর এক কবিতায় তিনি ক্ষোভ করে বলেছিলেন £ 
আর বার এ ভারতে কে দিবে গো আনি 
সে মহা-আনন্দ মন্ত্র, সে উদাত্ত বাণী 
সজ্জীবনী স্বর্গে মর্তে সেই মৃত্যুজয় 
পরম ঘোষণা, সেই একাস্ত নির্ভয় 
অনস্ত অযুতবার্তী। 
রে স্বৃত ভায়ত, 
গুধু সেই এক আছে, নাহি অন্ত পথ। 


6, নৈবেদা। ৬৪ 
খ্ঃ 


আমাদের পরম সৌভাগ্য, ঘটনাচক্রে রবীজ্রনাথ সেই ভূমিক! 
নিজেই গ্রহণ করেছিলেন । তার মতো উপযুক্ত পাত্র আমর আর 
কোথায় পাব? সেই কাব্যশক্তি, সেই মনীষ। তার বচনে আরও 
বর্ণাচ্য রূপ পেয়ে আর একবার আমাদের কাছে আত্মপ্রকাশ করেছে। 
রবীন্্রসাহিত্য উপনিষদের বাদীরই নূতন রূপ। রবীন্দ্রনাথ বর্তমান 
যুগের আধুনিক কবি নন, তিনি সেই প্রাচীন যুগের খষিকবির 
নবতম আবির্ভাব । 


সমাপ্ত 


4